somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট গল্প : প্রতীক্ষা ও ভালোবাসা

২২ শে নভেম্বর, ২০০৯ সকাল ১০:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মানুষের জীবনে কখন ও কখন ও এমন ঘটনা ঘটে যা সে কখন ও কল্পনা ও করতে পারে না। জীবন তার গতিতে চলতে থাকে কিন্তু মাঝে মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রাঘাত ঘটে যায় যা জীবনকে তার গতিপথ থেকে কক্ষচ্যূত করে ছাড়ে। যেমনটি ঘটেছে আমাদের শোভনের জীবনে।
শোভন আর শান্তা যেন একই বৃন্তে ফোটা দুইটি ফুল। একজন ছাড়া আর একজনের শোভা যেন মলিন। শোভন শান্তার থেকে বছর চারেকের বড়। ওদের পরিচয়টা একটা দূর্ঘটনার মাধ্যমে বলা যায়। শোভন তখন বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করার পথে। আর শান্তা সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধ নামক যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে চরম হতাশায় পতিত। পরবর্তী বছর সুযোগ আছে বলে অভিভাবকেরা শান্তনা দিতে লাগল। দেখতে দেখতে আর ও একটা বছর কেটে গেল আর শান্তা হয়ে পড়ল আরও হতাশ। সেই হতাশা সাথে নিয়ে শান্তা আবার ও ঝাপিয়ে পড়ল ভর্তিযুদ্ধে, শুরু করল প্রস্তুতি। কোচিং, টিচার কোনকিছুতেই তেমন কোন উন্নতি হলো না শান্তার অবস্থার। এমতবস্থায় শান্তার অভিভাবকেরা সরনাপন্ন হলো শান্তার কাজিন এর যে পেশায় একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। শোভন তার খুবই প্রিয় ছাত্র, পড়াশুনা ছাড়া যার আর কোন ধ্যান জ্ঞান নেই। শিক্ষক ভদ্রলোক ভালোমত জানেন শোভন যদি দায়িত্ব নেয় তবে এ যাত্রা শান্তা উতরে যাবে, কিন্তু টিউশনির নাম শুনলে শোভনের গায়ে জ্বর আসে আবার তা ও যদি কোন ছাত্রি পড়াতে হয়। শোভনের সাফ কথা টিউশনি করার থেকে পার্কে বাদাম বিক্রি করা ঢের সম্মানের, অন্তত আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে।
শিক্ষক ভদ্রলোক তাই একটু ঘুর পথে এগো্লেন। তিনি জানেন শোভন তাকে অসম্মান করবে না। একদিন শোভন ক্লাস শেষ করে হলে ফেরার জন্য পা বাড়িয়েছে এমন সময় শিক্ষক ভদ্রলোক তাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন
- শোভন একটু জরুরী প্রয়োজনে তোমাকে আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে।
- কোথায় স্যার!
- তোমার জরুরী কিছু না থাকলে চলো আমরা বেরিয়ে পড়ি, গিয়েই দেখ কোথায় যাচ্ছি।
অগত্যা শোভন রাজি হয়ে উঠে বসল শিক্ষক মহোদয়ের গাড়িতে। শোভন জানেনা সে কোথায় যাচ্ছে কিন্তু সে জানে তার শিক্ষক তাকে খারাপ কোথাও নিয়ে যাবে না। কিছুক্ষণ পরে একটি বাড়ির গেট দিয়ে গাড়ি ভিতরে গেল এবং করবেল বাজাতেই দরজা খুলে গেল। দরজার ওপাশে যাকে দেখল তার চোখে চোখ পড়ে গেল শোভনের আর সে কোন ভাবেই নিজের চোখকে সরাতে পারল না। অপর প্রান্তে যিনি ছিলেন তার ও একই অবস্থা, তারপর ও নিজেদের সংযত করে ড্রইংরুমে প্রবেশ করল তিনজন। ঢুকেই শিক্ষক মহোদয় বললেন-
- শোভন এই তোমার ছাত্রী আর ঐ তার বই খাতা, কাজেই দেরী না করে রিডিং রুমে চলে যাও আর পরিচয়পর্বটা সেখানেই সেরে নাও।
- কিন্তু স্যার আমি তো........
