somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ফকির ইলিয়াস
আলোর আয়না এই ব্লগের সকল মৌলিক লেখার স্বত্ত্ব লেখকের।এখান থেকে কোনো লেখা লেখকের অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা, অনুলিপি করা গ্রহনযোগ্য নয়।লেখা অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা করতে চাইলে লেখকের সম্মতি নিতে হবে। লেখকের ইমেল - [email protected]

কবিতা পড়ে যে উপলব্ধি জন্মে, তা-ই কবিতার অর্থ / শঙ্খ ঘোষ

১৫ ই নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ৯:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন কবি শঙ্খ ঘোষ । তিনি আমার একজন প্রিয় কবি। যিনি বলেন- এই শহরের রাখাল আমি । কবিতা বিষয়ে তার ভাবনাগুলো অনেককেই ভাবাবে বলে আমার বিশ্বাস। তার এই ভাষণ টি তাই এখানে শেয়ার করলাম কবিতা প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের জন্য ।
*******************************************************************
কবিতা পড়ে যে উপলব্ধি জন্মে, তা-ই কবিতার অর্থ
শঙ্খ ঘোষ

-------------------------------------------------------------
সাতচল্লিশ সালের পরে সাতানব্বই সালে আমি বরিশাল জেলার বানারিপাড়ায় আমার জন্মগ্রামে প্রথম গিয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশে সাতানব্বই সালের আগে আমি বেশ কয়েকবার এসেছি। উনিশশ পঁচাত্তর, তিরাশি এবং পঁচানব্বই সালে আমি বাংলাদেশে এসেছি। এছাড়াও সাতানব্বই সালের পরে দুহাজার এক সালে একবার এসেছি। সুতরাং যিনি আমার সম্পর্কে বললেন যে সাতচল্লিশ সালের পর সাতানব্বই সালে আমি প্রথম বাংলাদেশে আসি, তার জানার মধ্যে অসম্পূর্ণতা আছে। বেশির ভাগ সময়ই আমি বাংলাদেশে এসেছি বেড়াতে। সভার ব্যাপারটা আমার কাছে বোরিং লাগে। আমার মেয়ের সঙ্গে উনিশশ পঁচানব্বই সাল থেকে বাংলাদেশের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। সে আমাকে বলেছে যে, আমার মেয়ের মেয়েদের অর্থাৎ আমার নাতনিদের নিয়ে বাংলাদেশে যেতে হবে। আমি তাকে না করে দিয়েছি। আমি বলেছি যে, আমি তোমাদের সঙ্গে যাবো না, আমরা যদি যাই নিজেরা নিজেরা যার, তোমাদের সঙ্গে কেন যাবো। আমার মেয়ের ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত প্রবল। আমি তাকে ঠেকাতে পারিনি। ফলে ঠিক হয়েছিল যে এ সময়টায় আমরা আসবো। আসার দিন পাঁচ ছয়েক আগে আমার এতোটাই শরীর খারাপ করলো যে, আসাটা প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তখন এ রকম একটা কথা হয়েছিল যে, যেতেই হবে, গিয়ে চুপ করে এক জায়গায় বসে থাকবে।
এখানে হয়তো আসা হতো, একা একা, লুকিয়ে লুকিয়ে। দু-চার জনের সঙ্গে হয়তো দেখা হয়ে যেতো, তবে এভাবে অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে বসা হতো না। লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণের পক্ষ থেকে এরা যোগাযোগ করেছে বলেই আজকের সভায় আসা হলো।
