somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রূপকথা নয়!

০৫ ই এপ্রিল, ২০১০ বিকাল ৫:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি ওকে জিগ্যেস করলাম, 'ওটা কি'?
রূপাই বললো, 'ওটা তোর'।
-'আমার তাহলে ঝুলিয়ে রেখেছিস কেন? দিয়ে দিলেই পারিস!'
-উঁহু। এখন দেবনা।
এই বলে সে মিটিমিটি হাসতে লাগলো।

ওর নাম রূপকথা। কেউ ডাকে রূপা, কেউ বা কথা। আমি যখন যা খুশি-তাই ডাকি। আমার বন্ধু রূপাই। কিংবা রূপকথা। বন্ধুদের আড্ডার ভীড়ে, কখন যেন আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল অদ্ভুত এক বন্ধুত্ব। বন্ধুর চেয়ে বেশি, কিন্তু প্রেমের নয়। যদিও অসংখ্য টিপ্পনির মাঝেও আমাদের সম্পর্কটা ছিল অনেক বেশি অনুভূতির।
ও আমাকে চিঠি লিখত। আমিও লিখতাম। বছরে দুটো করে। আমি লিখতাম আমার জন্মদিনে, আর ও লিখত ওর জন্মদিনে। তখন তো আর মোবাইল কিংবা ইন্টারনেটের সময় নয়, যে চাইলেই কথা হবে! তাই আমাদের সবকিছু যেন ঠাঁই পেত চিঠির আদরে। আমি ২৪ পৃষ্ঠা লিখলে, ও লিখত ২৫ পৃষ্ঠা। আর দেখাও হত বছরে দু'বার কি তিনবার। আমাদের অনুভূতিরা যতই কাছাকাছি আসছিল, আমাদের দেখা হওয়ার প্রয়োজনীয়তাটা ততই কমে যাচ্ছিল। একজনের ভাবনার অপূর্ণতা যে অন্যজন পূর্ণ করে দিতে জানি!

ওর ঘরটা আমার দেখার খুব শখ-একদিন জানালাম ওকে। জানতাম, ওর ঘরে কারোরই প্রবেশাধিকার নেই। ও সাফ না করে দিল। এত শক্ত করে কেউ না করে? আমি মৃদু তিরষ্কার করলাম। 'তুই তো লৌহমানবী'। ও হাসল। বললো, 'আচ্ছা যা, একদিন দেখাব'।

ওর ঘরে ঢুকে, আমি বাকরূদ্ধ। পুরো সাদা একটা ঘর, এমনকি আসবাব গুলোও সাদা। একপাশে একমানুষ সমান একটা আয়না। খাটটা রয়েছে ঘরের মাঝখানে। বিশাল। অনায়াসে দশজন মানুষের ঠাঁই হবে।
আমি বললাম, 'এত্ত বড়'?
ও বললো, ফুটবল টিম বানানোর ইচ্ছে আছে।
ঘরের কোনে কি একটা ঝুলছে।
আমি ওকে জিগ্যেস করলাম, 'ওটা কি'?
রূপাই বললো, 'ওটা তোর'।
-'আমার তাহলে ঝুলিয়ে রেখেছিস কেন? দিয়ে দিলেই পারিস!'
-উঁহু। এখন দেবনা।
এই বলে সে মিটিমিটি হাসতে লাগলো।
আমি চুপ।
ও বললো, 'তোর জন্য ওই শান্তিনিকেতনী ব্যাগটা কিনে রেখেছি। যেদিন দেখব, তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা, ওই ব্যাগটা তোর হাতে দিয়ে দেব।
ভেতরে একটা ডায়েরী আছে। আর যাবার সময় একপ্যাকেট সিগারেট, একটা দেয়াশলাই, আর কিছু জারুল ফুল দিয়ে দেব।'
এই টুকু বলে সে উঠে গিয়ে ব্যাগটাতে হাত বুলিয়ে এল।
তারপর বলল, তুই এটা নিয়ে দক্ষিণ দিক বাদে, যে কোন দিকে হাঁটতে শুরু করবি। যতক্ষণ না সমুদ্রের দেখা পাস, থামবিনা। তারপর সমুদ্রের সামনে বসে, এই ডায়েরীটা পুরো করে চিঠি লিখবি আমাকে।
আমি বললাম, 'দক্ষিণের সমুদ্র কি দোষ করল'?
ও বললো, 'দক্ষিণে তো চেনা সমুদ্র'।
'তোর দরকার অচেনা সমুদ্র'।
আমি বললাম, 'তোর চিঠি নে'।
ও বলল, 'চিঠি দিয়ে, তুই চলে যা'।
-'আমার খুব দেখার ইচ্ছে, আমার চিঠি তুই কিভাবে পড়িস'।
-'দেখতে হবেনা'। এখন যা তুই'।
আমি চলে আসছিলাম।
পেছন থেকে ও ডাকল, 'শোন'।
আমি দরজার কাছে গিয়ে ঘুরে তাকালাম।
রূপকথা বললো, 'আমার একটা সাদা ড্রেস আছে জানিস? আমি তোর চিঠি পড়ার সময়, ওই ড্রেসটা পড়ি। তারপর খাটের মাঝখানে বসে তোর চিঠি খুলি। একবার পড়ি, তারপর কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেলি চিঠিটা। তারপর আমার চারপাশে বিছানায় ছড়িয়ে দেই। সাদা বিছানার উপর, ছেঁড়া চিঠির টুকরো গুলোকে আমার জুঁই ফুলের মত মনে হয়। জানিস, আমি সেই ফুলের গন্ধও পাই!'
এইটুকু বলে, সে বলল, চিঠি পড়া দেখতে চেয়েছিলি না? এবার নিশ্চয়ই দেখতে পাবি'!
'Close your eyes & try to see.'
আমি কিছু না বলে চলে এলাম।
কখনো কখনো না বলাতেও অনেক বেশি কিছু বলা হয়ে যায়।
আমি উদভ্রান্তের মত ঘুরতে থাকি রাস্তায় রাস্তায়।

