লক্ষ লক্ষ কোষ (Cell) এর সমন্বয়ে আমাদের জৈবিক শরীর। কিছু কোষের অস্বাভাবিক, অনাকাংখিত ও অকল্পনীয় বৃদ্ধির ফলে আমাদের শরীরের টিস্যুর ধ্বংস প্রাপ্তিকে ক্যান্সার বলা হয়। এটি একটি মরণ ব্যাধি। পৃথিবীতে প্রতি বছরের সকল মৃত্যুর ১৩% ক্যান্সার জনিত কারনে ঘটে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার ৯৫%। বর্তমান সময়ে, বাংলাদেশে প্রায় ১ মিলিয়ন মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত। গত ২০০৭ সালে সারা পৃথিবীতে ৭৬ লক্ষ লোক ক্যান্সারে মারা গেছে মর্মে এক তথ্য বিবরণীতে জানা গেছে। ক্যান্সারকে আমরা এক শ্রেণীর অসুখ বলতে পারি যার কতকগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল:-
১. কোষের আকার, আয়তন এবং আচরণে পরিবর্তন;
২. কোষের অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি;
৩. অ্যাডভান্সড অবস্থায় কখনও কখনও কোষের পুরাতন অবস্থান ত্যাগ এবং নতুন স্থানে অবস্থান পত্তন; এ অবস্থাকে মেটাস্ট্যাসিস (Metastasis) বলা হয়।
ক্যান্সারের লক্ষণ:-
(ক) শরীরের কোন স্থান ফুলে উঠা, ঘায়ের মত হওয়া ও রক্ত বের হওয়া;
(খ) শরীরের সংযোগস্থল ফুলে উঠা;
(গ) কাশি হওয়া;
(ঘ) লিভার বড় হওয়া;
(ঙ) হাড়ে ব্যথা অনুভব করা;
(চ) আক্রান্ত হাড় ভেংগে যাওয়া;
(ছ) ওজন কমে যাওয়া;
(জ) ক্ষুধা কমে যাওয়া;
(ঝ) অবসন্নতা;
(ঞ) রক্ত শূন্যতা ও ঘর্মাক্ততা।
ক্যান্সার নিয়ে গত দু দশকে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। কিন্তু কোষ (ঈবষষ) গুলোর মলিকুলার লেভেলে যে পরিবর্তণ সাধিত হয় তার চিকিৎসা আদৌ সম্ভব হবে কিনা সে ব্যাপারে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত নিশ্চয়তা সহকারে কিছু বলতে পারছেন না।
ক্যান্সারের আণবিক ভিত্তি (Molecular basis of cancer):
একটি স্বাভাবিক এবং সুস্থ শরীরে কোটি কোটি কোষ পরস্পর নির্ভরশীল ও জটিল এক অবকাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ এবং এ কোষগুলো একে অপরের যৌক্তিক বৃদ্ধির সাথে সংশ্লিষ্ট। নিজ নিজ এলাকায় যখন কোষ উৎপাদনের জন্য সিগনাল দেওয়া হয় তখন কোষ তৈরি হয়। এ কোষগুলো শরীরের অবকাঠামোর সাথে সংগতি রেখে নিজ নিজ সাইজ (Size) ধারণ করে এবং শরীরের প্রয়োজনানুসারে গঠিত হয়। কিন্তুু ক্যান্সার কোষগুলো ঠিক এর বিপরীত আচরণ করে। শরীরের কোষ গঠণের যে প্রক্রিয়া তা হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রক্রিয়ায় ক্যান্সার কোষগুলো গঠিত হয়। কোষ বৃদ্ধির যে প্রক্রিয়া অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কোষ গঠনের জন্য আমাদের যে জৈব প্রক্রিয়া রয়েছে তার প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা প্রদর্শন করত: কোন রূপ নিয়ন্ত্রণের তোয়াক্কা না করে তাদের নিজস্ব যে মতলব থাকে তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জড়িত