ফকির ইলিয়াস
========================================
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আওয়ামী লীগের সভানেত্রী যে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন তা বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষেরই অজানা ছিল। এ ঘোষণার মাধ্যমে দেশের মানুষ জেনেছে, আওয়ামী লীগের সভানেত্রীরও সেখানে একটি দায়িত্বপূর্ণ অবস্খান ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার পর দেশব্যাপী ভেঙে পড়েছে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব। তারা বলছে, নেত্রী না থাকলে তারাও থাকবে না। এটা নিয়ে এ ক’দিনে সভা-সমাবেশ-বিবৃতি লক্ষ্য করেছে দেশবাসী। এখানে উল্লেখ করা দরকার, বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার নিরঙ্কুশ বিজয় পাওয়ার পর গোটা দেশের মানুষ নতুন আশা বুকে নিয়ে দাঁড়ায়। তারা নবজাগরণে সঞ্চারিত হন। প্রত্যাশা একটাই- একটি সুখী বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন।
কিন্তু শুরু থেকেই ছাত্রলীগের লেবাসধারী একটি চক্র দেশে অরাজকতা সৃষ্টিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। নিজেরাই হয়ে ওঠে নিজেদের প্রতিপক্ষ। দখল নেয়ার সর্বগ্রাসী মানসিকতা তাদের হন্য করে তুলে। যা ছিল গোটা দেশবাসীর কাছেই চরম অস্বস্থির কারণ। এই অবস্খায়, প্রধানমন্ত্রীসহ সিনিয়র মন্ত্রীরা তাদের থামানোর চেষ্টা করেন বারবার। কিন্তু তারা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। বরং কোন কিছু তোয়াক্কা না করে নিজেদের কর্মীদের খুন মারধর করতেও তারা পিছপা হয়নি।
এখানে সঙ্গত কারণে একটি প্রশ্ন আসে। তা হচ্ছে ছাত্ররাজনীতি কি এবং কেন তা করা দরকার। বাংলাদেশে ছাত্রসমাজ সব সময়ই সাধারণ গণমানুষের বিবেকের প্রতীক হিসেবেই প্রতীয়মান হয়ে আসছে। ’৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুথান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণআন্দোলন, এমনকি জাতির খরা, দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা, পরিবেশ আন্দোলনেও এই জাগ্রত ছাত্রসমাজ অতন্দ্র ভূমিকা পালন করেছে। যা জাতির ইতিহাসে স্বর্ণোজ্জ্বল হয়েই লেখা আছে এবং থাকবে। গরীয়ান ছাত্রসমাজ অতীতে কখনই ভোগবাদী ছিল না।
এই ছাত্রসমাজকে ভোগবাদী করে গড়ে তুলতে অত্যন্ত ঘৃণ্য ভমিকা রাখেন দেশের একজন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। তার বক্তব্য ছিল ‘আই নিড ইউ ইয়াংম্যান’। বিনিময়ে তিনি চালু করেছিলেন ছাত্রদের মাঝে ‘গিভ এন্ড টেক’-এর রাজনীতি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে সামরিক জান্তারা দাপট বাড়াতে শুরু করে। তখন তাদের নিজস্ব ভিত টিকিয়ে রাখার জন্য দুটো ঘৃণ্যতম কাজ করতে হয়। প্রথমটি হচ্ছে মৌলবাদী রাজাকার শক্তিকে সর্বতোভাবে পুনরুত্থান করা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে দেশের শাণিত ছাত্রসমাজকে লোভ-লালসা দিয়ে কলুষিত করা।
জেনারেল জিয়া প্রথমে যে দলটি করেন এর নাম ছিল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল)। পরে নাম পাল্টিয়ে তাকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) করেন। এর পাশাপাশি ছাত্রদের দিয়ে দল গঠনের খায়েশে জিয়াউর রহমান বিভিন্ন জেলা সফর করেন এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ছাত্রনেতাদের লোভ-লালসা দেখিয়ে ছাত্রদলে টানার চেষ্টা করেন সরাসরি। একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বলতে পারি, জিয়াই সেই ব্যক্তি যিনি ১৯৭৭-৭৮ সালে জেলা পর্যায়ের ছাত্রনেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে ‘যে কোন মূল্যে’ ছাত্রদল দাঁড় করার ঘোষণা দেন। জাসদ ছাত্রলীগের বেশকিছু ছাত্র নেতা, ডানপন্থী এবং বামপন্থী বিভিন্ন দলের ছাত্রনেতাকে বাগিয়ে বিভিন্ন প্রধান প্রধান জেলাগুলোতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি গঠনে সমর্থও হন।
