somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার বাবার স্মৃতি

২১ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাবা, আমার আজ আর আমাদের মাঝে নেই। ১৯৯৮ সালের ১৭ আগষ্ট তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন এমন এক জগতে যেখান থেকে কেউ আর ফিরতে পারেন না।
আমার বাবা ছিলেন খুব সহজ সরল একজন মানুষ। মাতবর বাড়ির বড় ছেলে হয়ে ও যিনি কোনদিন কোন সালিশীতে অংশগ্রহণ করেন নি। সরকারী চাকুরী করতেন, দূরে পোস্টিং হলো হঠাৎ, তখন আমার দাদা-দাদী খুবই অসুস্থ, তাই চাকুরীই ছেড়ে দিলেন, আমি তখন মাত্র দেড় বছরের।
এরপর বাবাকে করতে হয়েছে অমানুষিক পরিশ্রম। পৈর্তৃক সূত্রে প্রাপ্ত জমিজমার অভাব ছিল না। তাই চাকুরী ছেড়ে গৃহস্থালী দেখাশুনা করতে লাগলেন। এর মাঝে হঠাৎ একদিন আমার গ্রান্ডফাদার মারা গেলেন। স্বভাবতই মুসলমান যৌথ পরিবারের ভাঙ্গনের সুর বেজে উঠল। উল্লেখ্য আমার বাবারা দুই ভাই। মুরব্বীদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিন ঠিক হলো সংসার আলাদা করার। বাবা ও মেনে নিলেন, কিন্তু তখন তিনি বুঝতে পারেন নি কতটা দূর্ভোগ তার জন্য অপেক্ষা করছে। নির্ধারিত দিনের পূর্ব রাতে ডাকাত পড়ল আমাদের বাড়িতে। আর এমন ই ডাকাতি হলো পরদিন সকালে আমাদের কলাপাতায় ভাত খেতে হলো। কিন্তু বছর পাঁচেক পরে ডাকাতি হওয়া গহনা সহ অনেক তৈজসপত্র পাওয়া গেল আমার চাচার ঘরে।
এরপর বাবা ছোট খাট ব্যবসা শুরু করেন এবং যে জমাজমি ছিল তা চাষবাস করে মোটামুটি চলতে লাগল আমাদের সংসার। দুইভাই, এক বোন, বাবা মা আমার দাদীকে নিয়ে আমাদের সংসার। মধ্যবিত্ত পরিবারের চিরায়ত ঝামেলা আমাদের সংসারে ও ছিল। বাবা সবসময় চেষ্টা করেছেন তার সন্তানদের যত্ন নিতে, মানুষের মত মানুষ করতে।
আমাদের ছোট বেলায় আমাদের তিন ভাইবোনের কোন টিউটর ছিল না। বাবা নিজে আমাদের পড়াতেন এবং আমরা দুইভাই এসএসসি পর্যন্ত তাঁর কাছেই পড়েছি। আর বাবা তার শিক্ষাদানে সফল ছিলেন কারন আমরা তিন ভাই বোনই ফাইভে এবং এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছি।
ছোটবেলা থেকে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন আমার বাবা। রাতে বাবার কাছে ঘুমাতে না পারলে ঘুম হতো না। বাবা আমার পাশে না বসলে আমার খাওয়া হতো না। বাবা পড়াতে না বসলে আমার পড়া হতো না। এভাবে আমি বাবার একবারে ছায়াসংগী হয়ে উঠলাম।
বাবা আমাদেরকে প্রচন্ড স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কখন ও নিজের কোন সিদ্ধান্ত আমাদের উপর চাপিয়ে দিতেন না, বরং যে বিষয়ে তিনি বলছেন তার ভালো এবং মন্দ দুইটা দিকই তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরতেন এবং আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে বলতেন । বাবা ছিলেন আমার বন্ধু। আমার মনে আছে কলেজে পড়ার সময় এক সহপাঠীর উপর আমি খুবই রেগে যাই এবং তাকে মারব বলে সিদ্ধান্ত নেই এবং বাবাকে বলি আমি ঐ সহপাঠিকে মারব। কিন্তু কি আশ্চর্য! বাবা একটু ও রেগে গেলেন না, বরং বুঝালেন মারলে কি লাভ আর না মারলে কি লাভ এবং বললেন এখন কি করবা তুমি সিদ্ধান্ত নাও।
এমন মানুষটা তার ছেলেদের সফলতা নিজে চোখে দেখে যেতে পারেন নি। ১৯৯৮ সালের আগস্ট মাসে বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন, অবশ্য আগে থেকেই ডায়েবেটিস এ ভূগছিলেন তিনি। ১৫ দিন ক্লিনিকে থাকার পর ১৭ আগস্ট বিকাল সাড়ে পাঁচটায় প্রাণপ্রিয় বাবা আমাদের সামনে দিয়েই চলে গেলেন অন্যজগতে। এই ১৫ টা দিন একমুহুর্ত বাবা আমাকে তার কাছ থেকে সরতে দেননি। ক্লিনিকেই আমাকে সারতে হয়েছে আমার গোসল, খাওয়া, ঘুম; না এ নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ নেই, কিন্তু মাত্র ৫২ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন এবং যখন গেলেন তখন তার মাথার নীচে আমাদের দু ভাইয়ের হাত আর সামনে মা ও আমার ছোটবোন এবং আর ও অনেক আত্নীয় স্বজন।

আজ, বাবার উদ্দেশ্যে শুধু বলতে ইচ্ছা করছে, বাবা তুমি কি পার না আমাদের মাঝে আমার ফিরে আসতে, আজ ১১ টা বছর তোমাকে ছাড়া আমরা কেমন আছি তোমাকে বলে আমি বোঝাতে পারব না।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১:৩৫
৮টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:২৫



ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে। এই স্থানটি খুবই নিরিবিলি। দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা খুবই খারাপ। এমন ফাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×