ফকির ইলিয়াস
-------------------------------------------------------------
একটি জিজ্ঞাসা গোটা বাঙালি জাতিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আর তা হচ্ছে ওয়ান ইলেভেনের প্রাপ্তি কি? এর লাভক্ষতি এই জাতির জীবনে কি গুরুত্ব বহন করছে? কতটা গুরুত্ব বহন করছে? নির্বাচন ডিসেম্বরে হবে কি না তা নিয়েও গুঞ্জনের শেষ নেই। দেশে-বিদেশে বেরুচ্ছে সব চমকপ্রদ খবর। কারও কারও মতে আরেকটা ওয়ান ইলেভেন আসছে! অবস্খা যাই হোক না কেন, একটা অজানা গন্তব্যের উদ্দেশে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ এটা সবাই বলছেন একবাক্যে।
যারা দুর্নীতিবাজ বলে এতদিন বলা হচ্ছিল, তারা একে একে জামিন পাচ্ছে। একই বেঞ্চে এতগুলো মামলার জামিন কীভাবে হয়, তা নিয়েও শোনা যাচ্ছে নানা কথা। বেগম খালেদা জিয়া আড়ি ধরেছিলেন তিনি তার পুত্র তারেক রহমানকে সঙ্গে না নিয়ে কারাগার থেকে বেরুবেন না। শেষ পর্যন্ত সেটাই হতে যাচ্ছে। তারেক মুক্তি পাওয়ার পর খালেদাও মুক্ত হবেন।
কিন্তু তারপরও বিএনপি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা আন্দোলন করে যাবে। তারা চালিয়ে যাবে তাদের কর্মসচি। তাহলে কি খালেদা জিয়া ও জামায়াতের জোট মনে করছে বর্তমান সরকার খুবই দুর্বল! জোরে একটা ধাক্কা দিলেই এরা কুপোকাত হয়ে যাবে!
দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্ণধাররা বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগ মোর্চার হাতে ক্ষমতা দিয়েই বিদায় নেবে। কিংবা নিতে হবে। আবার কারও কারও মতে, এই সরকার তাদের একটি ছায়া গণতান্ত্রিক সরকার বানিয়েই বিদায় নেবে। ছায়া সরকার গঠন করতে না পারলে তারা নতুন করে ভাববে।
তাদের ভাবনা যাই হোক না কেন, দেশের মানুষ প্রকৃত দুর্নীতিবাজ ও তাদের স্বজনদের হাত থেকে রেহাই পেতে খুবই উদগ্রীব ছিলেন। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, একটি ওয়ান ইলেভেন সৃষ্টি না হলে ক্ষমতালিïসু একটি মহল স্খায়ী ব্যবস্খায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রাখত দীর্ঘকাল। তাদের সেরকম একটা পরিকল্পনা ছিল। আর সেই পরিকল্পনা কত গভীর ছিল, তা বোঝা যায় ড. ইয়াজউদ্দিনের একজন উপদেষ্টা বিচারপতি ফজলুল হকের দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশের মধ্য দিয়ে। ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ পদাধিকার বলে (?) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়ে যাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন তাদের একজন এই বিচারক ফজলুল হক। তিনি এটাই মনে করেছিলেন, তিনি তো চার দলীয় জোটেরই উত্তরসরি। অতএব, গাফিলতি করলে তাকে কেউ কিছুই বলবে না। তার কোন বিচার কেউ করবে না।
দুই.
