আমার চাকরি ও পড়াশোনা একসঙ্গে চলতে লাগলো। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ক্লাসের সময়ই বেশিরভাগ কাজ পড়ে। ফলে ক্লাস মিস হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই আমার পক্ষে ক্লাসের চেয়ে কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হয়।
প্রতিটা কাজেই পাউণ্ড দরকার। মাথার উপরে ঝুলছে বিপুল অংকের টিউশন ফি। পুরোটাই আমাকে কামাই করে পরিশোধ করতে হবে। দেশ থেকে টাকা এনে এখানে পড়ার কোনো মানে হয় না।
আবার পড়াশোনা করতে গেলে কাজের সময় পাওয়া যায়না। বেশি কাজ করলে পড়ার মতো মানসিকতা থাকে না। এসব বহুমুখী সমস্যায় এখানকার ছাত্ররা নিমজ্জিত।
প্রথম কাজটা পাওয়ার পর তারা প্রথম সপ্তাহে তিন দিন কাজ দিলো। প্রথম তিনদিন কাজ করার পর আমার কাজটাকে বেশ হালকা কাজ বলেই মনে হলো।
পরের সপ্তাহের কাজের জন্য আমি অফিসে গেলাম। তারা আমাকে জানালো, তোমার কাজের সিরিয়াল পরে জানানো হবে। সোমবার পর্যন্ত কোনো কাজ নাই।
সোমবার সকালে আমি ঘুমাচ্ছি। সাড়ে আটটার সময় আমার কাছে অফিস থেকে ফোন আসলো। ফোন করলো মালিকের মেয়ে।
হ্যালো, দুরন্ত। তোমার না এখন কাজে থাকার কথা, তুমি কোথায়? আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। আমার কাছে কোনো কাজের সিডিউল আসেনি।
সে আমাকে জানালো, এখনই কি কাজে যেতে পারবে?
আমি রাজি হয়ে গেলাম। বললাম, আধাঘণ্টার মধ্যে আসছি। তাড়াতাড়ি কোনোরকমে চোখমুখে পানি দিয়ে রেডি হয়ে রওনা দিলাম।
এরপর এভাবে সেই মেয়ে বহুদিন আমাকে জ্বালিয়েছে। হঠাৎ ফোন করে বলে, তোমার না এখন কাজে থাকার কথা.... তুমি জানোনা? আমিও শেষের দিকে ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করতাম। কারণ এতে কোথাও কাজে যাবার জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হয়না। মানসিক চাপটাও থাকে না। চট করে চলে গেলেই হয়। কাজের সময়ও বেশি না। বড়জোর দুই-তিন ঘণ্টা।
এভাবে দুই-তিন সপ্তাহ কাজ করার পর তারা আমাকে সেই এলাকা থেকে অন্য এক এলাকায় নিয়মিত কাজ দিতে থাকে। সে এলাকায়ও আমাকে পরিচর্যা করতে হতো একজন খুব বুড়ো আর একজন ডিজঅ্যাবল মানুষের।
বুড়ো মানুষটার নাম এরিখ। সে ছিল খুবই ভদ্র। সে আর তার ওয়াইফ একটা বাড়িতে ছিল। তার ওয়াইফও বেশ বুড়ো। তাদের ছেলেও ছিল। কিন্তু তারা ওই বাড়িতে থাকতো না। পাশের বাড়িতে থাকতো। তবে তাদের ওপর বেশ নজর রাখতো। এমনকি বুড়ি বাড়ির বাইরে গেলে তারা একজন করে বাসায় এসে বসে থাকতো। কেউ থাকতে না পারলে ফার্স্ট চয়েস কেয়ার এজেন্সি থেকে কেউ না কেউ থাকতাম। সেক্ষেত্রে কাজটা হতো খুব আরামের। বুড়োর পাশে সোফায় বসে ঘুমালেই হতো। ঘণ্টাপ্রতি টাকা দেয়া হলেও কোনো কাজ থাকতো না। আমি অবশ্য একটু সতর্ক। তাই কাজের সময় কখনো ঘুমাতাম না।
