সৈয়দ আবুল মকসুদ
=====================================
তাঁর বিখ্যাত বন্ধু ও সমসাময়িকদের মধ্যে আবু সয়ীদ আইয়ুব (১৯০৬-১৯৮২) ছিলেন সবচেয়ে বেশি মননশীল: যুগপৎ কলা-সাহিত্য-দর্শন ও বিজ্ঞানের বিষয়সমূহ তাঁরই ছিলো সবচেয়ে বেশি অধীত। ভারতীয় বা পাশ্চাত্য দর্শন শুধু নয় কোনো বিষয়ই ভাসা-ভাসাভাবে জানায় তাঁর ছিলো বিশেষ আপত্তি। আইয়ুব লিখেছেন অপেক্ষাকৃত কম, অধ্যয়ন করেছেন বেশি, ভেবেছেন আরও বেশি। জীবন সম্পর্কে আইয়ুবের উপলব্ধিজাত অভিজ্ঞতা তাঁর বন্ধুদের কাছে অজ্ঞাত ছিলো না। পারিবারিক ভাষা উর্দুতে তাঁর নিশ্চয়ই অধিকার ছিলো অসামান্য। যদিও তা তাঁর সাহিত্যচর্চার মাধ্যম ছিলো না। বাংলা এবং ইংরেজি দু’ভাষায়ই তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি ব্যক্ত করেছেন নিজস্বচিহ্নিত এক সুসংবদ্ধ অথচ দ্যুতিময় ভাষায়। সাহিত্য হোক, দর্শন হোক, গভীরভাবে কোনোকিছু আয়ত্ত ও আত্মস্থ না করে তিনি কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাচর্চার বিষয়গুলোর অন্তর্গত ছিলো প্রথমে পদার্থবিজ্ঞান, পরে দর্শন: জ্ঞানের জগতে দুইই অপরিহার্য। বস্তুজগৎ ও ভাবজগৎ দুইই ছিলো তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এই দুইয়ের সমন্বয়েই মানুষের জীবন। কাব্য ছিলো তাঁর প্রিয়া। বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের দৃষ্টিতে তিনি আধুনিক কাব্য উপভোগ ও ব্যবচ্ছেদ করেছেন। দার্শনিক বিষয় ছাড়া তাঁর প্রধান বিচার-বিশ্লেষণের এলাকা রবীন্দ্রসাহিত্য- বিশেষ করে রবীন্দ্রকাব্য। রবীন্দ্রকাব্য সুধা আকণ্ঠ পান করে তিনি তাঁর উপলব্ধি ও পর্যবেক্ষণ যে ভাষায় বর্ণনা করেছেন তা কোনো প্রথাগত সমালোচনা নয়, বাংলা সাহিত্যে তা এক নতুন ধরনের সংযোজন। আইয়ুবের সমালোচনামূলক প্রবন্ধ উন্নীত হয়েছে শিল্পে। তাঁর রবীন্দ্রকাব্য-ব্যাখ্যা এক ধরনের মননশীল কাব্য বৈকি! দর্শনের খ্যাতনামা অধ্যাপক কালিদাস ভট্টাচার্য আইয়ুব সম্পর্কে এক প্রবন্ধে যথার্থই বলেছেন: ‘আমি শুধুই অবাক হই কেন তিনি নিজে সৃষ্টিশীল সাহিত্যের, বিশেষ করে কবিতার দিকে গেলেন না। তাঁর রবীন্দ্রচর্চা মননশীল কবিতার কিনারে গিয়ে পৌঁছেছে।’
(I only wonder why he never turned to creative literature for himself, particularly to poetry. His study of Rabindranath verges on intellectual poetry. The Viswabharati Quarterly, May 1975-April 1976).