এইমাত্র একজন আমার শৈশবস্মৃতি সম্পর্কে জানতে চাইছে। ঠিক আছে, বলছি। আমার জন্ম হয় মামার বাড়িতে। চাঁদপুরে আমার মামার বাড়ি ছিল। সেখানে আমার জন্ম। বানারিপাড়া আমার গ্রাম। কিন্তু বাংলাদেশ বললে আমার কাছে সবচেয়ে বড় যে জায়গাটা, সেটা চাঁদপুরও নয়, বানারিপাড়াও নয়, সেটা পাকশি। পাবনার পাকশি, হার্ডিঞ্জ ব্রিজের সংলগ্ন যে ছোট্ট রেলওয়ে স্টেশনটা সেটা হলো পাকশি। আমার গোটা স্কুলের পড়াশোনা করেছি পাকশি স্কুলে। মানে আমার স্কুল ওই একটাই, পাকশি স্কুল। এর বাইরে আমার কোনো স্কুলের অভিজ্ঞতা নেই। এর একটা কারণ ছিল যে, আমার বাবা ওই স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন। ফলে বাবার স্কুলে পড়েছি। আমার দাদা বাবার স্কুলে পড়েছে ৬ মাস, আমার ছোট ভাই ক্লাস সিক্স পর্যন্ত। একমাত্র আমি পুরোপুরি বাবার স্কুলে পড়েছি। এবং আমি একটা গর্ব গর্ব ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম যে বাবার স্কুলের একমাত্র ছাত্র আমি। পাকশি জায়গাটা আমার শৈশবের একটা বড় অংশ যেখানে কেটেছে তা হচ্ছে পাকশি। পঁচাত্তর সালে যখন বাংলাদেশে এলাম, হঠাৎ করে বললাম যে পাকশি যাব, আমাকে পাকশি নিয়ে চল, না হয় আমি একাই যাবো। কিন্তু আমাকে যারা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তারা একা ছাড়বেন না। দুজন তখন আমার সঙ্গী ছিল, তখন তরুণ লেখক- আবুল হাসনাত, মফিদুল হক। পাবনা খুব ছোট্ট শহর কিন্তু আমার আতঙ্ক হচ্ছিলো।
আতঙ্কটা হলো, আমি সাতকাহন করে বলেছি যে পাকশি দারুণ একটি জায়গা, কিন্তু এবার এরা এসে তো সেটা দেখতে পাবে না। আমার চোখে আমি যা দেখছি এরা তা দেখতে পাবে কি? এদের কীভাবে ঠেকাবো? পরে ভাবলাম যে ওদের বলব, আপনারা এখানে বসুন আমি ঘুরে দেখছি। কিন্তু তাদেরকে দেখলাম আমার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুরছে। যেতে যেতে ওদের খুব ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, জায়গাটা খুব খারাপ লাগছে। তারা যা বললো, সত্যি কথা, তারা বললো যে এ রকম জায়গা আমরা কখনো দেখিনি। তখন আমার মনে হলো, সত্যি সত্যি জায়গাটার মধ্যে আছে কিছু। ছোট্ট মফস্বল শহর। খুব গোছানো রেলওয়ে কলোনি। পেছনে ছিল একটা বন। সেটা এখন কেটে ফেলা হয়েছে। ভোরবেলা উঠে পদ্মার তীরে গেলাম বেড়াতে। নানারকম খেলার মাঠ, ছোট স্কুল, খুব বেশি ছাত্র নেই সেখানে। পনের বছর বয়স পর্যন্ত আমার একটা স্বপ্নের মধ্যে কেটেছে বলে মনে হয়। ষোল বছর বয়স যখন আমার, সেটা সাতচল্লিশ সাল, আমি স্কুল পরীক্ষা দিলাম, কলেজে এসে ভর্তি হলাম। তারপর কলেজে এসে চলে গেলাম কলকাতায়। একটা অন্যরকম জীবন শুরু হলো। ফলে এ তিনটি জায়গা, চাঁদপুর, বানারিপাড়া আর পাকশি - এ তিনটি জায়গার জন্য মায়া রয়ে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি পাকশির জন্য। সত্যি বলতে কি, যিনি যে স্কুলে পড়েছেন সে স্কুলটা হানা দিতে থাকে সারা জীবন। আমার কাছে যেমন পাকশি স্কুল। আমি এখনো ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখতে পাই, কিছু না কিছু ঘটছে সে স্কুলে। আমার ধারণা সবারই এ রকম হয়। নাকি আমার বয়স হয়েছে বলেই এ রকম হয় ঠিক বলতে পারছি না। হ্যাঁ, পদ্মার চরেও বেড়াতে যেতাম। তখনো চর ছিল। এখন সেটা আরো বড় হয়েছে। এদিক থেকে ওদিক জল আসতো। সে সরে অনেক বিপদেও পড়েছি। আমার এক বন্ধু ছিল খুব দুষ্ট। সে সবাইকে ধোঁকা দিতো। সে একদিন চরে গিয়ে বললো যে এই আমাকে ধর, আমি তলিয়ে যাচ্ছি। আমরা তাকে ছেড়ে আসছিলাম। কিন্তু যখন দেখা গেলো কোমর পর্যন্ত তলিয়ে গেছে, তখন বোঝা গেলো চোরাবালিতে আটকে গেছে। তখন দৌড়ে সবাই তাকে সেই চোরাবালি থেকে উদ্ধার করলাম। সুতরাং চর ছিল, চোরাবালিও ছিল। আরেকটা ব্যাপার ছিল, ছোটবেলায় ঘরে ঘরে হঠাৎ রটে গেলো যে, ইলিশের নৌকা এসেছে, ইলিশের নৌকা এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা সব দৌড়ালাম সেখানে। দৌড়ে গিয়ে দেখি নৌকার ওপর একেবারে পাহাড় করা ইলিশ। আমরা জোড়ায় জোড়ায় সবাই ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরে এসেছি। এ রকম ছিল আমাদের মফস্বল শহরের জীবন।
