২১ ডিসেম্বর ২০০৮ , ঢাকার দৈনিক সংবাদ - এ তেমনি একটি খুব দরকারি প্রবন্ধ লিখেছেন ,রুকুনদ্দৌলাহ। তিনি যশোর এলাকার কিছু রাজাকারের কুকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরেছেন। লেখাটি এখানে সবার সাথে শেয়ার করলাম।
Click This Link
যশোরের কয়েকজন রাজাকারের কাহিনী
রুকুনদ্দৌলাহ
------------------------------------------------------------
খাজা সাঈদ শাহ : মেজো হুজুর হিসেবে সমধিক পরিচিত। খাজা সাঈদ শাহ সে সময় নওয়াপাড়ার পীর। সবাই তাকে মেজো হুজুর বলেই সম্বোধন করত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে মুক্তিযোদ্ধা শনাক্ত করতেন। তারপর তাদের হত্যা করা হতো। লাশ ফেলা হতো ভৈরব নদে। অভয়নগর থানার রাজাকার বাহিনী ও পিস কমিটির প্রধান ছিল মেজো হুজুর। অভয়নগর এলাকায় স্বাধীনতার পক্ষের লোকজন হত্যা করার জন্য তার ছিল বিশেষ বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্য ছিল ৩০ জনের মতো।
নওয়াপাড়ার পুরনো বাসস্ট্যান্ডের পাশে মেজো হুজুরের টর্চার সেল ছিল (আমজাদ মোল্লার বাড়ি)। এখানে অসংখ্য মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে।
ডা. ইব্রাহীম : খাজুরা এমএন হাইস্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারি ছিল ডা. ইব্রাহীম। তখন ১৯৭১ সাল। সে সময় নিজের স্কুলে স্খাপন করে রাজাকার ক্যাম্প। টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহৃত হয় স্কুলের কমনরুমটি। এখানে পৈশাচিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষদের। লাশ ফেলা হতো চিত্রা নদীতে।
এখানে অনেককেই হত্যা করা হয়েছে। তবে নাম জানা গেছে, লক্ষণ পরামানিক, ডা. আবদুল কাদের, সহোদর দুই মুক্তিযোদ্ধা আয়েন উদ্দীন আয়না ও ময়েন উদ্দীন ময়না, আজিজসহ আরও ২২ মুক্তিযোদ্ধাকে এখানে হত্যা করা হয়। ওই ২২ মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশলে বন্দি করা হয়। শুধু তাই নয় ৬ ডিসেম্বর ’৭১ এখানে রাজাকারদের হাতে মিত্র বাহিনীর ৬ জন অফিসার নিহত হন।
এমএন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল জলিল জানান, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় ইব্রাহীম ডাক্তার এক প্রকার নিজ উদ্যোগেই স্কুলে রাজাকার ক্যাম্প চালু করে। তার রাজাকার বাহিনীতে সদস্য ছিল ২৫ জন। তারা হলো হেকমত আলী, মোসলেম আলী, আমজাদ আলী, হাবিবর মোল্লা, ফসিয়ার মোল্লা, লিয়াকত আলী, আবদুর রহমান, মোশারেফ মুন্সী, সমির উদ্দীন, হাসান আলী, কাদের ড্রাইভার, রুহুল আমিন, সিদ্দিকুর রহমান, নাসির হাকিম লস্কর, জুলফিকার, কাজী সিরাজসহ (ঘোপ সেন্ট্রাল রোডে আবাস গেড়েছে সে সবার কাছে রাজাকার সিরাজ হিসেবে পরিচিত) আরও কয়েকজন।
খালেক মোড়ল : যশোরের (যশোর সদর, বাঘারপাড়া, অভয়নগর ও মনিরামপুর) চারটি থানার রাজাকার কমান্ডার ছিল সে। বাড়ি সদর উপজেলার কচুয়া গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সে রূপদিয়া বাজারে অবস্খিত পাকিস্তানি সৈন্যদের আস্তানায় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তথ্যাদি সরবরাহ করত। সে কচুয়া মেঠোপাড়ার হাদিস, হাটবিলার ইজ্জত আলী, ঘাটকূল কচুয়ার সন্যাল মিস্ত্রি, ভগবতিতলার জলিল, বসুন্দিয়ার মাহফুজসহ শত শত মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে। রূপদিয়ায় অবস্খিত পাক সেনাদের টর্চার সেলে প্রথমে আটকে রেখে পালাক্রমে রাজাকার ও পাকিবাহিনীরা নির্যাতন চালাত। তারপর হত্যা করে ভৈরব নদে লাশ ফেলা হতো। সে নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের সঙ্গেও জড়িত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর খালেক মোড়ল ধরা পড়ে। দু’বছর জেলবাসের পর ছাড়া পায়।
