somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জীবনে একবার:ঝুম্পা লাহিড়ী ( ইংরাজী থেকে ভাষান্তর)

১০ ই জুলাই, ২০০৯ দুপুর ১:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি এর আগে তোমাকে অনেকবার দেখেছি, কিন্তু আমার জীবনে তোমার উপস্থিতি মনে করতে মনে পড়ে ইনমান স্ক্যোয়ারে আমার বাড়িতে দেওয়া তোমাদের বিদায় সম্বর্ধনারই কথা৷ তোমার পরিবার কেম্ব্রিজ ছেড়ে অন্য বাঙালী পরিবারগুলোর মত আটলান্টা বা অ্যারিজোনায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল না; আমার পরিবার-আত্মীয়রা যে সংগ্রাম আরম্ভ করেছিল তার পথে না হেঁটে তারা চলল ভারতে৷ সেটা ছিল ১৯৭৪ সালের কথা৷ আমার তখন ছ' বছর বয়স৷ তোমার বোধহয় নয়৷ আমার পরিষ্কার যেটা মনে পড়ে তা হ'ল সেই দিনের অনুষ্ঠানের আগের কয়েক ঘন্টা, পার্টির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন আমার মা৷ পালিশ করা আসবাবপত্র, টেবিলে প্লেট, ন্যাপকিন পরিপাটি করে সাজানো, ঘরময় ভেড়ার মাংস আর পোলাওয়ের গন্ধ ও বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য মা'র শখের ফরাসী সুবাস, মা প্রথমে নিজের গায়ে স্প্রে করলেন তারপরে আমার জামায়, আমি যা পরেছিলাম স্প্রে তা সাময়িকভাবে কালো করে দিল৷ সে সন্ধ্যায় আমি কলকাতা থেকে ঠাকুমার পাঠানো জামা পরেছিলাম৷ সাদা ছোট ঝুলের পাজামা, সবজে নীল কুর্তা আর প্লাস্টিকের মুক্তো লাগানো কালো ভেলভেটের জ্যাকেট৷ স্নানের সময় জামা তিনটে আমার খাটেই রাখা ছিল, আমি দাঁড়িয়ে কাঁপছিলাম, আঙুলের ডগাগুলো পর্যন্ত সাদা হয়ে গেছিল আর কুঁচকে ছিল৷ মা পাজামার বড় ঘেরের মধ্যে সেফটি পিন দিয়ে দড়ি পরাচ্ছিলেন, তারপরে দড়ির মধ্যে একটু একটু করে কোমরের কাপড় ভাঁজ করে আমার পেটের কাছে বেঁধে দিলেন৷ পাজামার ভেতরের সেলাইয়ে গোলের মধ্যে বেগুনি হরফে প্রস্তুতকর্তার স্টিকার৷ স্টিকারের জন্যই আমি পাজামাটি পরতে আপত্তি করেছিলাম, কিন্তু মা' অভয় দিয়েছিলেন একবার ধোওয়ার পরে সিলটি আর থাকবে না আর কুর্তা দিয়ে ঢাকা থাকায় কেউ দেখতেও পাবে না৷
মা'র কিন্তু দুশ্চিন্তা বাড়তেই থাকলো৷ খাবার যথেষ্ট কিনা, সকলের জন্য হবে কিনা সাথে আবহাওয়া নিয়েও চিন্তা ছিল মা'র৷ তুষারপাতের সম্ভাবনা ছিল৷ সে সময়ে বাবা-মা বা তাদের বন্ধুদের নিজস্ব গাড়িও ছিল না৷ তোমরা সহ সকল অতিথিরাই মিনিট পনেরোর হাঁটা পথের দূরত্বে থাকতে৷ হয় হার্ভার্ড বা এমআইটির আশেপাশে বা মাস অ্যাভেনিউ ব্রিজটি পেরিয়ে৷ কেউ কিছু দূরেও থাকতো, ম্যালডেন, মেডফোর্ড বা ওয়ালথাম থেকে বাসে বা ট্যাক্সিতে আসত৷ আমার চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে মা তোমার বাবার প্রসঙ্গ তুলে বলতে লাগলেন, "আমার মনে হয় ডক্টর চৌধুরি বাড়ির লোকদের নিয়ে গাড়িতে আসতে পারেন"৷ তোমার মা-বাবা সামান্য বয়স্ক আর আমাদের তুলনায় এদেশে বেশ পুরানোও বটে৷ ওঁনারা দেশ ছেড়েছিলেন ১৯৬২ তে৷ তখনও বিদেশী ছাত্রদের এদেশে আসার ছাড়পত্রের আইন বদলায় নি৷ আমার বাবা ও তাঁদের বন্ধুরা তখনও পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছিলেন৷ তোমার বাবার তখন পি.এইচডি হয়ে গেছে৷ আন্ডোভারের এক ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে তিনি সিলভার রঙের একটি গাড়ি চালিয়ে কাজে যেতেন৷ আমি বেশ কয়েকবার অনেক রাতে পার্টি শেষের পরে বা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যাওয়ার পরে ঐ গাড়িটি আমাকে বাড়ি নিয়ে এসেছে৷
