বহু আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তের প্রস্তাব সম্বলিত সংবিধান সংশোধন বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আজ শনিবার বিকেল ৩টা ৩৩ মিনিটে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সংক্রান্ত এ বিলটি উত্থাপন করেন।
এর আগে ব্যারিস্টার শফিক বিলটি উত্থাপনের প্রস্তাব তুললে তাতে আপত্তি দেন সংসদের একমাত্র সংসদ সদস্য মো: ফজলুল আজিম। এ সময় তিনি বলেন- ‘এই বিলটি সংসদে উত্থাপিত হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে। বিরোধী দলের সাথে আলোচনা করেই এসব সংশোধনী আনা হোক।’ বিলটি পাস হলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে বলে দাবি করে তিনি এটি উত্থাপন করা থেকে বিরত থাকারও আহবান জানান। এর আগে আজিম বলেন- ‘এই বিলে সংবিধানের যেসব সংশোধনীর প্রস্তাব আনা হয়েছে তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে। এক্ষেত্রে আমি মনে করি সরকার ও বিরোধী দলের ঐক্যমতের ভিত্তিতেই সংবিধান সংশোধন হওয়া উচিত।’ এর জবাবে ফজলুল আজিমের বক্তব্য ‘যুুক্তিসঙ্গত’ নয় জানিয়ে আইন মন্ত্রী দাবি করেন- আদালতের রায়ের আলোকেই সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সময় তিনি সংসদের সামনে এই বিল প্রণয়ণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। পরে বিল উত্থাপনের প্রস্তাব ভোটে দেন স্পিকার আব্দুল হামিদ এ্যাডভোকেট। কণ্ঠভোটে এ প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন আইন মন্ত্রী।
উত্থাপিত বিলের ২১তম দফায় বলা হয়েছে “সংবিধানের ‘২ক পরিচ্ছেদ-নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বিলুপ্ত হইবে।” বর্তমানে সংবিধানের এই পরিচ্ছেদে মূলত ৫৮(খ), ৫৮(গ), ৫৮(ঘ) ও ৫৮(ঙ) অনুচ্ছেদ রয়েছে। আর এসব অনুচ্ছেদেই তত্ত্ববাধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত সাংবিধানিক বিধানগুলো রয়েছে। ওদিকে- বিলের ২০তম দফায় সংবিধানের ৫৮ক অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদকালে কতিপয় বিধানের অপ্রযোজ্যতা’ শিরোনামে দেয়া ২১ নম্বর সুপারিশে এই অনুচ্ছেদটি বিলুপ্তি করতে বলেছিল সদ্য বিলুপ্ত সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি। বিলের ৪৫তম দফায় প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পদ বিলুপ্ত করে ১৪৭ অনুচ্ছেদ সংশোধনের এবং ৪৭তম দফায় ১৫২ অনুচ্ছেদ থেকে পদ দুটির সংজ্ঞা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
এবারের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে এ ব্যাপারে কিছুই বলেননি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদ। এখানে শুধু অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতাগ্রহণকারীদের শাস্তি প্রদান ও নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী দাবি করেছেন- সংবিধান সংশোধনের এই বিলটি আইনে পরিণত হলে তা ‘জনগণের রাজনৈতিক ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সংরক্ষণে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।’
অপরদিকে- ৪৮ পৃষ্ঠার এই বিলের প্রথম ভাগে বাংলায় লেখা প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো দ্বিতীয় ভাগে ইংরেজীতে ভাষান্তর করা হয়েছে। তবে ‘বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতি’ দুই ভাগেই বাংলায় লেখা রয়েছে।
বিশেষ কমিটির সুপারিশের মতো এই বিলের দফার সংখ্যা ৫১টি হলেও তা হুবুহু সেই সুপারিশগুলোর আদলে নেই। অনেক ক্ষেত্রে বিলের একটি দফার মধ্যেই কমিটির একাধিক সুপারিশ সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
এদিকে- সংসদে উত্থাপনের পর এ বিলটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ২ সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট প্রদানের জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন-২০১১ প্রণয়নে আনীত এই বিলটি গত ২০ জুন মন্ত্রি সভায় অনুমোদিত হয়। উল্লেখিত বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বিলটি প্রস্তুত করা হয়। এর আগে গত ৮ জুন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলসহ ৫১টি সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করে বিশেষ কমিটি। এরপর এসব সুপারিশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য প্রতিবেদনটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের নির্দেশ দেন স্পিকার আব্দুল হামিদ এ্যাডভোকেট। এরই প্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের ঐক্যমত ছাড়াই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সংক্রান্ত বিল প্রস্তুতের প্রক্রিয়া শুরু হয়। মন্ত্রি সভা এ বিলের অনুমোদন দেয়ার পর সংবিধানের ৮২ অনুচ্ছেদ অনুসারে এটি সংসদে উত্থাপনের অনুমতি দেন রাষ্ট্রপতি মো: জিল্লুর রহমান।
উল্লেখ্য, ক্ষমতাসীন মহাজোট নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের ৬৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দিনে অর্থাৎ বৃহস্পতিবারই এ বিলটি সংসদে উত্থাপিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মুদ্রণে বিলম্ব হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। ওই দিন সংসদ অধিবেশন মুলতবী করার প্রায় আধা ঘন্টা পর রাত ১০টার দিকে এই বিলের কপি বিজি প্রেস থেকে সংসদ সচিবালয়ে আসে।
বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষের আগেই আগামী নির্বাচন
বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আগামী জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। এমন বিধান রেখেই জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করা হয়েছে।
সদ্য বিলুপ্ত সংবিধান সংশোধনে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমার ক্ষেত্রে যে-সুপারিশ করেছিল, উত্থাপিত বিলে তারই প্রতিফলন দেখা গেছে। বিশেষ কমিটি সংবিধানের সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ১২৩-এ সংশোধনী এনে সুপারিশ করে বলেছিল ‘মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ এই সুপারিশটি বিলে সন্নিবেশিত করার সময় ‘পূর্ববর্তী’র জায়গায় ‘পরবর্তী’ মুদ্রিত হলেও সংসদে উত্থাপনের আগে তা হাতে লিখে ঠিক করে দেয়া হয়। এই অবস্থায় বিলটি পাস হলে আগের মডেলের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কবর রচিত হওয়ার পাশাপাশি সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার র্প্বূবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে করার বিধান কার্যকর হবে। তবে আগামী সংসদ নির্বাচন কীভাবে কার অধীনে হবে, তা অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে।
এদিকে- প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অনুপস্থিতিতেই বিল উত্থাপন ও পাস হতে যাচ্ছে। তাছাড়া সংবিধানের সপ্তম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়-নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ কপিপ্রকাশের আগেই বিলটি পাস হতে পারে।
বিলের ৩ নম্বর প্রস্তাবে রয়েছে- প্রথম অনুচ্ছেদে প্রস্তবনায় ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন হবে। বিলে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে ১৫০(২) অনুচ্ছেদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত বাংলাদেশের ঘোষণা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিলে বলা রয়েছে- ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাত শেষে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা।’ ঘোষণাটি হল- ‘ইহাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যাহা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।’ একই সঙ্গে বিলে সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে ১৫০(২) অনুচ্ছেদে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণ এবং সপ্তম তফসিলে ১৫০(২) অনুচ্ছেদে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব রয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৯ এ সংশোধনীর প্রস্তাব এনে বিলে বলা হয়েছে ‘ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালী জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালী জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।’ ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে বিলে প্রস্তাবে করা হয়েছে ‘মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’
১৯ অনুচ্ছেদে (২) দফার পর (৩) দফা সংযোজনের প্রস্তাব দিয়ে বিলে বলা হয়েছে- ‘(৩) জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ সংবিধানে নতুন ২৩ক অনুচ্ছেদ সন্নিবেশের প্রস্তাব দিয়ে বিলে বলা হয়েছে- ‘২৩ক। উপজাতি, ুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি। রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’
উত্থাপিত হতে বিলে অনুচ্ছেদ ৬৫-এ সংশোধনী এনে সংসদের সংরতি আসনের সংখ্যা ৪৫ থেকে বৃদ্ধি করে ৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ৬৫ অনুচ্ছেদে নতুন করে ৩(ক) দফা সংযুক্ত করার প্রস্তাব দিয়ে বিলে বলা হয়েছে- ‘৩(ক) সংবিধান (পঞ্চদশ) আইন-২০১১ প্রবর্তনকালে বিদ্যমান সংসদের অবশিষ্ট মেয়াদে এই অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ণিত প্রত্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত তিন শত সদস্য এবং (৩) দফায় বর্ণিত পঞ্চাশ মহিলা-সদস্য লইয়া সংসদ গঠিত হইবে।’ এর ফলে চলতি সংসদেই নারী আসন পাঁচটি বাড়তে যাচ্ছে।
অধস্তন আদালতসমূহের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা সম্পর্কিত ১১৬ অনুচ্ছেদে সংশোধনীর প্রস্তাব এনে বিলে বলা হয়েছে- ‘বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরীসহ) ও শৃঙখলাবিধান রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত থাকিবে এবং সুপ্রীম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে।’
ফিরে দেখা : সংবিধানের প্রথম থেকে চতুর্থদশ সংশোধনী
১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০১০ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবিধানে ১৪টি সংশোধনী আনা হয়েছে। এর সংশোধনীর সংক্ষিপ্তসার শীর্ষ নিউজ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।
প্রথম সংশোধনী : সংবিধানের প্রথম সংশোধনী আনা হয় ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে। এ সংশোধনীর মাধ্যমে ৪৭ অনুচ্ছেদে দুইটি নতুন উপধারা সংযোজন করা হয়। এ সংশোধনীর মূল কারণ ছিল গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য আইন তৈরি করা ও তা কার্যকর করা।
দ্বিতীয় সংশোধনী : ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হয়। যার মাধ্যমে সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদে (২৬, ৬৩, ৭২ ও ১৪২) সংশোধন আনা হয়। নিবর্তনমূলক আটক, জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও এ সময় মৌলিখ অধিকারগুলো স্থগিতকরণ সম্পর্কে প্রথমদিকে সংবিধানে কোনো বিধান ছিল না। এ সংশোধনীর মাধ্যমে বিধানগুলো সংযোজন করা হয়।
