একঃ
বাংলাদেশে বর্তমানের মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা সম্ভবত কম বেশি দুই কোটিতে পৌচেছে। অনুমান করা যায এর অর্ধেক ব্যবহারকারী হচ্ছেন নারী। ধরে নিলাম নারী মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮০ ল। এই ৮০ ল মোবাইল ব্যবহারকারী নারীর প্রত্যেকেরই রয়েছে একাধিক মোবাইল ফোন ব্যবহারজনিত গ্লানিকর বিড়ম্বনা কাহিনী। বয়স কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে এই সব নারী সারা দিন কম বেশি পুরুষ নামধারী কিছু বিকৃত রুচির মানুষের অবাঞ্ছিত ‘কলের’ (Annoying Call)আতংকে আতংকগ্রস্ত হয়ে থাকেন।
দুইঃ
কযেক দশক ধরে পুরুষ পরিচয় ধারী এই বিকৃত রুচির মানুষগুলোর প্রধান শিকার কর্মজীবি নারী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কিংবা সাংসারিক প্রয়োজনে বাইরে আসা নারীরা। এতে কত মেয়েদের শিক্ষা জীবনের ইতি টানতে হয়েছে ? কত অভিবাবক নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নাবালিকা মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার চেষ্টা করেছেন ? কিংবা কত নারী এদের উৎপাতে কর্মক্ষেত্র থেকে নিজে কে নিভৃত ঘরের কোণে সরিয়ে এনেছেন ? তার পরিসংখ্যান কেউ রাখেনি। ইভটিজিং বিষয় টা আজ অনেকটা গা সহা হয়ে গেছে। তাই ,একান্ত বাধ্য হয়ে নারীরা প্রতি দিন নীরবে এই সব লাঞ্ছনায় মৃয়মান হচ্ছে। এই সব লোমশ হাতের আঁচড়ে ক্ষত বিক্ষত দেহ-মন নিভৃতে লুকিয়ে রাখছে। এই সব লোলুপ চোখের চাহুনিতে দগ্ধ হচ্ছে।
তিনঃ
আমরা এমন সমাজের বাসিন্দা যেখানে আমরা বেশির ভাগই শক্তিমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবার শুধু সাহসহীনই নই; উপরন্ত্ যদি বঞ্চনার শিকার কেউ প্রতিবাদে চেঁচিয়ে উঠে, সদা শান্তি প্রিয় এই সব বাসিন্দারা তাদের শান্তি ঘুমভাঙ্গার অপরাধে সেই নিপীড়তের প্রতি বেশি ক্রদ্ধ হয়ে উঠি। এ কথাটা, ন্যায্য মুজুরী বঞ্চিত শ্রমিকের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, লাঞ্ছিত নারীর ক্ষেত্রেও একই রকম সত্য। চুড়ান্ত প্রতিবাদ স্বরূপ যখন কোন নারী আত্মহননের পথ চুড়ান্ত ভাবে বেছে ন্যায় তখন আমরা একটু নড়ে চড়ে বসি , একটু আফসোস বাক্য বিতরণ করি।
সমাজরে এই পরজীবি বাসিন্দাদের একাংশ আবার ঘরের বাহিরের ‘ইভটিজিং’ এর প্রতিকার খুজেন নারী কে গুহাবাসী করা কিংবা আপাদমস্তক র্যাপিং পেপারে মুড়ে রাখবার মধ্যে।
চারঃ
এ সবই অতি পুরাতন কথা। পুরাতন কথা জবর কাটার জন্য লজ্জিত। যারা এক সময় নারীকে গৃহবন্দী করে বা বুরখার অন্তরালে ঢেকে পশুগুলোকে বাইরে ছেড়ে দিয়ে নির্লিপ্ত ভাবে বসে বসে ঝিমুছিলেন , এবার তাদের ঘুমও হারাম হবার জোগার হয়েছে।
কারণ , ইভটিজারদরে দৌরত্ব আজ খোদ অন্দর মহলে ঢূকেছে মোবাইল ফোনের সূক্ষ ছিদ্র গোলে।
