somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ফকির ইলিয়াস
আলোর আয়না এই ব্লগের সকল মৌলিক লেখার স্বত্ত্ব লেখকের।এখান থেকে কোনো লেখা লেখকের অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা, অনুলিপি করা গ্রহনযোগ্য নয়।লেখা অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা করতে চাইলে লেখকের সম্মতি নিতে হবে। লেখকের ইমেল - [email protected]

শ্রদ্ধার্ঘ : কে জি মুস্তাফা / তাঁকে নিয়ে তিনটি লেখা

১৪ ই মার্চ, ২০১০ ভোর ৫:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর সম্পাদিত দৈনিক মুক্তকন্ঠ তে নিয়মিত লিখতাম আমি। ফোনে কথা বললেই বলতেন,
আরে পরিযায়ী পাখি যে ! দেশে ফিরছেন কবে ?
আমি বলতাম , ফিরবো কে জি ভাই ! ফেরার জন্যইতো বিদেশে
এসেছি ।
ফেরা কি হবে আমার ? জানি না। আজ কে জি ভাই চলে গেলেন । যেখান থেকে কেউ কোনোদিনই ফিরে না। তাঁকে নিয়ে তিনজন বিশিষ্ট
জনের তিনটি লেখা এখানে তুলে রাখলাম ।

কে জি মুস্তাফার প্রয়াণ
কিংবদন্তীতুল্য নেতা
কামাল লোহানী

-----------------------
সাংবাদিকতা জগতের এক কিংবদন্তিতুল্য নেতার মৃত্যু হলো। তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন দক্ষ সাংবাদিক যেমন হারালাম, তেমনি হারালাম একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিককে। কে জি মুস্তাফার সাংবাদিক সত্তার বাইরেও যে রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা ছিল, সেটি ছিল প্রগতিশীল ও আদর্শভিত্তিক। তাই তাঁর জীবনে আন্দোলন-সংগ্রামে জেল-জুলুম ও নির্যাতন-নিপীড়নও সহ্য করতে হয়েছে। তিনি ভাষাসৈনিক ছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়েছিল এ বঙ্গের ছাত্রসমাজের কাছ থেকে, তখন কে জি মুস্তাফা ছিলেন পূর্ববঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য। এ ভাষা আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের পর যখন অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার স্ফুরণ ঘটল ওই তরুণ ছাত্রসমাজের মধ্যে, তখন জন্ম নিয়েছিল একটি নতুন ছাত্র সংগঠন, যার নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। এ সময় পূর্ববঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে ছাত্র ফ্রন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করার দায়িত্ব যাঁদের হাতে ছিল, তিনি ছিলেন তাঁদের একজন। সে কারণে ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে এ দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কে জি মুস্তাফার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। তিনি সত্য ভাষণে অকপট ছিলেন এবং যেকোনো সংকটে চটজলদি সিদ্ধান্ত নিতে পারঙ্গম ছিলেন। অসাধারণ ছিল তাঁর সাহস।
আমার স্মৃতিতে যত দূর মনে পড়ে, আমি তাঁকে প্রথম দেখেছিলাম ১৯৫৩ সালে ঢাকায় পুঁথিপত্র প্রকাশনীর ঘরে। এটি শুধু দোকান ছিল তা-ই নয়, রাজনীতি ও সংগ্রামের প্রয়োজনে পুঁথিপত্র একটি প্রকাশনী সংস্থায়ও পরিণত হয়েছিল। এর স্বত্বাধিকারী ছিলেন ছাত্রনেতা মোহাম্মদ সুলতান এবং এম আর আখতার মুকুল। এ প্রতিষ্ঠানটিই ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সম্মেলনের সময় ছিল যোগাযোগের কেন্দ্র। এখানেই প্রথম তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি তখন কমিউনিস্ট পার্টির তরফ থেকে নতুন ছাত্র সংগঠনটির সংযোগ রক্ষা করছিলেন।