হয়ে পড়ে ক্যান্সার কোষগুলো। এ কোষগুলোর আরও কপট ও বিশ্বাসঘাতক রূপ হলো এরা যে স্থানে বিস্তৃত হয়, সে স্থান হতে এদের শরীরের অন্যত্র সরে যাওয়ার প্রবণতা এবং সেখানে গিয়ে শরীরের অন্য টিস্যুগুলো আক্রমন করা এবং শরীরের দূরবর্তী যে কোন স্থান দখল করে একতাবদ্ধ ভাবে অবস্থান গ্রহণপূর্বক টিউমার এর রূপ ধারণ করা। সময়ের পরিক্রমায় এ ধরণের টিউমারগুলো দিন দিন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে এবং আমাদের শরীরের যে টিস্যু ও কাঠামোগত শাখা প্রশাখা আছে তাদের ধ্বংস সাধনে লিপ্ত হয়।
ক্যান্সারের সৃষ্টি হয় মাত্র একটি কোষ থেকে। কোষ বৃদ্ধি ও বিভাজনের সময় কোন কারণে (যেমন অতি বেগুনি রশ্মি বা কোন বস্তু যা কোষের জেনেটিক ম্যাটেরিয়ালের ক্ষতি সাধন করে) কোষের ডি.এন এ তে কোন পরিবর্তন হলে তা থেকে কোষের নিয়ন্ত্রিত অবস্থার ব্যত্বয় ঘটে। এ ধরণের ঘটনার সংখ্যা যত বৃদ্ধি পায় ততই কোষটি পরিবর্তিত হয় এবং এক পর্যায়ে এসে ক্যান্সারাস হয়ে যায়। কোষের এ পরিবর্তনকে সেলুলার ট্রান্সফরমেশন (Cellular Transformation) বলে।
ডি এন এ হলো কোষের সার্বিক তত্ত্বাবধায়নের জন্য নির্দেশপত্র বা ব্লুপ্রিন্ট। যখন ডি এন এ তে পরিবর্তন হয় তখন কোষের প্রেটিনেরও পরিবর্তন সাধিত হয়। এই প্রোটিনের কাজ যদি হয় সেলের কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রণ, তবে স্বাভাবিক ভাবেই পরিবর্তিত প্রোটিনের কারণে কোষ বৃদ্ধি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। এ অবস্থায়, যখন কোষের বিভাজন বন্ধ রাখার কথা, পরিবর্তিত সেল কোষ বৃদ্ধি ও বিভাজন চালিয়ে যেতে থাকে।
কোষের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির আরেকটি উপায় হল কোন অবস্থায় কোষের যদি কোন ক্ষতি সাধনকারী পরিবর্তন ঘটে তাহলে কোষটি নিজে থেকেই মারা যায়। এটি হল স্বাভাবিক ঘটনা যাকে বলে এ্যাপোপটোসিস (Apoptosis)। এর ফলে সেলটির নিজের ক্ষতি হয় কিন্তু মানুষের শরীর সার্বিকভাবে উপকৃত হয়। কিন্তু কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির ফলে ডি এন এ তে পরিবর্তনের হার ও বৃদ্ধি পায়। এর ফল যদি এ্যাপোপটোসিস পদ্ধতিতে নিয়োজিত কোন প্রোটিনে পড়ে তাহলে কোষটি অমরত্ব লাভ করে।
কোষটি আরও বোনাস লাভ করে যখন তাকে কোন জায়গায় আবদ্ধ হয়ে থাকতে হয় না। সুনিয়ন্ত্রিত সেল একটি জায়গায় এ্যাংর্কড অবস্থায় থাকে এবং তার প্রতিবেশী সেলগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে। নিয়ন্ত্রণহীন কোষ এই নিয়ম গুলোও মানে না এবং তা একটি পর্যায়ে এসে সারা শরীরে ছড়িয়ে পরে।
ক্যান্সার তৈরির ধাপ বা পর্যায়:
ক্যান্সারের আরেকটি গুরত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এটি ধাপে ধাপে তৈরি হয়। অন্য কথায় এটি একটি Multistep Process..
