শামীম কবীরের কবিতা
ভূমিকা ও সংগ্রহ : নভেরা হোসেন
=====================================
মাত্র ২৪ বছর ছয় মাস বেঁচে ছিল কবি শামীম কবীর। শামীমের জন্ম ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল বগুড়া জেলার কাহালু গ্রামে নানার বাড়িতে। ১৯৯৫ সালের ২ অক্টোবর বগুড়ায় নিজ বাড়িতে শামীম আত্নহত্যা করে। ঠনঠনিয়া কবরস্থানে যাওয়ার পথে বন্ধুরা কেউ উপস্থিত ছিল না, কেউ জানতে পারেনি কবিতার সাথে তার এই আভিমানিক বিচ্ছেদের কথা। শৈশব থেকেই শামীম কবিতা অনুরাগী । ক্লাস সেভেন থেকে রংপুর ক্যাডেট কলেজ এং সেই সূত্রে কবিতার সাথে অধিক সখ্য। ক্যাডেটবন্ধু তাজুল হক সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন নদীর সাথে সম্পর্ক শামীমের কবিতা প্রেমকে ইমাজিনেশন থেকে বাস্তবের পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিল। সতেরো বছর বয়সে কোথায় দেবো রাজস্ব নামে কবিতার পান্ডুলিপি তৈরি করে সে। শামীমের মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় তার কবিতা সমগ্র। এখানে মুদ্রিত কবিতাগুলো তাতে ঠাঁই পায়নি। একজন কবির সংবেদনশীলতার পুরোটাই ছিল শামীমের মধ্যে। রংপুর ক্যাডেট থেকে মাধ্যমিক এবং রাজশাহী সরকারী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার পর প্রথাগত পদ্ধতির পড়ালেখার প্রতি অনিহার কারণে শামীম লেখালেখির সাথে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত সময়ে লিটল ম্যাগাজিনকে ঘিরে গড়ে-ওঠা ঢাকার সাহিত্য জগতের সাথে সে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। নদী, প্রান্ত, দ্রষ্টব্য, রূপম, একবিংশ ইত্যাদি লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর কবিতা প্রকাশ পেত। সমসাময়িক কবিদের মধ্যে শামীম মেধাবী কবি হিসেবে পরিচিত ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে খুব শান্ত প্রকৃতির হলেও ভেতরে ভেতরে সে ছিল প্রচন্ড অস্থির চরিত্রের। কবি বন্ধুদের সাথে তার বোহেমিয়ান জীবন-যাপন পরিবার ও সামাজিক দৃষ্টিকোণে অগ্রহণযোগ্য ছিল। আপাদমস্তক একজন কবি ছাড়া আর কিছইু ছিল না সে। শামীমের কবিতা নব্বইয়ের দশকের কবিতায় এক ভিন্নমাত্রা সংযোজন করে নিঃসন্দেহে। আধুনিক মানুষের ভেতরের জটিল মনস্তত্ত্ব, নিঃসঙ্গতা, চারিত্রিক বহুত্ব, মানসিক ব্যবচ্ছেদ_ এসব ছিল তার লেখার প্রিয় বিষয়। লেখার পাশাপাশি সে ছবি আঁকতো এবং চমৎকার গান গাইতো শামীম। ...তবু কবিতা, হাঁ, কবিতাতেই সে নিমগ্ন হয়ে আছে এতটা দিন, এতটা বছর পরেও।
--------------------------------------------------------------------
কিন্তু
ভেবেছিলাম যে কোনো স্রোতের মধ্যেই এইভাবে নির্বিকার
ভাবলেশহীন যাবো আলাভোলা বাতাসের মতো, যে-রকম
জন্মগ্রহণেরও আগে, অনেক আগেই আমি মায়ের জঙ্ঘার
খুব গোপন জানালা দিয়ে দেখেছিলাম রৌদ্রের বিভ্রম
প্রতীক্ষার ভঙ্গি নিয়ে-ভেবেছিলাম পার হয়ে যাবো ইহকাল
কোনো মতে, মাঝেমধ্যে ঘুমন্ত নিশ্বাস ছুঁয়ে হয়তোবা শুধু
ধরাশায়ী হতে হবে, পথেঘাটে ভীষণ নাকাল
তা'তে কী-বা এসে যায় (রক্তের মধ্যেই আছে কাতরতা-ধুধু
