লাভ ক্ষতির হিসাব
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিবিদরা জলবায়ুবিদদের সঙ্গে নিয়ে শুরু করেছেন কস্ট বেনিফিট এনালাইসিস। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ধরণটি কেমন হবে আর এর ফলে কতো খরচ হবে, কতো লাভ হবে ইত্যাদি এই কস্ট বেনিফিট এনালাইসিসের মূল লক্ষ্য।
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারনে যদি জলবায়ু পরিবর্তন হয়ে যায় তাহলে পৃথিবীর ক্ষতি বেশি হবে নাকি জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ করার জন্য ব্যয় বেশি হবে? এই দুটির মধ্যে কোনটি লাভজনক?
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে পৃথিবীর মানুষদের আর্থিক ক্ষতি হবে। আবার গ্লোবাল ওয়ার্মিং প্রতিরোধ করতেও আর্থিক ব্যয় হবে। এই বিষয়ে বিশ্বব্যাপী চলছে ব্যাপক গবেষণা এবং হিসাব নিকাশ। তাপমাত্রা বাড়লে শীতপ্রধান কিছু দেশে ফসল উৎপাদন বাড়বে। রাশিয়া, কানাডা সহ এ ধরনের কয়েকটি দেশের অর্থনীতি নতুন করে প্রাণশক্তি ফিরে পাবে। অন্যদিকে দেখা যায় তাপমাত্রা বাড়লে ফসল উৎপাদন কমে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বহু দেশের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যাবে।
রাশিয়ার একটি আইস ব্রেকার জাহাজ। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে এগুলোর চলাচল অনেক সহজ হবে
বৃটেনের হাউস অব লর্ড-এর এক রিপোর্টে বলা হয় বিশ্বের মোট উৎপাদনের ০.২% থেকে ৩.২% পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে গ্লোবাল ওয়ার্মিং প্রতিরোধের জন্য।
এসব যুক্তি দেখিয়ে কিছু অর্থনীতিবিদ এবং বিজ্ঞানী গ্লোবাল ওয়ার্মিং প্রতিরোধে ব্যয় করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তারা বলছেন গ্লোবাল ওয়ার্মিং সম্পূর্ণ অনিশ্চিত একটি বিষয়। তাই এ ধরনের অনিশ্চিত একটি বিষয়ে অর্থ ব্যয় করা উচিত নয়। এর চেয়ে স্পষ্ট ফলাফল পাওয়া যায় এমন কিছু বিষয়ে অর্থ ব্যয় করাই লাভজনক। দরিদ্র দেশগুলো গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারনে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তারা বলছেন, উন্নত দেশগুলোর উচিত শিল্প কারখানার কার্বন ডাইঅক্সাইড হ্রাস কিংবা এ ধরনের বিষয়ের পিছনে অর্থ ব্যয় না করে বরং দরিদ্র দেশগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি বিষয়ে অর্থ ব্যয় করা উচিত। তারা বলছেন এতে ভুক্তভোগীরাই গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলাফলের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো সামর্থ্য অর্জন করবে। যেমন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এমন করতে হবে যেন কৃষিকাজ বাদ দিয়ে সবাই অফিস আদালত কিংবা শিল্প কারখানায় কাজ করে। ফলে বিস্তীর্ণ ভূমি পানিতে ডুবে গেলেও লোকজনের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু পানির লেভেল যদি শুধু এক মিটার উচ্চতায় সীমাবদ্ধ না থেকে পৃথিবীর স্থলভাগের সবকিছুই ডুবিয়ে দিতে থাকে তাহলে কি হবে এ বিষয়ে তেমন কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেন নি।
এ ধরনের হিসাবের অংকটা মেলানো খুবই কঠিন। বিশেষ করে কেউই যখন বলতে পারছেন না ঠিক কি ঘটতে যাচ্ছে। বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড কি পরিমাণ থাকবে তা নির্ভর করে উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো এই গ্যাস নিয়ন্ত্রণে কি ধরণের উদ্যোগ নেয় তার ওপর। কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রার ওপর নির্ভর করবে পৃথিবীর তাপমাত্রা কি পরিমাণ বাড়বে।
নর্থ সির ট্রল গ্যাস ফিল্ড। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক গ্যাস উত্তোলন স্থাপনা
কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ
ফ্রেঞ্চ তেল কম্পানি টোটাল সম্প্রতি রাশিয়ান তেল কম্পানি গ্যাজপ্রমের সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। তাপমাত্রা সামান্য বাড়লে এদের প্রডাকশন খরচ অনেক কমে যাবে। শুধু এ চুক্তিই নয়, পৃথিবীর প্রচুর তেল ও গ্যাস কম্পানিগুলো এখন তাকিয়ে আছে নর্থ সি, উত্তর মেরু আর আলাস্কার দিকে। তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেই এসব জায়গা থেকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বেশ সহজ হয়ে যাবে। প্রডাকশন খরচও কমবে।
জলবায়ু পরিবর্তন সবার জন্য ক্ষতিকর হবে না। তাপমাত্রার সামান্য বৃদ্ধি রাশিয়ার অর্থনীতিতে খুবই উপকারী হবে। রাশিয়া এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ সহ কিছু শীতপ্রধান দেশের বিস্তীর্ণ প্রান্তর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। তাপমাত্রা সামান্য বাড়লে এই জমিগুলোতে কৃষিকাজ করা যাবে।
পৃথিবীর মোট তেল এবং গ্যাসের প্রায় ২৫% উত্তর মেরু অঞ্চলে এবং রাশিয়ার উত্তরাংশে মজুদ আছে বলে ধারণা করা হয়। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা, তুষার এবং বরফের কারণে এগুলো অনুসন্ধান করতে খরচ বেশী হয়। তাপমাত্রা সামান্য বাড়লে এগুলো অনুসন্ধান অনেক সহজ হয়ে যাবে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রবার্ট ম্যানডেলসন জানান ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লে সাবেক সোভিয়েত রাজ্যগুলোর প্রবৃদ্ধি প্রায় ১১% বাড়বে। কোনো দেশের পক্ষে ১১% প্রবৃদ্ধি অর্জন করা অত্যন্ত লোভনীয় একটি বিষয়।
প্রাথমিক হিসেবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জন্যই গ্লোবাল ওয়ার্মিং ক্ষতিকর হবে। জলবায়ু পরিবর্তন অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম নর্ডহুস ধারণা করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমেরিকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৫% কমবে। এছাড়াও ইন্ডিয়া ৫% এবং আফ্রিকার দেশগুলো ৪% জিডিপি হারাবে বলে তিনি জানান। অর্থনীতিবিদরা জানাচ্ছেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে শিল্পোন্নত দেশগুলোর তেমন ক্ষতি না হলেও কৃষি প্রধান দেশগুলোর প্রচুর ক্ষতি হবে। মি. নর্ডহুস জানাচ্ছেন ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বৃদ্ধিতে সমগ্র পৃথিবীর প্রবৃদ্ধি ৩% কমে যাবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মে, ২০০৮ সকাল ১১:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