প্রথম পর্যায়ে, অনয়ন্ত্রিত কোষ বৃদ্ধির ফলে একটি Critical Size এ পৌছায় এবং আস্তে আস্তে একটি পিন্ড, দলা বা ক্ষতের আকারে চোখে পড়ে। যখন অসুখটি বিস্তৃতি লাভ করে তখন অসুখের লক্ষণগুলোও পরিবর্তিত হয় এবং দেহব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
শুধু পিন্ড আকারে এক জায়গায় আবদ্ধ থাকলে আরোগ্য লাভ সহজসাধ্য। এ অবস্থায় ক্যান্সারের পর্যায়টিকে Benign Tumour বলা যায়।
কিন্তুু যখন অসুখটি ছড়িয়ে পড়ে তখন চিকিৎসা কষ্টসাধ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে অসাধ্য। ক্যান্সারের এ রূপকে Malignant Tumour বলে।
ক্যান্সারের ধরণ:
আমরা একশতের বেশী ধরনের ক্যান্সার রয়েছে মর্মে জানি। তবে যে ক্যান্সার গুলো বেশী আলোচিত সেগুলো হলো ফুসফুসের ক্যান্সার, ব্লাডার ক্যান্সার, অগ্নাশয়ের ক্যান্সার, স্টোমাক ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার, কিডনির ক্যান্সার, ব্লাড ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার, রেকটাম ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, ব্রেইন ক্যান্সার, প্রস্টেট ক্যান্সার ইত্যাদি।
ক্যান্সরের প্রকারভেদ:
ক্যান্সারের প্রকারভেদ অনেক দৃষ্টিকোণ থেকে হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকার হলো:
১. Carcinoma: এ ধরণের ক্যান্সারের উদ্ভব হয় শরীরের ত্বকে বা বাহ্যিক আবরণে। যেমন:- মুখগহ্বর, অন্ননালী, অন্ত্র বা জরায়ুর ক্যান্সার।
২. Sarcomas এ গুলো দেহের বিভিন্ন প্রকার সংযুক্তকারী টিস্যুতে (Connectivce tissue) উদ্ভব হয়, যেমন হাড় (bone), কোমলাস্থি (Cartilage), মেদ (fat) এর ক্যান্সার ইত্যাদি।
৩. Lymphoma and myeloma: দেহের রসসঁহব immune system এর কোষে এ ধরনের ক্যান্সার তৈরী হয়।
ক্যান্সারের কারণ:
স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা ক্যান্সার নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন এবং এখনও গবেষণা চলছে। কিন্তু তাঁরা ক্যান্সার এর প্রকৃত কারণ সমন্ধে নিশ্চিত হতে পারছেন না। তবে অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে ক্যান্সার এর ঝুঁকি বা কারণ সমন্ধে নিম্ন বর্ণিত উপাদান (Factor) কে সনাক্ত করা যায়:
(ক) বয়স: অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে দেখা যাচ্ছে যে, বার্ধ্যকে উপনীত হলেই ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। নতুন উ™ভূত ক্যান্সার ৭০ ভাগেরও বেশি দেখা যায় ষাটোর্ধ মানুষের দেহে।তবে এ কথা বলা ঠিক হবেনা যে অল্প বয়সে ক্যান্সার হবে না। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে ক্যান্সার বেশি দেখা যায়।
(খ) তামাক: আমেরিকাতে এক গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি বছর প্রায় ২,০০,০০০ (দু লক্ষ) আমেরিকান তামাকের ব্যবহারের কারণে ক্যান্সারে মৃত্যু বরণ করে। পৃথিবীতে ক্যান্সারে যত মৃত্যু হয় তার এক পঞ্চমাংশ তামাকের ব্যবহারের কারনে। তামাক থেকে উৎপাদিত দ্রব্য (সিগারেট, জর্দ্দা, গুল ইত্যাদি) ব্যবহার অথবা সিগারেট, বিড়ি, হুক্কার ব্যবহার প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট থাকা ক্যান্সার এর ঝুঁকি বাড়ায়। যাঁরা ধুমপায়ী তাদের ফুসফুস, কণ্ঠ নালী, মুখ, অন্ত্রনালী, কিডনী, গলা, পাকস্থলী, অন্ত্র¿াশয় এর ক্যান্সারের আশঙ্কা অধুমপায়ীদের চেয়ে অনেক অনেক বেশী। যাঁরা ধুমপায়ী তাদের উচিত দ্রুত ধূমপানের অভ্যাস হতে নিজেকে মুক্ত করা। কারণ যাঁরা ধূমপান করেন তাঁদের ক্যান্সারের ঝুঁকি যাঁরা ধূমপান করেন না তাঁদের চাইতে অনেক গুণ বেশী। যাঁরা ধূমপায়ী অথচ কোন ক্যান্সারে আক্রান্ত, তাঁরা যদি ধূমপান ত্যাগ করতে পারেন তবে অন্য কোন অংঙের ক্যান্সার এর ঝুঁকি হতে মুক্ত থাকতে পারেন।