- তুমি টিউশনি কর না, এই তো! তুমি এখানে টিউশনি করছ না, আমার বোনটা গতবছর সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ও চান্স পায়নি। এবার ওর শেষ চেষ্টা, তুমি ভাই দায়িত্ব না নিলে যে এ যাত্রা রক্ষা হচ্ছে না।
নিরুপায় হয়ে শোভন শান্তার পিছন পিছন রিডিংরুমে পৌছালো, যেতে যেতে শান্তা তার মাকে ডেকে জানিয়ে দিল তার কাজিন এসেছে। রিডিংরুমে গিয়ে শোভনই প্রথম মুখ খুলল-
- আমি শোভন, বিশ্ববিদ্যালয়ে থার্ড ইয়ারে পড়ছি।
- আমি শান্তা আর আমার পড়াশুনার খবর তো আপানর স্যারের কাছে শুনলেন।
- ভর্তি পরীক্ষার জন্য কেমন প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
- আর প্রস্তুতি! আমাকে দিয়ে যে কিছুই হবে না, তা উনারা কেউই বুঝতে চান না। আর আমাকে আপনি করে বলছেন কেন, আমি বয়সে আপনার থেকে অনেক ছোট।
- না ঠিক অভ্যাস নেই তো,
- মানুষের অনেক কিছুই অভ্যাস থাকে না, অভ্যাস করে নিতে হয়।
- ঠিক বলেছেন, মানে বলেছ, এইযে তুমি বললে না তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না, কিন্তু এই হবে না টাকে হবে করাটা ও অভ্যাসে পরিনত করতে হবে।
- বা, বেশ ত আপনি, আমার কথা দিয়ে আমাকেই ঘায়েল করছেন।
এমন সময় শিক্ষক মহোদয় এবং শান্তার মায়ের প্রবেশ। শিক্ষক মহোদয় ঢুকেই –
- কি অবস্থা শোভন, তোমার ছাত্রীর ভবিষ্যত কেমন মনে হচ্ছে।
- আজকেই কেমন করে বলব স্যার, সবে তো পরিচয়।
- হ্যা, আমি জানি তুমি দায়িত্ব নিলেই ভবিষ্যত বলে কিছু হতে পারে। ওর চান্স পাোয়ার বিষয়টাকে তোমার চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিতে হবে, আর কোন চ্যালেঞ্জে যে শোভন পরাজিত হয় না সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইট কাঠ ও জানে।
এরপর শিক্ষক মহোদয় শান্তার মায়ের পরিচয় করিয়ে দিলেন শান্তার মায়ের সাথে। পরিচয় পর্বের পরে শান্তার মায়ের আন্তরিক ব্যবহার দেখে শোভনের মনে হতে লাগল বাংলা সিনেমার খালেদা আক্তার কল্পনা তার সাথে কথা বলছেন। যাই হোক সব মিলিয়ে শোভন দায়িত্ব নিতে রাজী হয়ে গেলো।
এরপর শোভন নিয়মিত শান্তাকে তার পড়াশুনায় সহযোগীতা করতে লাগল আর ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে এক অকৃত্রিম বন্ধুত্ব ও গড়ে উঠল। শান্তা ভর্তি পরীক্ষায় আশাতীত ভালো করল এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সাবজেক্টে ভর্তি হলো। শান্তার ক্লাস শুরু হওয়ার পর তাদের বন্ধুত্ব আর ও গাঢ় হতে শুরু করল। আর সেই বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। এভাবেই কাটছিল তাদের দিন। প্রেমের পাশাপাশি শোভনের মুল কাজ ছিল শান্তার পড়াশুনায় সহযোগীতা করা।
