আমরা লেক ডিস্ট্রিক্ট ভ্রমণ শেষে ট্রেনে করে রওনা দিয়েছিলাম কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই। হোয়াইটহ্যাভেন নামে একটা ছোট্ট শহরের কথা অবশ্য আগেই শুনেছিলাম। ট্রেনে যাবার সময় হোয়াইটহ্যাভেন দেখে তাড়াতাড়ি ট্রেন থেকে নেমে আসলাম। ভাবলাম শহরটা একটু ঘুরে দেখি।
৪৩৩ বছরের জীবন শেষে কয়লাখনিটি বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নেমে এসেছে মন্দা। হোয়াইটহ্যাভেন তবু স্মরণ করছে তার সেই যৌবনকালকে। এখন এখানে কোনো কয়লা উঠানো হয় না। রয়ে গেছে শুধু পুরনো কয়লাখনির ধ্বংসাবশেষ.....
১৯৮৬ সালে আমাদের দেশে ভূতাত্ত্বিক অধিদপ্তর যখন বড়পুকুরিয়ায় প্রথম কয়লাখনির বিস্তারিত অনুসন্ধান করছে সে সময়ই ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ ব্রিটেনের হোয়াইটহ্যাভেনের কয়লাখনিটি বন্ধ হয়ে যায়। এর সাথে সাথে এ শহরের ৪৩৩ বছরের কয়লা যুগের সমাপ্তি হয়।
১৭৩০ সালে এ শহরে ছিলো তৎকালীন সবচেয়ে (৪৫৬ ফিট) গভীর কয়লাখনি। গভীরতম সে পিটের নাম ছিলো স্যালটম পিট। সে পিট অবশ্য ১৮৪৮ সালে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এখনও সে পিটের কিছু ধ্বংসাবশেষ আছে। ১৮০০ সালের কয়লাখনিগুলোর মধ্যে এটাই বর্তমানে ব্রিটেনের সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। ঘোড়া ব্যবহার করে সে সময় কয়লাখনি থেকে কয়লা উপরে উঠানো হতো। এখানেই প্রথম সাগরের নিচের কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা হয়।
এ এলাকায় কয়লা উত্তোলন শুরু হয় ১৫৫৩ সালে। দীর্ঘ এ সময়ে প্রায় ৭০ বার কয়লাখনি পানিতে ডুবে যায়। এ খনিতে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ৫ শতাধিক শ্রমিক মারা যায় (কয়লাখনিতে প্রায়ই দুর্ঘটনা হয়)। এছাড়াও হোয়াইটহ্যাভেন একটি পুরনো বন্দর ও পোতাশ্রয়। এমন একটা পুরনো শহরে এসে পুরনো আমলের ডক আর বিল্ডিংগুলো দেখতে ভালোই লাগছিলো।
এখানে বেশ কয়েকটা পুরনো ডক আছে। আমরা হাটতে হাটতে একটার ভেতরে ঢুকলাম। সেটার ভেতরে একটা টাওয়ার আর বাতিঘরও ছিলো। কিন্তু কোনো জনপ্রাণীও ছিলো না। অবশ্য দুই একজন বুড়ো মাঝে মাঝে হাটাহাটি করতে করতে আসছিলো। তাদের একজনের কাছে জিজ্ঞাসা করে জানলাম বাতিঘরটাতে রাতে এখনো আলো জ্বলে।
পাশের সাগরটার নাম আইরিশ সি। এক বুড়িকে জিজ্ঞাসা করে নামটা নিশ্চিত হওয়া গেল।
হোয়াইটহ্যাভেন বন্দর পোতাশ্রয় অবশ্য অতো পুরনো না। সাইনবোর্ড দেখে বুঝলাম এটা মাত্র ৩০০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত.....
আরেকটা ডক দেখলাম চালু আছে। সেখানে বেশ কিছু বোট ছিলো।
হোয়াইটহ্যাভেনের ছোট রেল স্টেশনটা আরো ছোট হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকটা প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হয়ে গেছে।
এক লোক পাখিদের বেশ খাবারদাবার দিচ্ছিলো দেখে ভালোই লাগলো। অনুমতি ছাড়াই তার কয়েকটা ছবি তুলে ফেললাম (বৃটেনে এটা আইনবিরুদ্ধ)। মুখে কিছু বলেনি কিন্তু সে একটু বিরক্ত হয়েছিলো মনে হয়। তাই তার সাথে আলাপটা জমানো গেলো না।
পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য এ শহরের চেষ্টার শেষ নাই। গত কয়েক বছরে এখানে আয়োজন করা হয়েছে নানান বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের। নতুন আর পুরনো যুগের সমন্বয়ের জন্য রাস্তায় তৈরি করা হয়েছে নানান ভাস্কর্য। পুরনো আমলের কামানগুলোকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রাস্তায় রাস্তায়.....
লেখা না থাকলে বুঝতেই পারতাম না যে এটা সাইকেল স্ট্যান্ড।
আমরা আগেই শুনেছিলাম এখানে একটা জাদুঘর আছে। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতে করতে সেটা খুজে বের করলাম। জাদুঘরটার নাম দা বেকন। সেটার ভেতরে ঢুকে কিছু ছবিও তুললাম .......
বাচ্চাদের বিভিন্ন অনুভূতি লিখে রাখার জন্য ব্যবস্থা ছিলো জাদুঘরের ভেতরে। যেমন, তোমার প্রিয় শব্দ কোনটা? হাটার সময় তুমি কি চিন্তা করতো ভালোবাসো? তোমার মতে জীবনের মানে কি? তুমি কিভাবে স্মরণীয় থাকতে চাও। বড়রাও এগুলোর উত্তর পোস্টকার্ডে লিখে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখছে....
এ সময়ই আমার ক্যামেরাটা হাত থেকে পড়ে নষ্ট হয়ে গেল। অবশ্য অ্যাক্সিডেন্টাল ড্যামেজের ওয়ারেন্টি থাকায় তা ঠিক করতে পরে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে কিছু ছবি মোবাইল ক্যামেরায় আর বন্ধুর ক্যামেরা ধার করে তোলা লাগলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

