তার সামনা সামনি বসা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, টপ টপ করে চোখ থেকে পানি পড়ছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে ভাঁজ করে বসা হাঁটুর কাছটা। চন্দ্রিমা উদ্যানের বারবণিতা আর ভিখিরির ভীড় ঠেলে যতটুকু বিচ্ছিন্ন হওয়া যায়, আমাদের নৈঃশব্দ তার চেয়ে বেশি কিছুনা। বসে আছি সেই সকাল থেকে। এর মধ্যে একবোতল পানি কেনার জন্য উঠেছিলাম মাত্র।
সামলে নিলো তান্না।
মাথা নিচু করেই চোখ মুছলো জামার খুঁট দিয়ে। একটু হেসে বললো, আমি খুব বোকা মেয়ে, তাইনা? দিন, পানির বোতলটা দিন।
বোতল হাতে নিয়ে সে উঠে গেলো। আমি মাথা কাত করে তাকিয়ে আছি ওর দিকে। একসময়-সেই প্রেমে পড়ার বয়সটাতে ওর জন্য কতকিছুই না করেছি! ওর কঠিন হৃদয়ের গলি-ঘুপচি ঘুরে ক্লান্ত হওয়াই সারা হয়েছে কেবল, আলোর দেখা পাইনি কখনো। বহু বছর পর আবার আমরা দুজন মুখোমুখি। অথচ, সময়টা আলাদা। এবং আবেগটাও। সেদিনের সেই স্পষ্টভাষী, কঠোর মেয়েটা আজ যেন মোমের মতই গলে গলে পড়ছিলো কথাগুলো বলার সময়। আমি ভেবেছিলাম, আমার খুব খারাপ লাগবে শুনতে। পুরনো অনুভূতিগুলো আবার না জেগে বসে! কিন্তু না, একসময় যাকে দেখলে অস্বস্তিতে নিজের বোধগুলোকে গুলিয়ে ফেলতাম, আজ তাকে দেখেই মায়া হচ্ছে ভীষণ! মা, নাকি করুণা? না, মায়া। নিখাদ মায়া।
ফিরে এলো তান্না। চোখ মুখ ধুয়ে এসেছে। বেশ স্নিগ্ধ লাগছে ওকে দেখতে।
ও বললো, গান শুনবেন?
আমি বললাম, না।
হেসে উঠলাম দুজনেই। এই ছোট্ট একটি প্রশ্ন এবং তার উত্তরটাতে আমাদের কতবছরের বৈরী অতীত যে মিশে আছে-তা কেবল আমরাই জানি।
ও বললো, আপনার বন্ধু রাজ আমাকে একবার ভালোবাসার কথা বলেছিলো জানেন?
আমি মাথা নাড়লাম, বলে যাও।
সে আমাকে বলেছিলো, 'তান্না, তোমাকে কিভাবে ভালোবাসি বললে তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবেনা-একটু বলবে?'
-তুমি কি উত্তর দিয়েছিলে?
-'আমি কিছুই বলিনি। কারণ, সে যে প্রশ্নটা করেছিলো, সে প্রশ্নের উত্তরে 'না' বলার কোন সুযোগ ছিলোনা। আর আমি 'হ্যাঁ' বলতেও ইচ্ছুক ছিলাম না।'
আমি হো হো করে হেসে উঠলাম।
-আমার ধারণা, তান্না কিছুটা ভ্রূ কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমার ধারণা, ওই কথাটা আপনিই তাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, তাইনা?
-আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম।
-নিজের পছন্দের মানুষকে হারানোর ভয় ছিলো না আপনার? আমি যদি হ্যাঁ বলে দিতাম?
আমি একটা সিগারেট ধরালাম। পা'দুটো টান টান করে নিয়ে বসলাম। আকাশের দিকে সজোড়ে ধোঁয়া ছুঁড়ে দিয়ে বললাম, 'যা পাইনি, তা হারানোর ভয় কি? অন্য কেউ যদি জয় করে নেয় তো নিকনা!'