পাকশিতে আমি গিয়েছিলাম, আমি কিন্তু কোনো দায়িত্ব নিয়ে যাইনি। গিয়ে একটা দায় বোধ করেছিলাম। কারো ভালো লাগলো কি লাগলো না তার ওপর আমার কিছু নির্ভর করছে না। সাতানব্বই সালে যখন প্রথম বানারিপাড়ায় গেলাম, আমার এক কাকা ছিল। তিনি বানারিপাড়ায় প্রায় সব সময় থাকতেন। তিনি তিপ্পান্ন সালে চলে গেছেন, তারপরে পঁচাশি-ছিয়াশি সালে তিনি একবার দেশের বাড়িতে গিয়েছিলেন।
আমি যখন বানারিপাড়া থেকে ফিরে গেলাম, কাকা আমার বাড়িতে থাকতেন। বললেন, কী দেখলে, কী দেখে এলে? আমি বললাম, ‘লাবণ্য’। তিনি বললেন, ‘চিনতে পারলে কিছু’। আমি বললাম, ‘সব’। কাকা বললেন, সব বাজে কথা, আমি দশ বছর আগে গিয়েছি তখন কিছুই চিনতে পারেনি। আর তুমি দশ বছর পরে গিয়ে সব চিনে গেলে। সব বাজে কথা। আমি কিন্তু মনে করিনি যে, কাকা বাজে কথা বলছে, সমস্যাটা হলো, আমি কী আশা করি তাই নিয়ে। অনেক সময় কী হয়, একটা গ্লাসে আধাআধি জল আছে। যদি জিজ্ঞেস করা হয়- কেউ বলবে অর্ধেক খালি, কেউ বলবে অর্ধেক ভর্তি। কে কোনটা দেখছে সেটার ওপর নির্ভর করছে। ব্যাপারটা সাইকোলজিক্যাল। আমি যাদের দেখতাম তারা নেই। পঞ্চাশ বছরে কোনো জায়গা বদল না হয়ে পারে না। সেটা অস্বাস্থ্যকর। যেমন পাকশিতে আমাদের ছেলেবেলায় যে জায়গাটাতে শুধু সাইকেল চালাতাম, পঁচাত্তর সালে কিংবা তারপরে সেখানে যখন গিয়েছি তখন দেখেছি সেখানে রিকশা চলছে। সুতরাং পরিবর্তন তো কিছু হয়েছেই। নতুন তুন কিছু বাড়ি হয়েছে। কিন্তু একটা শহরের বা একটা গ্রামের যে চরিত্র থাকে সেই চরিত্রটাই যে পরিবর্তিত হয়েছে সেটা আমার কাছে মনে হয়নি। বানারিপাড়া এবং পাকশিতে চোখ বন্ধ করে আক্ষরিক অর্থে আমি দেখেছি। এখানে এ রকম থাকার কথা ছিল, ওখানে ওরকম। থাকবার কথা, যারা সঙ্গী ছিল তাদেরকে বলেছি। কিন্তু আমার বাড়ি, যে বাড়িতে ছিলাম, কাকা সেটা দেখে হাহাকার করবে সেটা বুঝতে পারি। শৈশবে আমাদের বাড়িটায় একটা বড় দালান বাড়ি ছিল। রান্নাঘর, কাচারি ঘর, মণ্ডপবাড়ি ইত্যাদি ঘর ছিল আমাদের বাড়িতে। কিন্তু সেই ঘরগুলোর একটাও নেই। কিন্তু আমার উল্লাসের কারণ দালান বাড়িটা সে রকম আছে। ফলে আছে- নেই এর মধ্যে ইল্যুশন তৈরি হয়। বানারিপাড়াতে আমার তেমন কোনো বন্ধু নেই। পাকশিতে দুতিন জনের খোঁজ করেছিলাম। একজনকে পেয়েছিলাম। সে আমার ঠিক বন্ধু নয়, আমার চেয়ে বয়সে একটু বড়। আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু একজন ছিল তার নাম আনোয়ারুল ইসলাম। আমার সহপাঠী বন্ধু ছিল। আমি তার কথা জিজ্ঞেস করলাম। তখন সবাই বললো যে, হ্যাঁ, তাকে তো আর পাবেন না। একাত্তর সালে পাক বাহিনীরা যাদেরকে মেরে ফেলেছে সে তাদের মধ্যে একজন। একজন লোক আমাকে দেখালো যে, এ জায়গাটাতে তাকে পুঁতে ফেলা হয়েছে। দুবছর আগে আমি রাত এগারটায় বাড়ি ফিরেছি। বাড়িতে যে কাজ করে মেয়েটি, সে ছাড়া কেউ ছিল না। সে বললো যে তোমার একটা ফোন এসেছিল, সে একটা নম্বর দিয়েছে, বলেছে যে যতো রাতই হোক তুমি যেন তাকে ফোন কর। আমি বললাম, নাম বলেছে। বললো, হ্যাঁ, নাম