আমার সালাম জানিবেন। হয়তো আপনিও শুনিয়াছেন, বর্তমান সরকার
কৃষককে পরিচয়পত্র দিবার সিদ্ধান্ত নিয়াছে। আমি খবরটি কাগজে পড়িয়াছি। প্রিয় পিতা , তাই আপনাকে এই চিঠি লিখিতে বসিলাম।
আপনার হয়তো মনে আছে , দাদাজান মৃত্যুর সময় একজোড়া লাঙল-জোয়াল , আর দুইটা হালের গরু ছাড়া আর কিছুই রাখিয়া যান নাই। সেই কৃষিস্বপ্ন বুকে নিয়া আপনি আমরা সাত ভাইবোনকে পরার জমি চাষ করিয়াই মানুষ করিয়া তুলিয়াছিলেন। আপনার সৎ কর্মপরিধিই আমাদেরকে এই সমাজে দাঁড়াইবার সাহস যোগাইয়াছে।
প্রিয় পিতা ,
এই দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে আপনার বড়ছেলে যখন ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিল , তখনও তার বুকে ছিল সেই কৃষকপুত্রের সাহস। তার কাঁধের লাঙল , স্টেনগানে পরিণত হইয়াছিল। আর তা হইয়াছিল , এই মাটিকে ভালোবাসার ফসল হিসাবে।
আপনার সেই ছেলে আর ফিরিয়া আসে নাই। এই দেশের জন্য দিয়েছিল
জীবনের শেষ রক্তবিন্দু।
আপনি যখন পুত্রশোকে মূহ্যমান , তখন কোনো রাজনীতিক আপনাকে
দেখিতে আসে নাই । জানতে চায় নাই আপনি কেমন আছেন।
প্রিয় পিতা ,
সারের জন্য আপনার মেঝোছেলে কালিয়াকৈরে পুলিশের গুলিতে নিহত
হইয়াছিল। বীজের জন্য চুয়াডাঙায় লাইনে দাঁড়াইয়া আপনি, পুলিশের
লাঠির গুতো খাইয়া বাড়ি ফিরিয়া অজ্ঞান হইয়া পড়িয়াছিলেন। আপনার
এই অবস্থা দেখিয়া হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হইয়া মারা গিয়াছিলেন
আম্মাজান। সেইসব কথা আমরা ভুলিয়া যাই নাই।
এর চাইতে শোকের আবহ একটি কৃষক পরিবারের জন্য আর কী
হইতে পারে ?
প্রিয় পিতা ,
তিরিশ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশে কৃষকের কোনো পরিচয়পত্র
লাগানোর কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।
যে মাটি শ্যামল লালিমায় তার সন্তানদেরকে লালন করে , সেই মাটিতে
পরিচয়পত্র বুকে ঝুলাইয়া হাঁটার কোনো আবশ্যকতা আছে কী ?
প্রিয় পিতা ,
আমরা রাজনীতির পরিচয়বানিজ্য অনেক দেখিয়াছি।আর দেখিতে চাইনা। যে কৃষক জীবন ভর্তুকি নির্ভর , তা স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো
কৃষকই চান নি। কিন্তু হায় ! গেল ৩৮ বছর ধরিয়া আমরা সেই ভাগ্যবরণ
করিয়াই চলিয়াছি। এই পরিহাসের শেষ কোথায় ?
প্রিয় পিতা ,
আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে বিজ্ঞান নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা চাহিয়াছিলাম।
দেশের অন্যান্য অনুৎপাদন খাতে বড় অংকের বাজেট বরাদ্দ হইলেও
কৃষির উন্নয়নের কথা আসিলেই দেখা দেয় সকল কৃপণতা ! কেন এই
বৈষম্য ? কেন এই হটকারিতা ? এর জবাব কে দিবে ?
প্রিয় পিতা,
আপনাকে বিনীত অনুরোধ করি , আপনি কোনো সরকারী পরিচয়পত্র
গ্রহণ করিবেন না। কৃষক হিসাবে বাঁচিতেও পরিচয়পত্র লাগিবে- এর
জন্য আপনি মুক্তিসংগ্রামে পুত্র হারান নাই।
মনে রাখিবেন, এই দেশে কৃষক সমাজই এখনও অত্যধিক সম্মানিত।
কোনো লুটেরা রাজনীতিক সমাজ নয়। তাই সেই শ্রেণীর হাত হইতে
পরিচয়পত্র লইয়া কৃষককে ধন্য হইতে হইবে বলিয়া মনে করার কোনো
কারণ নাই ।এর মাধ্যমে দলীয় লেবাস লাগাইবার যদি কোনো গোপন
অভিলাষ থাকিয়া থাকে তবে তাহা হইবে আরো লজ্জা ও দুর্ভাগ্যজনক।
প্রিয় পিতা ,
আপনার সাহস এখনও এই দেশে ঝড় -বান কে ও আটকাইয়া দেয়।
প্রজন্ম আপনাকে তাদের প্রতীক হিসাবেই আজীবন মনে রাখবে।
আপনি ভালো থাকুন , পিতা । আপনি সুস্থ ও নিরাপদ থাকুন।
ইতি
আপনার কৃষকপুত্র
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ সকাল ৯:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