'জয় করে নেয় তো নিকনা'- ঠোঁট বেঁকিয়ে ভেংচি কেটে উঠলো তান্না। আপনি কি জানেন, সে যে ধার করা কথা নিয়ে আমাকে প্রস্তাব দিতে এসেছিলো, একথা বুঝতে আমার কয়েক সেকেণ্ডের বেশি লাগেনি!
-বলো কি? ডেঞ্জারাস কণ্ডিশন! বুঝলে কিভাবে?
-দেখুন, ইনট্যিউশন বলুন আর যাই বলুন, মেয়েদের এই জিনিসটা অনেকটা বর্মের মতই। যে মানুষ ভালোবাসার কথাটা বলতেও ভণ্ডামি করে, তার জন্য করুণা জন্মায়-ভালোবাসা না।
-বেচারা রাজ! আমি বললাম, অথচ ও ভেবেছিলো, এমন অব্যর্থ প্রস্তাব পেয়ে তুমি দিশেহারা হয়ে গেছো।
-আচ্ছা, আপনি কি জানতেন, যে আপনার আরেক বন্ধু-যিনি আমার প্রতিবেশি, আমি তার প্রতি খুব দূর্বল ছিলাম?
-টের পেতাম। ওই যে কি বলে, 'ইনট্যিউশন', ওটা দু-এক ফোঁটা আমাদেরও আছে।
-আমি তাকেও রিফিউজ করেছিলাম কেন, তা জানেন?
-ও তোমাকে প্রপোজ করেছিলো কিনা, তাই তো জানিনা! ব্যাটা বন্ধু বেঈমান!
-হ্যাঁ করেছিলো। শুধু তাইনা, আমি 'হ্যাঁ' বলার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম।
-তাহলে আবার 'না' বললে কেন?
-সেদিন বাসায় একা ছিলাম। একটা পুরোনো গল্পের বই ফেরৎ দিতে সে এসেছিলো বাসায়। মানে আপনার বন্ধু। বসে বসে গল্প করছিলাম। একসময় সে প্রপোজ করে বসলো। কিছুটা লজ্জা, কিংবা আচমকা প্রাপ্তির ধাক্কা সামলাতে আমি হ্যাঁ বলার জন্য কিছুটা সময় নিচ্ছিলাম। মনে হয়, সে এটা বুঝতে পেরেছিলো; ওই যে, দু-এক ফোঁটা ইনট্যিউশনের কথা যা বললেন। ঠাট্টা করতে করতে একসময় সে আমাকে জাপটে ধরে বুকে হাত দেয়। কোনমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাকে 'না' বলতে আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করিনি। নিজেকে অসম্ভব নোংরা আর ঘেন্না লাগছিলো তখন। আপনার সাথে কথা বলার জন্য খুব অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। একবার ভেবেছিলাম মরে যাই!
-কেন, আমার সাথে কথা বলার জন্য কেন? তুমি তো আমাকে দেখলে তেরো হাত দূর দিয়ে যেতে।
-কারণ, বিগত চার বছরে আপনি আমার সাথে যতবার কথা বলেছেন, চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছেন। কখনো আমার শরীর দেখার চেষ্টা করেন নি। আমার তখন একজন পুরুষ মানুষের সাথে কথা বলার প্রয়োজন ছিলো। আমার একজন কনফিডেন্ট মানুষের সংগ দরকার ছিলো। কারণ, আমি চাচ্ছিলাম না, পৃথিবীর সমস্ত পুরুষের উপর আমার ঘৃণা জন্মাক।
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলো সে।
একটু থামলো।
আমি চাচ্ছিলাম, আমার চোখের দিকে তাকালো তান্না। আমি চাচ্ছিলাম, ওই নোংরা মানুষটাকেই আবার আমি ভালোবাসি।
=======================================
(গল্পটা অনেক দীর্ঘ। তাই এখানেই থামছি। সেই নোংরা মানুষটাকে সে জীবনে পেয়েছিলো কিনা-সে প্রসঙ্গ থাক। সব সত্যি জানতে নেই। বেঁচে থাকুক ভালোবাসা।
ব্লগ জীবনের দু'বছর পার করলাম।
সবাইকে আসন্ন ফাল্গুণ আর ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা।)
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০২২ রাত ১১:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