বলেছে। নাম লেখা দেখি আনোয়ারুল ইসলাম। সে একটা গ্র্যান্ড হোটেলে এসে উঠেছে। খুব করে বলেছে যে, আজকে যতো রাতই হোক যেন ফোন করি, কারণ কাল সকালবেলা সে চলে যাবে। আমি রাত ২টা পর্যন্ত ফোন করে তাকে পেলাম না। পরদিন সকালবেলা আবার ফোন করলাম। হোটেলে ফোন করে, যোগাযোগ করে কিছুই বুঝতে পারলাম না। গিয়ে জানলাম যে সে চলে গেছে। আনোয়ার হয়তো অপেক্ষা করেছিল আমি তাকে ফোন করবো। আর আমি চেষ্টা করেও তাকে ফোনে পাচ্ছি না। সে হয়তো ভেবেছে যে আমি তাকে ভুলে গেছি। অথচ প্রত্যেক সময় আমি তাকে মনে করছি। এ রকম কতো মজা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আবু সয়ীদ আইয়ুবের হাতে শামসুর রাহমানের কিছু কবিতা আমার কাছে যায়। সেই সময় তার কিছু কবিতা দেশ পত্রিকায় ছাপা হয়। মনে হলো, এসব কবিতা দিয়ে চট করে একটা বই করে ফেলা যায় কিনা। ‘দুঃসময়ে মুখোমুখি’ ছাপা হয়েছিল। এখানেও ছাপা হতে দেখেছি ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি’। মুক্তিযুদ্ধের সময় আল মাহমুদ তো ওখানেই ছিল। আল মাহমুদ নামে তার অনেক লেখা ছাপা হতো। আনোয়ার পাশার কথা মনে পড়ে। এমএ তে আনোয়ার পাশা আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম। আমাদের ইউনিভার্সিটি পত্রিকা যেটা বছরে একবার করে বেরুতো, সে বছরে সম্পাদনার দায়িত্ব আমার ছিল। তবে আনোয়ারের কবিতাও ছিল। সে সময় ও কবিতাটা ছাপতে চেয়েছিল মোহাম্মদ আনোয়ার নামে। তারপর থেকে সে আনোয়ার পাশা নামেই লিখেছে। ওর কবিতার বইয়ের আগে ওর রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প নিয়ে একটা বই ছিল। ও বললো যে আমি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে একটা চাকরি পেয়েছি। ও বললো আমি চললাম। আমি বললাম, সত্যিই চলে যাচ্ছে, ও বলল হ্যাঁ চলে যাচ্ছি। তুমি আমাদের দেশে থাক, আমি তোমাদের দেশে চলে যাচ্ছি। সেটা উনিশশ একষট্টি-বাষট্টি সালের কথা। তারপর আর দেখা হয়নি।
আমার একটা কবিতা সম্পর্কে জয় একবার লিখেছিল। কখন কীভাবে লিখেছিলাম মনে নেই। জয়ের লেখা পড়ে মনে হলো একেবারে ঠিক আছে। কিন্তু একজন এসে আমাকে বললো যে, জয় যা লিখেছে তা মোটেও ঠিক নেই। আমি বললাম, একেবারে ঠিক বলেছ! তবে এটা ঠিক কবিতা পাঠের পর নিজের কাছে একটা অর্থ দাঁড়িয়ে যাবে। কবিতা পড়ে যে উপলব্ধি জন্মে তা-ই কবিতার অর্থ।
ভারতের সিমলায় আমি কিছুদিন ছিলাম। সেখানে এডভান্স স্টাডি সেন্টার বলে একটা জায়গা আছে। সেখানে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দেশ-বিদেশ থেকে জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিরা আসেন। পড়াশুনা করেন। সেমিনার করেন। তো বলা হলো যে, এখানে একজন আসবেন, তাকে আর যেতে হবে না, পুরো এক বছর থাকবেন। সৌভাগ্যক্রমে আমিই হলাম সেই ব্যক্তি। আমি বললাম, এখানে আমি এক বছর থেকে কী করবো। তারা বললো যে, যা খুশি করবেন, আপনার যা ভালো লাগে। সেখানে জ্ঞানী পণ্ডিত ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে সেই সময়টা আমার কেটেছিল। সিমলার সবচেযে উঁচু যে জায়গাটা, সামার ভিউ তার নাম। তার উপরেই বাড়িটা, বাড়িটা সবার পরিচিত। যেখানে সিমলা চুক্তি হয়েছে। বিরাট রাজ প্রাসাদ ওই উঁচুতে তিনতলা বাড়ি। বিশাল বিশাল ঘর একেকটা। ওখানে পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। অনেকে এসে পড়াশোনা করে চলে যেতেন। আমি ওই বিশাল বাড়িতে গোটা ৫ দিন একা ছিলাম। পাহাড়ের উঁচুতে বাড়িটাকে মেঘ ঘিরে রেখেছে, একটা অবিশ্বাস্য অবস্থাকে আমি উপভোগ করেছিলাম। এ রকম একটা দিনে হঠাৎ একটি লেখা শুরু করেছিলাম।
