(আগেই বলে দিচ্ছি আপনি যদি গালিবাজ,উগ্রবাদি,ইসলামোফোবিক কিংবা রাজাকার হয়ে থাকেন তবে আগেভাগেই বিদায় নিন।)
প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি মিশরে আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে নির্মিত হয়েছিল গিজার বিখ্যাত পিরামিড। আজ চার হাজার বছর পর আবারও কি নতুন কোন পিরামিড তৈরি হচ্ছে কিংবা হবে? যদি তাই হয় তবে এবার আর তা পাথরের তৈরি হবে না। বরং বিশ্ব দেখবে এক বীভৎস দৃশ্য; লাশের তৈরি একেবারে আনকোরা নতুন এক পিরামিড।
স্মৃতিটা একটু ঝালাই করে নেওয়া যাক। তিউনিশিয়ার দেখাদেখি মিশরেও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মত আরব বসন্তের ছোঁয়া লাগে। ফলশ্রুতিতে ২০১১ তে পতন ঘটে তিন দশক মিশর শাসন করা হোসনি মোবারকের। অন্যান্য আরব দেশে যেসব আন্দোলন হয়েছে তাতে সব চিন্তাধারার লোক অংশ নিলেও ইসলামিস্টরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর মূল কারণ আরব বিশ্বের একনায়কদের দ্বারা তারাই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত ছিল। আর এখানেই মিশর ব্যতিক্রম। তাহরির স্কয়ারে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তাতে ইসলামিস্ট,সেকুলার,লেফটিস্ট ইত্যাদি সব ঘরানার লোকই প্রায় সমানুপাতে ছিল। এর প্রমাণ মেলে ২০১২ তে অনুষ্ঠিত মিশরের ইতিহাসের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত ডঃ মুরসি সামান্য ব্যবধানে (৫১.৭৩% ভোট) জয়ী হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আহমেদ শফিক পান ৪৮.২৭% ভোট। স্পষ্টতই মিশরের জনগণ দুভাগে বিভক্ত হয়ে রায় দেয়।সমস্যার শুরু মূলত ওখানেই।আর কোন জাতি যখনই বিভক্ত হয়ে পড়ে তখনই সেখানে হায়েনার মত ফায়দা লুটতে থাকে বহিঃশক্তি। এই 'Divide and Rule' পলিসি দিয়েই ব্রিটিশরা দুনিয়া শাসন করেছে।
গণতন্ত্রের সোল এজেন্ট টাইটেল এর প্রধান দাবিদার আমেরিকা নির্বাচনের রায় মেনে নিতে বাধ্য হয়। তবে বহু পুরাতন মিত্র মুবারকের স্থানে ইসলামিস্ট মুসলিম ব্রাদারহুডকে তারা যে কখনোই অন্তর থেকে মেনে নিতে পারেনি তার প্রমাণ মেলে যখন আমেরিকান কংগ্রেসের কিছু সদস্য হিলারি ক্লিনটনের ডেপুটি চীফ অফ স্টাফ হুমা আবেদিনের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি সহানুভূতির অভিযোগ আনে। মুরসি ক্ষমতায় এসেই নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। তিন দশকের একচেটিয়া শাসনের ফলে প্রশাসন এবং সেনাবাহিনী ছিল মুবারকপন্থিদের পূর্ণ দখলে। স্বভাবতই অনেকেই মুরসি সরকারের সাথে সহযোগিতা করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। অনেকে কৌশলে সরকারি দায়িত্ব এড়িয়ে যান। ফলে মুরসি প্রশাসনের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেতে অসমর্থ হন। প্রশাসনিক কাঠামোতেই যখন গলদ তখন দেশের স্বাভাবিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত হতে বাধ্য। মুরসির প্রতিপক্ষ যারা মিশরের জনগণের প্রায় অর্ধাংশ তারা ধীরে ধীরে অসন্তুষ্ট হয়ে উঠতে থাকে।
