আক্রান্ত মননে শোক স্মৃতিছায়া
ফকির ইলিয়াস
===================================
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারের পুলিশ বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয়েছেন দেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ, সংগঠক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে পেট্রোবাংলা ঘেরাও করতে যাচ্ছিলেন তারা। এর মাঝে পুলিশ বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে। পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সবার প্রতি লাঠিচার্জের সেসব দৃশ্য টিভিতে দেখেছি। মনে হয়েছে, দেশ ও জাতি এখনও চরম বর্বরতম যুগ পার করছে! কারণে বিনা কারণে, বিনা উস্কানিতে কোন সরকারি বাহিনী নিরীহ মিছিলকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে না।
বেশকিছু কর্মীসহ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আক্রান্ত হওয়ার পর সরকারিদলের কিছু নেতা প্রথমদিকে খুব দায়িত্বহীন বক্তব্য দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের একজন মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছিলেন, 'তারা পুলিশের পারমিশন নিয়েছেন কিনা সন্দেহ আছে।'
জাতীয় সম্পদ রক্ষা কমিটি পুলিশের পারমিশন নিয়েই ঘেরাও-এর ডাক দিয়েছিল। এটা ম. খা. আলমগীরেরও জানা কিংবা বোঝার কথা। তারপরও তিনি এমন অসংলগ্ন বক্তব্য দিলেন কেন? এটা কি সরকারি নেতাদের অহঙ্কারী মনোভাবের প্রকাশ?
এই বর্বর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রীরা আনু মুহাম্মদকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছেন। খোঁজ-খবর নিয়েছেন। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। জাতীয় সম্পদ বিষয়ে সরকার কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা জনগণের জানার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। এবং তা জনগণকে জানিয়েই করতে হবে। এর কোন ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না, উচিতও নয়। জাতীয় কমিটি ইতিমধ্যে আরও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সেই কর্মসূচি অনুযায়ী সভা-সমাবেশের ডাক দেয়া হয়েছে। তাদের সব কর্মসূচি নিয়মতান্ত্রিকভাবে পালন করতে দেয়া উচিত বলে মনে করি। সেসঙ্গে অতি উৎসাহী এই পুলিশ সদস্যরা কারা তা খুঁজে বের করে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমরা দেখেছি এই ঘটনার পরপরই আনু মুহাম্মদকে দেখতে বেগম খালেদা জিয়া দ্রুত হাসপাতালে ছুটে গেছেন। চারদলীয় জোট এই জাতীয় কমিটিকে তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবেই। জাতীয় সম্পদ রক্ষা কমিটি কোনভাবেই যেন বিএনপি-জামায়াত জোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না হয়, তা খেয়াল রাখা খুবই জরুরি। আশার কথা এই, কমিটিকে সর্বাত্মক সহায়তা দিতে দেশের কৃতী প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা এগিয়ে এসেছেন। সরকারকে জাতীয় বিবেকসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দুই
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে দেশে-বিদেশে যখন শোকাহত প্রতিবাদ চলছে, ঠিক সেই সময়েই ঘটে গেল আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনায় চিরবিদায় নিলেন দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিক, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। একজন প্রবীণ রাজনীতিকের এই মর্মান্তিক মৃত্যু ছিল খুবই অপ্রত্যাশিত ঘটনা। রাজনীতিতে তার পক্ষ-বিপক্ষ ছিল। কিন্তু সর্বজনীনভাবে তিনি ছিলেন খুবই উদার চিত্তের মানুষ। তার এই উদারতাকে কাজে লাগিয়ে তার চারপাশে বেড়ে উঠেছিল এক ধরনের তোষামোদ বাহিনী। এক ধরনের চাটুকার। যারা তার সুনাম ডুবিয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
ব্যক্তিগতভাবে বারবারই আমি তার সাহচর্যে যাবার সুযোগ পেয়েছি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সফরে এলে প্রবাসীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে তার সঙ্গে বৈঠক করা, কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। মনে পড়ছে, যুক্তরাষ্ট্রে সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা করার দাবি ছিল প্রবাসীদের দীর্ঘ দিনের। পরে রাষ্ট্রীয়, টেকনিক্যাল জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। এরপরে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের অন্যতম প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রে সোনালী ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি 'সোনালী এক্সচেঞ্জ কোম্পানি' স্থাপিত হয়। যার মাধ্যমে প্রবাসী যুক্তরাষ্ট্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রে সোনালী এক্সচেঞ্জের বেশ কটি শাখা প্রসারিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট আসার ব্যাপারেও এম. সাইফুর রহমানের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। প্রবাস বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন, প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানকল্পে তিনি সব সময় আন্তরিকতা দেখিয়েছেন।
বারো বার জাতীয় বাজেট পেশ করার সুযোগ পয়েছেন সাবেক এই অর্থমন্ত্রী। দেশের অর্থনৈতিক সচলতা ধরে রাখতে তিনি সবসময় সমসাময়িক বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রাখতেন। এটা ছিল তার বিচক্ষণতা।
তিনি নিজে সবসময় বলতেন তার শরীরে কোন দুর্নীতির দুর্গন্ধ নেই। কিন্তু এটা খুব ঘনিষ্ঠভাবে প্রতীয়মান হয়ে পড়েছিল, তাকে মুখ্য শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে তার নিজ পরিবারের কিছু সদস্যসহ কিছু ঘনিষ্ঠভাজন চরম দুর্নীতিবাজে পরিণত হয়েছিল। এদের চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা অতিষ্ঠ করে তুলেছিল জনজীবন। এই চক্রের হাত থেকে বারকি শ্রমিক থেকে শুরু করে পত্রিকার সম্পাদক পর্যন্ত রেহাই পাননি।
নিউইয়র্ক সফরে এলে এসব বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করতে চেয়েছি। কিন্তু তিনি হয়তো এড়িয়ে গেছেন, না হয় নির্লিপ্ত থেকেছেন। বিশেষ করে সিলেটে ও মৌলভীবাজারে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল, এর কর্ণধার কারা, তা ওই অঞ্চলবাসীর অজানা নয়। সাইফুর রহমান কঠোর হস্তে এদেরকে দমন করতে পারতেন। কিন্তু করেননি। তিনি নীতি বিসর্জন দিয়ে স্নেহের কাছে পরাজিত হয়েছেন। আর তার ব্যর্থতা এখানেই, আটকা পড়েছেন শেষ জীবনে। ফলে চরম জনপ্রিয় এই নেতার ভূমিধস পরাজয় ঘটেছে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।
আজ তিনি নেই। তার নাম যত্রতত্র ব্যবহার করে যারা ফায়দা লুটেছে তারা বেঁচে আছে। জাতীয় উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে তার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট থেকে কৃতী অর্থমন্ত্রী হওয়ার উদাহরণ তো অনুসরণযোগ্য বটেই। তার বিদেহী আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক।
নিউইয়র্ক , ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৯
-------------------------------------------------------------------
দৈনিক সংবাদ। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৯ শুক্রবার প্রকাশিত
ছবি - ম্যারি এ্যান
আলোচিত ব্লগ
পাখি মন

রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন
শৃঙ্খল মুক্তি আমার
শৃঙ্খল মুক্তি আমার

ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন
=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন
রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।