বিরক্তিকর মোবাইল কলের শিকার সিংহ ভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা। পথে ঘাটে টিজিং এর ভুক্ত ভুগীরা মূলত কিশোরী - তরুণীরা। কিন্তু মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী 'ইভ টিজাদের' অধিকাংশেরই কোন বাচ-বিচার নাই। বৃদ্ধা থেকে সদ্য কথা শেখা মেয়েটি কেউ তাদের অত্যাচার থেকে নিস্তার পাচ্ছে না। তাদের মোবাইল মাধ্যমে দৌরত্ব অনেক মেয়ের জন্য তার অভিবাবকের বিশ্বাস হানির কারণ হযেছে। জন্ম দিযেছে গৃহ বিবাদ, স্বামী স্ত্রী পারস্পরিক সন্দেহ।
পাঁচঃ
প্রবাদ আছে ··········কারও সর্বনাশ, কারও পৌষ মাস।
মোবাইল ‘ইভ টিজার’ রা আপনার আমার ব্যক্তিগত বা পরিবারিক অশান্তি যত বড় কারণ হোক না কেন,র্কারও সর্বনাশ, কারও পৌষ মাস।নির্ঘুম রাত কাটা না কেন ; এরা মোবাইল ফোন কোম্পানির জন্য হযে এসেছে আশীর্বাদ সরূপ্ । উন্মুক্ত করে দিযেছে নতুন আয়ের পথ। ব্যবসার নব দিগন্ত।
এখন জানেন না এ বাণিজ্য সম্পর্কে , তবে ঘুরে আসুন গ্রামীণ ফোনের পাতায় http://www.grameenphone.com/index.php?id=491
অতি সাধারণ একটা হিসাব দেই। প্রতি ব্যবহারকারী মাথা পিছু মাসিকCall Block Service চার্জ মাত্র ৩০/০০ টাকা। যদি চমকদার বিজ্ঞাপনে ভালো ভাবে মার্কেটিং করা যায় ; তবেই কেল্লা ফতে। এক রকম বিনা বিনিয়োগে মাসে ছাক্কা ৩০ কোটি টাকা সোজ পাবলিকের পকেট কেটে নিজেদের তহবিলে।
ছয়ঃ
বাংলা লিংক পাবলিক কে মা দিবসে মায়ের প্রতি Sorry বলানোর জন্য কতই না চেষ্টা করলো ক’দিন । অন্য দিকে , তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে কত মা ( ও ভবিষ্যৎ মা) যে প্রতি নিয়ত অপমানিত হচ্ছে আর আতংকের মধ্যে বাস করছে তার জন্য বাংলা লিংক একটি বার Sorry বলার প্রয়োজন উপলব্ধি করেছে কি? বরং মা’দের এই অপমান কর জীবনের সুযোগ নিয়ে , নতুন ব্যবসা পেতে নিযেছে। ইভ টিজিং নামক নতুন প্রোডাক্ট মার্কেটিং এর জন্য তৈরি হয়েছে চঠকদার বিজ্ঞাপণ ।
সাতঃ
পুজিবাদ এমন এক ব্যবস্থা যেখানে পুজি বিনিয়োগকারী কে প্রতিনিয়ত তাড়িত করে বৃহৎ মুনাফার মধ্য দিয়ে পুজিকে আরও ফুলিয়ে ফাপিয়ে নেওয়ার। এখানে কোন নৈতিকতা, কোন সামাজিক দায়বোধ কাজ করে না ।শুধু চাই যে কোন সুযোগকে যে কোন প্রকারে ব্যবহার করে মুনাফা লুটা ।
আমার কথা বিশ্ব্বাস হল না ? আসুন পুজিবাদের পক্ষে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিবিদের কথা শুনি , যিনি আবার দেশের বৃহত্তর মোবাইল অপারেশন কোম্পানীর ব্যবসার সাথে যুক্ত।
গ্রামীণ ফোনের উচ্চ কলরেট সর্ম্পকে সাপ্তাহিক ২০০ কতৃক প্রশ্ন।(২৯ জুলাই ২০০৫ সংখ্যা দ্রষ্টব্য)
সাপ্তাহিক ২০০০ঃ আপনারা কলচার্জ অনেক বেশি নিচ্ছেন। অর্থাৎ আমাদের দেশের মোবাইল কোম্পানিরা কলচার্জ বেশি রাখছে। বিশেষ করে পাশ্ববর্তী দেশের তুলনায় অনেক বেশি বলে কি মনে হয় না?
