এশিয়া এবং আফ্রিকার সংযোগস্থলের ছোট দেশ ইজরায়েল যা আগে কিনা প্যালেস্টাইন হিসেবে পরিচিত ছিল। মাত্র ২২,০০০ বর্গ কিলোমিটার এর আয়তন। লোক সংখ্যা মাত্র ৭৭ লক্ষ, ৭৬% ইহুদী, ২১ ভাগ আরব মুসলমান এবং বাদ বাকী অনান্য। পৃথিবীর একমাত্র ইহুদীপ্রধান দেশ ইজরায়েল। এই এলাকা নিয়ে ইহুদি এবং আরবদের মধ্যে দ্বন্দ অনেক প্রাচীন কাল থেকেই ।
এই ভুখন্ড নিয়ে যুদ্ধ হয়েছে অনেক। আব্রাহাম বা ইব্রাহীম নবীর ছোট ছেলে ইসাকের হলেন ইহুদিদের পুর্বপুরুষ। ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তোরার মতে স্বয়ং আল্লাহ এই ভুখন্ডের মালিকানা(The promised land) দিয়েছেন ইসাকের অধস্তনদের অর্থাৎ ইহুদীদের। কোরানে রাজা ডেভিড, সলোমন, জেকব, থেকে শুরু করে অনান্য নবীদেরকেও স্বীকার করে নেওয়া আছে। ইব্রাহিমের অপর পুত্র হলেন ইসমাইল এবং আরবেরা হলেন ইসমাইলের অধস্তন পুরুষেরা। বাইবেলের এবং তোরা’র দাবী অনুসারে ইসমাইল ছিলেন দাসীর পুত্র এবং তাদেরকে বহিস্কার করা হয় । কোরানে বলা আছে আল্লাহ এই ভুখন্ড ইব্রাহীমের সব ছেলের মধ্যে সমানভাবে বন্টনের করেছেন। সেই হিসেবে আরবেরাও এই ভুখন্ডের দাবীদার।এখানকার “টেম্পল মাউন্ট থেকে হজরত মোহাম্মদ(সাঃ) মিরাজে যান, এখানকার মসজিদে নামাজ পড়েন ইত্যাদি। এটা হল ধর্মীয় ব্যাখ্যা।
বাস্তবতা হল এই অঞ্চলে ইহুদিরা রাজত্ব করেছে ১৩শ’ খৃস্টপূর্বাব্দ থেকে ১ম শতাব্দী খৃঃপূঃ পর্যন্ত। এরপর রোমান সাম্রাজ্য, পরে এসেছে বাইজেন্টাইনরা । পারস্যের সাসানিদরা ও শাসন করেছে কিছুদিন। মুসলিম দখলে আসার আগ পর্যন্ত ইহূদীরা এই অঞ্চলে সংখাগরিষ্ঠ থেকেছেন। এরপর ৬৩৭ খৃস্টাব্দে হজরত ওমর(রাঃ) এই এলাকা মুসলিম দখলে আনেন। পরবর্তী প্রায় ১৩০০ বছর পর্যন্ত এই এলাকা মুসলমানদের দখলে থেকেছে। মুসলিম আমলেই এখানে গড়ে ওঠে মসজিদ আল-আকসা, “ডোম অফ দি রক” ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর স্থাপত্য কীর্তি। এই সময়কালে ইহুদি এবং মুস্লমানদের সাথে খুব বড় কোন ঝামেলার সৃস্টি হয় নি। মোটামুটি শান্তিপূর্ন ভাবেই বাস করেছে মুসলমানেরা এবং ইহূদীরা।
জায়নবাদের প্রবক্তা “ থিওডোর হার্জেল” ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত তার বই “The Jews state” এ ইহুদীদের জন্য পৃথক আবাসভূমি’র প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তার বই এবং লেখা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদীদের মধ্যে ঝড় তোলে। তারা সবাই প্যালেস্টাইনকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে থাকেন। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ কালীন সময়ে এই এলাকা ছিল তুরস্কের সুলতানদের অধীন। ১৯১৭ সালে বৃটেনের পররাস্ট্রমন্ত্রী, আর্থার বেলফুর প্যালেস্টাইনে ইহুদী রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষনা দেন যা “বেলফুর ঘোষনা” হিসেবে খ্যাত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের সুলতান জার্মানীর পক্ষ নেন। বৃটিশ সরকার প্রতিজ্ঞা করেন যে তুরস্কের সুলতানের বিরুদ্ধে যদি আরবেরা বিদ্রোহ করেন তাহলে আরবদের ও সহযোগিতা করা হবে এবং প্যালেস্টাইন সহ যে সমস্ত আরব এলাকা তুর্কি শাসনাধীন ছিল তা স্বাধীনতা লাভ করবে ।