এরপর কে জি ভাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয় সাংবাদিকতা করতে গিয়ে। ১৯৫৫ সালে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আমি তখন দৈনিক মিল্লাত নামে একটি পত্রিকায় সবে প্রবেশ করেছি। তিনি তখন দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক ছিলেন। পরে কে জি ভাই দৈনিক সংবাদ ছেড়ে দৈনিক ইত্তেফাকে চলে যান। কিন্তু কিছুদিন পরই বাংলা সংবাদপত্র ছেড়ে তিনি ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভারে যোগ দেন। দীর্ঘকাল তিনি সাংবাদিক হিসেবে এ পত্রিকায় কাটিয়েছিলেন। এখানে একটি কথা বলে রাখি, কে জি ভাইয়ের সাংবাদিকতার জীবন শুরু আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেহাদে। পরে তিনি বেশ কিছুদিন দৈনিক আজাদে কাজ করেছেন। নিপুণ সাংবাদিকের দক্ষতা ছাড়াও কে জি মুস্তাফা সাংবাদিক ইউনিয়নের একজন প্রতিষ্ঠাতা এবং জাঁদরেল সংগঠক ছিলেন। তিনি কেবল দুই বঙ্গেই নয়, সারা পাকিস্তানেই সাংবাদিক সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল ও পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাংবাদিকদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল অবিসংবাদিত।
মুক্তিযুদ্ধ-উত্তরকালে কে জি মুস্তাফা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে কূটনৈতিক পেশায় যোগ দেন। প্রথমে লেবানন ও পরে ইরাকে সফলতার সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। শুনেছি, তাঁর প্রতিভাদীপ্ত কূটনৈতিক জীবনের প্রশংসা যখন লেবাননের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধুর কাছে করেছিলেন, তখন উত্তরে বঙ্গবন্ধুও গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন, আমি তো তোমার দেশে আমার এক বন্ধুকেই পাঠিয়েছি।
কিন্তু পঁচাত্তরের নির্মম হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু যখন সপরিবারে নিহত হলেন, তারপর ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমানের আমলে তাঁকে কূটনৈতিক পদ থেকে প্রত্যাহার করে দেশে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হয়ে তিনি ইরাকের রাজধানী বাগদাদেই থেকে গিয়েছিলেন এবং ইরাক থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত ইংরেজি সাময়িকী বাগদাদ টুডের সম্পাদনার দায়িত্বও গ্রহণ করেছিলেন। আর সেখানেই সপরিবারে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন যাপন করতে হয়েছিল।
দেশের সুস্থ অবস্থা ফিরে আসার পর কে জি মুস্তাফাও দেশে ফিরে এলেন। অনেক দিন বসে থাকার পর তিনি আবার সাংবাদিকতায় যোগ দিয়েছিলেন এবং চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বকোণ তাঁর হাত দিয়েই বেরিয়েছিল।
এ ছাড়া ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক মুক্তকণ্ঠের সম্পাদকও ছিলেন। পরে তিনি ইংরেজি ও বাংলায় কলামও লিখতে শুরু করেছিলেন। অসুস্থ হওয়ার বেশ কিছুদিন আগ পর্যন্ত তিনি নিয়মিত দৈনিক জনকণ্ঠে তাঁর লেখা চালিয়ে গিয়েছেন। বছরাধিককাল হলো তিনি আর লিখতে পারছিলেন না।
কে জি মুস্তাফার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে আমার একটি যোগাযোগ ছিল। সাংবাদিক ইউনিয়ন করতে গিয়ে বহুবার আমরা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন কাউন্সিল অধিবেশনে মিলিত হয়েছি। তাতে ইউনিয়ন সম্মেলন পরিচালনায় তাঁর দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় পেয়েছি। পরবর্তীকালে আমি যখন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলাম, তখন আমরা যেকোনো সংকটে পড়লে তাঁর কাছ থেকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ পেয়েছি। পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সেক্রেটারি জেনারেল কিংবা প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পরামর্শ দিতেন। আমার মনে আছে, আইয়ুব খানের আমলে যখন আমরা সামরিক শাসকের জারি করা সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধকারী কালা-কানুনের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, তখন তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আমাদের যেমন সাহস দিয়েছে, তেমনি আন্দোলনকে সফল করতে সহায়তা করেছে। আইয়ুবের জারি করা এ প্রেস অর্ডিন্যান্সের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম ছিল সর্বাত্দক। সে সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সব খবরের কাগজ ১৭ দিন পর্যন্ত বন্ধ ছিল, ওই ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্বের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন কে জি মুস্তাফা। এ আন্দোলনে সাংবাদিকদের পাশে গণমাধ্যমের অন্যান্য শাখার কর্মীরাও এসে জমায়েত হয়েছিলেন যেমন, তেমনি সারা পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ এ আন্দোলনে আমাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। যা সম্ভব হয়েছিল কে জি মুস্তাফা, আসরার আহমদ, মিনহাজ বার্না, আবদুল্লাহ মালিক, আই এ রহমান প্রমুখের নেতৃত্বে।
কে জি মুস্তাফা ছিলেন আদর্শিক রাজনীতির একজন সংগ্রামী পুরুষ। সাংবাদিক হিসেবে একজন দক্ষ কারিগর। ইউনিয়ন নেতা হিসেবে একজন বলিষ্ঠ সাহসী ব্যক্তিত্ব। আবার সাংবাদিকরা যেকোনো ক্ষেত্রে গিয়ে যে সফলতা অর্জন করতে পারেন, তা তিনি কূটনীতিক হিসেবে সফল হয়ে প্রমাণ করেছেন। তিনি আমাদের মধ্যে অমর হয়ে থাকবেন।
---------------------------------------------------------------------

সাহস ও আদর্শের প্রতিকৃতি
হারুন হাবীব

কে জি মুস্তাফার মৃত্যুসংবাদটি খুব একটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। কারণ কে জি ভাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পেঁৗছেছিলেন। তাঁর বয়স বিবেচনা করলেই বোঝা যায়। কাজেই আমাদের সর্বজনশ্রদ্ধেয় কে জি ভাইয়ের মৃত্যু আমাকে অতটা বিস্মিত করেনি। সঙ্গে সঙ্গে এও আমাকে বলতে হবে, কে জি মুস্তাফার মৃত্যুতে আমাদের সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতার ভুবনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়ে গেল তা সত্যি সত্যি বেদনার।
আমি মূলত মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে ফিরে সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশ করেছিলাম। কিন্তু কে জি ভাই আমাদেরও দুই প্রজন্ম আগে থেকে অর্থাৎ পাকিস্তান আমলের শুরু থেকেই সেদিনকার পূর্ব পাকিস্তানের সাংবাদিকতা জগতে মধ্যমণি হয়ে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে চলেছিলেন। সে সময় কেজি ভাইয়ের মতো সুবিশাল সাংবাদিকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচয়ের সুযোগ হয়ে ওঠেনি। পুরনো প্রেসক্লাব ভবনে যখন গেছি চা কিংবা অন্যান্য খাবার খেতে তখন কে জি মুস্তাফাকে সরাসরি দেখেছি। প্রথমদিকে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করেছি। কিন্তু ও রকম প্রখর ব্যক্তিত্বশীল একজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বেশি কিছু বলার সাহস আমাদের মতো তরুণদের হয়ে ওঠেনি। খুব বেশি দীর্ঘ নন; কিন্তু সুঠামদেহী। মাথায় বেশ ঝাঁকড়া চুল। এর মধ্যে কে জি ভাই তখনকার পাকিস্তান অবজারভারের বিশাল ব্যক্তিত্বশীল সাংবাদিক। কাজেই দূরত্ব স্বভাবতই ছিল। আজ কে জি ভাই তাঁর প্রিয় স্বদেশভূমি ছেড়ে চলে গেলেন চিরদিনের জন্য। কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা কতজনে কে জি মুস্তাফার সাংবাদিক কৃতিত্ব এবং