মনোহর ইয়ার্কি সখ্যতা) আমার উচিত ছিলো শ্মশানের শীত
থেকে পোড়া কাঠ কয়লার নিরপেক্ষ আঁধার জমানো কিংবা ধুলো
আর নর্দমায় গড়াগড়ি দেয়া, সন্ধে হলে সাচ্চা পুরোহিত
সেজে উলুকভুলুক মন্ত্রে দুনিয়া কাঁপানো যেতো, নৈশভোজে খাঁটি দেশী মুলো
ভেবেছিলাম এভাবেই- নিজস্ব কল্কিতে দেবো কষে টান, হঠাৎ ধাঁধার
সমাধান পেয়ে গেলে চৌরাস্তায় উবু হয়ে বসে খুব প্রবীণ
ভূতের মতো ভেল্কিতে দেবো চক্ষু ছানাবড়া করে আমি নিজেই সবার
কিন্তু-থেমে দাঁড়াতেই, কে য্যান ভেতর থেকে প্রাণপনে
বলে উঠলো-এভাবে কদ্দিন ওহে এভাবে কদ্দিন
হে দরোজা
হে দরোজা, গোথিক খিলানে আঁটা সুপ্রাচীন পথের দরোজা
কী কারণে পেতে হয় এমন প্রতীক্ষার সাজা
আকাশে নিশ্চল মেঘ, আবিষ্ট চাঁদের কুহেলিকা
উজ্জ্বল দুচোখ তুলে চেয়ে দ্যাখো একনিষ্ঠ বেদনার টিকা
সমুজ্জ্বল আমার কপালে
কী কারণে হে দরোজা কুয়াশার অধিক আড়ালে
এইভাবে নিষ্প্রাণ-থেমে যেতে হয় প্রতারক
পথের প্রান্তে এসে, হাঁটু জলে বৃদ্ধ ধ্যানী বক
ঘনভার অন্ধকারে হিরন্ময় নক্ষত্রের রথ
সীমাহীন প্রতীক্ষার মালা গাঁথে নির্জীব-শ্লথ
আলোকের গতিবেগে দীর্ঘপথ প্রায় উড়ে উড়ে
এসেছি তীরের মতো অন্তহীন অন্ধ চক্র ফুঁড়ে
সঙ্গীসাথী অনেকেই ছিলো, মধ্যপথে
ঝরে গ্যাছে, মরে গ্যাছে তারা- অভ্রভেদী অগি্নর শপথে
ও-পারে যাবার দীক্ষা নিয়েছিলো যারা
আমি শুধু ধুঁকে ধুঁকে অতিকষ্টে স্বপ্নগর্ভ অসীম সাহারা
পাড়ি দিয়ে শুধুমাত্র তোমারি প্রদত্ত ভরসায়
এতদূর এসেছি, তবু ক্যানো হায়
গ্রহণ করো না-
আমি তো অন্ধের মতো কোনোদিনই কারুর করুণা
প্রার্থনা করিনি কিংবা সীমাবদ্ধ জলে
কাটিনি সাঁতার, শুধু নিজের দখলে
যে টুকু উর্বর ভূমি ছিলো
একাগ্র চাষার মতো-প্রতিপার্শ্বব্যেপে একতিলও
অচাষা রাখিনি মাটি তার
[এবং দু'চোখে আঁকা ছিলো প্রতিবিম্ব দরোজার]
এ-পারে প্রতীক্ষারত অথচ হে গম্ভীর দরোজা
তুমি শব্দহীন আর দূর্গ প্রাচীরের মতো সোজা
ক্যানো রোধ করে আছো পথের সীমানা
গ্রাস করো, আমাকে গ্রহণ করো, ও-পাশের যে কোনো অজানা
আর সম্পূর্ণ নতুন পথে যেতে দাও, হায়
পরিত্যক্ত রেখে দিলে ক্যানো এইপাশে কুয়াশায়
আমি কি অস্পৃশ্য খুব-হীনগোত্র ইতর সমান
অথবা জঘন্য অপরাধী-মূর্তিমান
হে দরোজা কী কারণে স্পর্শ তুমি করো না আমায়
এইভাবে ফেলে রাখো শুধু কী অসহ্য প্রতীক্ষায়
হে দরোজা পথ ছাড়ো, বিষণ্ন কপাট খুলে তফাতে দাঁড়াও
সামান্যই আর পথ আছে- যেতে দাও, যেতে দাও
তবে কি সূচনাতেই ছিলো কোনো ক্ষমাহীন ভুল
যাত্রার শুরুতেই ছিঁড়ে গ্যাছে গন্তব্যের মূল
হে দরোজা তোমার গহিনে আরো যাবো- তুমি খুলে যাও
আর যদিবা অনড়ই থাকো তবে অন্তত বলে দাও :
কী কারণে-পথের প্রান্তে এসে এরকম থেমে যেতে হয়
আর, কোন অপরাধে বলো মূল্যহীন হয়ে যায় সমূহ প্রণয়
তা-হলে প্রারম্ভ থেকে পুনরায়
শুরু করা যেতে পারে পথক্রমা গভীর নিষ্ঠায়
আকাশে নিশ্চল মেঘ, আবিষ্ট চাঁদের কুহেলিকা
নিথর দু'চোখ তুলে চেয়ে দ্যাখো-কী গভীর বেদনার টীকা
দগ্ধ আমার হৃদয়ে
আমাকে যেতেই হবে অন্য প্রান্তে হে দরোজা তোমার অন্তর্ভেদী হয়ে
সুতরাং হে গম্ভীর কঠোর দরোজা
বলে দাও-কী কারণে পেতে হয় এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার সাজা