আরবদের বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন ফয়সল যিনি পরবর্তীতে সঊদি আরবের বাদশা হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয়ের পর আরবেরা তুর্কী শাসনের কবল থেকে বেরিয়ে এলেও ১৯২০ সালের লীগ অফ নেশন’স এর ম্যান্ডেট অনুযায়ী এই এলাকা থেকে যায় বৃটিশ শাসনাধীন । বৃটিশ ম্যান্ডেট শেষ হয় ১৫ই মে ১৯৪৮ সাল। বেলফুর ঘোষনার পর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ইহুদীরা এসে বসতি গড়তে থাকে প্যালেস্টাইনে, ক্রমশ বাড়তে থাকে ইহুদীদের সংখ্যা। আরবেরা নিজ দেশে পরবাসী হওয়ার আতঙ্কে পড়েন। শুরু হয় আরব ইহুদী দ্বন্দ। দাঙ্গা শুরু হয় আরব এবং ইহুদীদের মধ্যে যা ১৯২০,৩০ এবং ৪০ দশকেও চলতে থাকে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে ইউরোপে হিটলারের রোষানলে পড়ে ব্যাপক সংখ্যক ইহুদীরা পালিয়ে আসে প্যালেস্টাইনে। ১৯৪৭ সালে সদ্য প্রতিষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘ প্যালেস্টাইনকে আরব এবং ইহুদীদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করলেও তা আরবেরা মেনে নেয় নি। ১৪ই মে ১৯৪৮ সালে ইহুদী নেতা ডেভিড বেন গুইরো স্বাধীন ইজরায়েল রাস্ট্রের ঘোষনা দেন। শুরু হল আরব ইজরায়েল যুদ্ধ।
আরবদের সাথে ইহুদী ইজরায়েলের যুদ্ধ সব সময় চলছে। তবে এ পর্যন্ত ঘোষিত যুদ্ধ হয়েছে তিনটা, ১৯৪৮ সাল, ১৯৬৭ সাল এবং ১৯৭৩ সাল।
সংক্ষেপে সেই যুদ্ধ গুলো দেখে নেই একবার।
১৯৪৮ সালের যুদ্ধঃ- ১৯৪৮ এর ১৫ ই মে থেকে ৯ই জানুয়ারী ১৯৪৯ পর্যন্ত চলে এ যুদ্ধ । এই যুদ্ধে আরব লীগের অধীন আরব দেশ মিশর, সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন, সৌদি আরব, ইয়েমেন, ইরাক, সুদান ইত্যাদি দেশ গুলো অংশ নেয়। প্রথম দিকে আরব দেশ গুলো সাফল্য পেলেও আরব দেশগুলোর সার্বিক পরাজয়ের মধ্য দিয়েই শেষ হয় এই যুদ্ধ। যুদ্ধের ফলাফলে দেখা যায় ইজরায়েল তার দেশের সীমানা সুসঙ্গঠিত করে ।
প্রায় ৪ লক্ষ শরনার্থী ইজরায়েল ছেড়ে পাশের আরব দেশ গুলোতে আশ্রয় নেন যারা এখনো আর তাদের জন্মস্থানে ফিরতে পারেন নি। ইজরায়েল পক্ষে ৬০০০-৮০০০ জন এবং আরব পক্ষে ৮০০০ থেকে ১৫,০০০ জন মারা যান।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধ – এটাকে বলা হয়ে থাকে ৬ দিনের যুদ্ধ।৬৭ সালের ৪ঠা জুন থেকে শুরু করে ১০ই জুন পর্যন্ত চলে এই যুদ্ধ। সামরিক পরিভাষায় “Pre emptive attack”। প্রথম আক্রমন করে ইজরায়েল। এবং প্রথম দিনেই মিশরীয় বিমানবাহিনীর ৫০% যুদ্ধ বিমান ধ্বংশ করে দেয়। যুদ্ধের ফলাফলে ইজরায়েল মিশরের কাছ থেকে সিনাই মরুভুমি এবং গাজা এলাকা, জর্দানের কাছ থেকে জেরুজালেম সহ জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের এলাকা, সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান উপত্যকা ইত্যাদি এলাকা দখল করে নেয়।আরব পক্ষে মিশর সিরিয়া এবং জর্ডানের সেনাবাহিনীর সাথে যোগ দেয় তিনিসিয়া, মরক্কো, সুদান, লিবিয়া , কুয়েত, সউদি আরব, ইয়েমেন, ইরাক আলজেরিয়া এবং প্যালেস্টাইন লিবারেশান অর্গানাইজেশানের যোদ্ধারা।