ঐতিহ্য জানেন তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কে জি মুস্তাফা ছিলেন সাবেক পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের শীর্ষস্থানীয় নেতা। তাঁর আহ্বানেই তৎকালীন পাকিস্তানে সংবাদপত্রে সফল ধর্মঘট পালিত হয়। আমি তখনো সাংবাদিকতায় ঢুকিনি; কিন্তু কে জি ভাইয়ের নেতৃত্বে সেই যে সাংবাদিকদের ধর্মঘট, যা তখনকার আইউববিরোধী আন্দোলনকে এগিয়ে দিয়েছিল, তা ভাবতে আজও আমার বিস্ময় হয়। সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সেদিনকার পাকিস্তানে কে জি ভাই যে দক্ষ এবং সাহসী নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন তা আমাদের সাহসী ইতিহাসের অংশ।
কে জি ভাই অসাধারণ বাগ্মী ছিলেন, সাংবাদিকদের শীর্ষস্থানীয় নেতা। ৬০-এর দশকে সেদিনকার পূর্ব পাকিস্তানে সাংবাদিকতার যে অবিস্মরণীয় বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তার অন্যতম কিংবা প্রধানতম কারিগর ছিলেন কে জি মুস্তাফা। আমার মনে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে তিনি সর্বপ্রথম অংশগ্রহণ এবং দক্ষ সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছিল তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেই সুবাদে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু কে জি মুস্তাফাকে ইরাকের রাষ্ট্রদূত করেন। আমার সুযোগ হয়েছিল সেদিন জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে কে জি মুস্তাফাকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজনে থাকার। এরপর বহুদিন তিনি দেশে ছিলেন না, কারণ এরই মধ্যে ১৯৭৫ সালে পরিবারের লোকজনকে হত্যা করা হয়। তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারকে পাল্টে দিয়ে নানান ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসন জেঁকে বসে। এই শাসকরা মুক্তিযুদ্ধের সাড়ে ৩ বছরের মাথায় বাংলাদেশের প্রগতির চাকা টেনে ধরে। কে জি ভাই সারা জীবন প্রগতিশীল রাজনীতির পক্ষে কাজ করেছেন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়েছেন, পাকিস্তানি সেনাশাসকদের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। সেই কে জি মুস্তাফা কী করে বাংলাদেশের ভীষণ দুর্ভাগ্য মেনে নেবেন? কাজেই কে জি ভাই স্বেচ্ছা নির্বাসনে গেছেন বিদেশের মাটিতে। বছরের পর বছর তিনি ঘরে ফেরেননি।
আমার ঠিক মনে পড়ে না কে জি মুস্তাফা কোন সালে দেশে ফিরেছেন। তবে দেশে ফিরে তিনি তাঁর জীবনের আরেকটি অধ্যায় শুরু করেন সাংবাদিকতায়। যুক্ত হন দৈনিক সংবাদের সঙ্গে। চট্টগ্রামের পূর্বকোণের সঙ্গে, শেষ পর্যন্ত সাবেক দৈনিক মুক্তকণ্ঠ পত্রিকার সঙ্গে। কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি, কে জি ভাইকে আমরা সেদিনকার তরুণ সাংবাদিকরা চিনতাম সেই সাহসী দুর্ধর্ষ মানুষ, যিনি পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা হিসেবে নিজের সাহস ও যোগ্যতা প্রদর্শন করেছিলেন, সেই কে জি ভাইকে আমরা আর কখনো ফিরে পাইনি।
একদিকে তাঁর বয়স বেড়েছিল, অন্যদিকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির টানাপড়েনে কে জি মুস্তাফা ক্রমান্বয়েই নিজের মধ্যে গুটিয়ে পড়ছিলেন। মাঝে মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই নির্দিষ্ট সময় জাতীয় প্রেসক্লাবে বসতেন। তাকে ঘিরে বসতেন প্রবীণ ও নবীন সাংবাদিকরা। কে জি ভাই ধীরস্থিরভাবে তার বক্তব্য রাখতেন। কখনো তার ক্ষুরধার যুক্তি, তাঁর জীবনবোধ এবং দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা উপহার দিতেন আমাদের মতো নতুন প্রজন্মের সংবাদকর্মীদের। কিন্তু একটি বিষয় আমাকে উল্লেখ করতে হবে, কয়েক বছর আগে কে জি ভাই যখন নিয়মিতভাবে প্রেসক্লাবের কেবিনে বসতেন, তখন বেশিরভাগ সময় তিনি হয় নির্বাক কিংবা আনমনে চিন্তা করতেন।