রূপকথার মৃত্যুসংবাদ শুনলাম যখন, তখন আমি ঢাকায়। আমার এক বন্ধু এসে খবরটা দিল। কেন যেন অবাক হলাম না। কে জানে, হয়তো অবচেতন মন গোপনে প্রস্তুত হয়ে আছে!
-কি হয়েছিল?
-'জ্বর। সন্ধ্যা থেকে। রাতে হঠাৎ করে এত বেড়ে গেল, ডাক্তারের কাছে নেবার আগেই শেষ।'
আমার বন্ধু বললো, 'চল, যাবিনা'? রূপাকে এখনো কবরে নামানো হয়নি। তোর জন্য সবাই অপেক্ষা করছে'।
আমি বললাম, না।
আমি যাব না।
-'কি বলছিস, ভেবে বলছিস? পরে কিন্তু আফসোস করবি! শেষ দেখা।'
আমি বললাম, 'এখন যদি না দেখতে যাই, তাহলে আমাদের শেষবার যখন দেখা হয়েছিল, ওটাই তো শেষ দেখা হবে-তাইনা?
আমি রূপকথার জীবিত মুখটাই মনে রাখতে চাই'।
তুই যা।
আমার বন্ধু চলে গেল।
আমার তখন প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছিল।
আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

পরিশিষ্টঃ
রূপকথার মা'র সাথে একদিন দেখা হয়ে গেলো আচমকা। খালাম্মা আমাকে দেখেই কেঁদে ফেললেন। বললেন বাসায় এস।
ওইদিন সন্ধায় গেলাম ওদের বাসায়। খালাম্মা একথা সেকথার পর বললেন, 'বাবা, তুমি চিঠিতে কি এত লিখতে যে, রূপা পড়ে চিৎকার করে কাঁদতো?'
আমি বললাম, 'রাস্তায় যদি কখনো হোঁচট খেতাম, তাহলে আমি আমার ব্যাথার কথা না লিখে, পাথরটির ব্যাথার কথা লিখতাম'।
খালাম্মা বললেন, ওর রূমে যাবে?
আমি মাথা নেড়ে সায় জানালাম।
খালাম্মা রূম খুলে দিলেন। বললেন, 'প্রতিদিন ঘরটা পরিষ্কার রাখি। মেয়েটা খুব গোছানো ছিল তো!'
আমার'ও তাই মনে হচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল, হয়তো রূপকথা কাছেই আছে!
এক্ষুণি এসে পড়বে!
আমার চোখ পড়লো ঘরের কোনে।
ব্যাগটা আছে ওখানেই।

চুপচাপ তাকিয়ে আছি ব্যাগটার দিকে।
কানে ভাসছে রূপকথার শেষ কথা গুলোঃ

'দক্ষিণে তো চেনা সমুদ্র'।
'তোর দরকার অচেনা সমুদ্র'।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই অক্টোবর, ২০১১ রাত ১০:৫৪
৫০টি মন্তব্য ৫০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনব প্রতারনা - ডিজিটাল প্রতারক

লিখেছেন শোভন শামস, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১৮



একটি সাম্প্রতিক সত্য ঘটনা।
মোবাইল ফোনে কল আসল, একটা গোয়েন্দা সংস্থার ছবি এবং পদবী সহ। এই নাম্বার সেভ করা না, আননোন নাম্বার। ফোন ধরলাম। বলল আপনার এই নাম্বার ব্যবহার করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগে নিজেকে বদলে দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪১



"আমার স্বামী সংসারের কুটোটাও নাড়ান না। যেখানকার জিনিস সেখানে রাখেন না। মুজা খুলে ছুঁড়ে যেখানে সেখানে ফেলে দেন। নিজেকে পরিষ্কার রাখতে বারবার ভুল করেন! এতো বছর বিবাহিত জীবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×