somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উত্তর মেরুর বরফ গলছে: সম্পদের লোভে শুরু হয়েছে কাড়াকাড়ি

২২ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

উত্তর মেরুর হাড় কাপানো ঠাণ্ডা বাতাসের তীব্র আর্তনাদ, পাহাড়ের মতো বিশাল বরফখণ্ড ও দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারের কারণে আগে সেখানে খনিজ সম্পদ আহরণের তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ ছিল না। এসব কারণে এ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও ছিল না কারো তেমন আগ্রহ। ফলে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো চুক্তিও নেই। উদ্বেগজনক ব্যাপার হচ্ছে, পৃথিবীর তেল ও গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদের প্রায় চার ভাগের এক ভাগই আর্কটিক সাগরের তলদেশে আছে। এ কারনে তেল গ্যাসের মূল্য যতো বাড়ছে এ এলাকার প্রতি মানুষের লোভ ততোই বাড়ছে।
সম্প্রতি গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে উত্তর মেরুর বরফ গলে যাচ্ছে এবং আবহাওয়া সহনীয় হয়ে উঠছে। উত্তর মেরুতে মজুদ তেল, গ্যাসসহ বিভিন্ন সম্পদের মালিকানা দাবি করছে বিভিন্ন দেশ। কালো সোনা হিসেবে পরিচিত তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান করতে গিয়ে এ এলাকায় পরিবেশ নষ্ট করছে বিভিন্ন কোম্পানি।
মেরুর তাপমাত্রা বাড়ছে ফলে বরফ গলছে এবং আবহাওয়াও ধীরে ধীরে সহনীয় হয়ে উঠছে। এর ফলে বড় বড় তেল কম্পানি, জাহাজ কম্পানি এমনকি প্রাইভেট টুর অপারেটররাও আগ্রহী হয়ে উঠছে পৃথিবীর উত্তরতম অংশটির প্রতি।
২০০৫ সালের আগস্টে প্রথম একটি রাশিয়ান জাহাজ দি একাডেমিক ফিওদরভ কোনো আইস ব্রেকার ছাড়াই নর্থ পোল বা উত্তর মেরুতে পৌছায়। এরপর সে বছরই এ ধরনের আরো সাতটি জাহাজ আইস ব্রেকার ছাড়াই সেখানে পৌছায়। আগে এ ধরনের অভিযানে ভাসমান বরফখণ্ড ভাঙার জন্য জাহাজের সামনে অবশ্যই আইস ব্রেকার থাকতে হতো। বেশ কিছুদিন আগেই রাশিয়ান আইস ব্রেকারগুলো পর্যটকদের উত্তর মেরুতে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
আর্কটিক সাগরের বরফ যদি এভাবে পাতলা হয়ে গলে যেতে থাকে তাহলে ক্রুজ লাইনার বা প্রমোদ তরী, কন্টেইনার শিপ এবং অয়েল ট্যাংকার সবই আর্কটিক সাগরের ওপর দিয়ে যাতায়াত শুরু করবে। এতে তাদের যাত্রাপথ কমে যাবে কয়েক হাজার মাইল।

বরফ গলছে। মেরু ভল্লুকদের আবাসস্থল শেষ হয়ে যাচ্ছে.....

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ব্যাপারটি ঘটবে তেল ও গ্যাসের ক্ষেত্রে। পৃথিবীর তেল ও গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদের চার ভাগের এক ভাগই আর্কটিক সাগরের তলদেশে। ইউএস জিওলজিকাল সার্ভের এ ঘোষণা অনেক বিশেষজ্ঞকে আশ্চর্য করেছে। বরফ যতোই গলছে, তেল কম্পানিগুলো এ স্থান দখল করার জন্য ততোই মরিয়া হয়ে উঠছে।
লন্ডনের ফার্ম ইনভেসটেকের অ্যানালিস্ট ব্রুস এভার্স বলেন, আর্কটিকে অনুসন্ধান করা ছাড়া বড় কম্পানিগুলোর সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। তারা যদি ভাবে, সেখানে তেল ও গ্যাস আছে, তবে কোনোভাবেই তারা এটা হেলাফেলা করবে না। এ এলাকা যদি আর্কটিক ক্লোনডাইকে (ক্লোনডাইক কানাডার উত্তর-পশ্চিমের একটি নদী। এখানে ১৮৯৭ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত সোনা পাওয়া যেতো, যার লোভে এ এলাকায় বহু মানুষ ভিড় করেছিল)। পরিণত হয় তবে তারা সঙ্গী সাথীসহ ভিড় করবে। অন্যের আবিষ্কারের জন্য অপেক্ষা করার মতো সময় তাদের নেই।
ইউএস কংগ্রেসে বিল পাসের মাধ্যমে আলাস্কায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য অনুমতি নেয়ার চেষ্টা করছে বিভিন্ন কম্পানি। বারাক ওবামার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যেও এ ধরনের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর কথা আছে। ইতিমধ্যেই আলাস্কার অনেক উত্তরের ঠাণ্ডায়ও তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো কাজ শুরু করেছে। আলাস্কার সাগরে তেল-গ্যাস কোম্পানি বিপি অ্যামোকো একটি তেল সংরক্ষণাগার স্থাপন করছে যার নাম নর্থ স্টার।