আমার মা গর্ভবতী হয়ে যাওয়ার পরে আমাদের মা'দের প্রথম দেখা৷ মা তখনও কিছু জানতেন না৷ ওঁনার মাথাটা ঘোরাচ্ছিল এবং একটি ছোট পার্কের বেঞ্চে বসেছিলেন৷ তোমার মা একটি দোলনায় বসে আস্তে আস্তে দোল খাচ্ছিলেন সাথে তুমিও তাঁর উপরে ঝুঁকছিলে, মাথায় সিঁদুর আর শাড়ি পরা একজন অল্পবয়স্ক বাঙালী ভদ্রমহিলাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলেন তিনি৷ নিচু স্বরে মা’কে জিজ্ঞাসা করলেন, শরীর ঠিক লাগছে তো? তোমাকে দোলনা থেকে নেমে যেতে বললেন তারপরে তুমি আর তোমার মা মিলে মা’কে বাড়ি পৌঁছে দিলে৷ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময়েই তোমার মা বলেছিলেন যে বোধহয় আপনি সন্তান-সম্ভবা৷ সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা বন্ধু হয়ে গেলেন, আমাদের বাবারা যখন কাজে থাকত সেসময়টা তাঁরা একসাথে কাটাতেন৷ তাঁরা কলকাতায় ফেলে আসা জীবনের কথা বলতেন৷ যোধপুর পার্কে তোমার মা'র সুসজ্জিত বাড়ির কথা, ছাদের উপরে গোলাপ, জবাগাছের কথা আর আমার মায়ের মানিকতলায় পঞ্জাবি রেস্টুরেন্টের উপরের ছোট্ট ফ্ল্যাটের কথা যেখানে তিনটি ছোট্ট ঘরে সাতজন লোক থাকতেন৷ কলকাতায় তাদের দেখা হওয়ার সুযোগ ছিল খুবই কম৷ তোমার মায়ের বাবা ছিলেন সেসময়ের কলকাতার বিখ্যাত আইনজীবিদের মধ্যে একজন৷ পাইপ খেতে অভ্যস্ত, ইংরাজপ্রেমী, স্যাটারডে ক্লাবের মেম্বার৷ তোমার মা পড়তেন কনভেন্ট স্কুলে৷ ওদিকে আমার মায়ের বাবা ছিলেন জিপিও-র ক্লার্ক৷ এদেশে আসার আগে মা কখনও টেবিলে বসে খান নি, কমোডও ব্যবহার করেন নি৷ কিন্তু কেম্ব্রিজে গিয়ে দুজনের মধ্যে কোনও পার্থক্যই ছিলনা৷ দুজনেই ছিলেন সমান একা৷ বাজারে যেতেন একসাথে, উভয়ই স্বামীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিতেন, রান্নাও হত তোমাদের বা আমাদের স্টোভে৷ রান্না হয়ে গেলে নিজেদের মত ভাগ করে নিতেন৷ উল বুনতেন দুজনে মিলে৷ বুনতে বুনতে একঘেয়েমি এলে পাল্টাপাল্টি করে নিতেন৷ আমি যখন জন্মালাম, বন্ধু হিসাবে তোমার বাবা-মা ই হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন৷ তোমার ব্যবহার করা পুরনো উচুঁ চেয়ারে বসে আমাকে খাওয়ানো হত, তোমার ব্যবহার করা প্যারামবুলেটারে চড়ে আমাকে রাস্তায় ঘোরানো হত৷

বাকিটা পরে......................

ইংরাজী থেকে ভাষান্তর

[ঝুম্পা লাহিড়ীর শেষ প্রকাশিত ছোট গল্প সংকলন "আন অ্যাকাস্টামড আর্থ" থেকে নেওয়া একটি ছোট গল্প৷ গল্পটি প্রথম নিউইয়র্কার ডট কমে ২০০৬ এর মে মাসে প্রকাশিত হয়৷]
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×