somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি আটপৌঢ়ে ভালোবাসার গল্প

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ রাত ১:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মেয়েটি সেই যে মাথা নিচু করেছে, আর তোলার নাম নেই।
তার সামনা সামনি বসা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, টপ টপ করে চোখ থেকে পানি পড়ছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে ভাঁজ করে বসা হাঁটুর কাছটা। চন্দ্রিমা উদ্যানের বারবণিতা আর ভিখিরির ভীড় ঠেলে যতটুকু বিচ্ছিন্ন হওয়া যায়, আমাদের নৈঃশব্দ তার চেয়ে বেশি কিছুনা। বসে আছি সেই সকাল থেকে। এর মধ্যে একবোতল পানি কেনার জন্য উঠেছিলাম মাত্র।
সামলে নিলো তান্না।
মাথা নিচু করেই চোখ মুছলো জামার খুঁট দিয়ে। একটু হেসে বললো, আমি খুব বোকা মেয়ে, তাইনা? দিন, পানির বোতলটা দিন।
বোতল হাতে নিয়ে সে উঠে গেলো। আমি মাথা কাত করে তাকিয়ে আছি ওর দিকে। একসময়-সেই প্রেমে পড়ার বয়সটাতে ওর জন্য কতকিছুই না করেছি! ওর কঠিন হৃদয়ের গলি-ঘুপচি ঘুরে ক্লান্ত হওয়াই সারা হয়েছে কেবল, আলোর দেখা পাইনি কখনো। বহু বছর পর আবার আমরা দুজন মুখোমুখি। অথচ, সময়টা আলাদা। এবং আবেগটাও। সেদিনের সেই স্পষ্টভাষী, কঠোর মেয়েটা আজ যেন মোমের মতই গলে গলে পড়ছিলো কথাগুলো বলার সময়। আমি ভেবেছিলাম, আমার খুব খারাপ লাগবে শুনতে। পুরনো অনুভূতিগুলো আবার না জেগে বসে! কিন্তু না, একসময় যাকে দেখলে অস্বস্তিতে নিজের বোধগুলোকে গুলিয়ে ফেলতাম, আজ তাকে দেখেই মায়া হচ্ছে ভীষণ! মা, নাকি করুণা? না, মায়া। নিখাদ মায়া।

