"রাইফেলের নলের দিকে এই অবোধ শিশু কীভাবে তাকিয়ে ছিল ভাবলেই আমার বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে।"
লজ্জামুক্তি দিবস
হুমায়ূন আহমেদ
১৯ নভেম্বর। দুই হাজার নয়। বৃহস্পতিবার। আমি টিভির সামনে বসে আছি। এগারোটা বাজার অপেক্ষায়। বলা হয়েছে, এগারোটা মাহেন্দ্রক্ষণ। এই ক্ষণে জাতি হয়তোবা লজ্জা থেকে মুক্তি পাবে। সময় একটু বেশি লাগল, প্রায় বারোটা। বিশেষ ঘটনা ঘটল। চৌত্রিশ বছর পর জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের বিচার হলো।
কোলকাতার এক টিভি চ্যানেল থেকে টেলিফোন, তারা জানতে চাচ্ছে আমার কেমন লাগছে? আমি বললাম, লজ্জামুক্তির আনন্দ পাচ্ছি। আজ আমাদের লজ্জামুক্তি দিবস।
আমাকে সরাসরি প্রথম লজ্জা দিয়েছিলেন একজন বিদেশি। তার নাম ড. জেনো উইকস। তিনি নর্থ ডাকোটা স্টেট
ইউনিভার্সিটির পলিমার সায়েন্স বিভাগের প্রধান। এক সকালে হঠাৎ আমাকে বললেন, কফি খাবে? তোমার কফির দাম আমি দেব।
আমি যথেষ্ট আহ্লাদিত হওয়ার ভঙ্গি করলাম। আমেরিকানরা হিজ হিজ হুজ হুজ নিয়মে চলে। অন্যের কফির দাম দেয় না।
প্রফেসরের সঙ্গে মেমোরিয়াল ইউনিয়নের রেস্টুরেন্টে কফি খেতে গেলাম। তিনি কফির মগে চুমুক দিয়ে হঠাৎ করেই পড়াশোনার বাইরে একটা প্রশ্ন করলেন। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, তোমাদের দেশের জনক একজন বিখ্যাত মানুষ। তাই না?
আমি বললাম, হ্যাঁ।
তার নাম আমার মনে আছে। শেখ মুজিবুর রহমান। হয়েছে?
আমি বললাম, সামান্য ভুল হয়েছে। তার নামের আগে বঙ্গবন্ধু শব্দটি ব্যবহার করতে হয়।
প্রফেসর বললেন, এর অর্থ কী?
আমি বললাম, এর অর্থ বাংলাদেশের বন্ধু। দেশের মানুষ তাকে আদর করে এই টাইটেল দিয়েছে।
বলো কী!
শুধু তাকে না, তার স্ত্রীকেও দেশের মানুষ ডাকে বঙ্গমাতা। এর অর্থ, দেশের জননী।
প্রফেসর বললেন, তোমাদের এসব টাইটেল তো অর্থহীন। তোমরা এই পরিবারটির প্রায় সব সদস্যকে খুন করেছ। খুনিদের রক্ষার জন্য আইন পাস করেছ। হত্যাকারীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার কথায় কি কোনো ভুল আছে?
আমি বললাম, না।
প্রফেসর বললেন, আমাদের দেশের কিছু প্রেসিডেন্ট আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন। আমরা কিন্তু হত্যাকারীদের রক্ষার জন্য আইন পাস করিনি।
প্রফেসরের সামনে আমি লজ্জায় মাথা নিচু করলাম। তাকে মুখ দেখাতেও লজ্জা লাগছিল। মনে হচ্ছিল, মুখে নোংরা কাদা লেগে আছে।
প্রফেসর জেনো উইকস দু'বছর আগে মারা গেছেন। এই মহাপ্রাণ মানুষ তার সব বিষয়-সম্পত্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গেছেন। তিনি বেঁচে থাকলে আমি অবশ্যই তাকে বলতাম, স্যার, জাতি হিসেবে আমরা লজ্জায় ডুবেছিলাম। আজ লজ্জা থেকে মুক্তি পেয়েছি।
আনন্দের এই দিনে অন্য একটা প্রসঙ্গ বলতে ইচ্ছে করছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আলামতে আমার মতো অভাজন লেখকের অতি সামান্য ভূমিকা আছে। আমার লেখা সায়েন্স ফিকশন 'তোমাদের জন্য ভালোবাসা' বইটি সেই আলামত। বুলেটবিদ্ধ এই বই নিম্ন আদালতে প্রদর্শিত হয়েছিল।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে যে জাদুঘর আছে, সেখানেও নাকি বইটি আছে। আমি সেই জাদুঘরে কখনও যাইনি। যে বাড়িটিতে ছোট্ট রাসেলের দীর্ঘশ্বাস জড়িয়ে আছে, সেখানে আমি কখনও যাব না।
পনেরো আগস্ট আমার বঙ্গবন্ধুর আগে ছোট্ট রাসেলের কথা মনে পড়ে। রাইফেলের নলের দিকে এই অবোধ শিশু কীভাবে তাকিয়ে ছিল ভাবলেই আমার বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে। আহারে আহারে!
তথ্যসূত্র: আমার দেশ পত্রিকার এক পাঠকের কমেন্ট
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


