পিলখানায় বিডিআর ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হলেও বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। বিডিআর বিদ্রোহ মামলার তদন্ত সংস্থা সিআইডি এসব উত্তর খুঁজতে কোনো ঝুঁকি নেয়নি। জোড়াতালি দিয়ে দায়সারা গোছের তদন্ত করে ওইসব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ প্রশ্নবিদ্ধ অনেক ঘটনাই পিলখানায় সংঘটিত হয়েছে যার সুষ্ঠু তদন্ত হলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসত। কিন্তু সে পথে এগোয়নি সিআইডি। নারকীয় হত্যাযজ্ঞে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের বৈঠক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারা কী উদ্দেশ্যে ওই বৈঠকের আয়োজন করেছিল? এমন অনেক কিছুই এখনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহের আগে ক্ষমতাসীন দলের কয়েক নেতা এবং এমপির সঙ্গে বিদ্রোহে নেতৃত্বদানকারীদের বৈঠক, কথোপকথন নিয়েও নানা আলোচনা আছে। কিন্তু এসবের কোনো সুরাহা হয়নি। তদন্ত হয়েছে একতরফা।
জানা যায়, বিদ্রোহের পরিকল্পনার বিষয়টি অনেক আগে থেকেই জানতেন সরকারদলীয় কয়েকজন এমপি ও মন্ত্রী। এমনকি খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ও আওয়ামী লীগের এমপি শেখ সেলিমও বিষয়টি আগে থেকেই জানতেন। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে বিদ্রোহী জওয়ানরা দফায় দফায় বৈঠক করেন। বিদ্রোহে প্রত্যক্ষ ইন্ধন জোগান ৫৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি তোরাব আলী। তার ছেলে ছাত্রলীগ নেতা শীর্ষ সন্ত্রাসী হারুনর রশীদ লিটন ওরফে লেদার লিটনও ছিল বিডিআর বিদ্রোহের ইন্ধনদাতাদের অন্যতম। বিদ্রোহের ঘটনার পরপরই র্যাব গ্রেফতার করেছিল লেদার লিটনকে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তদবির করে তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়। সুযোগ করে দেয়া হয় বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার।
টিএফআই সূত্রে জানা যায়, ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার আগে ১৭ অথবা ১৮ ডিসেম্বর বেশ কয়েকজন বিডিআর সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের অফিসে যান। তারা তাপসের সঙ্গে বিডিআরের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন হাবিলদার মনির, সিপাহী শাহাবুদ্দীন, সিপাহী তারেক, সিপাহী আইয়ুব, ল্যান্স নায়েক সাইদুরসহ প্রায় ২৫ জওয়ান। সংসদ নির্বাচনের আগের দিন সন্ধ্যায় দরবার হল মাঠে বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী বিডিআর জওয়ানরা বৈঠক করে। বৈঠকে নৌকায় ভোট দিয়ে ফজলে নূর তাপসকে এমপি নির্বাচিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। ৪৪ ব্যাটালিয়নের সিপাহী সেলিম ও অবসরপ্রাপ্ত বিডিআর সুবেদার কাঞ্চন আলীর ছেলে এবং ব্যারিস্টার তাপসের নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগ কর্মী জাকির হোসেন টিএফআই সেলে এসব তথ্য জানায়।
টিএফআই সেলে বিদ্রোহী জওয়ানদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, বিগত সংসদ নির্বাচনের আগেই তারা বিদ্রোহের প্রস্তুতি শুরু করে। বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য তারা স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রার্থী ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে কয়েকদফা বৈঠক করেন। ব্যারিস্টার তাপস বেশকিছু দাবিদাওয়া মেনে নেয়ার আশ্বাসও দেন। ঢাকা মহানগরী আওয়ামী লীগের ৫৮ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি হাজী তোরাব আলী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী বিডিআর সদস্যদের বিভিন্ন সময়ে বৈঠক করার ব্যবস্থা করে দেন। তার ছেলে শীর্ষ সন্ত্রাসী লিটন এবং তার ভগ্নিপতি পিলখানার ঠিকাদার রেজাউল করিম রাজুর বিরুদ্ধেও বিদ্রোহে ইন্ধনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিডিআর সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সহযোগিতা এবং হত্যাকাণ্ডের সমর্থনে মিছিল বের করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে।