এরই মাঝে ২০১২ এর ডিসেম্বরে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরায়েল অবরুদ্ধ গাজায় আবারও সেনা অভিযান চালায়। ১০০ এর উপর ফিলিস্তিনি শহীদ হন। স্বাভাবিকভাবেই এন্টি জায়োনিস্ট মুরসি সরকারের কন্সেন্ট্রেশন কিছুটা হলেও সেদিকে ঘুরে যায়। ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ছিল গাজায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে নবনির্বাচিত মুরসি সরকারকে মিসর- ইসরায়েল শান্তিচুক্তি (আনোয়ার সাদাত কর্তৃক স্বাক্ষরিত) ভঙ্গে প্রলুব্ধ করা। কিন্তু ব্রাদারহুড এখানে ধৈর্যের পরিচয় দেয়। তারা আন্তর্জাতিক মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে এবং এক্ষেত্রে তারা সফলও হয়। গাজায় সিজফায়ার চুক্তি স্বাক্ষরেও প্রধান অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেন মুরসি যার ফলে তিনি সারা বিশ্বেই প্রশংসিত হন। এটা ছিল ইসরায়েলের উপর মিশরের ডিপ্লোম্যাটিক ভিক্টরি। তবে এসব করতে যেয়ে মিশরের অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যা অবহেলার মুখে পড়ে। বেকারত্ব বাড়তে থাকে, কিছু জায়গায় খাদ্যাভাব দেখা দেয়। মুরসির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ধীরে ধীরে স্ফীত আকার ধারণ করে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এন্টি জায়নিস্ট হওয়ায় ব্রাদারহুডের প্রতি মৌন সমর্থন রাখব এটা স্বাভাবিক। তবে তাদেরও কিছু সমালোচনার জায়গা আছে। প্রথমত মিশরে দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ এবং সরকার কর্তৃক নিপীড়িত থাকায় হঠাৎ ক্ষমতা পেয়ে ব্রাদারহুডের একটা অংশ ক্ষমতা দখলে মরিয়া হয়ে উঠে। মিশরকে রাতারাতি ইসলামাইজড করার এক অবাস্তব স্বপ্নে মেতে উঠেন তারা। মুরসির উপরও চাপ প্রয়োগ করা শুরু হয়। মুরসিও কিছুটা প্রভাবিত হন। ফলে মুরসি বিরোধী আগুনে বাতাস লাগা শুরু হয়। ব্যক্তিগতভাবে সৎ মুরসি (যা তার বিরোধীদের অনেকেও স্বীকার করেছে) নিজের অজান্তেই মিশরের প্রেসিডেন্ট থেকে ব্রাদারহুডের প্রেসিডেন্টে পরিণত হতে শুরু করেন। আমার মত আরও অনেককেই অবাক করে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক পূর্বে তিনি যে ভাষণ দেন তাতেও তিনি ক্ষমতা আঁকড়িয়ে ধরে রাখার ঘোষণা দেন। রাজনৈতিক খেলায় অনভিজ্ঞ মুসলিম ব্রাদারহুড এখানেই ভুল করে বসে। যার ফলে হালে পানি পেয়ে যায় মিশরের জায়নিস্ট মাইন্ডসেটের সেনাবাহিনী।
এরপরের কাহিনী তো সবারই জানা। ব্রাদারহুডের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে কিভাবে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। রক্ষা পাচ্ছে না মসজিদও। নারী-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে পাখির মত মারা হচ্ছে মানুষ। এক কায়রোর অভিযানেই প্রায় ৬০০ লোক শহীদ হয়েছেন (সরকারি হিসাব মতেই!); অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আল বারাদিও পদত্যাগ করেছেন। উল্লেখ্য ব্রাডারহুড কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়েও তার সমর্থকদের দ্বারা বিরোধীদের উপর সশস্ত্র আক্রমণ চালানোর ঘোষণা দেয়নি। দুই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকতে পারে। তবে মুসলিম ব্রাদারহুডই সম্ভবত ইতিহাসের একমাত্র দল যারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই এমন মার খেল কিন্তু শক্ত হাতে বিরোধীদের দমন(পড়ুন হত্যা) করল না। কায়রোতে সংঘটিত গনহত্যার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ এবং বহুরূপী আমেরিকাও। অবশ্য গদি টিকিয়ে রাখতে সৌদি বাদশাহ মিশরের সেনাবাহিনীর সমর্থন দিয়েছেন। এমনটা তার কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত নয়। বহুদিন ধরেই সৌদি রয়্যাল ফ্যামিলি ইসরায়েলের পারপাস সার্ভ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সৌদি দালালদের এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