(গ) সূর্যকিরণ: সূর্যের অতি বেগুনী রশ্মি আমাদের ত্বকের ক্ষতি সাধন করে এবং ত্বকের ক্যান্সার সৃষ্টিতে খুবই গুরত্ববহ। এ জন্য সূর্য কিরনের মধ্যে বিশেষভাবে দূপুরের সূর্য কিরণের মধ্যে অবস্থান সংক্ষিপ্ত করা বাঞ্চনীয়। বালি, পানি, বরফে প্রতিফলিত অতি বেগুনি রশ্মি হতেও আমাদের নিজেদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সূর্যের অতি বেগুনী রশ্মি পাতলা কাপড় এবং জানালার কাঁচ ভেদ করে প্রবেশ করতে পারে। সূর্য কিরনের মধ্যে হাঁটার সময় আমাদের উচিত হলো হাতের দস্তানা, লম্বা প্যান্ট এবং দীর্ঘ কিনারা যুক্ত টুপি এবং চশমা (যা অতি বেগুনী রশ্মি শোষন করে) ব্যবহার করা।
(ঘ) আয়ন সৃষ্টিকারী বিকিরণ (Ionizing Radiation) তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ, রেডনগ্যাস এবং এক্স-রে হলো আয়ন সৃষ্টিকারী বিকিরনের উৎস। পারমানবিক বোমার বিষ্ফোরণ, পরীক্ষণ, ব্যবহার এর কারণে রক্তের শ্বেত কনিকা, বক্ষ, স্তন, ফুসফুস এবং পেটের ক্যান্সার হওয়ার আশংকা আছে।
(ঙ) রেডন: রেডন এমন একটি তেজষক্রিয় গ্যাস যা চোখে দেখা যায় না বা এর স্বাদ ও নেয়া যায়না। সাধারণত: খনিতে র্যাডন গ্যাস থাকে। খনিতে কাজ করার সময় খনির শ্রমিকেরা এ গ্যাস বিষ্ফোরণের স্বীকার হয়। এ গ্যাসের ফলে শ্রমিকদের ফুসফুসের ক্যান্সার হয়।
(চ) কিছু কিছু শ্রমিক যাঁরা পেইন্টিং (Painting) বা নির্মান কাজের সাথে জড়িত বা রাসায়নিক কারখানায় কাজ করে তাদের ক্যান্সার হওয়ার আশংকা প্রবল। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, যে সমস্ত শ্রমিক এজবেস্টস, বেনজিন, বিভিন্ন পোকা-মাকড় দমনের বিষ, নিকেল, ভারীধাতু, ভিনাইল, ভিনাইল ফ্লোরাইড- ইত্যাদি রাসায়নিক দ্রব্য এবং বিভিন্ন বিষ নিয়ে কাজ করে তাদের ক্যান্সারের ঝুঁকি অত্যন্ত প্রবল।
(ছ) লিঙ্গ: মহিলাদের ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় ৩-গুন।
(জ) এলাকা/ভৌগলিক অবস্থান: পৃথিবীর একেক জায়গায় ক্যান্সারের প্রবণতা একক রকম। যেমন-জাপানে পাকস্থলীর ক্যান্সারের প্রাবল্য রয়েছে। কিন্তুু আমেরিকায় এর প্রাদুর্ভাব কম। আবার ঘাড়ের ক্যান্সার (Cervical cancer) বেশি হয় কলাম্বিয়ায় কিন্তুু জাপানে এ ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা কম। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যে ক্যান্সার বেশী হয় তা হল মুখ-গহ্বরের ক্যান্সার ও জরায়ুর ক্যান্সার।
(ঝ) এ্যালকোহল: অতিমাত্রায় এ্যালকোহল সেবন মুখ, গলা,স্তন, অন্ননালী এবং যকৃত-এর ক্যান্সার তৈরি করতে পারে। নতুন কিছু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, বিয়ার খাওয়ার ফলে মলাশয়ের ক্যান্সার (Rectum Cancer) হতে পারে। এটা দেখা গেছে যে, অ্যালকোহল জনিত ক্যান্সার মৃত্যুর প্রায় ৩-শতাংশের কারণ। যারা এ্যালকোহল পানকারী তারা যদি তামাক সেবী হয় তবে তাদো সমস্যা অধিক গুরুতর হয়ে থাকে।
(ঞ) Dietary factors (খাদ্য উপাদান): কিছু কিছু খাদ্য উপাদান ও ক্যান্সার সৃষ্টির সাথে জড়িত। যেমন: Smoked fish পাকস্থলীর ক্যান্সার তৈরি করে; কম আশ-যুক্ত খাবার অন্ত্রের ক্যান্সার করতে পারে, এবং উচ্চ-চর্বি যুক্ত খাদ্য ব্রেস্ট ক্যান্সার (beast cancer)-এর কারণ হতে পারে।