শান্তি নিকেতনে আমি এক বছর ছিলাম। একা থাকতাম। মাঝে মাঝে আমার স্ত্রী-কন্যা এসে থাকতো। একা থাকতাম বলে, কলকাতা থেকে তরুণ কবিরা বলতো, মাঝে মাঝে আমরা এসে থাকবো, আড্ডা দেবো। আমি বললাম এসো। অনেকে গেছে থেকেছে। ভাস্কর চক্রবর্তী বললো যে, আমি যদি আরো তরুণ কাউকে নিয়ে আসি সমস্যা হবে। আমি বললাম নিয়ে এসো। তো সে একজন তরুণকে নিয়ে এলো। রাতে খেতে বসে বলছে সে, জানেন তো আমার মা আমাকে কিছুতেই আসতে দেবেন না। আমি বললাম, কেন, শান্তি নিকেতন উনি পছন্দ করেন না। বললো, না না শান্তি নিকেতন উনি পছন্দ করেন। মা বললেন, শান্তি নিকেতনে যাবে যাও, কিš' যেখানে যাবে বলছ সেখানে গেলে আমি কিছুতেই যেতে দেবো না। তখন উনি আমার নাম উল্লেখ করে ছেলেকে বললেন, তুমি ভেবেছো আমি কিছু জানি না, উনি যে সারাক্ষণ মদে চুর থাকেন সেকথা আমি খুব ভালো করেই জানি। তখন তার ছেলে বললেন, মা তুমি ভুল করছ- সেটা উনি নন শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
বুদ্ধদেব বসু আমাদের সম্পর্কে কিছু বলতে যাবেন কেন- এখানে তো তার সঙ্গে আমাদের কোনো ঈর্ষার সম্পর্ক নেই। এটা একটা বয়সের সমস্যা। ধরা যাক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা, সুনীল ছন্দে একটা কবিতা লিখে সেটাকে আবার ভেঙে ফেললো। পুরোনো কোনো কবি হয়তো বুঝতে পারবে না এটা কেন হলো, কী করে হলো, কেন ভেঙে ফেলা হয়েছে। এছাড়া একটা শব্দকে কতোটা ছন্দে কতোটা শুষে নেওয়া যায় এটা নানা সময় নানাভাবে ঘটতে থাকে। পুরোনো দিনের লোকেরা অনেক সময় সেটা ধরতে পারেন না। ধরতে চান না। কারণ মনে করেন এটা ছন্দ হয়নি। বুদ্ধদেব বসু একা নন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় একবার আমাকে বলেছিলেন, তোমার বন্ধুরা ছন্দে বড্ড গোলমাল করে। আমি বললাম যে আপনি ধরে দেখিয়ে দেন। একটা জায়গা দেখান কোথায় গণ্ডোগোল করছে। তিনি বললেন এটা ধরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আমি বললাম, এটা আপনি বলছেন সুভাষ মুখোপাধ্যায় হয়ে, পদাতিকের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় হয়ে। আপনিই তো শিখিয়েছিলেন কীভাবে কবিতার মধ্যে শব্দকে শুষে নিতে হয়। সুনীলের গদ্যে কিংবা কবিতায়, শক্তির কবিতায় যেমন আছে- ভাল্লাগে না, ভাল্লাগে না আমাকে সুভাষ দা একদিন বললেন যে তোমাদের এ ব্যাপারটা ঠিক হচ্ছে না। ভাল্লাগে না এটা আবার কী রকম কথা। ওতো ওভাবে লিখছে- তা হলে আপনি বলে দিন কীভাবে লিখবে। সুভাষ দা ছেলে মানুষির মতো বললেন, যদি এভাবে যদি ধরো সে লিখলো, ভালো লাগে না। কথাটা শুনালো ভাল্লাগে না। এ পর্যন্ত বলে অবশ্য নিজেই হেসে ফেললেন। ছন্দের বারান্দা পাড়ে কেউ ছন্দ শিখতে চাইলে ভুল করবেন। ছন্দের বারান্দা ছন্দ শিখার বই আদৌ নয়। ছন্দ যে জানে, সে বুঝতে পারবে আমাদের কয়েকজন কবির ছন্দ ব্যবহার বৈশিষ্ট্য নিয়ে বলা আছে।
(সম্প্রতি শাহবাগস্থ আজিজ সুপার মার্কেটে লিটল ম্যাগ প্রাঙ্গণ আয়োজিত আড্ডায় প্রদত্ত বক্তৃতা)
-------------------------------------------------------------------------------
দৈনিক ভোরের কাগজ সাময়িকী । ১৪ নভেম্বর ২০০৮











সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:৪৫
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমন্ত্রন পত্র থাকলে ভিসার দরকার কী! আপনি জানেন আমি কে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



ভারত বাংলাদেশের কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে সেই আমন্ত্রণপত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠাবে। সেখান থেকে আমন্ত্রণপত্র যাবে সেই রাজনৈতিক ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টে, তারপর তার কাছে। এরপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাদিক হাসনাতের প্রোগামে রাজাকার মঈনুদ্দীন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫



এই ছবিটি লন্ডনে অনুষ্ঠিত হওয়া নিজেস্ব অর্থায়নে সাদিক হাসনাতের প্রোগামের। অসংখ্য আঙ্কেল আন্টিদের মাঝে একজন বিশেশ লোককে দেখা গেল সেখানে। লোকটাকে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে ছবিতে। এই লোকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেয়ে চেয়ে দেখুন

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৩১


আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ; স্বাভাবিকভাবেই তারা অনলাইনে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে। মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল করে তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

রাজনীতিতে সক্রিয় বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি গং। বিএনপি ও জামায়াত আগে জোটবদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:০৫



'এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে
ধুয়েছে আমার দেহ- বুলায়ে দিয়েছে চুল-চোখের উপরে
তার শান-স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে, আবেগের ভরে
ঠোঁটে এসে চুমো দিয়ে চলে গেছে কুমারীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

খাম্বা/খাল তারেক কে কিছু উপলব্ধি শেয়ার করছি

লিখেছেন অপলক , ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৪২

আজ আর মনের মাধুরী মিশিয়ে বকাঝকা করব না। আজ কিছু ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা শেয়ার করব।



খাল খনন বা ঢাকার বাসস্ট্যান্ড সরানোর চেয়ে কি কি গুরুত্বপূর্ন কাজ এই অর্থবছরে করা যেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×