বৃটেনের চারপাশে পানি। দেশটির দক্ষিণ অংশ জুড়ে আছে ইংলিশ চ্যানেল। ইংলিশ চ্যানেল সম্বন্ধে নতুন করে বলবার কিছু নেই। প্রধানত ফ্রান্স ও বৃটেনকে আলাদা করা এ চ্যানেলটি ৩৪ কিলোমিটার থেকে ২৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ছাড়াও বহু ঐতিহাসিক ঘটনার স্বাক্ষী এই ইংলিশ চ্যানেল।
ইংলিশ চ্যানেলে বৃটেনের একটা দ্বীপের নাম আইল অফ ওয়াইথ। ভিক্টোরিয়ান আমল থেকেই পৃথিবী বিখ্যাত হলিডে রিসোর্টের জন্য দ্বীপটি বিখ্যাত। এর উত্তরের সাগর পালতোলা নৌকা চালানোর জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এজন্য দ্বীপটির উত্তরের বন্দর কাউসে সারা বছর পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। সঙ্গত কারণেই এ দ্বীপটির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে উন্নতমানের নৌকা ও নৌকার পাল তৈরির জন্য। পৃথিবীর প্রথম ওভারক্রাফট এ দ্বীপটিতেই তৈরি হয় বলে জানা যায়। বিভিন্ন ধরনের জলক্রিড়া আর রেসের জন্যও এ জায়গা পৃথিবী বিখ্যাত। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে কাউস উইক। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ব্যাপী হয়ে আসা রেস সিরিজ। প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৮২৬ সালে। ১ হাজারেরও বেশি ইয়ট এবং প্রায় ৮ হাজার ৫০০ প্রতিযোগী এতে অংশ নেয়। এ দ্বীপের জনসংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার হলেও এসব কারণে দ্বীপটি প্রতি বছর প্রায় ৩ মিলিয়ন পর্যটক ভ্রমণ করে।
অফিস থেকে যখন পরের সপ্তাহের সিডিউল চলে আসলো তখনো আমি জানতাম না যে আমার পরবর্তী গন্তব্য আইল অফ ওয়াইথ। বৃস্টল, নিউপোর্ট আর সাউথহ্যাম্পটন লেখাগুলো দেখেই আমি চিঠিটা রেখে দিয়েছি। থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নিয়েও আমাকে তেমন ভাবতে হয়না। সময়মতো অফিস থেকেই অনলাইনে হোটেল বুকিং দিয়ে আমার মোবাইলে হোটেলের নাম-ঠিকানা পাঠিয়ে দেয়। আর খাবার খরচ আমার হলেও পরে বিলগুলো পাঠিয়ে দিলেই হবে। যাতায়াত নিয়েও কোনো চিন্তা নেই। সবই অফিসের দায়িত্ব। তিনজন ইন্ডিয়ান ছেলে আর আমি এই চারজনের একসঙ্গে কাজ। আমাদের সঙ্গে একটা গাড়িও আছে। তাদের কাছে ফোন করে রওনা দেবার সময়টা জেনে নিলাম।
যাদের সাথে এবারকার কাজে যাচ্ছি তারাও এ এলাকায় আগে যায়নি। কিন্তু এখানের গাড়িগুলোতে নেভিগেশন নামের একটা যন্ত্র ব্যবহার করার ব্যবস্থা আছে। এ যন্ত্র প্রতিনিয়ত স্যাটেলাইটের সাথে সংযোগ করে গাড়ির সঠিক অবস্থান নির্ণয় করে এবং পথের নিখুত দিকনির্দেশনা দিয়ে দেয়। ফলে রাস্তা নিয়ে কোনো চিন্তাই করতে হয় না।
আমাদের সাথে যেহেতু গাড়ি আছে তাই আমরা ফেরিতে করে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। এতে দ্বীপের ভেতরে যাতায়াতে সুবিধা হবে।