এরিখ খবরের কাগজ খুব পছন্দ করতো। এ কারণে প্রতিদিন সকালে তার বাসায় যাবার সময় আমি বাস থেকে তার জন্য একটা ফ্রি মেট্রো পত্রিকা নিয়ে যেতাম। এরিখকে বসার ঘরে সোফার উপর বসিয়ে চশমাটা পড়িয়ে দিয়ে তারপর হাতে পত্রিকাটা ধরিয়ে দিতাম। আমার কাগজটাতে সাইন নিয়ে তারপর হ্যাভ এ নাইস ডে, এরিখ। বলে সেদিনের মতো বিদায় নিতাম।
এরিখের ওয়াইফ, বুড়ির একটা গাড়ি ছিলো। সেটা অনেক পুরনো একটা কারাভ্যান। সেটা নিয়েই বুড়ি মাঝেমাঝে শপিং করতে যেতো।
আর দ্বিতীয় যাকে পরিচর্যা করতাম তার নাম কিটস। সে পুরোপুরি ডিজঅ্যাবল মানুষ। হুইলচেয়ার ছাড়া চলতে পারতো না। আবার মুখেও কথা বলতে পারতো না। হাতে কোনো জিনিস ভালোভাবে ধরতে পারতো না।
কিটসের বয়স ৪০ এর মতো। মাঝেমাঝে তার মেজাজ খুবই খারাপ থাকতো। সকালে কিটসের কাছে গিয়ে আমরা যখন তাকে ঘুম থেকে তুলতাম তখন প্রায় প্রতিদিনই তার গালি শুনতে হতো। এটাতে আমরা কিছু মনে করতাম না। কারণ, তাকে আমার কাছে খুবই অসহায় বলে মনে হতো।
ব্রিটিশ সরকার তার বাড়িটা বেশ যত্ন করে সাজিয়ে দিয়েছিলো। বাড়ির প্রবেশ পথ থেকে শুরু করে প্রতিটা দরজাই ছিল ডিজঅ্যাবল ফ্রেন্ডলি। অর্থাৎ হুইল চেয়ার যাতায়াতে কোনো অসুবিধা হতোনা।
তাদের বাসায় একটা কুকুর ছিলো। সেটা আমাদের সাড়া পেলেই ঘেউ ঘেউ শুরু করতো। তবে কখনো কামড়াতো না। কয়দিন পরে ওটার সঙ্গে আমার অবশ্য বেশ খাতির হয়ে গিয়েছিলো।
সামনে ক্রিসমাস। এ উপলক্ষে কিটসের বাসায় একটা খুব সুন্দর ক্রিসমাস ট্রি আনা হয়েছিল। তাতে অনেকগুলো ছোট রঙ্গীন বাতি ছিল। কিটস প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সেগুলো জ্বালাতো। আমি ইংরেজি কথাবার্তায় খুব একটা পারদর্শী না। সম্ভবত আগ্রহও কম। তবু কিটসকে শোনাতাম.... ওয়ান্ডারফুল। সে অবশ্য কোনো জবাব দিতো না।
এ সময়ই হঠাৎ একদিন শুনি কিটসের মা মারা গেছেন। তাতে কিটসের মন খুব খারাপ। পরদিন ওর বাসায় গিয়ে বুঝতে পারছিলাম। বেশ কয়দিন পরও তার মন ভালো হলো না।
এর মধ্যে আমার পরিচয় হলো আরো দুজন কেয়ারারের সঙ্গে। একজন হচ্ছে মুহাম্মদ সুব্রত অন্যজন জমজম। সুব্রত পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত। কিন্তু তার পরিবার মরিশাসে প্রতিষ্ঠিত। জমজম আফ্রিকা থেকে এসেছে। জমজম প্রথম দিনই জানিয়ে দিলো সে প্রেগন্যান্ট। আমিও গম্ভীর মুখে শুনলাম। কোনো মেয়ের কাছে থেকে এই কথা আমার এটাই প্রথম শোনা।
হ্যাদি আর ক্যারোলিন নামে আরো দুইজনের সঙ্গে পরিচয় হলো। ক্যারোলিনের ফোন নাম্বার একটা। কিন্তু সে ফোন করে অন্য নাম্বার থেকে। ব্যাপারটা জিজ্ঞাসা করতেই সে গম্ভীর মুখে জানালো অন্য ফোন নাম্বারটা তার বয়ফ্রেন্ডের। সেটাই প্রথম কোনো মেয়ের মুখ থেকে 'বয়ফ্রেন্ড' কথাটা আমার শোনা। শুনে খুবই হাসি পেলো। তবু হাসি চেপে রাখলাম।