ফিরে এলো তান্না। চোখ মুখ ধুয়ে এসেছে। বেশ স্নিগ্ধ লাগছে ওকে দেখতে।
ও বললো, গান শুনবেন?
আমি বললাম, না।
হেসে উঠলাম দুজনেই। এই ছোট্ট একটি প্রশ্ন এবং তার উত্তরটাতে আমাদের কতবছরের বৈরী অতীত যে মিশে আছে-তা কেবল আমরাই জানি।
ও বললো, আপনার বন্ধু রাজ আমাকে একবার ভালোবাসার কথা বলেছিলো জানেন?
আমি মাথা নাড়লাম, বলে যাও।
সে আমাকে বলেছিলো, 'তান্না, তোমাকে কিভাবে ভালোবাসি বললে তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবেনা-একটু বলবে?'
-তুমি কি উত্তর দিয়েছিলে?
-'আমি কিছুই বলিনি। কারণ, সে যে প্রশ্নটা করেছিলো, সে প্রশ্নের উত্তরে 'না' বলার কোন সুযোগ ছিলোনা। আর আমি 'হ্যাঁ' বলতেও ইচ্ছুক ছিলাম না।'
আমি হো হো করে হেসে উঠলাম।
-আমার ধারণা, তান্না কিছুটা ভ্রূ কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমার ধারণা, ওই কথাটা আপনিই তাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, তাইনা?
-আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম।
-নিজের পছন্দের মানুষকে হারানোর ভয় ছিলো না আপনার? আমি যদি হ্যাঁ বলে দিতাম?
আমি একটা সিগারেট ধরালাম। পা'দুটো টান টান করে নিয়ে বসলাম। আকাশের দিকে সজোড়ে ধোঁয়া ছুঁড়ে দিয়ে বললাম, 'যা পাইনি, তা হারানোর ভয় কি? অন্য কেউ যদি জয় করে নেয় তো নিকনা!'
'জয় করে নেয় তো নিকনা'- ঠোঁট বেঁকিয়ে ভেংচি কেটে উঠলো তান্না। আপনি কি জানেন, সে যে ধার করা কথা নিয়ে আমাকে প্রস্তাব দিতে এসেছিলো, একথা বুঝতে আমার কয়েক সেকেণ্ডের বেশি লাগেনি!
-বলো কি? ডেঞ্জারাস কণ্ডিশন! বুঝলে কিভাবে?
-দেখুন, ইনট্যিউশন বলুন আর যাই বলুন, মেয়েদের এই জিনিসটা অনেকটা বর্মের মতই। যে মানুষ ভালোবাসার কথাটা বলতেও ভণ্ডামি করে, তার জন্য করুণা জন্মায়-ভালোবাসা না।
-বেচারা রাজ! আমি বললাম, অথচ ও ভেবেছিলো, এমন অব্যর্থ প্রস্তাব পেয়ে তুমি দিশেহারা হয়ে গেছো।
-আচ্ছা, আপনি কি জানতেন, যে আপনার আরেক বন্ধু-যিনি আমার প্রতিবেশি, আমি তার প্রতি খুব দূর্বল ছিলাম?
-টের পেতাম। ওই যে কি বলে, 'ইনট্যিউশন', ওটা দু-এক ফোঁটা আমাদেরও আছে।
-আমি তাকেও রিফিউজ করেছিলাম কেন, তা জানেন?
-ও তোমাকে প্রপোজ করেছিলো কিনা, তাই তো জানিনা! ব্যাটা বন্ধু বেঈমান!
-হ্যাঁ করেছিলো। শুধু তাইনা, আমি 'হ্যাঁ' বলার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম।
-তাহলে আবার 'না' বললে কেন?
-সেদিন বাসায় একা ছিলাম। একটা পুরোনো গল্পের বই ফেরৎ দিতে সে এসেছিলো বাসায়। মানে আপনার বন্ধু। বসে বসে গল্প করছিলাম। একসময় সে প্রপোজ করে বসলো। কিছুটা লজ্জা, কিংবা আচমকা প্রাপ্তির ধাক্কা সামলাতে আমি হ্যাঁ বলার জন্য কিছুটা সময় নিচ্ছিলাম। মনে হয়, সে এটা বুঝতে পেরেছিলো; ওই যে, দু-এক ফোঁটা ইনট্যিউশনের কথা যা বললেন। ঠাট্টা করতে করতে একসময় সে আমাকে জাপটে ধরে বুকে হাত দেয়। কোনমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাকে 'না' বলতে আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করিনি। নিজেকে অসম্ভব নোংরা আর ঘেন্না লাগছিলো তখন। আপনার সাথে কথা বলার জন্য খুব অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। একবার ভেবেছিলাম মরে যাই!
-কেন, আমার সাথে কথা বলার জন্য কেন? তুমি তো আমাকে দেখলে তেরো হাত দূর দিয়ে যেতে।
-কারণ, বিগত চার বছরে আপনি আমার সাথে যতবার কথা বলেছেন, চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছেন। কখনো আমার শরীর দেখার চেষ্টা করেন নি। আমার তখন একজন পুরুষ মানুষের সাথে কথা বলার প্রয়োজন ছিলো। আমার একজন কনফিডেন্ট মানুষের সংগ দরকার ছিলো। কারণ, আমি চাচ্ছিলাম না, পৃথিবীর সমস্ত পুরুষের উপর আমার ঘৃণা জন্মাক।
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলো সে।
একটু থামলো।
আমি চাচ্ছিলাম, আমার চোখের দিকে তাকালো তান্না। আমি চাচ্ছিলাম, ওই নোংরা মানুষটাকেই আবার আমি ভালোবাসি।

=======================================

(গল্পটা অনেক দীর্ঘ। তাই এখানেই থামছি। সেই নোংরা মানুষটাকে সে জীবনে পেয়েছিলো কিনা-সে প্রসঙ্গ থাক। সব সত্যি জানতে নেই। বেঁচে থাকুক ভালোবাসা।
ব্লগ জীবনের দু'বছর পার করলাম।
সবাইকে আসন্ন ফাল্গুণ আর ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা।)
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০২২ রাত ১১:৫০
২৭টি মন্তব্য ২৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×