আমাদের মতো নবীনদের তাঁকে প্রশ্ন করে বেশি কিছু জানার সুযোগ হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে আমি কে জি ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ কখনো পাইনি, আজ কৃতজ্ঞচিত্তে একটি ঘটনার কথা মনে করতে চাই। সম্ভবত ২০০০ সালে আমি তখন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কলম ধরি এবং সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকি বলে আমাকে নিয়ে তখনকার সাম্প্রদায়িক শক্তির মুখপত্রগুলো লাগাতার অপপ্রচার চালাতে থাকে। সেই অপপ্রচারের মাত্রা এক সময় এতটাই তীব্র হয় যে, আমি ব্যক্তিগতভাবে ওদের বিরুদ্ধে আমার জীবনে আরেকটি যুদ্ধ শুরু করতে বাধ্য হই। ঠিক সেই সময়ই বেশ কয়েকটি কাগজে কে জি মুস্তাফা তাঁর ক্ষুরধার লেখনীতে আমার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর সেই সমর্থনকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার আকর এবং চরিত্র আজ আধুনিক জামানার হয়েছে। শত শত নতুন সংবাদকর্মী এই পেশায় যোগ দিয়েছেন। আমি মনে করি, কে জি ভাইয়ের হাতে আমাদের সাংবাদিকতার যে ভিত্তি গড়ে উঠেছিল, সে ভিত্তি ছিল আদর্শ, সাহস ও নৈতিকতার। আমরা যেন সেই সাহস, আদর্শ ও নৈতিকতাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি সেই প্রার্থনাই করব। আমি জানি না, কে জি ভাই তাঁর আত্দজীবনী লিখে গেছেন কি না। যদি না লিখে থাকেন তাহলে তাঁর জীবনী বাংলাদেশের নতুন সাংবাদিকদের অবশ্যই জানার সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। কে জি ভাইয়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল।
--------------------------------------------------------------------
কিংবদন্তিতুল্য মানুষটি চলে গেলেন
আবেদ খান

কে জি ভাই চলে গেলেন। আমাদের সাংবাদিকতা পেশার বর্তমান প্রজন্ম বুঝতে কি পারবে, কোন মানুষটি নিঃশব্দে লোকান্তরিত হলেন? সাংবাদিকতা পেশা যদি এককভাবেও কারো কাছে ঋণী থাকে তিনি হলেন কে জি ভাই-খন্দকার গোলাম মুস্তাফা। অনন্য রুচিবোধ, অসাধারণ নীতিনিষ্ঠা, অতুলনীয় সততা এবং অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব তাঁকে কিংবদন্তির মানুষে পরিণত করেছিল।
কে জি ভাইয়ের সাংবাদিকতার সূচনা কলকাতায়-বিভাগপূর্ব কাল থেকেই। সাতচলি্লশের পর ঢাকায়। বাম রাজনীতির প্রতি একনিষ্ঠ কে জি মুস্তাফার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি কখনো পেশার সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শকে জড়িয়ে ফেলেননি। আবার এই কে জি মুস্তাফাই সাংবাদিকদের অধিকার, দাবি-দাওয়া নিয়ে পাকিস্তানব্যাপী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনেও দিয়েছিলেন সক্রিয় নেতৃত্ব। রাজনৈতিক কারণে কখনো কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, আবার কখনো মাসের পর মাস আত্দগোপন করে থেকেছেন। এ তো গেল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কথা। সাংবাদিক হিসেবে কিংবা সাংবাদিকদের সংগঠক হিসেবেও তিনি একই রকম উজ্জ্বল। আজ যাঁরা প্রবীণ সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত, তাঁদেরও অনেকেরই পেশাজীবন শুরু হয় তাঁর হাতে। আবার তিনি ছিলেন নিখিল পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। দীর্ঘদিন, সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বাকস্বাধীনতা হরণকারী নীতির বিরুদ্ধে সে