তৃতীয় সংশোধনী : মূলত ভারত ও বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণী একটি চুক্তি বাস্তবায়ন করার জন্য ১৯৭৪ সালের ২৮ নভেম্বর এ সংশোধনী আনা হয়। ভারতের কিছু অংশ বাংলাদেশে আসবে এবং বাংলাদেশের কিছু অংশ ভারতে আসবে- এ চুক্তি বাস্তবায়নের জন্যই তৃতীয় সংশোধনী আনা হয়।
চতুর্থ সংশোধনী : ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি এ সংশোধনীর মাধ্যমেই দেশের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হয়। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করা; এক দলীয় শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা; রাষ্ট্রপতি ও সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রপতি অপসারণ পদ্ধতি জটিল করা; সংসদকে একটি তাহীন বিভাগে পরিণত করা; মৌলিক অধিকার বলবৎ করার অধিকার বাতিল করা; বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করা ও উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করা। ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাতিল হয়ে যায়।
পঞ্চম সংশোধনী: জাতীয় সংসদে এ সংশোধনী আনা হয় ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল। পঞ্চম সংশোধনী সংবিধানে কোনো বিধান সংশোধন করে নি। এ সংশোধনী ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টে সামরিক শাসন জারির পর থেকে ৬ এপ্রিল ১৯৭৯ পর্যন্ত সামরিক শাসনামলের সব আদেশ, ঘোষণা ও দণ্ডাদেশ বৈধ বলে অনুমোদন করে।
ষষ্ঠ সংশোধনী : ১৯৮১ সালের ১০ জুলাই এ সংশোধনী আনা হয়। ষষ্ঠ সংশোধনী কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে করা হয় নি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উপ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তৎকালীন বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে তাদের প্রার্থী হিসেবে আব্দুস সাত্তারকে মনোনয়ন দান করে।এ সংশোধনীর মাধ্যমে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী পদকে প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদ বলে গণ্য করা হবে না।
সপ্তম সংশোধনী : ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে সামরিক শাসন বহাল ছিল। ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সপ্তম সংশোধনী আনা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক শাসনামলে জারি করা সব আদেশ, আইন ও নির্দেশকে বৈধতা দেওয়া হয় এবং আদালতে এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন না করার বিধান করা হয়। এ সংশোধনীতে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬২ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ করা হয়। ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট এ সংশোধনী আদালতে কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত হয়।
অষ্টম সংশোধনী : ১৯৮৮ সালের ৯ জুন সংবিধানে অষ্টম সংশোধনী আনা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে (২, ৩, ৫, ৩০ ও ১০০) পরিবর্তন আনা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বলে ঘোষণা করা হয়, হাইকোর্টবিভাগের ৬টি স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করা হয়, বাঙ্গালীকে বাংলাদেশী এবং ডেক্কা কে ঢাকা করা হয়।
নবম সংশোধনী : নবম সংশোধনী আনা হয় ১৯৮৯ সালের ১১ জুলাই। এ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও উপ রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে কিছু বিধান সংযোজন করা হয়। এ সংশোধনীর আগে রাষ্ট্রপতি ও উপ রাষ্ট্রপতি যতবার ইচ্ছা রাষ্ট্রপতি পদের জন্য নির্বাচন করতে পারতেন। এ সংশোধনীর পর অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।
দশম সংশোধনী : ১৯৯০ সালের ১২ জুন দশম সংশোধনী বিল পাশ করা হয়। মহিলাদের জন্য আসন ১৫ থেকে ৩০ বাড়ানো হয়।
একাদশ সংশোধনী : ১৯৯১ সালে এ সংশোধনী পাশ হয়। এর মাধ্যমে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগদান বৈধ ঘোষণা করা হয়। এতে আরো বলা হয়, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এ উপ রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করতে পারবেন এবং উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে তার কর্মকাল বিচারপতি হিসেবে বলে গণ্য হবে।
দ্বাদশ সংশোধনী : ১৯৯১ সালের এ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৭ বছর পর দেশে পুনরায় সংসদীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
ত্রয়োদশ সংশোধনী : ১৯৯৬ সালের ২৬ মার্চ এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়।
চতুর্দশ সংশোধনী : ২০০৪ সালের ১৬ মে এ সংশোধনী আনা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরতি মহিলা আসন ৩০ থেকে ৪৫ করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সীমনা ৬৫ থেকে ৬৭ করা হয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি এবং সরকারি ও আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিকৃতি বা ছবি প্রদর্শনের বিধান করা হয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুন, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





