somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের দেশে হবে সেই মন্ত্রী কবে...।আনিসুল হক। (পর্ব-০১)

০৭ ই অক্টোবর, ২০১০ সকাল ১০:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সম্প্রতি আমেরিকার টাইম ম্যাগাজিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে নিয়ে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, মনমোহন সিং হয়তো কথা দিয়ে নিযুত অনুসারীর চিত্ত জয় করতে পারেন না, কিন্তু তিনি তাঁর কাজ দিয়ে কোটি কোটি মানুষের ভাগ্যের উন্নতি ঘটিয়েছেন। তিনি পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রটিকে পৃথিবীর দ্রুততম অগ্রসরমাণ অর্থনৈতিক শক্তিতেও উন্নীত করতে পেরেছেন। নানা কর্মসুচির মধ্য দিয়ে তিনি গরিব মানুষের নেতা হিসেবেও গণ্য হচ্ছেন। কথা নয়, কাজই মনমোহন সিংকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতাসমেত দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এনেছে।
কথা নয়, কাজে বড় হবে−এ ধরনের মানুষ কি আমরা বাঙালি সমাজে পাব না?
কবি জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারী দাশ বরিশালের একান্নবর্তী বাড়িতে বসে ঘরকন্না করতেন, রান্নাঘরে উনুনের পাশেই বসে যেতেন কবিতার খাতা নিয়ে, তেল-হলুদ মাখা হাতেই রচনা করে ফেলতে পারতেন কবিতা। একটা লাগসই কবিতা তিনি লিখে গিয়েছিলেন−আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে। তাঁর ছেলে জীবনানন্দ দাশ মায়ের এই চাওয়া পূরণ করতে পেরেছিলেন, তিনি একেবারেই কথা বলতে পারতে পারতেন না, মুখে কথা আটকে যেত, হাতের তালু ঘামত, কিন্তু লিখে রেখে গিয়েছেন অবিনাশী সব পঙ্ক্তিমালা, যা চিরকাল আলো দেবে বাঙালিকে। জীবনানন্দ দাশের মতো এ রকম একজন-দুজন মানুষ বাদ দিলে কুসুমকুমারী দাশের এই আক্ষেপ বাঙালি জাতির শাশ্বত আক্ষেপ হিসেবে আজও উচ্চারণযোগ্য −আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে। আর সেই কথাটিকে আরও নির্দিষ্ট করে নিয়ে বলা যায়−আমাদের দেশে কবে সেই মন্ত্রী কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।
দিনবদলের সনদ ঘোষণাকারী শেখ হাসিনা নির্বাচনে অভুতপূর্ব সাফল্য অর্জন করার পর মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। সেই মন্ত্রিসভা ছিল একেবারেই খোলনলচে পাল্টে ফেলা। সেটা দেখে এই অরণ্যে রোদনকারী কলামলেখক প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় একটা মন্তব্যকলাম লিখে ফেলেছিল। এই পরিবর্তনকে সাধুবাদ জানানোর পরে অর্বাচীন লেখক পরামর্শ দিয়েছিল, মন্ত্রীরা যেন কথা কম বলেন। বলা হয়েছিল, টেলিভিশনগুলোর নিশিরাতের টকশোগুলোয় তাঁরা যেন একটু কম যান। আর সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল বর্তমান যুগের সবচেয়ে বিপজ্জনক বস্তুটি সম্পর্কে−যার নাম টেলিভিশন খবরের ক্যামেরা। যেকোনো আলোচনা-অনুষ্ঠান-বিয়ের দাওয়াত-সচিবালয়ের অফিস কক্ষের দুয়ার−সর্বত্রই এই আপাত নিরীহ যন্ত্রটি মূর্তিমাণ বিপদের মতো হাজির হয়। অত্যন্ত সুমিষ্ট ভাষায় আবদার জানায় চলমান ঘটমান কোনো একটা জ্বলন্ত প্রশ্ন বিষয়ে মন্ত্রীর একটা মন্তব্যের জন্য। নানা কথাই মন্ত্রীরা বলেন। অনেক কথা বললে দুয়েকটা কথা অনবধানতাবশত বলা হয়ে যায়, যেটা স্িলপ অব টাং, অর্থাৎ কথার তোড়ে বলে ফেলা। পরে প্রচারমাধ্যমে আর সব কথা ফেলে দিয়ে রাখা হয় ওই জিহ্বার পিচ্ছিলতাজনিত বাক্যটিকেই। সেটিই প্রচারিত হয়। পরের দিন দেশজোড়া হইচই, মন্ত্রী এটা কী বললেন! এই সরকারের একেবারে শুরুর দিনগুলোতেই কাঙাল কলামলেখক এ বিষয় থেকে সাবধান থাকতে পরামর্শ দিয়েছিল সদ্য নির্বাচিত ও অভিষিক্ত মন্ত্রীবর্গকে। কাঙালের কথা কেবল বাসি হলেই ফলে, তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।
মন্ত্রীদের কথা বলতেই হবে কেন? যেকোনো অনুষ্ঠানস্থল থেকে বেরিয়েই কেন তাঁদের টেলিভিশন খবরের ক্যামেরাগুলোর সামনে দাঁড়াতে হবে এবং হক না-হক একটা মন্তব্য করতেই হবে? পৃথিবীর যাবতীয় বিপদ যে কথা থেকে সৃষ্টি হয়, তা কি তাঁরা জানেন না? নাকি টেলিভিশনের একটা জাদুকরী আকর্ষক ক্ষমতা আছে, তা মন্ত্রীদের চুম্বকের মতো টানে, তাঁরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো টিভি ক্যামেরার সামনে চলে আসেন এবং নিজের অজান্তেই কথা বলে ওঠেন?
আমরা অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মন্ত্রীরা মুখ খুলেছেন তো বিপদে পড়েছেন। যে মন্ত্রী যত কথা বলেছেন, তিনি তত অজনপ্রিয় হয়েছেন। বিএনপির জোট সরকারের আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো চিহ্নিত হয়েছিলেন ‘আল্লার মাল’ বলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও যেই উপদেষ্টার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল গণমাধ্যমে কথা বলার, তিনিই হয়ে উঠেছিলেন সবচেয়ে বিতর্কিত।
এ সরকারের আমলে এই অপ্রীতিকর কাজটির দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে যাঁর ওপরে বা যিনি স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন, তিনি হলেন বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান। তিনি কথা বলেছেন বেশি, বিতর্কও তাই তাঁর কথা নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে বেশি। গতকালকের সংবাদপত্রেও জ্বলজ্বল করছে তাঁর পরিবেশিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক তথ্য: বিডিআর বিদ্রোহের বিচার প্রচলিত আইনেই হবে। এ বিষয়ে আমরা কত কথাই না শুনলাম বিভিন্ন মন্ত্রীর মুখ থেকে, আর সেসব কত বিচিত্র ও কত পরস্পরবিরোধী। আমরা শুনেছি, বিডিআর ঘটনায় জঙ্গি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং পাওয়া যায়নি।
টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও মন্ত্রীদের মুখের বাঁধ খুলে গেছে। তাঁরা বলে চলেছেন। এক মন্ত্রী বললেন, যাঁরা টিপাইমুখ নিয়ে কথা বলছেন, তাঁরা না জেনে বলছেন। টিপাইমুখে বাংলাদেশের উপকার হবে। আরেক মন্ত্রী বললেন, সব বাঁধই ক্ষতিকর, তবে টিপাইমুখ নিয়ে কী হবে তা ভারতের কাছ থেকে জানতে চাওয়া হবে। এক মন্ত্রী বললেন, ভারতের হাইকমিশনার কুটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছেন। আরেক মন্ত্রী বললেন, ভারতের হাইকমিশনার কুটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেননি। সবই বচনামৃত। আমাদের মন্ত্রীরা কথাসরিৎসাগর বা তার প্রণেতা হয়ে উঠেছেন।


চলবে..................................

কষ্ট করে পড়ার জন্য ধন্যবাদ
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×