সময় দেশব্যাপী সাংবাদিকদের যে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার পুরোভাগে ছিলেন কে জি মুস্তাফা। সেই আন্দোলনের মুখে আইয়ুবের সামরিকজান্তাকে হার মানতে হয়েছিল এবং সর্বপ্রথম গঠিত হয়েছিল সাংবাদিকদের বেতন বোর্ড রোয়েদাদ। আজ সাংবাদিকতা পেশা যে মর্যাদা পেয়েছে, সাংবাদিকদের যে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে, তার জন্য কে জি মুস্তাফার অবদান অবশ্যই মনে রাখতে হবে। প্রায় ষাট বছরের পেশাগত জীবনে কখনো তিনি নীতি কিংবা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
কে জি ভাইকে আমি প্রথম দেখেছি একজন বাম রাজনীতিক হিসেবে, আমার কৈশোরকালে। আমাদের বাড়ির রাজনৈতিক আবহের মধ্যে। মাঝে মাঝে রাতের বেলায় অল্প সময়ের জন্য আসতেন তিনি। এরপর দেখেছি পত্রিকা অফিসে। আজাদে, সংবাদে, ইত্তেফাকে, অবজারভারে-সেই পাকিস্তান আমলে। ছোটখাটো মানুষ কিন্তু অসামান্য ব্যক্তিত্ব। সিদ্ধান্ত প্রদানে সামান্যতম দ্বিধা নেই। সত্য কথাটি উচ্চারণে সামান্যতম কুণ্ঠা নেই।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর আদর্শগত ভিন্নতা ছিল সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। কিন্তু তা কোনো অবস্থাতেই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে আক্রান্ত করেনি। বঙ্গবন্ধুর চেয়ে কয়েক বছরের ছোট ছিলেন বটে, তবে বন্ধুত্বের সম্পর্কে তা কোনো বাধা হয়নি কখনোই। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু তাঁকে ইরাক এবং ইয়েমেনের রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগ দেন। নির্দ্বিধায় কে জি ভাই সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর তাঁর নিয়োগ বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু তারপর তিনি দেশে ফেরেননি। থেকে যান ইরাকে-যোগ দেন বাগদাদের একটি জাতীয় দৈনিকে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে। ১৯৮৪ সালের দিকে ইরাকের বাগদাদে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় আমার। মুখে স্নেহসিক্ত হাসি। তারও বেশ কিছুকাল পরে তিনি দেশে ফেরেন। কিছুকাল বিরতির পর প্রত্যাবর্তন ঘটে সাংবাদিকতা পেশায়ও। একটি নতুন দৈনিকের দায়িত্ব গহণ করেন তিনি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত থাকেননি সেখানে। ফিরেছিলেন দৈনিক সংবাদ পত্রিকায়ও। সেখানেও বেশি দিন থাকা হয়নি। তখন তাঁর বয়স হয়েছে-কমে এসেছে গুরুদায়িত্ব বহনের ক্ষমতাও। তারপর কিছুকাল থেকেছেন লেখালেখির ভেতরে। শেষ পর্যন্ত অবসর।
আমাদের সাংবাদিকতা জগৎটি ক্রমশ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছে। পাকিস্তান আমলে এই পেশার নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন তাঁদের অনেককে আমরা হারিয়েছি ইতিমধ্যেই। কেবল মুসা ভাই আছেন, ফয়েজ ভাই আছেন, নির্মল দা আছেন, লোহানী ভাই আছেন-তবে নিষ্ঠুর সময় তাঁদের কর্মক্ষমতা হরণ করেছে অনেকখানি।
কিন্তু তারপর? এক অপরিসীম শূন্যতা-সর্বগ্রাসী শূন্যতা কে জানে কোথায় নিয়ে যাবে এই পেশাকে! আমাদের দুর্ভাগ্য, কে জি ভাই তাঁর সুবিশাল অভিজ্ঞতার এবং কর্মজীবনের কোনো সঞ্চয় রেখে যেতে পারলেন না তাঁর উত্তরাধিকারদের জন্য।
আমরা কালের কণ্ঠের সাংবাদিক-কর্মচারী-পৃষ্ঠপোষক ও শুভানুধ্যায়ীদের পক্ষ থেকে জনাব কে জি মুস্তাফার স্মৃতির প্রতি জানাই আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
------------------------------------------------------------------
লেখাগুলো দৈনিক কালের কন্ঠ / ১৪ মার্চ ২০১০ - থেকে
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×