সাধারণত প্রতিটি খেলায় জয়-পরাজয় থাকে। কেউ জেতে, কেউ হারে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির খেলাটি বড়ই বিচিত্র। এই খেলায় কেউ হারছে না! সবাই জয়ী হচ্ছে! এমনটি ভাবা কি সঙ্গত? না, তা ভাবার কোন অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না।
আওয়ামী লীগ মনে করছে তারা ক্রমশ আরও পরাক্রমশালী হচ্ছে। একই ধারণা বিএনপিরও। জামায়াতের আমিরের জামিনের পর তাদের সেক্রেটারি এখন নেমেছেন জোরেশোরে মাঠে ময়দানে। তিনি বিএনপিকেও সংগঠিত করার কাজ করছেন। তারেক মুক্তি আন্দোলনের যতটা ভিডিও চিত্র বিভিন্ন চ্যানেলে দেখি তাতে দেখা যায় শিবিরের কর্মীরাই সিংহভাগ। সেই পুরনো খেলা। যে জামায়াতের সম্মেলনে তারেক রহমান অতিথি হয়েছিলেন এখন সেসব রোকন তাদের জান বাজি রেখে মাঠে তো নামবেই।
বাংলাদেশে ‘জানবাজ’দের এই যে মহড়া সেটাই একদিন বাংলাভাই-শায়খ রহমানের শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। এটাই ছিল প্রকৃত মৌলবাদীদের ঢাল। যারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে নেপথ্যে তারাই একটি কট্টর শক্তিকে গড়ে তোলে বাংলাদেশের সবক’টি জেলায় বোমা ফাটানোর স্টোনটেস্ট করেছিল। আজ সেই শক্তি কি দুর্বল? না তারা মোটেই দুর্বল নয়। দু:খজনক হলেও সত্য, এখনও তারা এক ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় পাচ্ছে। আর পাচ্ছে বলেই তাদের গডফাদার কেউ মুক্তি পাচ্ছে, কেউ থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর এই ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে মলত রাষ্ট্রের জনগণের আইওয়াশ করা হচ্ছে। আর সে কারণেই বলা খুবই ন্যায্য যে, পরাজয়টা হচ্ছে দেশের জনগণেরই। এর আরেকটা উদাহরণ দেয়া যাক।
এখন পবিত্র রমজান মাস চলছে। সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল রমজান মাসে দ্রব্যমল্যের গতি রোধ করে রাখা হবে। বাংলাদেশের করপোরেট ব্যবসায়ীরাও এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়েছে কি? না হয়নি। ব্যবসায়ীদের নেতা আনিসুল হক এখন সরকারি বাহিনীর সাহায্য কামনা করেছেন। সে সংবাদ আমরা টিভিতে দেখলাম। এতে স্পষ্ট বোঝা গেল, কথা কেউই রাখছে না। না ব্যবসায়ী, না রাজনীতিক। জাতির পাশে দাঁড়াতে কেউ রাজি নয় দু:সময়ে।
অথচ এই করপোরেট বেনিয়া গোষ্ঠী দরিদ্র মানুষের পকেটের শেষ টাকাটিও হাতিয়ে নিতে কত তৎপর। একটি মোবাইল ফোন কোম্পানির বিজ্ঞাপন প্রায়ই বিভিন্ন চ্যানেলে দেখি।
একটি স্কুল ছাত্রের হাতে মোবাইল ফোন। বিজ্ঞাপনে তার বক্তব্য হচ্ছে ‘বড় হয়ে কিনব।’ একটি শিশুকে এভাবে অপ্রয়োজনীয়, বেনামি মোবাইল ফোনের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করাটা সম্পূর্ণ অনৈতিক কাজ। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুর হাতে এভাবে মোবাইল ফোন তুলে দিতে উদ্বুদ্ধ করা হবে কেন? লক্ষ্য একটি, বাজার বাণিজ্য গড়ে তোলা। অথচ এসব বেনিয়ারা সমাজের কল্যাণের কথা সামান্য পরিসরে ভাবছে বলেও মনে হয় না।
সব মিলিয়ে এই রাষ্ট্রের সামনে উজ্জ্বল শুভদিন অপেক্ষা করছে, তেমনটি বলার কোন সুযোগ এ মুহর্তে নেই। যে যেভাবে পারছে এক ধরনের দখলের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। দুদক মামলা করছে, আইনি ফাঁকে বেরিয়ে আসছে দুর্নীতবাজরা। জনগণ সন্ত্রাসের নিপাত চাইছে। এক শ্রেণীর রাজনীতিকরা এখনও পৃষ্ঠপোষকতা করছে গডফাদারদের।
এখন যারা বিচারাধীন তারা জামিন পাচ্ছে। যাদের সাজা হয়েছে তারাও জামিন পাচ্ছে। লাইনে আছে আরও অনেকেই। এই লাইন ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। বন্যা, খরায় পীড়িত জনগণের শুধু নির্বাক হয়ে দেখা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। অথচ রোজা, ঈদ, পজোয় এদেশের মানুষ আনন্দে মাতবে, পেট ভরে খেতে পারবে সেটাই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। না, সে চেতনার তোয়াক্কা এখন আর কেউ করে না। সবই ফাঁকা বুলি। সবই নিছক ভণ্ডামি।
নিউইয়র্ক ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮
-------------------------------------------------------------------------------
দৈনিক সংবাদ । ৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮ শুক্রবার প্রকাশিত
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ৭:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