সাউথহ্যাম্পটন ফেরিঘাটে গিয়ে দেখি বিশাল কাণ্ড। ফেরির মোট দুইটা ফ্লোরে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা আছে। ফেরির বাইরে সৃশৃঙ্খলভাবে সারি সারি গাড়ি দাড়িয়ে আছে। সিগনাল পাওয়া মাত্র গাড়িগুলো আস্তে আস্তে ফেরিতে উঠতে লাগলো। এটাই প্রথম আমার এতো বড় দুইতলা ফেরিতে উঠা।
বেশ কিছু সমুদ্রগামী জাহাজ দেখলাম। সাউথহ্যাম্পটন বন্দরটাকে বেশ বড় বন্দর বলেই মনে হলো। অবশ্য চারপাশে সমুদ্রবেষ্টিত বৃটেনে বহু বন্দর আছে। এর কোনোটাই কোনোটার চেয়ে কম না।
আমাদের ফেরিটি রেড ফানেল কম্পানির। এতে দ্বীপটিতে যেতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। অন্যদিকে দ্বীপটিতে যাবার লঞ্চ হচ্ছে রেড জেট। নামে লঞ্চ হলেও খুব দ্রুতগামী এ জলযানে দ্বীপটিতে যেতে সময় লাগে মাত্র ২৩ মিনিট। দূর থেকে এ জলযানগুলোকে দেখলে মনে হবে যেন পানির উপর দিয়ে উড়ে চলছে।
আবহাওয়াটা খুব একটা ভালো ছিলো না। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। তারপরও বৃষ্টি উপেক্ষা করে পর্যটকদের ভিড় লেগেই ছিল।
ঠাণ্ডা বাতাস আর বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ফেরির ছাদে উঠলাম। ফেরির ছাদে গিয়ে দেখি মানুষের ভ্রমণের শখের কোনো শেষ নেই। বহু নৌকা আর স্পিড বোটে করে মানুষজন নৌবিহার করছে। ফেরির ছাদে কেউ সপরিবারে বৃষ্টিতে ভিজছে। কেউবা ছবি তুলছে। আমি বৃষ্টির পানি থেকে ক্যামেরা বাঁচিয়ে কয়েকটা নৌকার ছবি তুললাম। বহু ধরনের পালতোলা নৌকা আর ইয়ট দেখা যাচ্ছিলো। দ্রুতগতির আধুনিক স্পিড বোট আর পালতোলা নৌকা উভয়ের কম্বিনেশনটা বেশ ভালোই লাগলো....
বহু দূরে দুবাইয়ের বুর্জ আল আরবের মতোই একটা টাওয়ার দেখা যাচ্ছিলো। আমরা চিনতে পারলাম। টাওয়ারটার নাম হচ্ছে স্পিনাকার টাওয়ার। লন্ডনের বাইরে এটাই বৃটেনের সবচেয়ে উচু টাওয়ার (মানুষের ওঠার উপযোগী)। কয়েকদিন আগে সেখানেও আমরা কাজে গেছিলাম। কিন্তু খুব ব্যস্ত থাকায় ঘোরাঘুরির সময় পাই নাই। ছবিও তোলা হয়নি। আজকে ক্যামেরার জুমকে কাজে লাগিয়ে টাওয়ারটার ছবি তুললাম। যদিও ৮-১০ মাইল দূর থেকে তেমন ভালো ছবি আসলো না। পোর্টসমাউথ ইংলিশ চ্যানেলে বৃটেনের আরেকটি বন্দর। মূলত সে বন্দরের প্রতীক হিসেবেই ১৭০ মিটার উচ্চতার এ টাওয়ারটিকে তৈরি করা হয়েছে।
আইল অফ ওয়াইথের মূল বন্দর কাউরে গিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড। হাজার হাজার পালতোলা নৌকা, স্পিড বোট, ইয়ট, ফেরি, ছোট-বড় নৌকা এসবের যেন মেলা বসেছে। সামারের হলিডে উদযাপন করার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ যেন দ্বীপটাতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।
তারপরও দ্বীপটার পর্যটক ব্যবস্থাপনা বেশ ভালো বলেই মনে হলো। কারণ রাস্তাতে উল্লেখযোগ্য কোনো জানজট দেখা গেল না। নিরাপদেই আমরা আমাদের কাজের জায়গায় পৌঁছালাম।
বেশ পুরনো একটা চার্চ দেখলাম।
একখান খুব সুন্দর পোর্শে গাড়ি দেখে ছবি তুলছিলাম। কিন্তু ছবি তোলা মাত্রই দেখি গাড়ির মালিক পিছনে এসে দাড়িয়েছে। তাড়াতাড়ি আবার হাঁটা দিলাম.....