এরই মধ্যে শোভনের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলো এবং সে আশানুরুপ ফল করে, একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে চাকুরী নিয়ে বিভাগীয় শহর ছেড়ে রাজধানী শহরে পাড়ি জমালো। আর শান্তা পড়াশুনার প্রয়োজনে পড়ে রইল বিভাগীয় শহরেই। কিন্তু দু’জন দু’জায়গায় থাকলে ও একটা মুহুর্তের জন্য ও আলাদা হতে পারেনি কেউ। শোভন ডিউটি শেষ করেই ব্যস্ত হয়ে পড়ত মোবাইলে। ঘন্টার পর ঘন্টা মোবাইলে কথা বলে তারা প্রমাণ করত গ্রামীন ফোনের শ্লোগান “দৃরত্ব যতই হোক, কাছে থাকুন”। ঢাকায় এসেও শোভন মান্তার জন্য নোট তৈরী করত আর তা ইমেইল করে পাঠাত শান্তার মেইলে, শান্তার কাজ ছিল সে নোট প্রিন্ট নিয়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেয়া।
এভাবে শান্তা ও তার পড়াশুনা শেষ করল। ফলাফল ও ভালো করল। পড়াশুনা শেষ করেই শান্তা ঢাকায় আসার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শোভন চাইল বিয়ে করে নিয়ে আসবে কিন্তু শান্তা আর ও পড়াশুনা করার ইচ্ছা প্রকাশ করল। অবশেষে শান্তা ও চলে এলো ঢাকাতে। দু’জনে একই সংগে ভর্তি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি এক্সিকিউটিভ প্রোগ্রামে। সারাদিন অফিস শেষ করে শোভন সন্ধ্যায় শান্তাকে নিয়ে চলে যায় ক্লাসে, ক্লাস শেষ করে শান্তাকে তার হোস্টেলে পৌছে দিয়ে ফিরত নিজের ডেরায়। ছুটির দিনগুলি তারা কাটাতে শুরু করল ঢাকা ও তার আশ পাশেল দর্শণীয় স্থানগুলি পরিদর্শণ করে। এভাবে কেটে গেল একটা বছর। সামনে তাদের পরীক্ষা, এরই মধ্যে শান্তা জানালো সে কয়েকদিনের জন্য একটু গ্রামে যাবে, শোভন আপত্তি করল পরীক্ষার আগে গ্রামে না যাওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। কিন্তু শান্তা শুনল না, সে গেলো গ্রামে আর গ্রামে যাওয়ার পর থেকে শান্তার মোবাইল বন্ধ। শোভন দিন কাটাতে লাগল ডানা ভাংগা পাখির মত, আরচাতকের মত মোবাইলের তিকে তাকিয়ে থাকে কখন শান্তার পোন আসে। কিন্তু ফোন আর আসে না।
অবশেষে শান্তা ফিরল ঢাকায়, পরীক্ষার কয়েকদিন আগেই। এসে শান্তা দেখা করল শোভনের সাথে। শোভন কোন কিছু জিঞ্জাসা করার আগেই শান্তা তার হাতে একটি কার্ড ধরিয়ে দিল, কার্ডটি খুলল শোভন। একটি বিবাহোত্তর সম্বর্ধনার দাওয়াত পত্র। পাত্র-পাত্রীর নাম দেখে চমকে উঠল শোভন। পাত্রী আর কেউ নয় তার এতদিনের সঙ্গিনী শান্তা। শোভন কিছু বলতে পারল না শান্তাকে। শান্তা বিদায় নিয়ে চলে গেলো।
পরদিন শোভন অফিসে গেলো না, তারপরদিন ও না। বেশ ভেঙ্গে পড়ল সে। এরই মধ্যে পরীক্ষা শুরু হলো প্রথম পরীক্ষায় শোভন হাজির নেই দেখে সবাই শান্তাকে ধরল কারন জানতে, শান্তা কোন উত্তর দিলনা। পরদিন শোভন অফিসে কিছু না জানিয়ে ঢাকা থেকে কোথায় যে গেলো তা কেউ জানতে পারল না। দিন যায় মাস যায় বন্ধুরা প্রতীক্ষার প্রহর গোনে এই বুঝি শোভন ফিরে এলো, অফিসে তার পদে নতুন লোক এসেছে, কলিগরা তারপরও আশায় বুক বাধে, ফিরে আসবে তাদের হাসি খুশী প্রাণখোলা সহকর্মীটি। কিন্তু শোভন সে কোথায়.....................
১৮টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×