যাই হোক, সেনাবাহিনীর এমন বেপরোয়া আচরণ শুধু ব্রাদারহুডের জন্যই নয় বরং মিশরের সব মানুষের জন্য বিপদ সংকেত। এখন যেসব সেকুলার বা লেফটিস্ট ভাবছেন সেনাবাহিনী তো ইসলামিস্টদেরকে মারছে। সমস্যা কি? তাদেরকে বলছি সমস্যা হল আপনারা যদি ভেবে থাকেন সেনাবাহিনী জনগণের অধিকার রক্ষা করবে আর দেশে গণতন্ত্র সমুন্নত রাখবে তাহলে আপনি নেহাতই দিবাস্বপ্ন দেখছেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্রগুলো কায়েম হওয়ার পর থেকে একটা উদাহরণ দেখাতে পারবেন যেখানে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় এসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেছে? আপনাদের কি মনে হয় সেনাবাহিনী আপনাদেরকে জামাই আদরে রাখবে? কথাগুলো আপাতদৃষ্টিতে মিশরের জন্য প্রযোজ্য হলেও আমি এখানে কথাগুলো সেসব বাংলাদেশীদের উদ্দেশ্যে বলছি যারা কোন এক অজানা কারণে মিশরের গনহত্যাকে সমর্থন দিচ্ছেন। যে জাতি একাত্তরে সেনাবাহিনীর ভয়াবহ গনহত্যার সাক্ষী সেই মহান জাতির অংশ হয়ে কিভাবে আপনি বিশ্বের যেকোনো স্থানে সেনা আগ্রাসনের সমর্থন দিতে পারেন? আর মিশরের জনগণকে নিজের ভাগ্য নিজেই ঠিক করতে হবে। কারণ ''আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে'' (আল কুরআন ১৩:১১) অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কারাগারের পেছন থেকে আবারও যেন শাসক হয়ে উঠেছেন হুসনি মোবারক। মিশর কি আবার সেনা শাসনে ফিরে যেতে চায়? আবারও ত্রিশ বছরের ইমারজেন্সি স্টেটে (ইতোমধ্যে জারি করা হয়েছে) ফিরে যেতে চায়? যদি তা না চায় তবে মিশরের সর্বস্তরের সর্বমতের মানুষকে আজই সেনাবাহিনীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তা নাহলে শেষপর্যন্ত ক্ষতি জনগণেরই হবে। আর ফায়দা লুটবে বিদেশী শক্তি। লাশের তৈরি পিরামিডের ধারণাও তখন বাস্তবে রূপ নিবে। মনে রাখতে হবে যে মত নিয়ে তর্ক বিতর্ক পরেও করা যেতে পারে কিন্তু একবার আগের মত সেনাশাসন কায়েম হয়ে গেলে বিতর্ক তো দূরে থাক, মত প্রকাশের স্বাধীনতাটুকুও পাওয়া যাবেনা।
পোস্টের শেষে কেবল মিশরের ভয়াবহ পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য মিশরপ্রবাসী ব্লগার মাহমুদুল হাসান কায়রোর একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস (অনুমতি সহকারে) শেয়ার করলামঃ
''আপডেট:
গত রাত থেকে ঘেরাও করে রাখা রামসিস এর বিখ্যাত মসজিদ আল ফাথ'হে আটকে থাকা কয়েকশ মানুষের উপর এ্যাকশনের প্রস্তুতি চলছে। যে কোন সময় যৌথ বাহিনীর অভিযান........
অভিযোগ: তাদের নিকট অস্ত্র রয়েছে..........''
(যুক্তিভিত্তিক কমেন্ট স্বাগত জানাই)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০১৩ রাত ১১:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