দ্বীপের টুরিস্ট অ্যাট্রাকশনগুলো বেশ সুন্দর। টুরিস্ট ইনফরমেশন বিল্ডিংটাও পাথরের তৈরি বেশ পুরনো বিল্ডিং।
প্রিমিয়ার ইন হোটেলে আমাদের বুকিং দেয়া ছিল। হোটেলটাকে আমার বেশ পছন্দ হলো। হোটেলের বাইরে খুব সুন্দর বসার ব্যবস্থা। ভেতরে একটা বেশ সমৃদ্ধ বার আর রেস্টুরেন্ট আছে। রাতে খাবারের মেনু পছন্দ করলাম চিকেন কারি আর রাইস। ব্রিটিশদের চিকেনকে আমি বেশ সন্দেহের চোখেই দেখি। কারণ এ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা মোটেই ভালো না। কোন সময় আবার কাঁচা খাবার খাওয়া লাগে। কিন্তু এবারকার চিকেন কারিটা সেরকম না। বেশ ভালোই সিদ্ধ করা। স্বাদটাও খারাপ না। আর কয়েকদিন ভাত না খাওয়ায় গাপুস-গুপুস করেই সব খেয়ে নিলাম।
এখানকার প্রায় প্রত্যেক হোটেলেই পর্যটকদের ঘোরাঘুরির জায়গা সহ বিভিন্ত তথ্য সমৃদ্ধ বহু পুস্তিকা সাজানো থাকে।
হোটেলের বাগানেরও কয়েকটা ছবিও তুলে নিলাম।
পরদিন সকালে আমাদের হোটেলের খরচের সাথে নাস্তার ব্যাপারটাও অন্তর্ভূক্ত ছিল।
নাস্তার জন্য রেস্টুরেন্টে যাওয়ার পর দেখি অনেক রকম ফলমূল, চা-কফি, জুস, দুধ, পাউরুটি, বনরুটি, টোস্ট, মাখন ইত্যাদি সাজানো আছে। পাশে একটা টোস্টার রাখা আছে। যার যার পছন্দ মতো নিয়ে খাওয়া যায়। অবশ্য আমরা গিয়ে বসা মাত্র এক লোক এসে জিজ্ঞাসা করলো আপনারা কোন ধরনের নাস্তা খাবেন।
আমি ইংলিশ ব্রেকফাস্ট পছন্দ করলাম। আমার সঙ্গে অন্যরাও তাতেই সম্মতি জানালো। সঙ্গের ভারতীয় বন্ধুরা অবশ্য গরুর পাশাপাশি পর্ক বা শুকরও খায় না। এ ব্যাপারটা তারা জানিয়ে দিলো।
আমি তাদের একটু ভয় দেখালাম, নতুন অর্ডারের জন্য কিন্ত আলাদা বিল দিতে হবে।
কক্সবাজারে একবার এরকম হয়েছিলো। হোটেলের ফিক্সড নাস্তায় ছিল ডিম সিদ্ধ আর ব্রেড। আমরা তা চেঞ্জ করে ডিম ভাজি আর পরোটা নিয়েছিলাম। বিল দিতে গিয়ে দেখেছিলাম, নাস্তার মেনু সামান্য চেঞ্জ করার কারণে হোটেলের বিল আরও দেড়শ টাকা বেশি।
ইংলিশ ব্রেকফাস্ট আসলো। অর্ধেক টমেটো কেটে তা আগুনে পুড়িয়ে বেশ মজাদার একটা আইটেম তৈরি করেছে। আর ছিল মাশরুম, বিন আর ডিম। এই নাস্তাতে আমার কিছুই হলো না। বুফে পদ্ধতির খাবার তো ছিলোই। তাই আবার খাবার নিয়ে আসলাম। তরমুজ, পেপে, আম আরও কয়েকটা সুস্বাদু ফলের সালাদ। দুই বাটি খেয়ে শান্ত হলাম। এদের আপেলের জুসটা খুব সুস্বাদু ছিল। তবে মাত্র এক গ্লাস খাওয়ার পরই দেখি আর জুস নাই। সকাল দশটা পর্যন্ত নাস্তা সার্ভ করা হয়। দশটা পার হয়ে গিয়েছিল। তাই আর রিফিলের অপেক্ষা না করেই চলে আসলাম।
আমি অনেক খাবার নিলেও সবগুলিই খেয়ে শেষ করেছিলাম। কিন্তু আমার সঙ্গের ছেলেগুলো থালাভর্তি খাবার নষ্ট করলো দেখে একটু দুঃখই লাগলো। খাবার নষ্ট করাটা প্রচুর মানুষের অভ্যাস। বাড়তি খাবারের জন্য অবশ্য বাড়তি কোনো বিল আসলো না।