এই সময় ইজরায়েলের সমারিক শক্তি ছিল ২,৬৪,০০০ সৈন্য যার মধ্যে ১০০,০০০ যুদ্ধে অংশ নেন, ৩০০ বিমান, এবং ৮০০ ট্যাঙ্ক।
আরব পক্ষে ছিল মোট ৫লক্ষাধিক সৈন্য যার মধ্যে প্রায় আড়াই লক্ষ্য সৈন্য যুদ্ধে অংশ নেয়, ছিল ৯৫৭টি যুদ্ধ বিমান এবং আড়াই হাজারের বেশী ট্যাঙ্ক। আরব পক্ষে ৪৫০ টিরও বেশী বিমান ধ্বংশ হয়, মারা যায় ১৫০০০ -২০০০০ যোদ্ধা এবং সহস্রাধিক ট্যাঙ্ক ধংশ প্রাপ্ত হয়। প্রায় ৬ হাজার আরব যুদ্ধবন্দী হন।
পক্ষান্তরে ইজরায়েল হারায় ১ হাজার যোদ্ধা, ৪৫০০ জন যখম হন, ৪৬টি বিমান হারায় এবং মাত্র ১৫ জন ইজরায়েলী যুদ্ধবন্দী হন।
এই যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যায় সুয়েজ খাল, লোহিত সাগরকে ভুমধ্য সাগরের কে যওগ করার ফলে গড়ে উঠেছে এশিয়া এবং ইউরোপের প্রধান যোগাযোগ রক্ষাকারী নৌপথ। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির আওতায় সিনাই ফিরে পায় মিশর, গোলান মালভূমিও ফিরে পেয়েছে সিরিয়া।
১৯৭৩ সালের যুদ্ধঃ- ১৯৭৩ সালের আরব ইজরায়েল যুদ্ধকে বলা হয়ে থাকে ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধ (Yom Kippur war)। ইয়ম কিপ্পুর হল ইহুদি ধর্মের পবিত্রতম দিন। এই দিনেই মিশর এবং সিরিয়া একসাথে আক্রমন করে ইজরায়েলকে। প্রথমদিকে কিছুটা বেকায়দায়ই পড়ে ইহুদিরা। পুরোপুরি যুদ্ধে নামতে তাদের সময় লাগে আরো ২/৩দিন মত। অক্টোবর মাসের ৬ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত চলে এই যুদ্ধ।
আরব পক্ষে এই যুদ্ধে অংশ নেয় বরাবরের মত মিশর, সিরিয়া, জর্ডান, ইরাক।
এই সময় আরবদের শক্তি ছিল- মিশর (৬ থেকে ৮ লক্ষ্য সৈন্য, ১৭০০ ট্যাঙ্ক, ২,৪০০ আর্মার্ড ক্যারিয়ার, ১০৪ টি যুদ্ধ জাহাজ, ১৪০টি হেলিকপ্টার, ১৫০টি মিসাইল ব্যাটারী এবং ৪০০ যুদ্ধ বিমান) সিরিয়া ( দেড় লক্ষ সৈন্য, ১২০০ ট্যাঙ্ক, ৮০০-৯০০ আর্মার্ড পারসোনেল ক্যারিয়ার,
ইজরায়েলের ছিল সাড়ে তিন থেকে ৫ লক্ষ সৈন্য, ১৭০০ ট্যাঙ্ক, ৪৪অটী যুদ্ধ বিমান, ৩০০০ আর্মার্ড ক্যারিয়ার এবং ৯৪৫ টি আর্টিলারী ইউনিট।
ফলাফলঃ- আরব পক্ষে ৮থেকে ১৫ হাজার জন নিহত, ১৮ থেকে ৩৫ হাজার আহত, ৮ হাজারের বেশী যুদ্ধবন্দী, আড়াই হাজার ট্যাঙ্ক এবং ৩৫০-৫০০ বিমান ধ্বংশ ১৯টি যুদ্ধ জাহাজ ডুবে যায় । ইজরায়েল পক্ষে আড়াই থেকে ৩ হাজার নিহত, সাড়ে সাত থেকে ৯ হাজার আহত ২৯৩ জন যুদ্ধবন্দী এবং ৪০০ ট্যাঙ্ক ধ্বংস প্রাপ্ত, ১০২ টি যুদ্ধ বিমান ধ্বংশ।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০১১ সকাল ১০:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