নরওয়েজিয়ান কম্পানি স্ট্যাটঅয়েল একটি গ্যাস ফিল্ডের কাজ করছে যা বরফ শীতল ব্যারেন্টস সাগরের ওপারের সবচেয়ে উত্তরের বসতি হ্যামারফেস্ট থেকে ৯০ মাইল দূরে। স্নো হোয়াইট নামে পরিচিত প্রকল্পটি থেকে লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) ইওরোপ ও আমেরিকায় রফতানি শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আর্কটিক এনার্জির ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে স্টকম্যান ফিল্ড। এটাও ব্যারেন্টস সাগরে অবস্থিত। রাশিয়ার উপকূল থেকে এটি ৩০০ মাইল দূরে। স্নো হোয়াইট থেকে এটি ১০ গুণ বড়। সমুদ্রের বুকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্যাস রিজার্ভার এটি। এখানে রাশিয়ার কম্পানি গ্যাজপ্রম আরো কয়েকটি কম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে প্রায় ১২০টি কূপ খনন করার ঘোষণা দিয়েছে।
মি. এভারস বলেন, এটা দুর্ভাগ্য যে, নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল দেশগুলোর তেল ও গ্যাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য এখন রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল এলাকাগুলোই পরিণত হচ্ছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে।
এ ধরনের আগ্রহের ফলে দেশগুলোতে কূটনৈতিক উত্তাপও ছড়িয়ে পড়ছে। এ এলাকার সীমানা নিয়ে রাশিয়া, আমেরিকা, কানাডা, নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ড এ আটটি দেশের মধ্যে বিবাদ তৈরি হয়েছে।
গত বছর ইউএস ও কানাডার মধ্যে বিবাদ তৈরি হয়েছে নর্থ ওয়েস্ট প্যাসেজের শিপিং লেন নিয়ে। কানাডা এ এলাকাটিকে তার নিজের এলাকা বলেই মনে করে। এলাকাটির নিরাপত্তার জন্য দেশটি সেখানে মিলিটারি শক্তি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ইউএস অবশ্য এলাকাটিকে আন্তর্জাতিক জলসীমা হিসেবে মনে করে। নরওয়ে ও রাশিয়া ব্যারেন্টস সাগর নিয়ে ঝগড়া শুরু করেছে। ডেনমার্ক একাই সম্পূর্ণ উত্তর মেরুর মালিকানা দাবি করেছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দেশ সংলগ্ন সাগরের উপকূল ঢাল থেকে ৩৫০ মাইল পর্যন্ত সমুদ্রের দাবিদার। বর্তমান জরিপে দেখা গেছে, কোনো দেশের সীমানাই উত্তর মেরুর মালিকানা দাবি করার মতো অবস্থানে নেই। সে কারণে এলাকাটি ইন্টারন্যাশনাল সি বেড অথরিটির আওতাধীন হওয়ার কথা। অবশ্য ডেনমার্ক জানাচ্ছে ভিন্ন কথা। ডেনমার্কের একটি অংশ হচ্ছে গ্রিনল্যান্ড। ডেনমার্ক জানাচ্ছে, গ্রিনল্যান্ড থেকে সাগরের তল দিয়ে ১ হাজার ১০০ মাইল লম্বা একটি সরু ভূমি রেখা উত্তর মেরু পর্যন্ত চলে গেছে। ২০০৪ সালে এ প্রচেষ্টা শুরু করার সময় ড্যানিশ সায়েন্স মিনিস্টার হেলগে স্যানডার জানান, এর ফলে ডেনমার্ক তেল-গ্যাসের মতো সম্পদের মালিকানা পাবে। কানাডা ও রাশিয়াও উত্তর মেরুর মালিকানা দাবি করে এ ধরনের প্রমাণ হাজির করার চেষ্টা করছে। এ ধরনের বিষয় নিষ্পত্তি করতে সাধারণত অনেক বছর সময় লাগে।
আর্কটিক সাগরের এ পরিবর্তন পরিবেশ আন্দোলনকারীরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গেই দেখছেন। গত বছর নরওয়ে ঘোষণা করে এ এলাকার ভঙ্গুর ইকোসিস্টেমকে বাচানোর জন্য তেল বা গ্যাস কূপ খনন সীমিত করা হবে। ব্যারেন্ট সাগরের ৩১ মাইলব্যাপী কূপ খনন বর্জিত এলাকাটি থেকে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। অবশ্য ২০১০ সালে নিষেধাজ্ঞা আর থাকবে না। তারপর এ এলাকায় ব্যাপকভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা হবে। এ কাজ করার জন্য এখনই ১৭টি কম্পানিকে মোট ১৩টি তেল ও গ্যাস লাইসেন্স দেয়া হয়েছে।
গ্রিনপিসের এক ক্লাইমেট ক্যামপেইনার স্টেফানি টিউমোর প্রশ্ন করেন, আমরা কি কিছুই শিখিনি? পৃথিবীর মেরুগুলোর পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, এটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও এ পরিস্থিতি আর চলতে দেয়া যায় না।
[দুরন্তের পুরনো লেখা]
ছবি: নাসা ও গুগল।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ৩:৩৬
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×