বাংলাদেশের ছাত্রসমাজকে ভোগবাদী এবং সন্ত্রাসী করে তুলতে এতে নতুন মাত্রা যোগ করেন আরেক সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ। তিনি ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছাত্রদেরই নিজেদের প্রতিপক্ষ করে গড়ে তোলাতে আন্ডারগ্রাউন্ড জোগানদারও নিয়োগ করেন। যারা প্রাক্তন ছাত্রনেতা হিসেবে ছাত্রদের মধ্যে যোগসাজশ তৈরি করে মূলত শিক্ষাঙ্গনকে নৈরাজ্যক্ষেত্র বানাতে ভূমিকা রাখেন। সে সব ঘটনা বাঙালি জাতি ভুলে যায়নি। কোনদিন যাবেও না।
প্রায় একই প্যারালাল সূত্রে বাংলাদেশে ক্রমশ বিস্তার লাভ করে ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির’। অখণ্ড পাকিস্তানে ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’ নামে জামায়াতের যে ছাত্র সংগঠনটি ছিল, পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে এরাই নতুন নামে আবির্ভূত হয়।
এটা দেশবাসীর স্পষ্ট মনে আছে, শুরুতে ছাত্রশিবির কিন্তু কোনমতেই নিজেদের জামায়াতের ছাত্রসংগঠন বলে পরিচয় দিতে রাজি হতো না। তারা নিজেদের স্বতন্ত্র ইসলামী ছাত্র সংগঠন বলে দাবি করলেও তা বেশিদিন চালাতে পারেনি। উন্মোচিত হয়ে পড়ে তাদের মুখোশ। জামায়াত ও শিবিরের একই এজেন্ডা দেখে দেশবাসীর বুঝতে অসুবিধা হয়নি, একটি মিথ্যা পরিচয় দিয়েই এরা যাত্রা শুরু করেছিল। এরপর তারা এ দেশের শিক্ষাঙ্গনে, কিরিচ, কুড়াল, রামদা প্রভৃতিসহ রগকাটার সংস্কৃতি চালু করে, যা ক্রমে ক্রমে গোটা দেশের শিক্ষা পরিবেশকে দূষিত এবং ক্ষতিগ্রস্থ করে।
ছাত্রদের লক্ষ্য কি হওয়া উচিত, তা বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালেই জানা এবং বোঝা যায়। বাংলাদেশের ছাত্ররা গণমানুষের আশা-আকাক্ষার প্রতীক হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে জাতীয় প্রয়োজনে। বলা দরকার, এখনও রাজনীতিকরাই ছাত্রদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন নিজেদের স্বার্থেই। যদিও তারা তাদের সন্তানদের পাঠাচ্ছেন বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নেয়ার জন্য। আমি মনে করি এটাও রাজনীতিকদের এক ধরনের আত্মপ্রতারণা।
জরুরি কথা হচ্ছে, ছাত্রলীগের ভবিষ্যৎ কি হবে তা বিবেচনায় না আনলেও এটা খুবই নিশ্চিত, জামায়াত ও বিএনপি তাদের দুটি ছাত্র সংগঠন শিবির এবং ছাত্রদলকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েই যাবে। তারা এই কাজ করবে নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনে। আর সেই সত্য মানলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকেও তাদের ছাত্র সংগঠন, ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পৃষ্ঠপোষকতা করে যেতেই হবে। এর কোন বিকল্প নেই।
