
রানীর সংখ্যা বাড়াতে বাড়াতে ১০০ করতে চান তিনি। বর্তমানে তার ২৩ জন রাণী রয়েছেন
রাজা-মহারাজাদের কথা কমবেশি সবাই জানি। ইতিহাসের পাতা উল্টালেই দেখতে পাওয়া যায় রাজাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও কাহিনী। কেউ ছিলেন বীরত্বের জন্য, কেউ ছিলেন মহানুভবতার জন্য জনপ্রিয়, আবার কেউবা ছিলেন অত্যাচারের জন্য নিন্দিত। বর্তমান বিশ্বে এখনো কোনো কোনো দেশে রাজতন্ত্র বিরাজমান। এদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রম রাজা হলেন আফ্রিকার 'স্বোয়াজিল্যান্ড' দেশের রাজা তথা রাষ্ট্রপ্রধান মাখোসেতিভ ওরফে এমস্বোয়াতি থ্রি। মাত্র ৪ জেলা নিয়ে ছোট্ট এক দেশ স্বোয়াজিল্যান্ড। ২০০৯ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী দেশটির জনসংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার। দেশের আয়তন ১৭,৩৬৩ বর্গকিলোমিটার। একদিনেই স্বোয়াজিল্যান্ডের যে কোনো প্রান্ত থেকে ঘুরে রাজধানী এমবাবানেতে ফিরে আসা যায়। উত্তর থেকে দক্ষিণে ২০০ কিলোমিটার, পূর্ব থেকে পশ্চিম ১৩০ কিলোমিটার। দক্ষিণ আফ্রিকা আর মোজাম্বিকের পিঠ, কান ঘেঁষা এই দেশের অধিবাসী মূলত স্বোয়াজিরাই। সিস্বোয়াতি তাদের মাতৃভাষা। দেশের সরকারি কাজকর্মের ভাষা ইংরেজি।
আফ্রিকা মহাদেশের লোকজন এমস্বোয়াতি রাজাকে উলঙ্গ রাজা বলে অভিহিত করে। মূলত এ রাজার কিছু অনৈতিক ও নিয়ন্ত্রণহীন সামাজিক কাজকর্মের জন্য তার নাম উলঙ্গ রাজা। এ রাজার কাহিনী শুরু করার আগে একটু পেছনে তাকানো যাক। এমস্বোয়াতি থ্রি-র বাবা কিং সোভুজা টু একদিকে যেমন একের পর এক বিয়ে করেছেন, তেমনই স্বোয়াজিদের বিভিন্ন গোষ্ঠী সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ চালিয়ে গেছেন। কিং সোভুজা ৭০টি বিয়ে করেছিলেন। ২১০ জন ছেলেপুলে হয়েছিল তার। অনেকের মতে, রাজা এমস্বোয়াতির ভাই-বোনের সংখ্যা ২১০ ছাড়িয়ে। ৬১ বছর রাজত্ব চালিয়ে ৭৯ বছর বয়সে কিং সোভুজা যখন নিউমোনিয়ায় মারা যান, তখন তার নাতিপুতি তস্য পুতিনাতির সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
১৯৬৮ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে স্বোয়াজিল্যান্ড। সেই বছরের ১৯ এপ্রিল ভূমিষ্ঠ হন বর্তমান রাজা এমস্বোয়াতি থ্রি। যদিও এই এমস্বোয়াতিই যে ভবিষ্যতের রাজা হবেন, তা পূর্ব নির্ধারিত ছিল না। কারণ, স্বোয়াজিল্যান্ডের রাজারা তাদের উত্তরসূরি মনোনীত করে যেতে পারেন না। এরকমই প্রথা ছিল সেদেশে। রাজার মৃত্যুর পর রাজপরিবারের গণ্যমান্যরা মিলে সিদ্ধান্ত নেন, শূন্য সিংহাসনে কাকে বসানো হবে। এ জন্য প্রথমে বাছা হয় রানীদের মধ্যে একজনকে, যিনি শুধু এক ছেলেরই মা, সচ্চরিত্র এবং যার মধ্যে রাজমাতা হওয়ার সব গুণাবলী আছে। সেই রানীর ছেলের স্বভাব-চরিত্রও রানীর মতোই প্রশংসনীয় হতে হবে। পুত্র বিবাহিত হওয়া চলবে না। কিং সোভুজা টু যখন মারা গেলেন তখন আজকের এই রাজা এমস্বোয়াতি ইংল্যান্ডের ডোরসেটে শেরবোর্ন বোর্ডিং স্কুলে পড়তেন। বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। ভাবী রাজার হয়ে দেশ চালানোর জন্য প্রথমে সিনিয়র কুইন তথা গ্রেট ওয়াইফ তথা শি-এলিফ্যান্ট তথা কুইন মাদার হিসেবে বাছা হয়েছিল বর্তমান রাজার মাকে। আর সেই শি-এলিফ্যান্টের ছেলে হওয়ার সুবাদে ভাবী রাজার মুকুট চলে আসে এমস্বোয়াতির মাথায়। চার বছর মা-ই রাজকর্ম চালান। পরবর্তীতে ১৯৮৬-তে মাত্র ১৮ বছর ৬ দিন বয়সে এমস্বোয়াতি রাজা হন। হয়ে যান স্বোয়াজিল্যান্ডের এনগোয়েনামা তথা কিং লায়ন। এই রাজার রাষ্ট্রে সংসদ আছে, মন্ত্রিপরিষদও আছে। আছে হাইকোর্ট এবং আপিল কোর্টও। কিন্তু বাবার মতোই সংবিধান-আইনের তোয়াক্কা করেন না এমস্বোয়াতি, তার নির্দেশই শেষ কথা। এই রাজার দেশে বছরে যত মৃত্যু হয় তার ৬১ শতাংশই এইডস আক্রান্ত হয়ে। এই দেশে গর্ভবতী মহিলাদের ৪২ শতাংশই এইডসে আক্রান্ত। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে এইডসে ভোগান্তির হার ৪৯ শতাংশ। দেশের মানুষের গড় আয়ু মাত্র ৪০ বছর। এইডসের মোকাবিলায় নিজেকে অগ্রপথিক প্রতিপন্ন করতে এই রাজা আইন করেছিলেন আঠারোর কম বয়সীরা যৌনসংসর্গে লিপ্ত হলে তাকে/তাদেরকে জরিমানা হিসেবে একটি করে গরু বা সাড়ে ৬ হাজার স্থায়ীয় মুদ্রা জরিমানা দিতে হবে।
গরিবী থেকে নিস্তার পেতে রাজার বউ হতে চায় এই দেশের মেয়েরা। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের শুরুতে রিড ড্যান্সের আয়োজন করে রাজা এমস্বোয়াতি। এই রিড ড্যান্স থেকে রাজা একজন কুমারীকে নিজের রানী হিসেবে বেছে নেন। তবে বিয়ে করেন গর্ভবতী হওয়ার পর। অর্থাৎ রিড ড্যান্স থেকে তিনি পাত্রী পছন্দ করেন। এর পর পাত্রীটি গর্ভবতী হলে তাকে সরকারিভাবে বিয়ে করেন। তারা কবে গর্ভবতী হবেন, সেই প্রতীক্ষায় থাকেন রাজা। কারণ রানীর সংখ্যা বাড়াতে বাড়াতে ১০০ করতে চান তিনি। বর্তমানে তার ২৩ জন রাণী রয়েছেন।
ড্যান্সে অংশগ্রহণকারী মেয়েরা যে কুমারী তা বোঝাতে তাদের হাতে থাকে নেপালি খুকরির মতো এক ধরনের দা। সেই দা দিয়েই নলখাগড়া কেটে আনে তারা। চিতাবাঘ এবং সমগোত্রীয় অন্যান্য প্রাণীর চামড়া কেটে তৈরি সুপার মিনিস্কার্ট পরা এই মেয়েরা ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত অবস্থায় নাচে। সেই নৃত্যানুষ্ঠানের দৃশ্য ভিডিওতে তুলে রাখা হয়। রাজামশাই তথা রাষ্ট্রপ্রধান তার অবসর সময়ে সেই ভিডিও দেখে টপলেস বিউটিদের মধ্য থেকে ভাবী রানী নির্বাচন করেন। উদোম রাজার নিম্নাঙ্গের কিছুটা ঢাকা থাকে কাপড়ে, তার উপরে সিংহের চামড়া। সেই ১৯৯৯ সাল থেকে এই রাজা এভাবেই একের পর এক রানী বেছে আসছেন।
রাজা এমস্বোয়াতির ব্যবহারের জন্য চার কোটি টাকা দামের গাড়ি আছে। ১১০ কোটি টাকা দামের প্রাইভেট জেট বিমান আছে। প্রত্যেক রানীর জন্য আলাদা আলাদা প্রাসাদ তৈরি করা আছে সরকারি খরচে। এছাড়া প্রত্যেকের জন্য রয়েছে বিএমডবি্লউ গাড়ি। জনগণের দাবিকে উপেক্ষা করে দেশের কথা চিন্তা না করে নিজস্ব অনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন রাজা এমস্বোয়াতি। এসব বিকৃত চিন্তার জন্যই আফ্রিকার লোকজন তাকে উলঙ্গ রাজা বলে ডাকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