আমজেদ মোল্লা ও কায়েম আলী : বাঘারপাড়া উপজেলার প্রেমচারায় তাদের বাড়ি। তাদের বাহিনীতে ছিল নওশের, ইদ্রিস, সবুর বিশ্বাস, দলিল উদ্দিন, মোজাহার বিশ্বাস, আহমদ আলী, মতিয়ার, দাউদ, গফুর, সোবহান, নওশের, লিয়াকত, আজিবর, সিদ্দিক হোসেন, মজিদ, আনসার, মাহাতাব, জবেদ, ফসিয়ার ও গফুর। এই বাহিনী অসংখ্য মানুষ খুন করে। লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে ঘর-বাড়িতে। তারা চাঁনপুরের মুক্তিযোদ্ধা নওশেরের মা ও বাবাকে গুলি করে হত্যা করেছিল। সাত মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে পাতকুয়ার মধ্যে লাশ ফেলে দেয়। খোকন নামে একজনকে হত্যা করে লাশ ভেলায় ভাসিয়ে দেয়া হয়। তার বাবাকেও হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এই রাজাকার বাহিনী বন্দবিলা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম, ছাত্র সাখাওয়াতকে ঘুমন্ত অবস্খায় গুলি করে হত্যা করে। একই ভাবে হত্যা করা হয় আবুল মণ্ডল, রুহুল ও আফসারকে। সবার বাড়ি প্রেমচারা গ্রামে। নির্মমভাবে হত্যা করা হয় গাইদঘাটার সুরত আলী, মুক্তার আলী, আড়োকান্দির মান্নান, পিয়ারপুরের চাঁদ আলী ও তার স্ত্রী এবং রজব, উত্তর চাঁদপুরের আয়নাল, নিমটার তারাপদের স্ত্রীসহ অসংখ্য মানুষকে। লুটতরাজ, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা রয়েছে অগণিত।
আফছার : একাত্তরের একজন ডাকসাইটে ঘাতক আফছার জল্লাদের বাড়ি সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামে। তার হাতেই সৃষ্টি হয় রূপদিয়ার বধ্যভূমি। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সে ঘাড়ে রাইফেল ঝুলিয়ে কচুয়া, রূপদিয়া, চাউলিয়া, নরেন্দ্রপুর এলাকায় চালায় ত্রাস।
রূপদিয়া বাজারে ১৯৭১ সালে রুস্তম ডাক্তারের বাড়িতে ক্যাম্প ছিল। সেখানে বাঙালিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো। এই ক্যাম্পের জল্লাদ ছিল আফছার। তার হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুল হক, মোস্তফা মৌলভী, সান্যাল, গফুর, মৃধা, আবদুল জলিল, গহর আলী।
আফছারের সঙ্গী ছিল খালেক, গোলাম, মোজাহের, লুৎফর ও ওয়াজেদ। তাদের কাজ ছিল মুক্তিকামী মানুষকে খুন করা। নারী ধর্ষণ ও লুটতরাজ করা। আফছার ও তার সঙ্গীরা সবার কাছে ঘাতক হিসেবে পরিচিত। সে সময় তাকে অনেকে, ‘মেজর’ বলে সম্বোধন করত। মুক্তিযুদ্ধ শেষে আফছার বছর খানেক জেল খাটে।
মেহের : সবার কাছে মেহের জল্লাদ হিসেবে পরিচিত। বাবার নাম কবিরাজ ইয়াকুব আলী। বাড়ি মনিরামপুর উপজেলার পাতন গ্রামে। মেহের জল্লাদ রাজাকার কমান্ডার হওয়ার পর একটি ‘কিলিং স্কোয়াড’ গঠন করে। তাহেরপুরের গৌরদাস বাবুর বাড়ি দখল করে মেহের সেখানে মেয়েদের ধরে এনে ধর্ষণ করত। ধর্ষণ শেষে নির্যাতন করে হত্যার পর লাশ ভাসিয়ে দিত নদীতে।
এক পর্যায়ে মানুষ খুন তার নেশা হয়ে দাঁড়ায়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় সে কত মানুষ হত্যা করেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এম এম কলেজের ভিপি আসাদ, জেলা কৃষক সমিতির সম্পাদক শান্তি, বাম রাজনীতিক তোজো, ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মানিক, আকরাম, আলী আহমদ, মসা, গেরো, অহেদ, গৌরদাস, খোকা, মোসলেম, আমির, আনন্দ, তপন, কল্পনা, ফজলুসহ অসংখ্য মানুষ খুন করে মেহের জল্লাদ।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৯:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