(ট) অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি ও অন্যান্য শর্করা জাতীয় খাবার খেলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে কফি পান করলে লিভার ক্যান্সার কম হতে পারে মর্মে পরীক্ষাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ঠ. বংশগত জটিলতা:
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে স্তন, ডিম্বাশয়, মূত্রথলির গ্রšি,’ মলাশয় ইত্যাদির ক্যান্সার পিতামাতার হয়ে থাকলে তাদের সন্তানদেরও হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা এ ধরনের ক্যান্সার এর সাথে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জিনের পরিবর্তনকে দায়ী করে থাকেন। অবশ্য স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট করে বলছেন না যে বংশগত কারণের সাথে কোন ক্যান্সারের যোগসূত্র রয়েছে।
ড. নিম্নমানের খাবার, কর্মহীনতা এবং শারিরীক ওজনের আধিক্য:
যাঁরা নিম্নমানের খাবার খেয়ে থাকেন, কর্ম বিমুখ এবং যাঁদের শারিরীক ওজন কাম্য ওজনের চেয়ে অধিক তারা বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, যাঁরা চর্বি জাতীয় খাবার বেশী খান তাঁরা মলাশয়(Colon) , জরায়ু এবং মূত্র গ্রথির ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন। শারিরীক পরিশ্রম এবং ব্যায়াম না করা এবং ওজনের আধিক্যের কারণে স্তন, অন্ননালী, মলাশয়, কিডনী এবং জরায়ুর ক্যান্সার এর সমধিক সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢ. ভাইরাস: ক্যান্সারের একটি বড় অংশ ভাইরাস জনিত।
ক্যান্সার সৃষ্টিতে কিছু কিছু ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা রয়েছে।
Human Papilloma Viruses (HPVS) : এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ঘাড়ের (Cervical Cancer) ক্যান্সার হয়।
Hepatitis B and Hepatitis C Viruses: যদি এ ভাইরাসে কোন রোগী আক্রান্ত হয় তবে আক্রান্ত হওয়ার কয়েক বছর পর লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে।
Human T-Cell leukemia/Lymphoma virus (HTLV-I) : এ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে আমাদের রক্তের শ্বেত কনিকা ক্যান্সারাক্রান্ত হতে পারে।
Human immunodeficiency virus (HIV)- এ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের শ্বেত কানিকার ক্যান্সার (লিম্ফোমা) হতে পারে। এই ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির immune system কে দুর্বল করে দেয় ফলে অন্যান্য cancer সৃষ্টিকারী ভাইরাস সহজে কাজ করতে পারে।
Helicobacter pylofi এ ব্যাকটেরিয়া আমাদের পাকস্থলীর ক্ষত (Ulcer) সৃষ্টির জন্য দায়ী এবং সময়ের বিবর্তনে পাকস্থলীর এবং রক্তের শ্বেত কনিকার ক্যান্সার সৃষ্টি করে।
কিছু কিছু হরমোনের প্রয়োগ: পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, আমাদের বিশেষভাবে মেয়েদের মিনট্রেশন জনিত সমস্যায় এসট্রোজেন (এক ধরনের হরমোনের) প্রয়োগের ফলে স্তন ও হৃদপিন্ডের ক্যান্সার হয় এবং রক্ত জমাট বাঁধা সহ পক্ষঘাতের আক্রমণ ঘটে।
ক্যান্সার প্রতিরোধের উপায়:
ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য যে ঝুঁকিগুলো উপরে বর্ণিত হলো সে গুলো থেকে মুক্ত থাকার মধ্যেই ক্যান্সার প্রতিরোধের উপায় নিহিত। নিম্নে উপায়গুলো বর্ণিত হলো:
জীবন-যাপন প্রণালীর পরিবর্তন: আলোচনায় আগেই দেখা গেছে যে, অতিরিক্ত এ্যালকোহল পানের সাথে যেমন মুখ, গলা, অন্ননালী, শ্বাসনালী এবং যকৃত এর ক্যান্সার এর সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি ধুমপানের সাথে সম্পর্ক রয়েছে ফুসফুস, কন্ঠনালী, অন্ননালী, পাকস্থলী, অন্নাশয় এবং কিডনীর ক্যান্সারের। আবার শারিরীক পরিশ্রমহীনতা ও ওজনের আধিক্যের সাথে সম্পর্ক রয়েছে স্তন, মালাশয়ের ক্যান্সারের। সুতরাং ক্যান্সার বিষয়ে উপরিল্লিখিত অভিজ্ঞতার আলোকে যদি ধূমপানকারী ও এ্যালকোহলে আক্রান্ত ব্যক্তিগণ তাদের জীবন যাত্রায় পরিবর্তন আনে তবে অবশ্যই ক্যান্সারের আধিক্যের সীমা সংকুচিত হবে।
জীবন যাত্রার অন্য পরিবর্তন যোগ্য উপায় হলো যে কর্মস্থলের সাথে ক্যান্সার এর সংযোগ রয়েছে সেস্থান ত্যাগ করা। এক তথ্য বিবরণী দৃষ্টে দেখা যায় যে ফাইবার এবং তামাকের ধোঁয়াতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। এ ক্ষেত্রে কর্মস্থলের পরিবর্তন তথা জীবন যাত্রায় পরিবর্তন আনলে এ ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে।
খাদ্য ব্যবস্থা:
আমরা আগেই জেনেছি যে, স্থুলতা ক্যান্সারের ঝুঁকির অন্যতম কারণ। বহু পরীক্ষা নিরীক্ষায় দেখা গেছে যে, গরু, ছাগল, ভেড়া প্রভৃতির মাংস ভক্ষণের পরিমান সীমিত তথা কম হলে, মলাশয়ের ক্যান্সার সীমিত হবে। অন্যদিকে আগুনে পোড়াইয়া ভাজা মাংসের সাথে যে ক্যান্সারগুলোর সম্পর্ক রয়েছে মর্মে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে সেগুলো হলো পাকস্থলী, মলাশয়, এবং স্তন ক্যান্সার। এক পরীক্ষাতে দেখা গেছে, যে মহিলারা প্রাণীজ চর্বি সমৃদ্ধ খাবার বেশী খান তাঁদের স্তন ক্যান্সারের প্রবণতা: যাঁরা কম চর্বি সমৃদ্ধ খাবার খান তাদের চেয়ে কমপক্ষে ২০% বেশী। অন্যান্য কিছু কিছু ক্যান্সার প্রতিরোধের সাথে জড়িত সংগঠন মিলের পরিশিলীত চিনির সাথেও ক্যান্সারের সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবী করছেন এবং পরিশিলীত চিনি ও শর্করা অধিক খাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কোন কোন মহল মোবাইল টেলিফোনের রেডিয়েশন জনিত কারনে আমাদের শ্রবন যন্ত্রের ক্যান্সার এর আশংকা ব্যক্ত করছেন। World Cancer Research Fund এর সাথে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক সমীক্ষার প্রেক্ষিতে American Institute of Cancer Research ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়াতে আমাদের খাদ্য বিষয়ে নিম্নোক্ত সুপারিশ প্রদান করে।
(ক) এমন খাবার বা পানীয় খাওয়া যাবেনা যা ওজন বাড়ায়, যেমন শর্করা সমৃদ্ধ পানীয় খাওয়া যাবে না।
(খ) বৃক্ষজাত খাবার খেতে হবে।
(গ) গরু, ছাগল, ভেড়া, শুকর ইত্যাদির মাংস খাওয়া অতি সীমিত করতে হবে।
(ঘ) এ্যালকোহল পানকে সীমিত করতে হবে
(ঙ) লবন খাওয়া কমাতে হবে।
প্রতিকার নয় প্রতিরোধই ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়াবার সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। কেমো থেরাপী, রেডিও থেরাপী, হরমোন থেরাপী না ইমিউনো থেরাপী বা অন্য কোন অবলম্বন নয়, বরং জীবন যাত্রায় পরিবর্তন ও খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সাঠিক পরিকল্পনার মধ্যেই ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ১২:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



