
ঘড়ির নতুন সময় এবং আমাদের মধ্যবৃত্ত জীবনে টানাপোড়েনঃ
ক'দিন ধরে ঢাকা শহরে শেষরাতের হাওয়ায়ও হেমন্তের আবেশ চলে এসেছে। ভোর রাতের একটু একটু ঠান্ডা হাওয়া ।সূর্য উঠে সাড়ে ছয় টায় । ডিসেম্বর শেষ নাগাদ তা উঠবে আরও আধা ঘন্টা পড়ে। কাঁথা টা জড়িয়ে একটু ঘুমি নেওয়ার বেশ উপযুক্ত সময়।
কিন্তু আজকাল আর হেমেন্তের ভোরের আরাম ঘুমটা আমার মতই অনেকের হারাম হতে চলেছে। ৯ টায় অফিস।রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামের বিষয় টি মাথায় রেখে বেড়তে হয় এক-দেড় ঘন্টা আগে। তার আগেই একবার বাজার ব্যাগ হাতে ছোটা।আর প্রতি দিন সাতসকালে ৬ বছরের ভাগ্নি 'পুশন'এর স্কুলে যাওয়া নিযে কান্না আর আমার বোনের চিৎকার চেঁচামেছি তে বিছনায় চোখ বুজে পড়ে থাকবার উপায় থাকে না। ক'দিন আগে ব্লগে দেখেছিলাম একজন ব্লগার কোমলমতি শিশুদের স্কুলে যাওয়ার সময় বিবেচনা করে ঘড়ির সময় পুনঃবিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন।
আজ সকালে বাসে অফিসে আসার সময় একজন সহযাত্রী দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতায় জ্বালানি উপদেষ্টা উক্তি '' ঘড়ির কাঁটা আর পেছানো হবে না ।'' শীর্ষক খবরটি জোড়ে জোড়ে পড়ে শুনাতেই তা বাসের মধ্যে বাকি যাত্রীদের 'হট টকিং' পযেন্ট তৈরি করে দিলেন। এমন কি যে সহযাত্রিক কে প্রতিদিন বাসে উঠেই ঘুমিয়ে পড়তে দেখি তিনিও দেখি আজ রীতিমত আলোচনার সরব অংশীদার।
প্রায় প্রত্যেকের দৈনন্দিন জীবন - পারিবারি- দাম্পত্য জীবনে পরিবর্তিত ঘড়ির সময় নানা মুখী তিক্ততা সৃষ্টি করেছে। দু-একজন বিষয় টির পক্ষ নিতে গিযে বাকিদের আক্রমনার্তক জবাবে খুব বেশি দূব অগ্রসর হতে পারলে না, চুপ করে গেলেন। একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তি ঘড়ি সময় এগিয়ে দেওয়ার কারণে যে এখন অনেকেরই 'ফজরের নামাজ কাযা ' হচ্ছে না এবং এন 'ফজিলত'এ আল্লাহর রহমত সমগ্র জাতীয় জীবনে আর্র্শীবাদ হিসাবে নেমে আসবে এ বয়ান গাইতে গিয়ে রীতিমত মার খাবার উপক্রম হলেন। সবাই যখন তর্কে লিপ্ত আমি বাসের জানালার দিকে তাকাতেই আমার মনের পর্দায় ভেসে উঠলো কিছু সময় আগে দেখি আসা 'সোহাগ'এর অশ্রুসজল মুখ।
ঘড়ির নতুন সময় এবং সোহাগের কান্না ভিজা চোখঃ
'সোহাগ' আমার বাসার গলির মুখের ছোট রেস্তরাটার কাজ করে। বয়স ৮ কিংবা ৯ । (কখনও জানা হয় নি ।) রমজানের পর হতে বাসায় আমার জন্য তাড়াহুড় করে সকালের নাস্তা বানানোর ঝামেলা এড়াতে আমি পাড়ার রেস্তরা হতেই নাস্তা সরে অফিসে ছুটি। প্রতি সকালের মত আজ সেখানে ঢুকে ' সোহাগ' কে ডাকতেই সে যথারীতি আমারা নিধারিত নাস্তা নিয়ে হাজির। কিন্তু 'সোহাগ' এর মুখের দিকে তাকাতেই মনটা থমকে গেল। চোখ দুটো টকটকে লাল ।কান্নার পানি দু' গালে শুকিয়া আছে। কি ব্যাপার জানতে চাইলে মাথা নিচু করে দাড়ি রইলো। বেশি কান্নার ফলে সর্দি বসে যাওয়ায় নাকে টেনে আমার কাছ থেক সরে পরলো। বিল মিটাবার সময় মহাজন কে জিজ্ঞাস কররাম,'' মামা, সোহাগের কি হয়ছে?''