ডিএডি হাবিব টিএফআই সেলে জানিয়েছেন, বিডিআর বিদ্রোহের দাবিদাওয়া নিয়ে তারা সরকারের প্রভাবশালী এমপি ও সাবেক মন্ত্রী শেখ সেলিমের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায় শেখ সেলিমের বনানী চেয়ারম্যানবাড়ির বাসায় বিদ্রোহী জওয়ানদের একটি গ্রুপ যায়। শেখ সেলিমের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে শেখ সেলিম জানান, এটা তার বিষয় নয়, এটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়। বৈঠকে ডিএডি জলিল, ডিএডি হাবিব, সিপাহী সেলিম, সিপাহী কাজল, ল্যান্স নায়েক রেজাউল, হাবিলদার মনির, সিপাহী শাহাবুদ্দীন, সিপাহী একরাম, সিপাহী আইয়ুব, সিপাহী মইন, সিপাহী রুবেল, সিপাহী মাসুদ, সিপাহী শাহাদাত এবং বেসামরিক নাগরিক জাকির উপস্থিত ছিলেন। টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদে শেখ সেলিমের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বৈঠক করার বিষয়টি জানিয়েছেন সিপাহী কাজল, ডিএডি হাবীব, ডিএডি জলিলসহ অন্যান্য জওয়ান।
বিদ্রোহী জওয়ানরা কয়েকদফায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এর মধ্যে ২২ ফেব্রুয়ারি তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু দেখা না হওয়ায় মন্ত্রীর এপিএসের কাছে তাদের দাবিদাওয়া সংক্রান্ত একটি লিখিত কপি দিয়ে আসেন। সিপাহী রেজাউলসহ কয়েকজন জওয়ান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন।
টিএফআই সেলে আওয়ামী লীগ কর্মী জাকির জানায়, রেকর্ড উইংয়ের হাবিলদার মনির কম্পিউটারে কম্পোজ করার জন্য তাকে একটি লিফলেট দেয়। জাকিরের শ্যালক অপু লিফলেটটির ৪/৫টি কপি কম্পিউটারে কম্পোজ করে দেয়। এগুলো ফটোকপি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, শেখ সেলিম এমপি, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এমপির অফিসে পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত হয়। হাবিলদার মনির ও জাকিরের ছোটভাই কবিরকে দিয়ে লিফলেটগুলো এপিএস টুটুলের মাধ্যমে তাপসের কাছে পৌঁছানো হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিফলেট পৌঁছায় সিপাহী শাহাবুদ্দীনসহ ২/৩ জন। আনুমানিক ২১ অথবা ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ সেলিম এমপির বাসায় লিফলেট নিয়ে যান ডিএডি জলিল, ডিএডি হাবিব, হাবিলদার মনির, সিপাহী শাহাবুদ্দীন, সিপাহী তারেক ও সিপাহী আইয়ুবসহ ১৫ থেকে ২০ জন। দাবিদাওয়া সংবলিত লিফলেটটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয় সদর রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সিপাহী মফিজকে। মফিজ তার শ্বশুরের মাধ্যমে লিফলেটের দুটি কপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব নেয়।
সিআইডির তদন্তে এসব বিষয় উঠে এলেও তদন্ত সংস্থা এ নিয়ে কোনো ঘাঁটাঘাঁটি করেনি। তারা ওপরের নির্দেশমতো ফরমায়েশি তদন্ত শেষ করে নিয়ে আসে। উপরন্তু তারা বলছে, বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ ছিল পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। সিআইডি ব্যারিস্টার তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ সেলিম, হাসানুল হক ইনু, মির্জা আজমসহ আওয়ামী লীগের কয়েক নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তারা বিদ্রোহের সময় বৈঠক, কথোপকথন নিয়ে তাদের কাছ থেকে তেমন কিছু জানার চেষ্টা করেনি। সিআইডি গতকালও বলেছে ব্যারিস্টার তাপসের সঙ্গে বিডিআর সদস্যদের ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ ছিল। বিদ্রোহে তার কোনো ইন্ধন ছিল না। তারা আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলী প্রসঙ্গে বলেছেন, তোরাব আলী ব্যক্তিগতভাবেই জড়িত ছিল। এতে দলের কোনো নির্দেশনা ছিল না।
আমার দেশ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১০ইং

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