ড· ইউনুসঃ এটা আসলে হিসাবের ব্যাপার। নরওয়ের কোম্পানি এটা চালায়। তারা ভাবছে রেট কমালে আয় কমে যাবে। রেভিনিউ কমে যাবে। ব্যবসাযী হিসেবে রেভিনিউ কেন কমাবো? বরং বাড়াবো। কাজেই আমি যতক্ষণ এই রেট চালাতে পারবো ততণ চালিযে যাবো।
সুতরাং , কথা হচ্ছে মুনাফা টা কি করে বাড়বে। সে টা দেশের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে ভি ও আই পি ব্যবসা করে হোক আর ইভ টিজিং কে কেন্দ্র করেই হোক। টাকাই হচ্ছে লক্ষী , টাকাই দিবা নিশি আরাধোনা।
আটঃ
এবার একটা ভিন্ন কাহিনী বলি। বেশ কিছু দিন আগে ঢাকা বিশ্ব্ববিদ্যালয় এলাকার বেশি ভাগ রাত অন্ধকারে আবৃত থাকার প্রকৃত রহস্য পত্রিকায় পড়ে ছিলাম্। এর পুর্বে আমার ধারণা ছিল , লাইটগুলো বোধ হয নানা প্রয়োজনে অন্ধকারে বিচরণকারীরা ভেঙ্গে দেয়। রিপোর্ট থেকে জানলাম, আমি ভুল লোকদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছিলাম, এরা মূলত অন্ধকারের সুযোগ গ্রহণকারী। লাইট ভাঙ্গে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল এলাকায় নিয়মিত লাইট সরবরাহ করে সেই সব সাপ্লাইয়ার। এদের একটা ‘পেইড টোকাই’ গ্রুপ আছে , তাদের দিয়ে ক’দিন পর পর এ কাজটি তারা করে। কেন করে ব্যাখা করার কি আর প্রয়োজন আছে?
বলছিলাম মোবাইল অপারেটদের ব্যবসায়িক হীন মনোবৃত্তির কথা ।চলে গেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইট সরবরাহকারী ঠিকাদারদের কথায়। মাপ করবেন ,ধান ভানতে শিবের গীত গাইলাম তাই। কিন্তু, কারণ একটা আছে। এরা সব ব্যববসায়ীর জাত। বলা যায না, মোবাইল ইভ টিজিং এ মুনাফার লোভে তাড়িত হয়ে না আবার ‘টোকাই ইভ টিজার ভাড়া করে মোবাইল অপারেটরা।
নয়ঃ
লেখাটা সংক্ষিপ্ত করার জন্য এখানেই শেষ করতে পারতাম্। কিন্তু মানুষ হিসাবে অন্তত মোবাইল ইভ টিজিং এর বিষয়ে আমরা কি সোচ্চার হতে পারি না।
আমি একান্ত নিজস্ব ভাবনা থেকে কিছু প্রস্তাবনা উত্থাপন করলাম। জানি না হাস্যকর শোনাবে কি না? তবুও সাহস করে পেশ করলাম। পাঠকের মতামত ও সমালোচনায় তা ক্রুটি মুক্ত ও সমৃদ্ধ হবে প্রত্যাশা করছি।
১) নতুন বা পুরাতন মোবইল সীম ব্যবহারে ন্যাশনাল আইড নং ব্যবহার বাধ্যতামূলককরণ।
২) ইভ টজিং সংক্রান্ত অভিযোগগুলো মোবাইল ফোন কোম্পানীর পক্ষ থেকে যথাযথ মনিটরিং, এ জন্য প্রতিটি মোবাইল অপারেটরের নিজস্ব ইউনিট খোলা।
৩) অভিযোগ সত্য হলে প্রথম বার ‘ইভ টিজার’ কে সর্তক করা। এ ক্ষেত্রে সীম যে ন্যাশনাল আই ডি ব্যবহার করে কেনা বা সংগৃহীত সে ব্যক্তির জবাব দিহিতা। প্রতিষ্ঠানিক মোবাইলের ক্ষেত্রে উক্ত প্রতিসষ্ঠানের দায় দায়িত্ব বহণ করা।
৪) একই ব্যক্তির নামে দ্বিতীয অভিযোগের ক্ষেত্রে (ইভ টিজিং শিকার একই জন হওয়ার প্রয়োজন নাই) উক্ত ন্যাশনাল আই ডি বিপরীতে নতুন সীম উত্তলোন এক বছর সাসপেন্ড রাখা এবং একই ন্যাশনাল আই ডি এর বিপরীতে বিদ্যমান সকল সীম এক বছরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া ।
৫) একই ব্যক্তির নামে তৃতীয় অভিযোগের ক্সেত্রে উক্ত ন্যাশনাল আই ডি ধারণকারী ব্যক্তি কে মোবাইল ব্যবহারে সারা জীবনের জন্য অযোগ্য ঘোষনা করা এবং মোবাইল ফোন কতৃপক্ষ হতে সতদ প্রনোদিত ভাবে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচারের জন্য উত্থাপন।
৬) মোবাইল ইভ টিজিং এর ক্ষেত্রে ভিকটিমের অভিযোগের উত্তাপন বা সাক্ষ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে আইন সংশোধন করা।
৭) সকল মোবাইল অপারেটর ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সম্মিলিত ভাবে মোবাইল ইভ টিজিং নিযে কাজ করা।
৮) মোবাইল ফোন অপারেটরদের অনৈতিক ‘ইভ টিজিং’ নিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে, এর বিরুদ্ধে মোটিভেশন প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া।
মতামতের অপেক্ষায়।
ধন্যবাদ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