' কী আর হবে।খাইয়া খাইয়া গতরে চর্বি জইম্মা গ্যাছে। নবাবের বাচ্চা ঘুম ছয়টার সময়ও ভাঙ্গে না। দিচ্ছি আজ কিছু চর্বি খসাইয়া।''
ঘড়ির নতুন সময় এবং শ্রম শোষনের নীরব হাতিয়ারঃ
নতুন ঘড়ির সময়ের সাথে আমাদের দৈনন্দিন জীবন কে এখনও আমরা সমন্বয় করতে পারছি না আর সেই কারণের সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে আমাদের অভিযোগ- উষ্মার শেষ নাই। কিন্তু আমরা ' সাদা আস্তিন'এর নীতিবাগিশ মধ্যবৃত্তরা খবর রাখি না যে পরিবর্ততিত ঘড়ি সময় 'সোহাগ' এর মত লক্ষ লক্ষ শ্রম জীবি মানুষের জীবনে শ্রম শোষন নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বহু বছর ধরে যে 'সোহাগ'রা আমার মত অফিস যাত্রীদের রোজকার নাস্তা সময় হাজির করতে পাঁচ-সাড়ে পাঁচ টায় ঘুম থেকে উঠতো,সেই 'সোহাগ' নতুন সময়ে সেই একই সময় ঘড়ি ধরে উঠতে হয় যেন আমার অফিসে যাবার বিঘ্ন না ঘটে।আবার ঠিক আগের মতই, যত সময় আশে পাশের মানুষ সজাগ থাকে- যতক্ষন পর্যন্ত তাদের চায়ের তৃষ্ঞা পায়, ততক্ষন 'সোহাগ'দের রাতে ঘুমতে যাবার তার উপায় নেই।
সোহাগের রেস্তরার মহাজন কে নতুন সময় সম্পর্ক বেশ ক' মাস আগে জিজ্ঞাস করেছিলাম, ''ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা আগিয়ে দেয়াতে তো আপনার বেশ লাভ হচ্ছে, কারণ এক ঘন্টা বেশি দোকান খোলা থাকে।' মহাজন উত্তরে বলেছিল,' তা মোটেও নয়।' তারপর সে যা ব্যাখ্যা করে।
যে ব্যক্তি দিনে আগে দুই কাপ চায় খেত, এখন সেই ব্যক্তি দুই কাঁপের বেশি চা খায় না।তবে তার চা খাবার সময়টা বিস্তৃত হয়েছে ।ফলে অপরিবর্তিত ভোক্তাদের অপরিবর্তিত চাহিদা মিটাতেই ছোট খাটো রেস্তোরা-মুদি দোকান- বিপনী বিতান-ছোট খাটো ওয়ার্ক শপ এক ঘন্টা বেশি খোলা থাকছে।এক ঘন্টা বেশি খোলা থাকা মানেই একানে কর্মরত মানুষদের এক ঘন্টার অতিরিক্ত শ্রম।
এভাবেই দীর্ঘ হযেছে সোহাগের মত অসংগঠিত শ্রম ক্ষেত্রের শ্রমিকদের শ্রম ঘন্টা । কিন্তু বাড়ে নি এক টাকাও বেতন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

