ফকির ইলিয়াস
=======================================
বর্তমান সময়ে তালেবান এবং আল-কায়েদার চারণভূমি বলে পরিচিত ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রটি চায় না বাংলাদেশে স্থিতিশীল অবস্থা চালু থাকুক। এর অন্যতম একটি কারণ আছে। আর কারণটি হচ্ছে তাদের এই মানসিকতা যে, ‘আমাদের শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে তোমরা কি সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে?’
এই হীন মানসিকতা সিংহভাগ পাকিস্তানিদের মাঝে। কথাটির অনুরণন আমরা এখনো শুনতে পাই। সম্প্রতি একটি আড্ডায় পাকিস্তানি-আমেরিকান একজন শিক্ষকের কথা শুনে আমার স্পষ্টই মনে হয়, ওরা এখনো বাংলাদেশের সুখ দেখতে নারাজ। এই শিক্ষকের নাম শওকত আফসার। তিনি নিউইয়র্কে একটি কলেজে সমাজবিজ্ঞান পড়ান। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রসঙ্গ আসলে শেখ মুজিবকে দোষারোপ সিংহভাগ পাকিস্তানিরাই করে। সঙ্গে তারা যোগ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নামও। মুজিব-ভুট্টো এই দুজনে ক্ষমতা ভোগ করার জন্যই ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রটিকে ভাগ করেছিলেন- এমন একটি উষ্মা প্রকাশ করেই পাকিস্তানিরা আলোচনা শুরু করে।
সত্তরের নির্বাচনের আগে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অবস্থাটি কেমন ছিল? কেমন ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের গতি-প্রকৃতি, রাজনীতির ভবিষ্যৎ? এই প্রশ্নটির উত্তর অনেকেই জানেন। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের উত্তরসূরি জে. ইয়াহিয়া খান সামরিক যাঁতাকলই চালু রেখেছিলেন অখণ্ড পাকিস্তানে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোনো ইচ্ছেই এসব জান্তাদের ছিল না। ছিল না এ জন্য, কারণ ‘ফ্রি এন্ড ফেয়ার ইলেকশন’- হলেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের ভোটের কাছে পাকিস্তানিরা হেরে যাবে, তা নতুন কোনো বিষয় ছিল না। তাই সামরিক নিষ্পেষণের মাধ্যমে বাঙালিকে দমিয়ে রাখা হোক- সেটিই ছিল পাকিস্তানিদের সহজ পথ।
জাতিগতভাবে পাকিস্তানিদের স্বরূপ-চরিত্র কেমন, তা একটু লক্ষ্য করলেই যে কোনো বাঙালি সহজভাবে বুঝতে পারবেন। তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্যের সহানুভূতি নিতে চাইলেও পবিত্রতম ধর্ম পালনে নিজেরা সব সময়ই উদাসীন। সেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যিনি ‘জিন্নাহ টুপি’ মাথায় রেখে রাজনীতি করতেন, তার ব্যক্তিগত জীবনাচার ছিল উদভ্রান্ত কোনো পাশ্চাত্য নাগরিকের মতোই। বিভিন্ন ইতিহাসবেত্তারা বারবারই এ প্রসঙ্গে বলেছেন।
সেই পাকিস্তান রাষ্ট্রটি এখনো মনেপ্রাণে বাংলাদেশের কল্যাণ চায় না। তারা যে কোনোভাবেই বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, স্থিতিশীলতা থামিয়ে দিতে মাঠে আছে। এর মাধ্যমে তারা একাত্তরে পরাজয়ের সামাজিক শোধ যেমনভাবে নিতে চায়, তেমনি বিনষ্ট করতে চায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্প্রীতি। এর জন্য যা যা করা দরকার, তার সবকিছুই করে যাচ্ছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করি। সিলেট প্রেসক্লাবে ‘মিডিয়া সেন্টার’ স্থাপনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের ঢাকাস্থ দূতাবাস কম্পিউটার দিতে চেয়েছিল। সিলেট প্রেসক্লাবে গিয়ে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তা উদ্বোধন করার কথা ছিল ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাস কর্মকর্তার। কিন্তু সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সদস্যরা এর প্রতিবাদ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সাংবাদিকরা সোচ্চার হয়ে ঐক্য গড়ে তোলেন। ফলে পাকিস্তানি দূতাবাস সেই কম্পিউটার স্থাপনের কাজটি করতে পারেনি। এই খবরটি বিশ্বের সব বিবেকবান বাঙালি সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে। পাকি দূতাবাস প্রেসক্লাবে এমন মিশন চালাতে চাইছে কেন? তারা নেপথ্যে কী ষড়যন্ত্র আঁটছে?
সিলেট প্রেসক্লাবের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রেসক্লাবের কর্মকর্তারা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছেন। যারা এখনো পাকিস্তানি তমদ্দুন লালন করেন, তারা এক পক্ষে। অন্যদিকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সাংবাদিকরা এক পক্ষে। ইতিমধ্যে নতুন কমিটিও ঘোষিত হয়েছে। এই ঘটনা আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি চরেরা এখনো বাংলাদেশে তৎপর। এরা তাদের পাকি প্রভুদের মনোরঞ্জনের জন্য একাত্তরে যেমনটি করেছিল, সুযোগ পেলে এখনো তেমনটি করবে। সুযোগ পেলেই তারা অবমাননা করবে লাখ শহীদের রক্তের।
দুই.
