আজ ১৬ ই ডিসেম্বর ২০১১। আমাদের বিজয় দিবস। আমাদের স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি হবে আজ। আমাদের একটি লাল সবুজ পতাকা আছে । আর সব বাংলাদেশীর মতো আজ আমিও গর্বিত। বিজয়ের স্বাদ আমিও ভোগ করছি আমার সমস্ত দেহ মন দিয়ে। বিশ্বের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে আমাদের সদর্প পদচারনা। আমি নিজেও আমার দেশের দূত হয়ে হাজার মাইল দূরে অন্য কোন এক দেশে। এখানে যখন আমার দেশের পতাকা গায়ে চাপিয়ে পৃথিবীর অন্য সব জাতির মানুষের সাথে মিশি তখস আমার মতো গর্ব আর কেউ করেনা। কারণ, অনেক কষ্টে পাওয়া আমাদের এই স্বাধীনতা, এই পতাকা। সে কষ্ট আমি আমার চোখে দেখিনি তবে বিশ্বাস করি শতভাগ। আমার সশ্রদ্ধ সালাম সেই সকল মুক্তিযোদ্ধা, অমুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি যাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ত্যাগের ফল এই স্বাধীনতা। তবে কেন আমার স্বাধীনতার দাবী???
হ্যাঁ, আমি আবার স্বাধীনতা চাই। যেভাবে প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতা চেয়েছিল সেইভাবে কিংবা তারচেয়েও বেশী দৃড়ভাবে। আমি স্বাধীনতা চাই আমাদের মনের, চিন্তার, চিত্তের। আমরা পৃথিবীর বুকে আমাদেও মানচিত্র পেয়েছি ঠিকই কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাসে আমাদের জাতি হিসেবে যথেষ্ট সম্মান এখনো মিলেনি। আমরা আমাদের মনের স্বাধীনতা এখনো অর্জন করতে পারিনি।সারা পৃথিবী যেখানে ঞ্জান বিঞ্জানের চর্চায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৌড়ে অবতীর্ন সেখানে আমরা হাটছি উল্টোপথে। আমরা আমাদের স্বাধীনতার মূল্যায়ন কিংবা অতিমূল্যায়ন করতে যেয়ে অনেকক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করছি। আমরা আমাদের জাতির সূর্যসন্তানদের সম্মানিত করতে যেয়ে বরং করুনা করছি। আজকে যে বাংলাদেশীর বয়স ১৮ তার বাবা মায়ের জš§ মুক্তিযোদ্ধের সময় নাও হতে পারে। তাই বলে রাষ্ট্রীয় কোন প্রতিযোগীতামূলক ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের অগ্রাধিকার কিংবা বিশেষ সুবিধা দেয়া কি তাদেও জন্য বিশেষ করুনা নয়? যে নাগরিকের দেহের প্রতিটি রক্তবিন্দু তার দেশের পরিচয় বহন করে তার যোগ্যতার অর্ধেক কেটে নেয়া শুধুমাত্র সে অমুক্তিযোদ্ধার সন্তান আর কারো যোগ্যতা দ্বিগুন করে দেয়া তার বাবার পরিচয়ের জন্য; এ নজির পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। এই প্রথা কি রাজতন্ত্রের ঔরসজাত পরিবারতন্ত্রের প্রিিতষ্ঠানিক বা সরকারী প্রচারনা নয়? আমি একটা বিষয় মনে প্রানে বিশ্বাস করি কোনো মুক্তিযোদ্ধাই এইরকম বস্তুগত প্রতিদানের আশায় হাতে অস্ত্র তুলে নেননি। আর যদি কেউ নিয়ে থাকেন তবে তার প্রতিদান শুধু তাকেই দেয়া হউক তাহলে কারো মণ:ক্ষুন্ন কিংবা আশাহত হবে বলে আমার মনে হয় না। বাবা কিংবা মায়ের পরিচয়ে কেউ দেশের সকল ছেলেমেয়েদের চেয়ে বেশী যোগ্যতাসমপন্ন কিংবা উচুঁশ্রেণীর কিংবা বিশেষ সুবিধা ভোগ করবে তা কখনই মেনে নেয়া যায় না। এই দেশতো কারো একার নয়, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নয়। এই দেশ আমাদের সবার। নাগরিক অধিকার সবার সমান হবে এটাইতো স্বাধীনতার মূল প্রতিপাদ্য ছিল। এইরকম শ্রেনীবৈষম্য যদি থাকবেই তাহলে স্বাধীনতা কেন? কাদের জন্য?
