এই খবর টি ছাপা
হয়েছে ১৫ মার্চ ২০১০ দৈনিক সংবাদ - এ
'অষ্টম সংসদের ১০৪ সদস্য স্মাগলিংয়ে জড়িত ছিলেন'
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
=================================
৮ম জাতীয় সংসদের ৩০০ সদস্যের মধ্যে ১০৪ জন সরাসরি স্মাগলিংয়ে জড়িত ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও অর্থনৈতিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মইনুল হোসেন তার একটি গবেষণাপত্রের বরাত দিয়ে গতকাল এ তথ্য জানান। গতকাল ইকনোমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) অর্থনৈতিক অপরাধ সংক্রান্ত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে ৮ম জাতীয় সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেন তিনি। ড. মইনুল অন্য এক গবেষণার কথা উল্লেখ করে আরও জানান, ১৯৯০-৯১ সালে বিআইডিএস'র এক গবেষণার দায়িত্ব পান তিনি। যেখানে স্মাগলিং বা চোরাকারবারি নিয়ে ৩শ' পৃষ্ঠার একটি গবেষণাপত্র জমা দেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তার ওই গবেষণাপত্র প্রকাশ করেনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এন্টি-স্মাগলিং সেল। তারা সেটি পরে প্রকাশ করবে বলে বিআইডিএসকেও প্রকাশ করতে দেয়নি।
গতকাল সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে 'ইমপেক্ট অফ ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম অন দ্য ইকনোমি' শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ব্যবসায়ী সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী, টিআইবি'র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং এনবিআর'র সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ইআরএফ সভাপতি মনোয়ার হোসেন এবং ধন্যবাদ জানান সেক্রেটারি জেনারেল কায়সার হোসেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনকে দুর্বল করে দেয়ার অভিযোগ তুলে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দুর্নীতি দমন কমিশন দরকার। এর পাশাপাশি উপযুক্ত আইন ও আইনের প্রয়োগ, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, আমি আগেও বলেছি, বছরে দুদকের ১০০টি মামলা সুপ্রিম কোর্টে নিষ্পত্তি হলে ৫০ ভাগ দুর্নীতি কমে যাবে। গোলাম রহমান বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুদক আইনের কিছু সংশোধনী আনা হয়; বর্তমান সরকার সেটি সংসদে পাস করেনি। এ কারণে দুদকের কাজে সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যান মন্তব্য করেন ওই প্রক্রিয়ায় 'পা ছেড়ে কাঠি নিয়ে টানাটানি হয়' আর এ কারণে দুদকেও গতি আসছে না। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বিচার বিভাগ ও দুদককে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, আমাদের বিচার ব্যবস্থা এমন যে, সেখানে মূল বিষয় বাদ দিয়ে প্রক্রিয়াগতগত বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘ জটিলতা তৈরি হয়, যার ফলে বছরের পর বছর চলে যায়। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আর এজন্য তিনি দ্রুত নিরপেক্ষ বিচার কামনা করেন এবং একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান জানান, প্রধানমন্ত্রীর নাইকো দুর্নীতি মামলার রায় এখনও তাদের হাতে পেঁৗছেনি। রায়ের কপি পাওয়ার আগে তাই এ ব্যাপারে তিনি মন্তব্য করতে অপারগতা জানান। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুদকের মামলায় আপিলের দায়িত্ব এটর্নি জেনারেলের নয়, এটি দুদকের দায়িত্ব। তবে মামলার রায় দেখে যদি আপিলের প্রয়োজন না হয় তাহলে শুধু শুধু অর্থ খরচ করে আপিল করার দরকার নেই বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, মামলার রায়ের কপি পেলে আমরা বুঝতে পারব ন্যায়বিচার পেয়েছি কি না। মামলার প্রসিডুয়াল মিসটেক নিয়ে যে কথা উঠেছে সে সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, প্রসিডুয়াল মিসটেক নিয়ে যে দুটি মামলার রায় হয়েছে সে দুটো মামলার সঙ্গে আরও ৫০০ মামলা জড়িত।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী তার নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, অর্থনৈতিক অপরাধের কারণে ফিলিপস্'র মতো বহুজাতিক কোম্পানি এ দেশে ব্যবসা করতে পারেনি। কারণ তারা সরকারকে সঠিকভাবে শুল্ক দিয়ে ব্যবসা করলেও অন্যরা যারা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা করছিল তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। তিনি বলেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে একটি কন্টেইনারের জন্য খরচ হতো ১ হাজার ৭০০ টাকা; বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এটি কমে ৬০০ টাকায় নেমে এসেছিল। এখন আবার কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের খরচ বেড়ে ১ হাজার ২০০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ব্যবসায় ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের মূল্যবোধ এমন পর্যায়ে পেঁৗছেছে যে, রাস্তায় কন্টেইনার থেকে মাল চুরি হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বিদেশী ক্রেতারা সঠিক পরিমাণ পণ্য পাচ্ছেন না। এতে দেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি এখন এমন স্তরে পেঁৗছে গেছে, যেখানে সৎভাবে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, আইনপ্রণেতারা যদি আইন ভাঙেন তবে সেখানে আর করার কিছু থাকে না।