গত সাতই এপ্রিল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বেশ দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছেন দেশের বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার ভাষণটি শুনলাম টিভির কল্যাণে। সে ভাষণে তিনি শুধুই নিজেদের সাফাই গেয়েছেন। এমনকি এটাও বলেছেন ‘সেনা পরিবারের’ একজন সদস্য হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন ওয়ান ইলেভেন সেনাবাহিনী ঘটায়নি। ঘটিয়েছে উচ্চাভিলাষী কিছু সামরিক অফিসার। যদি তার কথাই সত্য বলে মেনে নিতে হয় তবে বলতে হবে বাংলাদেশে পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, মৌলবাদীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন, ছাত্রদের হাতে ব্যাপক অর্থবিত্ত এবং অস্ত্র তুলে দেয়ার পরিকল্পনাকারী যারা ছিল বেগম জিয়া তাদেরই উত্তরসূরি। বরং ২০০৭ সালে যে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী দেশকে হাওয়া ভবনের খপ্পর থেকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে এসেছিল এরা ’৭৫, ’৭৮-এর সেনানায়কদের মতো ক্ষমতালোভী ছিল না। আর মূল পার্থক্যটা সেখানেই।
আমি মনে করি বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে গতিশীল করার দায়িত্ব আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকেই নিতে হবে। কারণ ছাত্রলীগ টিকে না থাকলে, ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পর আওয়ামী লীগের নেতারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঠাঁই খুঁজে পাবেন না। সরে যাবে তাদের পায়ের নিচের মাটি। এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনা আমি আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড বরাবরে তুলে ধরতে চাই।
১. বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে সুযোগ্য নেতৃত্বের হাতে তুলে দেয়া হোক। ছাত্র নামধারী অছাত্রদের হাত থেকে বাঁচিয়ে ছাত্রলীগে গণতান্ত্রিক নিয়ম-শৃখলা প্রতিষ্ঠা করা হোক।
২. যেহেতু ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন তাই আওয়ামী লীগের সভাপতির সেখানে কি সাংগঠনিক দায়িত্ব থাকবে তা স্পষ্ট করা হোক। প্রয়োজনে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র পরিমার্জন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন করে আরও গঠনমূলক, কার্যকর করা হোক।
৩. ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ছাত্রলীগের যোগ্য নেতৃত্বই পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এসেছে। তাই অঞ্চলভিত্তিক নয়, জাতীয়ভিত্তিক মেধা বিবেচনায়ই ছাত্রলীগের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা জরুরি। এ বিষয়ে ভূমিকা নেয়ার জন্য ছাত্রলীগের প্রাক্তন নেতাদের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হোক।
৪. মনে রাখতে হবে ছাত্রলীগের সব সদস্যই অপরাধকর্মে জড়িত নয়। তাই যারা বিবেক জলাঞ্জলি দিয়ে ছাত্রলীগে কোন্দল, সন্ত্রাস করছে এদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্খা নেয়া হোক।
বিষয়টি খুবই স্পষ্ট, বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা যাবে না। তাই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই ছাত্রলীগকে ঢেলে সাজাতে হবে। ক্ষমতা চিরস্খায়ী নয়। দলীয় আদর্শ চিরস্খায়ী। এই ছাত্রলীগ বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যে বীরত্বপর্ণ অবদান রেখেছে, তা ভুলে গেলে চলবে না।
নিউইয়র্ক
৮ এপ্রিল ২০০৯
---------------------------------------------------------------------
দৈনিক সংবাদ। ঢাকা। ১০ এপ্রিল ২০০৯ শুক্রবার প্রকাশিত
ছবি - ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সম্মেলন উদ্বোধন করছেন
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ছবিটি ফটোগ্রাফার্স ডাইরেক্ট থেকে নেয়া ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