যে শিশুটি অতিরিক্ত খাবারের জন্য শিিররীক স্থুলতায় ভোগছে তার জন্য আমার মায়া হয় আর ক্ষোভ হয় তার অভিভাবকদের জন্য যারা কিনা তাকে অবিবেচকের মতো খাইয়ে অসুস্থ করে তুলছে। ঠিক তেমনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই তবে যারা তাদের প্রতি মেকি রাজনৈতিক ভালবাসা দেখিয়ে করুণা করছে তাদের প্রতি আমার ঘৃনা। আজকে সারা দুনিয়া যখন আগামী ৫০ বছরের হিসার কষছে সেখানে আমরা গত ৪০ বছরের হিসাব নিয়ে ব্যতিব্যস্ত । সে যুগে ফিরে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছি; সে চেষ্টার সিকিভাগও যদি সামনে এগুনোর জন্য করতাম তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের গর্ব পোষাকী রূপ ছেড়ে মানসিক গর্বেৃ রূপ নিতো ।
আমার স্বাধীনতার ইতিহাস হবে আমাদের সকলের অনুপ্রেরনা, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে তা আমাদের ভয়াবহ পিছুটান হয়ে দাড়িয়েছে । আমি আমার পূর্বপুরুষদের হাজরবার অভিসম্পাত দেই এইজন্যে যে তারা আমাদের জন্য কোনো অবিতর্কিত ইতিহাস রেখে যেতে পারেননি । যে ইতিহাস আছে তা জলবায়ু সংকটের মতো সংকটাপন্ন; কিছুদিন পরপর পাল্টায় । যে ইতিহাস আছে তা রীতিমতো আমাদের জন্য অভিশাপ । আর এই অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য আমাাদের টাইম মেশিন আবিষ্কার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে । অভিসম্পাত এই জন্যে যে স্বাধীনতার সময়ও সারাদেশ এক হতে পারেনি, ছোট হউক আর বড় হউক একাধিক গ্রুপ তখনও ছিল, তার পরবর্তী সময়েও সেই ধারাবাহিকতায় দেশের মাঝে স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ দুটি ভাগ ছিল এবং দু:খের বিষয় তা আজও আমাদের দেশে অন্যতম বড় এজেন্ডা, যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য চরম লজ্জার ব্যাপার । কিন্তু এতেই শেষ নয়, সেই অনৈক্যের বীজ এইডসের মতো আমাদের এই প্রজšে§ও ছড়িয়ে পড়েছে । কিন্তু কেন? কি স্বার্থ এর পেছনে? কেন আমরা সামনে তাকাতে পারছি না নাকি আমাদের কৌশলে সামনে তাকাতে দেয়া হচ্ছে না? কেন আমাদের স্বাধীনতা ও এর ইতিহাস আমাদের দেশের বিভক্তির কারণ হবে? কেন এই প্রজš§ ইতিহাসের মধু না নিয়ে বিষ নিয়ে নিজেদের কলুষিত করবে, দ্বিধাবিভক্ত করবে? এই প্রজšে§র জন্য সেইসকল বিতর্ক যা নিয়ে আমাদের বাপ দাদারা গত ৪০ বছর পার করে দিয়েছেন তা নিয়ে সময় ব্যয় করা কি চরম অবান্তর নয় যেখানে সারা দুনিয়ায় পালের হাওয়া বইছে উন্নতির দিকে, জ্ঞান বিজ্ঞান ও মানসিক উৎকর্ষতার দিকে । তাহলে এ অধ:পতনের দায় কার? আমাদের অবিভাবকদের, এই রাষ্ট্রের অবিভাবকদের ।
এই অনৈক্যের অভিশাপ আমাদের ৪০ বছরের পুরনো নয় বরং ৪০০’র ও বেশী বছরের পুরনো । তা নাহলে এই দেশ তুর্কি আর মোঘলদের দ্বারা শাসিত হতো না, ইংরেজদের গোলামীও করতো না, ধর্মের দোহাই দিয়ে অবিভক্ত বাংলা বিভক্ত হতো না, পাকিস্তানের কলোনীও হতে হতো না । এই অনৈক্য, বিভক্তি ও শ্রেণীবৈষম্যের অভিশাপ বহু বছরের পুরনো যা আমরা আজও বয়ে বেড়াচ্ছি । আমাদের এই মানসিক পরাধীনতার মুক্তি আজও মিলে নি । সময় ও কালের স্রোতের উল্টোধারায় আমার দেশ হাটছে তা আমার রাজনৈতিক স্বাধিনতার গর্বকে ছাপিয়ে হতাশার সাগরে ডুবিয়ে দিচ্ছে । তাই আজ আমি আমার দেশের জন্য আরেকবার স্বাধীনতা চাই; মনের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, শ্রেনীবৈষম্যের স্বাধীনতা, সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা । এই পৃথিবীর বুকে সত্যিকারের মাথা উচুঁ করে বাচাঁর স্বাধীনতা, কাগজে কলমের স্বাধীনতা নয় ।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ৩:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