ড. মইনুল বলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশ প্রথমবারের মতো সামরিক আমলাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন জিয়া ও এরশাদ। সামরিক আমলাদের পাশাপাশি এ সময় বেসামরিক আমলারাও মহীরুহ হয়ে ওঠে। গত ২০ বছর সংসদীয় গণতন্ত্র চালু থাকলেও ওই আমলাতন্ত্র থেকে বেরুতে পারেনি রাষ্ট্র। এ কারণে রাজনীতিবিদরাও এখন আমলাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।
ড. মইনুল বলেন, দেশে অপরাধ ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিবিদরা যুগপৎভাবে কাজ করছেন। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন মিশে গেছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ক্ষেত্রে জিয়া ও এরশাদ সমার্থক হয়ে গিয়েছিলেন, অথচ ওই রাজনৈতিক কারণেই এরশাদ এখন ফেরেশতা হয়ে গেছেন। তিনি আরও বলেন, দুদককে দুর্বল করার জন্য একটি আইন তৈরি করছেন আমলারা, যা কেবিনেটে তোলা হবে। সেটি যদি সরকারের মন্ত্রীরা গ্রহণ করেন তবে দুদকের ক্ষমতা খর্ব হবে। এটি হলে সরকারও তার জবাবদিহিতা এড়াতে পারবে না। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান না নিলে জনগণের কাছে এ সরকারকেও জবাবদিহি করতে হবে।
তিনি আরও জানান, ১৯৯৮ সালে বিআইবিএম'র ডিজি হিসেবে প্রেষণে নিয়োগ পেয়ে তিনি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ নিয়ে একটি গবেষণা করেন। সেখানে তখনকার অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সংসদে যে ২ হাজার ১১৭ জন ঋণখেলাপির তালিকা দিয়েছিলেন তার মধ্যে ১৫৭ জনের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল কোটি টাকার উপরে। ড. মইনুল সেখান থেকে ১২৫টি ফার্মের ওপর জরিপ চালিয়ে ৩১ জন রাজনৈতিক ঋণ খেলাপিকে চিহ্নিত করেন যার মধ্যে সর্বোচ্চ বিএনপি, ২য় স্থানে জাতীয় পার্টি এবং ৩য় স্থানে আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদদের অবস্থান।
ড. মইনুল রুগ্ণ শিল্পগুলোর সমালোচনা করে বলেন, ব্যাংক ঋণ নিয়ে শিল্পগুলো রুগ্ণ হয়ে গেলেও রুগ্ণ শিল্পের মালিকরা রুগ্ণ হননি। তারা অর্থ সরিয়ে নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠান করেছেন কিংবা বিদেশে পাচার করেছেন। তিনি জানান, তার কাছে এমন তথ্য রয়েছে যে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ওই ঋণ বিদেশে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ৭০ দশক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মন্দ ঋণের পরিমাণ ৯০ দশকে এসে প্রায় ৪০ শতাংশে পেঁৗছে। এরপর থেকে ব্যাংকগুলো রাইটঅফের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশে কমিয়ে নিয়ে এসেছে কিন্তু এ পুরো প্রক্রিয়াটি ভুয়া। যে ৫ শতাংশ প্রভিশন রেখে ব্যাংকগুলো মন্দ ঋণ সমন্বয় করছে তা কখনও তারা আদায় করতে পারেনি।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতির কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিক থেকে ৩ শতাংশ পিছিয়ে আছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন ৫ থেকে ৬ শতাংশ অর্জিত হচ্ছে। দুর্নীতিকে যদি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণ করা যেত তাহলে আরও ৩ শতাংশ বেশি জিডিপি অর্জিত হতো। তিনি টিআইবি'র এক গবেষণাপত্রের বরাত দিয়ে বলেন, দেশে বিভিন্ন ধরনের সেবা খাতে যে ধরনের দুর্নীতি হয় তার কারণে বছরে মাথাপিছু আয়ের প্রায় ৪ শতাংশ চলে যায়।
ড. ইফতেখার বলেন, ৪টি কারণে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ছে। আর্থিক সুবিধা, আইন ও বিধির যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সততার অভাবে দুর্নীতি বাড়ছে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অপরাধের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফ্রড বা জোচ্চুরি। সত্য আড়াল করে তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা নিয়ে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। এর পাশাপাশি মানিলন্ডারিং, সাইবার ক্রাইমও বাড়ছে। তিনি বলেন, আর্থিক অপরাধ সরকার ও সরকারের বাইরে দুই জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। এমন কি এনজিওগুলোতেও এ ধরনের অপরাধ ঘটছে। টিআইবি'র নির্বাহী প্রধান দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সংসদ, দুদক, বিচার বিভাগের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক এনবিআরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এনবিআর'র সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সামাজিক প্রতিরোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বেলন, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এখন আর দুর্নীতিবাজকে প্রত্যাখ্যান করে না আর এ কারণে দুর্নীতিবাজ চক্র আরও উৎসাহী হয়; এমন কি তারা দুর্নীতি করে বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হন। তিনি বলেন, দুদককে যেভাবে দুর্বল করা হচ্ছে এর ফলে দুর্নীতি দমন কমিশন না থেকে এটি 'অমিশন' হয়ে যাবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ৯:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