আমি কি অস্পৃশ্য খুব কিংবা ক্ষমাহীন পাপী- বিনষ্ট জীবন
হে দরোজা- বলে দাও, কোন পাপে ব্যর্থ হয় এইভাবে- সমগ্র ভ্রমণ
যে গ্যাছে, সে অন্য কেউ
যে গ্যাছে, সে অন্য কেউ, আমি নই।
এতো তাড়াতাড়ি আমি যাবো না এখান থেকে :
এতো তাড়াতাড়ি ক্লান্ত এই অবেলায়;
যে গ্যাছে, সে অন্য কেউ, আমি নই।
কোকিলের ঘুম ভাঙবার অনেক আগেই, অসমাপ্ত
যে বসন্ত চলে গ্যাছে দৃষ্টির আড়ালে,
অন্য কোনো সীমিত বাতাসে
সে আমাকে কানে কানে বলে গ্যাছে, প্রতীক্ষায় থেকো :
... আবার শুকোবে জল, হলুদ পাতার শব্দে
সচকিত হবে বনভূমি গির্জার চুড়োয় গাঁথা
ভগ্ন ক্রুশে সাদা চাদরের মতো
জ'মে যাবে মলিন তুষার, একজন
অবসন্ন পাদ্রী খুব কোমল আলোয় ঢাকা
চুড়ো থেকে পাঁচবার বাজাবেন তীব্র ঘণ্টাধ্বনি;
ভোর ঘুমে-তোমার চোখের কোণে অকস্মাৎ
জ্বলে উঠবে সঞ্চিত বারুদ।
কোনো একদিন ফের বসন্তের চিঠি নিয়ে তোমার অচেনা
এক সম্পূর্ণ নতুন গান গেয়ে উঠবে- তোমার বুকের মধ্যে
নিদ্রামগ্ন বিমূর্ত কোকিল;
শুধুমাত্র পৃথিবীর শেষতম ভোরতক প্রতীক্ষায় থেকো...
আমি তো এখনো আছি সেই বসন্তের জন্যে অনন্ত উন্মুখ প্রতীক্ষায়
আমি কি অপর কোনো ফাল্গুনের কোলাহলে মগ্ন হতে পারি?
অন্য কোনো কোকিলের গানে আমি হবো না মাতাল।
অসমাপ্ত সেই বসন্তের দু্যতি চোখে নিয়ে, তারপরে যাবো আমি,
এখন তো নয়।
সমুদ্র দেখিনি আজো; শুধুমাত্র সমুদ্র শঙ্খের
খুব ডোরাকাটা যোনিতে ঠেকিয়ে কান
তীব্র এক টাইফুন বয়ে গ্যাছে সমস্ত শরীরে।
এক অসফল নাবিকের দৃঢ় হাতে হাত রেখে কথা দিয়েছিলাম :
আমিও আঁধার রাতে সামুদ্রিক ফ্যানা নিয়ে প্রবাল দ্বীপের
খুব গোপন রত্নের ঘরে হানা দেবো, একটানে ছিঁড়ে দেবো
মাস্তুলের-সমস্ত জালের মতো কীর্ণ দড়াদড়ি।
বৃদ্ধ নাবিক আজো উপকূলে বসে আছে-
তীব্র দৃষ্টি, একা, হাতে ভাঙ্গা হাল।
সূতরাং-সমুদ্র-শঙ্খের পেটে না ঢুকেই পালাবো না আমি...
এতো তাড়াতাড়ি আমি যাবো না এখান থেকে,
এই অবেলায়; অন্য কেউ চোলে গ্যাছে,
আমি নই; যে গ্যাছে, সে অন্য কেউ।
পূর্বপুরুষের খুব মাটি-মেশা জৈবসারে ভীষণ উর্বর
যে সমতল জমি
সেখানে গহন এক তাজা বীজ পুঁতেছি গোপনে, নির্ঘুম রাতের শেষে
ঢেলেছি অঝোর বৃষ্টি, সোঁদা ঘাম, গাঢ় রৌদ্রকণা...
প্রকৃত স্বপ্নের মধ্যে
সে আমাকে বোলেছিলো, সোনালি ফসল দেবে, আমাদের
আঁধার বাড়িতে ফের জ্বলে উঠবে
শস্য গন্ধী নবান্নের আগুন।
সবেমাত্র নিদ্রিত বীজের পেটে কান রেখে- অঙ্কুরোদ্গমের
খুব অভ্রান্ত মিহিন শব্দ শুনেছি কেবল।
তার খুব বেড়ে-ওঠা ফসলী শরীর আর
সূবর্ণ শস্যের শিস্ না দেখেই চলে যাবো আমি?
এই হিম জড় হাত-নবান্ন্ আগুনে সেঁকে, তারপরে
যেতে পারি, যাবো :
আঁধার কাটার আগেই- যে গ্যাছে, সে অন্য কেউ, আমি নই।
আগুনে পোড়ার ভয়ে-যে গ্যাছে, সে অন্য কেউ, আমি নই
----------------------------------------------------------------------
দৈনিক সংবাদ সাময়িকী । ১৮ জুন ২০০৯ বৃহস্পতিবার
আলোচিত ব্লগ
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই
আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।
তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।