মা মারা যাওয়ার পর কিটসের মেজাজ প্রতিদিন খারাপ থাকতো। এ সময় সে আমার সাথেও খারাপ ব্যবহার করতো। আমি অবশ্য কিছু বলতাম না। কিন্তু ক্যারোলিন তাকে বেশ জোরে বলতো, তোমার জন্য কেয়ারারের দরকার নাই।
এর মধ্যেই একদিন কিটস হুইল চেয়ার থেকে পড়ে গেল। সে নিজেই পা দিয়ে খুব জোরে হুইল চেয়ার টানছিল। এ সময় পাশের ওয়ালে ঘষা লেগে হুইল চেয়ার আটকে গেল। সে চেয়ারের একদম কিনারে বসে ছিল। ফলে টাল সামলাতে পারেনি।
এ সময় আমার কিছুই করার ছিল না। কারণ আমি যদি ধরতে যাই তাহলে সে রাগ করে।
কিটসের বোন ছুটে আসলো। জমজম আর আমি তাকে ধরে আবার চেয়ারে উঠিয়ে দিলাম। কিটসের কিছু হয়নি এটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।
ওর বোন কিছু বললো না। তবু এ ব্যাপারটা আমার ওর বোনের কাছে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা দরকার ছিল। কিন্তু আমার ইংরেজি উচ্চারণ তেমন ভালো না। ফলে তদের সাথে সাধারণত কথাবার্তা বলতাম না। আমাদের যে রিপোর্টের খাতা ছিলো তাতে এ বিষয়টা উল্লেখ করা দরকার ছিল। কিন্তু আমি ওদের ওখানে গিয়েই রিপোর্ট লিখে ফেলেছিলাম। ফলে রিপোর্টেও এ বিষয়ে কিছু লেখা হয়নি। এটা আমার বিরাট একটা ভুল ছিল।
এর কয়েকদিন পর আমার কাছ ছিল হ্যাদির সাথে। হ্যাদি খুব তাড়াহুড়া করতো। এ সময় কিটসের হাতে কিসের একটা আচড়ের দাগ ছিল। তাদের বাসার কুকুরের কারণে হতে পারে। কিংবা ওয়ালে ঘষা লেগেও হতে পারে। কিন্তু এ আচড়ের ব্যাপারটাও রিপোর্টে লেখা দরকার ছিল। আমি সেভাবে খেয়াল করিনি। কারণ বিস্তারিত রিপোর্ট লিখে সময় নষ্ট করার মতো সময় আমার হাতে থাকেনা। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে পারলে আমি সেখান থেকে গিয়ে সকালের ক্লাস ধরতে পারি।
তার পরদিন হ্যাদির আবার কাজ ছিল। সেদিন সে কিটসের দাড়ি কামিয়ে দিতে গিয়ে তার গাল সামান্য কেটে ফেলেছে। দাড়ি সেভ করতে গিয়ে এমন ঘটনা প্রায়ই হয়। কিন্তু এবার কিটসের বোন অফিসে রিপোর্ট করে দিয়েছে।
আমি সেদিন কাজে ছিলাম না। তবু সম্ভবত সেই সাথে সে আমার নামেও কোনো অভিযোগ জানিয়েছিল (হুইল চেয়ার থেকে পড়ার জন্য)। এ কারণে পরের সপ্তাহে আমাকে অফিস থেকে জানানো হলো, কিটসের হাতে একটা আচড় পাওয়া গেছে। বিষয়ে আমি কিছু জানি কিনা।
আমি বললাম, জানিনা।
তারপর তারা জানালো, তার বাসা থেকে অভিযোগ এসেছে। তোমাদের কাজের পর থেকে কিটসের হাতে একটা আচড় পাওয়া গেছে। এ বিষয়টা তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমার কাজ বন্ধ থাকবে। তবে আশা করি এ সময় বেশি লম্বা হবে না। এরপর ফার্স্ট চয়েস কেয়ার এজেন্সি থেকে আর কোনো কাজ পাইনি।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