ফিরে আসি সেই পাকিস্তানি শিক্ষক শওকত আফসারের সঙ্গে আড্ডা প্রসঙ্গে। তিনি বললেন, ইসলামি মূল্যবোধ ধারণ করে অখণ্ড পাকিস্তান বহাল থাকলে আজ সে রাষ্ট্র ইউরোপের মতো সমৃদ্ধ হতে পারতো! আমি বললাম, তাহলে আপনারা একাত্তরে বাঙালিদের ওপর নেতৃত্বটা ছেড়ে দিলেই পারতেন! তিনি এর মৃদু প্রতিবাদ করলেন। বললেন, পাকিস্তানিরা অন্য যে কোনো জাতির চেয়ে কর্মঠ জাতি। তারাই পারতো অখণ্ড পাকিস্তানের নেতৃত্ব দিতে। আমি বললাম তাহলে তো আর গণতন্ত্র মানার পক্ষে আপনি সায় দিচ্ছেন না। তিনি বললেন, গণতন্ত্র তো ‘গরিব লোক’দের জন্য নয়। তাই আমাদের উচিত ছিল যোগ্যতার ভিত্তিতেই পাকিস্তানের নেতৃত্ব নির্ধারণ করা। আমি কিছুটা রাগতস্বরেই বললাম এটা তো গাদ্দারি ভাষা। উপস্থিত অন্যরা যোগ দিলেন আলোচনাটা থামিয়ে দিতে। আমিও কোনো গাদ্দার মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বাড়াতে রাজি হলাম না।
ওদের এমন মানসিকতা নতুন নয়, এরা সব সময়ই কর্তৃত্ব নিজের হাতে রেখে ‘হাম ভি মুসলিম, তুম ভি মুসলিম’ এমন বুলি অনেক আওড়িয়েছে। এখনো আওড়াতে চায়। কিন্তু আদতে তারা বাংলাদেশের কোনো কল্যাণই চায় না মনেপ্রাণে। ভুলে গেলে চলবে না পাকিস্তান ও তার অনুসারী ধর্মের ধ্বজাধারীরা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর। পাকিস্তানে বর্তমানে যে তালেবানি আগ্রাসন চলছে, তারা তা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে চায়। এর জন্য তারা পাকিস্তানি তো বটেই এমনকি ভারতীয় মুসলিম জঙ্গি গ্রুপকে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গেলো কিছু দিন আগে পাকিস্তানি জঙ্গি গ্রুপের কিছু তরুণ বাংলাদেশে ধরা পড়েছে। শুধু তাই নয়, ঢাকার পাকিস্তানি দূতাবাস বাংলাদেশের ডানপন্থী মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সখ্য বজায় রেখেই চলেছে। এনজিওর নামেও তারা সাহায্যের প্রজেক্ট হাতে নিয়ে বিস্তৃত রেখেছে নানা কর্মকাণ্ড। যা সরকারের ঘনিষ্ঠভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।
এটা বর্তমান বাংলাদেশের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের কথা যে, এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী এখনো মানসে পাকিস্তানি তমদ্দুন লালন করেন। এখনো তারা বলে বেড়ান ভারতই বাংলাদেশের প্রধান শত্রু। প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্র কেন শত্রু হবে? এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়েই তারা ‘ভারত নিয়ে নিলো’ এমন জুজুর ভয় দেখাতে সব সময়ই তৎপর। অথচ এই ভারত মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছিল, বিষয়টি এসব বুদ্ধির ঢেঁকিরা বেমালুম চেপে যান। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, খাবার, কৃষ্টি, সভ্যতা, সামাজিকতার দিক দিয়েও ভারত রাষ্ট্র সত্তাই, বাংলাদেশ রাষ্ট্রসত্তার অনেক কাছাকাছি। বিষয়টি তারা তো চেপে যানই, বরং তাদের ক্ষোভ এতোই বেশি যে আর কিছুদিন পর তারা যদি বাঙালি নারীদের শাড়ি আর পুরুষের পাঞ্জাবি-পাজামা পরার ওপরও ফরমান জারি করেন তবুও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে কটাক্ষ করেছেন সেই সব খিস্তিখেউড় মার্কা বুদ্ধিজীবীরা। কারণ সেটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন। এরা পয়লা বৈশাখ পালনকেও হিন্দু সংস্কৃতির অংশ বলে ফতোয়া দিয়েছে। অথচ তাদের পেয়ারা তালেবানি রাষ্ট্র পাকিস্তানের বশ্যতা স্বীকারে এখনো কুণ্ঠাবোধ করে না। এসব বিষয়গুলো বর্তমান প্রজন্মকে খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। একাত্তরে যারা বাঙালি নারীকে ‘গনিমতের মাল’ বলে আখ্যায়িত করেছিল সেইসব হায়েনারা এখনো বাংলাদেশে তৎপর। একাত্তরের ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রাক্কালে তারা গর্ত থেকে বেরিয়ে কচ্ছপের মতো উঁকি দিচ্ছে। তারা নানাভাবে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের পাঁয়তারা করছে। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট, শোনা যাচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে নাক গলিয়ে পাকিস্তান বিশ্বের বিভিন্ন মহলে ধরনা দিচ্ছে যাতে এই বিচার প্রক্রিয়া ঠেকানো যায়। এই বিষয়গুলো বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণের নজরে রাখা উচিত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার মানেই, মহান মুক্তি সংগ্রামে গণহত্যার বিপক্ষে নৈতিক বিজয়। এই বিজয় বাঙালি জাতিকে অর্জন করতেই হবে। #
--------------------------------------------------------------------
দৈনিক ভোরের কাগজ / ঢাকা/ ১১ জানুয়ারি ২০১০ সোমবার
প্রকাশিত
ছবি- গেইল ভ্যানএন্টর্যাপ
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৬:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


