বিদেশী মোবাইল কোম্পানীগুলোর বার্ষিক বিনিয়োগের বহুগুণ অর্থ আবার বিদেশেই পাচার হচ্ছে। যেমন- গত অর্থবছরে এদেশ থেকে প্রায় ৯শ কোটি টাকা নিয়ে গেছে গ্রামীণ ফোন লিমিটেড (জিপি)। যা ওই বছরে নরওয়ের টেলিনর কোম্পানির প্রতিনিধিত্বকারী এ প্রতিষ্ঠানটির বিদেশ থেকে আনীত বিনিয়োগের ৩৫ গুণেরও বেশী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বরাত দিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এই তথ্য জানিয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২৮তম বৈঠকের সুপারিশ অনুযায়ী ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে এ তথ্য জানানো হয়। পরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তা ওই কমিটিতে প্রেরণ করা হয়।
অন্যদিকে- গ্রামীণ ফোনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে নমনীয় মনোভাব দেখানো নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) ব্যবসায় জড়িত থাকার পরও ওই প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু জরিমাণা করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা চাওয়ায় উল্টো মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বিটিআরসি। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে খোদ ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব এমন অভিযোগ করেছেন। এ তথ্যটিও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ওই ২৮তম বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে পাওয়া যায়।
বিদেশী মোবাইল কোম্পানীগুলো ২০০৯-১০ অর্থবছরে এদেশ থেকে কত টাকা নিজের দেশে নিয়ে গেছে; সে তথ্য জানাতে মূলত ৬টি মোবাইল কোম্পানীরই বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের বার্ষিক হিসেব পাঠিয়েছে বিটিআরসি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া ওই হিসেব অনুযায়ী ২০০৯-১০ অর্থবছরে গ্রামীণ ফোন এদেশে ২৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা এনেছে এবং বিপরীতে ৮শ ৬৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বিদেশে পাঠিয়েছে। একই ভাবে ওরাসকম টেলিকম বা বাংলালিংক ২শ ৪০ কোটি ৪২ লাখ টাকা এনে ৫শ ৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা পাঠিয়েছে। একজিয়াটা বা রবি ৩শ ৩২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এনে ৬শ ৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা পাঠিয়েছে। প্যাসিফিক টেলিকম বা সিটিসেল ৭৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এনে ১শ ২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা পাঠিয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানী টেলিটকের জন্য বিদেশ থেকে মাত্র ৩৩ লাখ টাকা এলেও তারা পাঠিয়েছে ৫১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এরপরও গত অর্থবছরে মোবাইল কোম্পানীগুলোতে বিদেশ থেকে আসা মোট অর্থের চেয়ে পাঠনো অর্থের পরিমাণ ছিলো কম। এর একমাত্র কারণ এয়ারটেলের বিশাল বিনিয়োগ। ওই বছরে তারা ২ হাজার ১৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এদেশে এনেছে; আর নিয়েছে ৩শ ৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এরই প্রেক্ষিতে ওই বছর শেষে ৬টি মোবাইল কোম্পানীর বিদেশ থেকে আনীত অর্থের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬শ ৮৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর বিপরীতে তারা বিদেশে পাঠিয়েছে ২ হাজার ৪শ ৮৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
এই বৈদেশিক লেনদেনে মোবাইল কোম্পানীগুলো কোন কর ফাঁকি দিয়েছে কিনা তা জানাতে পারেনি মন্ত্রণালয়। এব্যাপারে তারা সংসদীয় কমিটিকে বলেছে, ‘কর ফাঁকির বিষয়ে বিটিআরসি কোন তথ্য দেয়নি। তবে এ সংক্রান্ত তথ্য দেয়ার জন্য তাদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।’ এ ব্যাপারে জানাতে শনিবার (২৬ মার্চ) সকালে ও দুপুরে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল জিয়া আহমেদ (অব.) এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। তবে গত ২৩ জানুয়ারি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ওই ২৮তম বৈঠকে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল জিয়া আহমেদ (অব.) বলেছিলেন, ‘বিটিআরসি প্রতিটি মোবাইল কোম্পানীর হিসাব অডিট করবে’।
