ফকির ইলিয়াস
=======================================
কয়েকদিন আগে একটি ভিডিও কনফারেন্স করেছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সেই কনফারেন্স বেশ কিছু আজব আজব প্রস্তাব করেছেন ক’জন অংশগ্রহণকারী। একজন বলেছেন, গাঁজা জাতীয় নেশা দ্রব্যগুলোকে লিগ্যাল করা হোক। ‘মারিজুয়ানা’-যুক্তরাষ্ট্রে একটি বহুল প্রচারিত শব্দ। সেই গাঁজা, ভাংকে আইনসিদ্ধ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দ্রুত চাঙ্গা হয়ে যাবে বলেও মত প্রকাশ করেছেন সেই ব্যক্তি।
নেশাদ্রব্য চোরাই পথে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হচ্ছে এটা ঠিক। যারা এটার আইনসিদ্ধতা চাইছেন, তারা বলছেন- তা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ট্রিলিয়ন ডলার ট্যাক্স পাবে। আর সেটাই হবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের শক্তি। জেগে উঠবে অর্থনীতি।
না, প্রেসিডেন্ট ওবামা এতে সায় দেননি। তিনি বলেছেন, না- এটা নৈতিকতাবিরোধী কাজ। প্রকাশ্যে গাঁজা খেয়ে আমি আমার প্রজন্মকে ধ্বংস হতে দিতে পারি না। এই ভিডিও কনফারেন্সে আত্মহত্যাকে প্ররোচনা করা, স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বেছে নেয়া, গর্ভপাত, সমকামীদের লিগ্যাল ম্যারেজ, প্রভৃতি উদ্ভট ইস্যু নিয়েও কথা বলেছেন অনেকে। প্রেসিডেন্ট ওবামা এর কোনোটাতেই সায় দেননি।
হ্যাঁ, কথা বলার অধিকার মানুষের আছে। কিন্তু বলার আগে ভাবা উচিত, যা বলা হচ্ছে- তা মানুষের জন্য কল্যাণকর কি না। হ্যাঁ, আমি বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর কথাই বলছি।
বর্তমান বিশ্বের চারদিকে এখন চরম বর্বরতা। ঘৃণ্য আদিমতা ঘিরে রেখেছে আমাদের প্রতিটি সকাল। ভোরে জেগেই আমরা জেনে যাচ্ছি- বিশ্বের কোথাও না কোথাও সহিংসতার কথা। চরম রক্তপাতের কথা। খুন হচ্ছে। খুনিরা দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিচ্ছে। কি নগ্ন আধুনিকতা আমাদের চারপাশে।
বিশ্বে বেশ কিছু বিষয় আছে যা খুবই সংবেদনশীল সবসময়ই ছিল। এখনো আছে। এর প্রধান বিষয়টি হচ্ছে ধর্ম। ধর্মের কথা শুনলেই আমাদের অনেকেরই বুক কেঁপে ওঠে। আমরা ক্রমশ ঋজু হয়ে যাই একটি নীতিমালার কাছে। নিবন্ধনের কাছে।
খোঁজ করলে দেখা যাবে, প্রতিটি ধর্মের মৌলিক চেতনা কিন্তু এক। সব অসত্য, সব দীনতা, সব অন্যায়ের বিরুদ্ধেই কথা বলেছে প্রতিটি ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু ধর্মীয় চেতনাকে সৃজনশীলতার আলোকে কাজে না লাগিয়ে তাকে মৌলবাদী চেতনায় কাজে লাগালে এর ফল কি দাঁড়াতে পারে? এর উদাহরণ আমরা এখন প্রায়ই দেখছি।
আমাদের সমাজে বেশ কিছু মুখোশধারী মানুষ আছে, যারা পোশাক-পরিচ্ছদে আধুনিক দাবি করলেও মূলত ধারণ করে হীন আদিমতা। এরা নিজেরা ধর্ম পালন করে না। কিন্তু অন্যকে ধর্মীয় উস্কানি দিতে আরামবোধ করে। ভারতের রাজনীতিক লালকৃষ্ণ আদভানীর জীবনাচার নিয়ে কলকাতার বামপন্থী নেতা মমতা ব্যানার্জী কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ভূতের মুখে আবার রাম নাম! এমন জ্যান্ত দানব বাংলাদেশেও আছে। আছে পাকিস্তানেও। পাকিস্তানের চরমপন্থীরা তো রীতিমতো হুমকি দিয়ে বসে আছে তারা শিগগিরই ওয়াশিংটন আক্রমণ করবে!
