ফকির ইলিয়াস
========================================
না, থামতে চাইছেন না পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত তিনি। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন তত্ত্ব দিচ্ছেন তিনি। বলেছেন, সাংবাদিকরা নাকি এ নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করছেন। যারা লিখছেন, তারা বাংলাদেশের সাংবাদিক, বাংলাদেশের সন্তান। মাটি ও মাতৃকার স্বার্থ রক্ষা করা তাদের পবিত্র দায়িত্ব। তারা সেই দায়িত্ববোধ থেকেই লিখছেন।
কিন্তু রাষ্ট্রদূত হয়ে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী কী বলছেন? টিপাইমুখ বাঁধ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের যে কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত হবে- তার মানবিক দিকটাও বিবেচনা করবেন না মান্যবর রাষ্ট্রদূত? রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব তো শুধু তার নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করাই নয়, কোটি মানুষ বাঁচানোর মানবিক নৈতিকতাবোধও তার থাকা চাই।
এটা আমরা সবাই জানি ভারতের বরাক নদী দুইভাগে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ অঞ্চলের ওপর দিয়ে ‘সুরমা’ ও ‘কুশিয়ারা’ নদী নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারত সেই বরাক নদী ও তুৎভাল নদীর সঙ্গমস্থলে ১৬১ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন এবং ৩৯০ মিটার দীর্ঘ বাঁধটির নির্মাণকাজ শুরু করছে। যা ২০১২ সাল নাগাদ শেষ হবে।
সবচেয়ে বেদনার কথা হচ্ছে, ভারত এ পর্যন্ত এই বাঁধ নির্মাণ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনা করেনি। তাদের এই প্রস্তাবনার দলিলপত্র, পরিকল্পনা কিছুই বাংলাদেশকে দেখায়নি। তারা খোলামন নিয়ে এ বিষয়ে আলোচনায় কেন আগ্রহী নয় সে বিষয়টি ক্রমশই রহস্যজনক হয়ে উঠছে। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের কী কী ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে সে নিয়ে বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে মতামত ব্যক্ত করতে শুরু করেছেন। তাদের মতে, এর ফলে বাংলাদেশে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সিলেট বিভাগ অঞ্চল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা এমনকি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলও আক্রান্ত হতে পারে। এ সব এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল শুকিয়ে মরুভূমির আদল ধারণ করতে পারে। বর্ষাকালে হঠাৎ পানি ছেড়ে দিলে অতিরিক্ত বন্যাকবলিত হয়ে এসব অঞ্চলে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটতে পারে। সিলেট বিভাগ অঞ্চলে ভূমিকম্পের আশঙ্কা দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। অনেকগুলো নদী শুকিয়ে যেতে পারে। ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার দ্রুত কথা বলবে সেটাই প্রকাশিত ছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি এ বিষয় নিয়ে ভাবিত বলে আমরা পত্রপত্রিকায় দেখেছি। যা জেনেছি, তার মূল কথা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি নিয়ে পর্যবেক্ষণের জন্য দুটি কমিটি গঠনের কথা বলেছেন। এই দুটি প্রতিনিধিদল টিপাইমুখ বাঁধ পর্যবেক্ষণ করবেন সরজমিন। এর একটি কমিটি গঠিত হবে পানি বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য কারিগরি গবেষকদেরকে নিয়ে। আর অন্যটি হবে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদেরকে নিয়ে। উভয় কমিটিই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সরকারকে রিপোর্ট দেবেন।
দুই.
খুব গভীরভাবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এই টিপাইমুখ বাঁধটি বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে- তা বলছেন স্বয়ং ভারতীয় গবেষকরাই। ভারতের মনিপুরের সেন্টার ফর অর্গানাইজেশন রিসার্চ এন্ড এডুকেশন (সিওআরই)-এর পরিচালক ড. দেবব্রত রায় এবং মনিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্স বিভাগের ড. সইবাম ইতোনমি এ নিয়ে তাদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন। তাতে দেখা গেছে, এই বাঁধ ভেঙে গেলে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে বা হতে পারে তা নিয়ে ভারত সরকারের কাছে কোনো মূল্যায়নপত্র নেই। এই দুই গবেষক, বাঁধ নির্মাণকারী সংস্থা ‘নিপকো’ এর কঠোর গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাঁধটি নির্মাণের জন্য পুরো এলাকায় সামরিক স্থাপনা কেন নির্মাণ করা হচ্ছে তাও প্রশ্নবিদ্ধ করছে অনেককে। বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, নির্মাণকারী সংস্থা ‘নর্থ ইস্ট ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন’ (নিপকো) যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে, তাতেও পরিবেশগত সমস্যাবলীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিষয়ে কোনো বিশদ বিবরণ নেই। মনিপুরের দুই বিশেষজ্ঞের মতে এর নেতিবাচক প্রভাব বিষয়ে জরিপ কার্যটিও এক্সপার্টদেরকে দিয়ে করানো উচিত।