এরপর নানা কাজে কয়দিন খুব ব্যস্ত ছিলাম। এ ফেরি দিয়ে মোট যাতায়াত করতে হলো ছয়বার। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের ছবি তুলেছি। সবগুলো ছবিই এ পোস্টে দিয়ে দিলাম। সব কাজ শেষে আসবার সময় সূর্যাস্ত হচ্ছিলো। আকাশটা বেশ লাল হয়েছিল।
আসার সময় আমাদের গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেল। এখানকার প্রত্যেক গাড়িতেই ইন্সু্রেন্স করা থাকে। ইন্সু্যরেন্স কম্পানিতে খবর দেয়া মাত্রই তারা গাড়িটাকে টেনে কাছের এক গ্যারেজে পৌঁছে দিলো। মেকানিক্স জানালো গাড়ির ক্ল্যাচ নষ্ট হয়ে গেছে। ঠিক করতে একদিন সময় লাগবে। জানা গেল, আমাদের গাড়িটার ইন্সু্রেন্স ছিল সবচেয়ে কম খরচের। শুধুমাত্র রোডসাইড অ্যাসিস্ট্যান্স এবং নিকটবর্তী গ্যারেজে পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত। তাহলে এই তিনশ মাইল রাস্তা আমরা আসবো কিভাবে?
গাড়ির মালিক সুধির অবশ্য নতুন এক বুদ্ধি করলো। বার্মিংহামে তার এক বন্ধুর ইন্সু্রেন্সটা বেশ ভালো ছিল। সে ইন্সুরেন্স অনুযায়ী যে যদি নিজের গাড়ি ছাড়াও অন্য কোনো গাড়িতে থাকে এবং সেই গাড়িটা যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলেই তা কার্যকর হবে। সে বন্ধর কাছ থেকে সুধির ফোন করে ডিটেইলস জেনে নিলো। এরপর ইন্সু্রেন্স কম্পানিতে ফোন করলো।
কাহিনীটা সে তৈরি করলো এভাবে, কিশোর তার বন্ধুর এই গাড়িতে করে ঘুরতে এসেছে। এখন গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেছে। সুধির তখন কিশোর সেজে ইন্সুরেন্স কম্পানিতে আবার ফোন করলো। কিশোরের ইন্সু্রেন্স ব্যবহার করেই তার গাড়িটা বাসায় নেবার বুদ্ধি...
এখানকার ইন্সু্রেন্স কম্পানিগুলি বেশি প্রশ্ন করে না। এরাও এসে বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করলো না। শুধু জানালো বেশি দেরী হবে না। আর জানালো রাস্তায় ট্রাক চেঞ্জ করতে হবে। কারণ তাদের একটা গাড়ি ৬০ মাইলের বেশি দূরে যায় না।
আধাঘণ্টা পরে একটা ট্রাক আসলো। এক ড্রাইভার এসে সেই জলজ্যান্ত প্রাইভেট কারটাকে ট্রাকে উঠিয়ে নিলো। বেশ বড় ট্রাক। ড্রাইভারের পেছনে ৫-৬ জন বসার মতো ব্যবস্থা আছে। আমরাও ড্রাইভারের পেছনে উঠে বসলাম। এই ট্রাকটা গাড়িটাকে নিয়ে ৬০ মাইল দূরের একটা সার্ভিসে নিয়ে গেল।
এই কম্পানির নেটওয়ার্ক বেশ ভালো। সেখানে আমাদের জন্য আগে থেকেই আরেকটা ট্রাক অপেক্ষা করছিল। এই ট্রাক থেকে গাড়িটা নামিয়ে অন্য ট্রাকে উঠিয়ে আবার রওনা দিলো। গাড়ির স্পিড একটু কম। ড্রাইভার জানালো তার সর্বোচ্চ স্পিড হচ্ছে ৫৯ মাইল। এর বেশি স্পিড তার গাড়িতে উঠে না। এভাবে রিকভারি ট্রাকে করেই মাঝরাতে বাসায় ফিরলাম....
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


