ফকির ইলিয়াস
========================================
ফেসবুক- এই সময়ে একটি বহুল নন্দিত সোস্যাল নেটওয়ার্ক। সামাজিক যোগাযোগ এবং মানবিক সম্পর্কের উন্নয়নে জন্মলগ্ন থেকেই এই অনলাইন নেটওয়ার্কটি বিনামূল্যে তার সদস্যদের নানা সুবিধা দিয়ে আসছে। বিশেষ করে নিজ বন্ধুমহলে সৃজনশীল কোনো ভাবনা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া, মতবিনিময় করা ইত্যাদির মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ উপকৃত হচ্ছেন বলা যায়। এটা ফেসবুকের সব সদস্যই জানেন, প্রযুক্তির নতুন দরজা এই অনলাইন কম্যুনিটিরও বেশকিছু নিয়মাবলি রয়েছে। ফেসবুকে বাংলা ভাষাভাষী সদস্যদের সংখ্যা এ মুহুর্তে হয়তো লক্ষাধিক হতে পারে। কারণ এর সদস্য সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এর সদস্য হওয়ার নিয়ম হচ্ছে কেউ একজন ইনভাইটেশন পাঠাবেন। তা অনুসরণ করে সদস্য ফরম পূরণ করতে হবে অনলাইনে। তারপর সার্চ করে বন্ধু তালিকায় নাম যোগ করে আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে হবে। আমন্ত্রিত বন্ধুরা সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে কনফারমেশন করবে। এভাবে প্রতিদিনই বাড়বে বন্ধুসংখ্যা। তারপর বন্ধুর বন্ধু কিংবা তারও বন্ধু এমন কেউ বেছে বেছে তার বন্ধু তালিকায় নাম যোগ করবে। এভাবে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে বন্ধুদের দল। হ্যাঁ, কেউ কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবেন কি করবেন না, তার এখতিয়ারও আছে নিজস্ব। মন চাইলে যোগ করবেন- না চাইলে করবেন না। এখানে একটি বিষয় আমি খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি, অনেকে নিজ নাম, নিজ ছবি না দিয়ে ছদ্মনামে ভিন্ন ছবি দিয়ে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলেন কিংবা খুলছেন। কেন তারা তা করেন কিংবা নেপথ্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি-না তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। ফেসবুক যে সুবিধাগুলো দিয়ে যাচ্ছে তার অন্যতম হচ্ছে, তাৎক্ষণিক অনলাইনে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট করা, গ্রুপ ডিসকাশন করা, আলোচনা করা, নিজ অ্যালবাম খুলে ব্যক্তিগত পারিবারিক ছবিগুলো সংরক্ষণ করা ইত্যাদি।
কিন্তু সাম্প্রতিককালে ফেসবুকে বেশকিছু নেতিবাচক কর্মকান্ড আমাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে। আগেই বলেছি, অনলাইন কম্যুনিটির বেশকিছু নিয়মকানুন ও শর্তাবলি রয়েছে, যা মেনে চলা একজন মানুষ হিসেবে সবার নৈতিক দায়িত্ব। বড় বেদনার সঙ্গে দেখছি, এসব শর্তাবলি অমান্য করে কেউ কেউ গোটা সোস্যাল নেটওয়ার্ককে কলুষিত করার চেষ্টায় মেতে উঠেছেন। শুধু ফেসবুকে কেন, কোনো অনলাইন গ্রুপ, ব্লগ, ডিসকাশন প্লাটফর্মেই কোনো অশ্লীল ছবি যোগ করা, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা, কারো চরিত্র হনন করা মারাত্মক গর্হিত কাজ।
পরিতাপের বিষয়, কিছু বাংলা ভাষাভাষী সদস্য সে রকম কাজ করে গোটা জাতিসত্তাকে কলংকিত করার চেষ্টা করছেন। ইদানীংকালে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করছি বেশ হতাশার সঙ্গে। ফেসবুকে ইংরেজি অক্ষরে বাংলা গালাগাল দিয়ে বেশ কিছু গ্রুপ খোলা হয়েছে এবং হচ্ছে। ‘গ্রামীণফোন’কে এমন অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়ে ব্যানার করা হয়েছে। তাছাড়া বাংলালিংক, একটেল, গ্রামীণ ব্যাংক প্রভৃতি সংস্থাকেও আক্রমণ করা হয়েছে অশ্লীল ভাষায়। মনে রাখতে হবে, বাংরেজিতে কথাগুলো লেখা হলেও এর পাঠক মূলত কে? শুধু বাংলা ভাষাভাষী নয়, অনলাইনে অন্য ভাষাভাষী বন্ধুও তো থাকতে পারে। থাকাটা স্বাভাবিক। কেউ যদি সেসব বাক্যের ইংরেজি অর্থ জানতে চায় তবে কি জবাব দেওয়া যাবে? এমনটাও লক্ষ্য করেছি, কেউ কেউ কোনো নারীর ছবি নিজ ফেভারিট বুকে যুক্ত করে- তাকে বাংলা ভাষায়, ইংরেজি অক্ষরে গালাগাল করেছেন। সোস্যাল নেটওয়ার্কে এমন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ গোটা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্যই লজ্জাজনক। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর জন্য সোস্যাল নেটওয়ার্ক কি উপযুক্ত স্থান? ফেসবুকে সাম্প্রতিককালে আরো যে উৎপাতটি বেড়েছে তা হচ্ছে, আত্মপ্রচারের জন্য গ্রুপ তৈরি করে একই আমন্ত্রণ বারবার কাউকে পাঠানো। জানা দরকার, কারো আমন্ত্রণ পাঠানোর অধিকার যেমন আছে, তেমনি প্রাপকের ‘ইগনোর’ করার অধিকারও আছে। কিন্তু বারবার একই ইনভাইটেশন পাঠিয়ে কাউকে বিরক্ত করার হেতু কী? এটা কেমন দীন মানসিকতার পরিচায়ক?
প্রায় একই কায়দায় বিভিন্ন, আলোচনা গ্রুপে যুক্তিতে না পেরে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার প্রবণতাও বেড়েই চলেছে। এখানে মনে রাখা দরকার, একজন লেখক স্বনামে ,নিজ দায়িত্বে যে লেখাটা লিখেছেন- তা তিনি লিখছেন বৃহৎ কল্যাণের কথা বিবেচনায় রেখে। তার যুক্তির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে হলে স্বনামে আবির্ভূত হওয়াটি বাঞ্ছনীয়। যুক্তিতে না পেরে গোপন নাম নিয়ে আক্রমণ করা তো কোনো সৃজনশীল কাজ নয়। নষ্ট মননের ভ্রূণ ছড়িয়ে আমরা কাদের আক্রান্ত করতে চাইছি? সামাজিক সম্প্রীতি বন্ধনের বদলে দীনতার বিষবাষ্প কেন ছড়াচ্ছি আমরা? কার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছি? না, একটি পরিশীলিত মানবগোষ্ঠীর কাছ থেকে এমনটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। অনলাইন কম্যুনিটি আমাদের জ্ঞানচর্চা, মতবিনিময়ের পথ প্রশস্থ করে দিতে চাইছে। এর অপব্যবহার করলে আমরাই ক্ষতিগ্রস্থ হবো সবচেয়ে বেশি। ক্ষতিগ্রস্থ হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
-------------------------------------------------------------------
দৈনিক সমকাল।ঢাকা। ১৮ এপ্রিল ২০০৯ শনিবার প্রকাশিত
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ৭:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