সাধারণ মানুষের কাছে এদের পৌঁছার প্রধান কৌশলই হচ্ছে ধর্মীয় তমদ্দুন। ভাবতে অবাক লাগে যে, আরব মুল্লুকে আল কোরআন নাযিল হয়েছিল, সেখানে চলছে একনায়কতন্ত্রের বাদশাহী শাসন। আর ইসলামী জোশের জিহাদ করে ধর্মীয় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জঙ্গিরা বেছে নিয়েছে আফগান-পাক-ভারতসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নরম মাটি। কেন নিয়েছে? কারণ এই অঞ্চলের জনমানুষেরা ধর্মপ্রাণ। তারা মুখস্থ ধর্মবিদ্যা রপ্ত করেই কাটিয়ে দিতে চেয়েছেন গোটা জীবন। জঙ্গি মৌলবাদী চক্রটি সেই সরলতাকে পুঁজি করেই আজ শিকড় গড়তে চাইছে এই অঞ্চলে।
বাংলাদেশে আজ কওমী মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। এই কওমী মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষা কারিকুলাম কি? তা কি আধুনিক-যুগোপযোগী? না নয়। বিজ্ঞানসম্মত বাস্তবতা দূরে থাক, রাষ্ট্রীয় সঠিক ইতিহাসই সেখানে ভালোভাবে পড়ানো হয় না। কোমলমতি শিশুদের আদিম কায়দায় দীক্ষিত করায় প্রচেষ্টা চলে। শুরু থেকেই একধরনের গোঁড়া, সীমাবদ্ধ চেতনার মাঝে তাদের বন্দি রাখা হয়।
ভেবে অবাক হই, বাংলাদেশের এক ধরনের স্বঘোষিত শিক্ষিত শ্রেণী এই গোঁড়ামি, জাহেলিয়াতের পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষক। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের প্রয়োজনে তারা অনৈতিক-অন্যায় কাজগুলোর পক্ষেও তালিয়া বাজাচ্ছেন। আর তাদের সামনেই ধ্বংস হচ্ছে একটি প্রজন্ম। অথচ তাদের সন্তানরা পড়ছে ইউরোপ-আমেরিকায়। নিদেনপক্ষে ভারতের কোনো ইংলিশ স্কুলে। হিপোক্র্যাসি আর কাকে বলে!
আর একটি শ্রেণী আছে, যারা মনের অজান্তেই লালন করে বর্বরতা। তারা ধর্মের নামে নৃশংসতার বিরুদ্ধে কথা বলা কে পাপের শামিল মনে করে। অথচ একনায়কতন্ত্রের দেশে মানুষ যে সুখে-শান্তিতে আছে, গণতন্ত্রের দেশে মানুষ সেই শান্তি ভোগ করতে পারছে না। সেই মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহ, আমীর, খলিফা, সুলতান, কিংদের পরোক্ষ সাহায্য সহযোগিতায় গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে জঙ্গি, সন্ত্রাসী পোষা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক দেশের মানুষদের এই বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে।
কোনো ধরনের ভন্ডামিই সমাজ নির্মাণে কল্যাণকর ভূমিকা রাখতে পারে না। অতীতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। কামানের বিরুদ্ধে ঢিল ছুড়া যাবে। কিন্তু তাতে লাভ হবে কি? শোষণটা সাম্রাজ্যবাদের হোক, আর মৌলবাদের হোক- এর স্বরূপ, গতি-প্রকৃতি এক এবং অভিন্ন। কোনো আধিপত্যবাদই মানুষের অগ্রসরমানতার প্রয়োজনে দরকারী নয়। সুশিক্ষা মানুষের মনের প্রখর জানালা খুলে দেয়। আর সে জন্যই প্রকৃত শিক্ষিত হয়ে গড়ে ওঠার কোনো বিকল্প নেই। আমার বেশ হাসি পায়, যখন দেখি কোনো কোনো অর্বাচীন জেনে বুঝেই বর্বরতাকে সাপোর্ট দেয়। এই শিকল ভেঙে বেরুবার পথ খুঁজতে হবে সবাইকে, সম্মিলিতভাবে।
--------------------------------------------------------------------
দৈনিক ডেসটিনি। ঢাকা। ১০ এপ্রিল ২০০৯ শুক্রবার প্রকাশিত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


