মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নূর খান লিটনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, টেলিফোনে আমি মানবাধিকার নিয়ে কোনো কথা বলি না। তিনি সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে ফোনে কথা বলতে রাজি হননি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সেক্রেটারি জেডআই খান পান্নার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বার বার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান বলেন, মইন উ আহমদের নিয়ন্ত্রিত জরুরি অবস্থার সরকারের পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এক কঠিন অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আদালতের এখতিয়ারে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, ব্যাপকভাবে নারী নির্যাতন এবং সর্বোপরি শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা-দুর্বৃত্তায়ন বাংলাদেশের জনসাধারণের মানবাধিকারকে এক শাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, দুর্বল মানবাধিকার কমিশন, আইনত অকার্যকর তথ্য কমিশন এবং ন্যায়বিচারের দুষ্প্রাপ্যতা এই পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। ২৯ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের পর দেশের মানুষ মনে করেছিল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সেই পরিস্থিতি দেখছি না। ক্রসফায়ার, গুপ্তহত্যা, রিমান্ডে নিয়ে বিচার বিভাগের আওতায় নির্যাতন, অসহায় মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব পরিস্থিতিকে প্রকট করে তুলছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতি এক ভয়ঙ্কর অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। মানবাধিকার ইস্যুগুলোকে সমন্বয় করে এখন জোরালো প্রতিবাদ না হলে বিভিন্ন রকমের স্বৈরাচারী উপাদান আরও ভয়ঙ্কররূপে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে বলে অধিকার সেক্রেটারি আশঙ্কা ব্যক্ত করেন।
নারীনেত্রী ও নারী গ্রন্থ প্রবর্তনার নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দেশে এখন অনেক রকমের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ নানা জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনায়ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। কোনো কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে বিচার ও তদন্তের প্রক্রিয়া সমানভাবে দেখা যায় না। কোনো কোনোটা নিয়ে অতিবাড়াবাড়ির দৃশ্য দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি বেশি হচ্ছে। এছাড়া রিমান্ডের নামে যা হচ্ছে, তার পুরোটাই নাগরিকের সাংবিধানিক ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এর জন্য প্রতিবাদ হওয়া উচিত।
কেস স্টাডি-১ : গত বৃহস্পতিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলায় ১০ সাংবাদিকসহ এক প্রক্টর আহত হন। ছাত্রলীগ বেপরোয়াভাবে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়।
কেস স্টাডি-২ : ৩০ জানুয়ারি ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের শতবর্ষ পালন অনুষ্ঠানের সমাপনীতে ছাত্রী ও মহিলাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চলে। নারীদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে তরুণরা ঢুকে তাণ্ডব চালায়। এতে শতাধিক তরুণী আহত হন। উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের আচরণে ঘটনাস্থলে অজ্ঞান হয়ে পড়েন অনেক তরুণী।
কেস স্টাডি-৩ : ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির সন্দেহে ৮৬ জনকে গ্রেফতারের পর নেয়া হয় রিমান্ডে। বিডিআর ঘটনা ছাড়া কোনো মামলায় একসঙ্গে এতজনের রিমান্ডের ঘটনা অতীতে কখনও ঘটেনি। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরকর্মী সন্দেহে গ্রেফতারের পর মামলা ছাড়াই তাদের রিমান্ডে নেয়া হয়। চট্টগ্রামে গুলিতে নিহত এক ছাত্রশিবিরকর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় তাদের সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালায় পুলিশ।
কেস স্টাডি-৪ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগকর্মী ফারুক হত্যার জের ধরে ১১ ফেবু্রয়ারি রাজশাহীর শিবিরনেতা হাফিজুর রহমান শাহিনকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ইসলামী ছাত্রশিবিরকর্মী মহিউদ্দিন মাসুমকে ষোলশহরে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
কেস স্টাডি-৫ : ৯ ফেবু্রয়ারি ঢাকার ৭০ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আহমদ হোসেনসহ তিন ব্যবসায়ীকে পৃথকভাবে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
কেস স্টাডি-৬ : ১১ ফেবু্রয়ারি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরকে সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যা মামলায় নতুন করে ৬ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। একই দিনে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) রেজাকুল হায়দার চৌধুরীকে আবারও দু’দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। তাদের পুলিশ রিমান্ডে নিলেও জিজ্ঞাসাবাদের নামে ঢাকায় আনা হয়। তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় বলে জানা গেছে।
কেস স্টাডি-৭ : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মহিউদ্দিন হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী সন্দেহে মোহাইমিন নামক একজনকে গ্রেফতার করে ১৫ ফেব্রুয়ারি রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। কারও সামনে কোনো ঘটনা ঘটলে তাকে রিমান্ডে নেয়ার কাহিনী এটাই প্রথম। পুলিশের দাবি অনুযায়ী প্রত্যক্ষদর্শীকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।
দেশব্যাপী এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। প্রতিনিয়ত সরকার ও সরকারনিয়ন্ত্রিত পুলিশ মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



