ফকির ইলিয়াস
---------------------------------
কয়েকটি রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে আবার জমে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বলেছেন, তাকে বাদ দিয়ে হলেও প্রয়োজনে দল যেন নির্বাচনে অংশ নেয়। তিনি আরও বলেছেন, যে কোন কৌশলে তাকে আগামী নবম সংসদ নির্বাচন থেকে দরে রাখা হতে পারে। তার পরও যে কোন মূল্যে আওয়ামী লীগ যেন নির্বাচনে অংশ নেয়। কারণ নির্বাচনই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ।
শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের পর একটি চিহ্নিত মহল বলতে শুরু করেছে, শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের একটি গোপন সমঝোতা হয়েছে। আর এর ভিত্তিতেই শেখ হাসিনা নিজ দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে বলছেন।
এটা সবার জানা, আওয়ামী লীগ একটি নির্বাচনমুখী দল। তাদের রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় শক্ত ভিত্তি। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তবে আওয়ামী লীগ অবশ্যই বাংলাদেশের যে কোন নির্বাচনে একটি ফ্যাক্টর। এসব জেনেশুনেই দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা তার দলকে নির্বাচনমুখী তৎপরতা আরও জোরদার করার দিকনির্দেশনা দিতেই পারেন। তাতে দোষের কি আছে? যারা হঠাৎ করেই এই বক্তব্যের সঙ্গে সমঝোতার গ খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তাদের প্রকৃত মতলবই বা কি? বরং আমি মনে করি, শেখ হাসিনা অন্তরাল থেকেও গণতন্ত্রের পক্ষে, গণমানুষের আশা-আকক্ষার পক্ষে কথা বলছেন। তার দলকে সুসংহত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন।
নানী তৈয়বা মজুমদারের শবদেহ দেখার জন্য প্যারোলে কয়েক ঘন্টার জন্য মুক্তি পেয়েছিলেন তারেক রহমান। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা যে এত ডেঞ্জারাস (বিপজ্জনক) তা জানতাম না’। তার এই বক্তব্যটিও ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে দেশে-বিদেশে।
তারেক রহমান এবং তার হাওয়া ভবন দেশের জন্য ‘বিপজ্জনক’ ছিলেন, নাকি ‘ত্রাণকর্তা’ ছিলেন এ নিয়েও যুক্তিতর্ক দেখানো হচ্ছে দেশে-বিদেশের বিভিন্ন আলোচনায় আড্ডায়। একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, ২১ আগস্টের মর্মান্তিক গ্রেনেড হামলার সঙ্গে হাওয়া ভবন জড়িত ছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু প্রমুখের সরাসরি যোগসাজশে এ পরিকল্পিত হামলাটি করা হয়। এমন অনেক কথা আমরা এখন প্রায় প্রতিদিনই পত্রপত্রিকায় দেখছি।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার দৃষ্টান্ত যে এত লোমহর্ষক, বর্বর হতে পারে তার উদাহরণ ছিল ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। হামলার পরপরই শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এটা বাবর-তারেক চক্র করিয়েছে। হাওয়া ভবনের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল এ হামলার পেছনে তাও বলেছিলেন শেখ হাসিনা। তা হলে তো হাসিনার কথাই সত্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। অত্যন্ত জঘন্য এই হামলার প্রত্যক্ষ মদদদাতা যদি তারেক রহমান, বাবর, পিন্টুরা হয়ে থাকেন তবে তারা এই দেশ ও জাতির জন্য ‘ডেঞ্জারাস’ নয় কি?
জনপ্রিয়তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরে গিয়ে সহিংস আক্রমণ করাকে কোন রাজনৈতিক সভ্যতা গ্রাহ্য করে না। আজ সেই সত্যটিই বাংলাদেশে প্রমাণিত হতে চলেছে। প্রভাব খাটিয়ে গোয়েন্দা তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছিল। দেশটাকে কীভাবে মগের মুল্লুক মনে করেছিলেন তারেক-বাবর চক্র।
দুই.
মাতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও কয়েক ঘন্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছিলেন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসায় গিয়েছিলেন তিনিও। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, চল্লিশ টাকা চালের সের। এ অবস্খায় মানুষ কেমন আছে তা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে।
যে কথাটি না বললেই নয়, তা হচ্ছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বিগত জোট সরকার খুব আন্তরিক ছিল কি? বরং নানা রকমের সিন্ডিকেট, মজুদদার, কালোবাজারিরা বেড়ে উঠেছিল জোট সরকারের ছায়াতলে। কৃষি, খাদ্য মন্ত্রণালয়গুলো ছিল সবচেয়ে বেশি নির্বিকার। বেগম জিয়ার সরকারে যারা ব্যর্থ মন্ত্রী ছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তাদের সরিয়ে দিতে পারতেন। যাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছিল, যেমন আমীর খসরু চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন কিংবা এবাদুল হক চৌধুরী তারা ছিলেন হয়তো হাওয়া ভবন না হয় অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের বিরাগভাজন। আজ সেই সাইফুর রহমানই কি-না বেগম জিয়ার বিপক্ষে দলে ঝাণ্ডা ধরতে তৎপর। নিজ পুত্রদ্বয়কে বাঁচাতে এবং নিজের হীন গডফাদারতন্ত্র ঢেকে দিতে এই প্রবীণ বয়সে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন সাইফুর রহমান। কথা হচ্ছে যারা মারাত্মক ব্যর্থ হওয়ার পরও ক্ষমতা ছাড়েননি তারাই আজ দেশ নিয়ে ভাবছেন। তাদের ভাষায় নিজেরা ছিলেন সবচেয়ে বেশি সফল সরকার। তাদের আস্তিনের পকেটে বেড়ে উঠেছিল শায়খ রহমান, বাংলাভাইয়ের মতো শীর্ষ জঙ্গিরা। বেগম জিয়ার জোট সরকার যদি জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা না করত, তবে হয়তো আজকের বাংলাদেশ এমন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতো না।
মুক্ত চিন্তা এবং মানবাধিকার বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংগঠন ‘ফিন্সডম হাউজ’ বাংলাদেশকে ‘আংশিক মুক্ত’ দেশ বলে জানিয়েছে তাদের প্রতিবেদনে। অর্থাৎ বাংলাদেশে এখনও স্বাধীনমত প্রকাশ মানবাধিকার সমুন্নত নয়। এটা বিশ্ববাসী জানে, বাংলাদেশে এখন বিশেষ ক্ষমতা আইন চলছে। ওয়ান ইলেভেন অনেক অধিকারই খর্ব করে দিয়েছে। কিন্তু এর আগে কেমন ছিল দেশের পরিস্খিতি? মৌলবাদী ফতোয়াবাজদের দাপট, জঙ্গিদের মহড়া, গোটা দেশজুড়ে বোমা হামলা, আদালত প্রাঙ্গণে বোমা আক্রমণ কাঁপিয়ে তুলেছিল গোটা দেশ। সিন্ডিকেট, লুটপাট, দুর্নীতি, সন্ত্রাস আর হাওয়া ভবনের দাপট সর্বত্র সর্বনাশের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল। আর নেপথ্যে দেশে শক্তি সঞ্চয় করেছিল একাত্তরে পরাজিত সেই অপশক্তি।
তিন.
সেনাবাহিনী প্রধান মইন উ আহমেদ আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, তিনি রাষ্ট্রপতি হবেন না। আর্মি রাষ্ট্রক্ষমতাও নেবে না। তার এই বক্তব্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষভাবে সহায়ক। কারণ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির মানুষকে গেল ৩৬ বছরের অধিকাংশ সময়ই কাটাতে হয়েছে নানা শঙ্কায়, নানা উৎপীড়নে। দেশের সাধারণ মানুষ যে স্বপ্ন এবং চেতনা নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এর সিকিভাগও বাস্তবায়িত না হওয়ার বেদনা আক্রান্ত করেছে বারবার সাধারণ মানুষের পাঁজর। প্রকারাস্তরে সেই পরাজিত রাজাকার গোষ্ঠীই ফুলেফেঁপে উঠেছে। অর্থ এবং শক্তি দুটিই সঞ্চয় করেছে তারা।
অনুষ্ঠিতব্য, ২০০৮ সালের বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনে তারা তাদের সে শক্তি আবারও দেখাতে পারে। বিভিন্ন মৌলবাদী শক্তি ভেতরে ভেতরে সংঘটিত হচ্ছে। যারা সাধারণ মুসল্লি, যারা ধর্ম-কর্মকে ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন, এদের কাছে জামায়াতিরা বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের নীরব প্রচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মুসলিম উম্মাহর ভোটব্যাংক সামনে রেখে এগুচ্ছে তারা। এ বিষয়টি অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও বিবেচনায় রাখতে হবে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই পতিত শক্তি, সংঘটিত হতেই থাকবে। পাশাপাশি এদের সহযোগী জঙ্গিবাদী স্কোয়াডও সক্রিয় থাকবে।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উথান মূলত ১৯৭৭ সাল থেকেই। এরা কীভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে, তা কারও অজানা নয়। আজ যারা বারবার বলছেন, দেশকে ওয়ান ইলেভেনের পর্বাবস্খায় ফিরিয়ে নেয়া উচিত নয় কিংবা ফিরতে দেয়া হবে না তাদের একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। আর তা হচ্ছে, ওয়ান ইলেভেন পর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশে হাসিনা-খালেদা রাজনীতিই শুধু ফ্যাক্টর ছিল না। এর চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর ছিল মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদী রাজনীতির উস্কানি। এসব উস্কানি যারা দিয়েছিল তারা এখনও রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের শীর্ষ গডফাদাররা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজধানীতে। এদের বহাল তবিয়তে রেখে ওয়ান ইলেভেনের প্রকৃত চেতনা প্রতিষ্ঠা করা যাবে কি? এদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে না পারলে, দেশ আজ হোক কাল হোক ওয়ান ইলেভেন পর্ববর্তী অবস্খায়ই ফিরে যাবে।
বাংলাদেশে ইতিহাসের আত্মানুসান খুবই জরুরি। ইতিহাস যখন আত্মানুসানে ব্রতী হয় তখনই একটি জাতির জন্য খোলে নতুন দরজা। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা বিষয়গুলো নিয়ে ভাববেন আশা করি।
------------------------------------------------------------------------------
দৈনিক সংবাদ । ঢাকা। ২৫ জানুয়ারী ২০০৮ শুক্রবার।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ৯:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