ওই বৈঠকেই কমিটির সভাপতি ড. অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেছিলেন, ‘২০০৯-১০ অর্থবছরে বিদেশী মোবাইল কোম্পানীগুলো এদেশ থেকে কত টাকা নিজের দেশে নিয়ে গেছে তার বিবরণী জানা প্রয়োজন।’ এর আগে তিনি আরো বলেন, ‘বিদেশী বিনিয়োগ আসলেই দেশ ও জনগণেল স্বার্থ রক্ষা হয়না। বিদেশী কোম্পানীগুলো কতটাকা নিয়ে যাচ্ছে তার হিসেব রাখতে হবে।’
মুখোমুখি মন্ত্রণালয়-বিটিআরসি
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২৮তম বৈঠকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব সুণীল কান্তি বোস জানান, ‘ভিওআইপি ব্যাবসার সাথে জড়িত থাকার কারণে গ্রামীণ ফোনকে শুধু জরিমানা করার সিদ্ধান্তটি মন্ত্রণালয়ের নয়; বিটিআরসি’র। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিটিআরসি’র কাছে জানতে চেয়েছিলো। কিন্তু বিটিআরসি তার পাল্টা জবাবে মন্ত্রণালয়কে বলেছে, তারা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বাধীন। মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কোন ব্যাখ্যা চাইতে পারে না। এমনকি মন্ত্রণালয়ের এর কোন তদন্তের এখতিয়ারও নেই।’
এর আগে এই কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর বৈঠকে অভিযোগ করেন, ‘বিদেশী বিনিয়োগ সম্প্রসারিত করার স্বার্থেই দেশীয় ছোট ছোট পিএসটিএন কোম্পানীগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।’ এই অভিযোগের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একই অপরাধে (ভিওআইপি ব্যবসায় জড়িত থাকায়) গ্রামীণ ফোনকে জড়িমানা করে ছেড়ে দেয় হল। কিন্তু দেশীয় কোম্পানীগুলোকে জরিমানা না করে লাইসেন্স বাতিলের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রমই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এটা অন্যায়।’
ড. মহিউদ্দিনের এই অভিযোগের ব্যাপারে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়েই বিটিআরসি’র বিরুদ্ধে উপরোক্ত অভিযোগ আনেন সচিব সুণীল কান্তি বোস। ওই সময় তিনি আরো বলেন, ‘দেশীয় কোম্পানীগুলোকেও গ্রামীণ ফোনের মত কারণ না দর্শিয়ে জরিমাণা করা যেত।’ এরই প্রেক্ষিতে মহিউদ্দিন খান আলমগীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দেশীয় কোম্পানীগুলোতে শুধু বন্ধই করা হয়নি। এদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে। কিন্তু গ্রামীণ ফোনের কারো বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। কারণ তারা বিদেশী। ঔপনিবেশিক আমলের এ ধরণের আচরণ স্বাধীন দেশে চলতে পারে না। জনগণকে এই অন্যায়ের জবাব দেয়ার মত ভাষা আমাদের (সংসদীয় কমিটির) নেই।’ এর আগে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী সকলকেই সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে। সাংবিধানিক এই দায়িত্ব মন্ত্রণালয় বিটিআরসির উপর ন্যস্ত করতে পারে না।’
পরবর্তীতে ওই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল জিয়া আহমেদ (অব.) আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেন, ‘যখন গ্রামীণ ফোনকে জরিমানা করা হয়েছে তখন বন্ধ হওয়া দেশী কোম্পানীগুলোকেও বন্ধ জরিমানা করা হয়েছিলো। কিন্তু জরিমানা দেয়ার পরও তারা শোধরায়নি। তাদের কোন গ্রাহক তালিকাও ছিলো না। এর আগে তিনি জানান, বন্ধ হওয়া দেশীয় ৫টি পিএসটিএন কোম্পানী দৈনিক ১ কোটি টাকা হিসেবে বছরে নূন্যতম ৩শ ৬০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।’
এছাড়া ওই বৈঠকে গ্রামীণ ফোনকে রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করতে দেয়ারও সমালোচনা করেন এই সংসদীয় কমিটির সভাপতি ড. অলি আহমেদ বীর বিক্রম। প্রসঙ্গত, জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রী এ কে খন্দকার, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও আ ন ম শামশুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
(প্রতিবেদনটি সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ'র বর্তমান সংথ্যায় প্রকাশিত হয়েছে)
আলোচিত ব্লগ
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন
স্মৃতির নৌকা
কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।
কোন কোন সন্ধ্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।