বাঁধটি নির্মাণের মাধ্যমে ভারত তাদের একতরফা স্বার্থই দেখছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভারত চাইছে, বরাক নদীর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে টিপাইমুখের এই বাঁধের মাধ্যমে কাছাড় সমতলে সেচ সুযোগ বাড়াবে। কিন্তু এর প্রভাবে বাংলাদেশের কী ক্ষতি হবে তা মোটেই তাদের বিবেচনায় নেই। এই বাঁধের মাধ্যমে ভারত কতো কিউসেক পরিমাণ পানি আটকাবে তাও তারা বলছে না। যদিও তারা বলেছে, এই বাঁধের মাধ্যমে তারা বছরে ছমাস পানি আটকে রাখবে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বাঁধ নির্মাণে ব্যর্থতার উদাহরণই বেশি। এর একটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের টেটন ড্যাম। এটি ছিল ৯০ মিটার উঁচু। অথচ বাঁধটি মাত্র এক ঘণ্টা পঁচিশ মিনিটে ভেঙে যায়। পেরুর হুয়াক্কাটো বাঁধটি ছিল অনেকটা টিপাইমুখ বাঁধের মতোই ১৭০ মিটার উঁচু। তা ভূমিধসের কারণে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ভেঙে যায়।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতের মনিপুরেও এই বাঁধের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত তৈরি হয়েছে। যদিও ‘নিপকো’র কারিগরি সমীক্ষায় বলা হয়েছে এই বাঁধ প্রজেক্ট ভারতের জন্য ৪০১.২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। যা থেকে মনিপুর সরকার ৪০/৪৫ মেগাওয়াট ফ্রি বিদ্যুৎ পাবে। এই বিদ্যুতের জন্য মনিপুরের ২৯৩ বর্গ কিলোমিটার জায়গা ওয়াটার রিজার্ভের নিচে চলে যাবে। যার মধ্যে থাকবে ৪৭৬০ হেক্টর বাগান, ২০৫৩ হেক্টর ধানি জমি। এ ছাড়া মনিপুরের ৭২৫১ বর্গ কিলোমিটার বনের মধ্যে ১৭৮.২১ বর্গ কিলোমিটার বন চিরতরে হারিয়ে যাবে। এই লাভ-ক্ষতির পরিমাণটি ভারত সরকার জনসমক্ষে প্রকাশ করছে না।
টিপাইমুখ বাঁধটি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি ‘ফারাক্কা’ হতে পারে সে সন্দেহ অমূলক নয়। এই বাঁধ নিয়ে ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালের প্রায় ২০০ জন বিশেষজ্ঞের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই ঢাকা ঘোষণায় এই বাঁধটি বন্ধ রাখতে ভারতের প্রতি দাবি জানানো হয়। কিন্তু ভারত এই দাবিটি গ্রাহ্য করছে না।
কেন্দ্রীয় সরকারের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে মনিপুর সরকার এই বাঁধ নিয়ে এখন মৌনতা অবলম্বন করলেও বাংলাদেশের সে সুযোগ নেই। কারণ এই প্রবাহের অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে জরুরিভিত্তিতে। জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন ব্যুরো, আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের প্রতিটি ফোরামে এই বিষয়টি উত্থাপন করা প্রতিটি বাংলাদেশের নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। নিউইয়র্ক, লন্ডনসহ বিশ্বের বাঙালি অধ্যুষিত শহরগুলোর অভিবাসীরা ইতিমধ্যেই তা নিয়ে জাগতে শুরু করেছেন। সভা-সমাবেশ, আলোচনা হচ্ছে।
মার্কিন কংগ্রেসে এ নিয়ে একটি শুনানি অনুষ্ঠানেরও প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী, বন ও পরিবেশ বিষয়কমন্ত্রী, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ত্রাণ বিভাগের মন্ত্রীসহ সকল মন্ত্রীরই এ বিষয়ে দায়িত্বপূর্ণ বক্তব্য দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। কারণ মনে রাখতে হবে বাঁধটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে এবং পরবর্তীতে কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত হলে তখন ‘দুঃখ প্রকাশ’ ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। খেটে খাওয়া বাঙালি জাতি তেমন কোনো বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চায় না।
বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ চেয়ে আছে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের দিকে। প্রয়োজনে ভারতের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রিবর্গ, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরিভিত্তিতে আলোচনার উদ্যোগ নিতে পারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ফলপ্রসূ না হলে, আসছে জাতিসংঘ অধিবেশনে এ নিয়ে জোরালো বক্তব্য দেয়ার জন্য বাংলাদেশকে প্রস্তুত থাকা এখন সময়ের দাবি। আবারো বলি, ভারত-বাংলাদেশের অত্যন্ত মিত্রপ্রতিম দেশ। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কোনো উদ্যোগ বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেবে না। নিতে পারে না। এই প্রজন্ম ‘ফারাক্কা’ কালীন প্রজন্ম নয়। তারা এর প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করে যাবেই।
১০ জুন, ২০০৯
-------------------------------------------------------------------
দৈনিক ভোরের কাগজ।ঢাকা। ১৪ জুন ২০০৯ রোববার প্রকাশিত
ছবি- নকশা টিপাইমুখ ড্যাম , গুগল থেকে
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুন, ২০০৯ সকাল ৭:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