আইয়ুবের একটি প্রবন্ধের একটি বাক্য এ রকম: ‘কবিতার লেখকের সামনে তো রয়েছে এমন এক উতরোল রাত্রি যার অন্ধকারে সমস্ত নক্ষত্রের আলো ঝলমল করছে।’ (আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ, পৃ. ১৯৯) কোনো একাডেমিক বিশ্লেষকের এমন বাক্য রচনার প্রয়োজন নেই- তাঁর পক্ষে তা সম্ভবও নয়।
কি প্রক্রিয়ায় তিনি রবীন্দ্রসাহিত্যের অনুরাগী হয়ে ওঠেন, সেকথা তিনি বলেছেন এবং এখন তাঁর পাঠকমাত্রেই সে-ঘটনাটি অবগত। কিন্তু যুক্তিবাদী মানুষটির মধ্যে ভাববাদ, ক্ষেত্রবিশেষে ভাবালুতাও, ক্রিয়াশীল ছিলো। একটু বেশি বন্ধুবৎসল ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্যে তিনি ব্যাপকভাবে আবিস্কার করেছেন একজন সাধক, আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে একজন মরমী অথবা আধ্যাত্মবাদী রবীন্দ্রনাথকে। তাঁর আগে আর কোনো সমালোচক রবীন্দ্রকাব্যকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে এতোটা গভীর ও বিস্তারিতভাবে বিচার বিশ্লেষণ করেননি। যদিও সমালোচক হিসেবে আইয়ুব অসম্ভব রকম আধুনিক। দর্শন ও কাব্যকে তিনি একত্র করেছেন। আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ-এর ভূমিকায় তিনি কবুল করে নিয়েছেন সোজা ভাষায়: ‘দ্বৈতাদ্বৈতচারীও বলতে পারি নিজেকে, কারণ আমার চোখে দর্শন আর কাব্যের মধ্যবর্তী সীমারেখা সর্বত্র খুব স্পষ্ট নয়।’ কেন নয় সে ব্যাখ্যাও তিনি করেছেন এবং অনেক পাঠকই তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন না। আইয়ুবের আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ (১৩৭৫) এবং পান্থজনের সখা (১৩৮০) রবীন্দ্রকাব্য আলোচনার ক্ষেত্রে অনেকদিন থেকেই দুটি ধ্রুপদ গ্রন্থে পরিণত হয়েছে। পথের শেষ কোথায় (১৩৮৪) ওই ধারারই এক সংযোজন। বহুসংখ্যক গ্রন্থের প্রণেতা তিনি নন। এই তিনটি গ্রন্থ ছাড়াও রয়েছে তাঁর ইংরেজিতে Poetry and Truth - যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭০ সালে প্রদত্ত ‘হীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারক বক্তৃতা’র গ্রন্থরূপ এবং Varieties of Experience (১৯৮০) পূর্বেই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত চৌদ্দটি প্রবন্ধের সংকলন। সম্পাদনা করেছেন তিনটি গ্রন্থ: আধুনিক বাংলা কবিতা (১৯৪৭, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথভাবে), পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা (১৩৬৬) এবং 10 Years of Quest (১৯৬৬, অম্লান দত্তের সঙ্গে)। অনুবাদ করেছেন মির্জা গালিবের গজল: গালিবের গজল থেকে (১৯৮৩) এবং রবীন্দ্রনাথের একশ’ একটি কবিতা: (১৯৬৬)। তাঁর কোনো গ্রন্থেরই অন্তর্ভুক্ত হয়নি এমন বেশকিছু বাংলা ও ইংরেজি প্রবন্ধ এখনো পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে রয়েছে। সেগুলো সংকলিত হলে আরো একটি কি দুটি গ্রন্থ হতে পারে। তাঁর Poetry and Truth আধুনিক কবিতার দার্শনিক ও নন্দনতাত্ত্বিক তাৎপর্য সম্পর্কে একটি বিশ্বমানের সমালোচনা গ্রন্থ। বোদলেয়ার, ভালেরি থেকে সমকালীন আধুনিক কবিতা পর্যন্ত এক অনবদ্য বিশ্লেষণ। দ্বিমত তাঁর সঙ্গে পোষণ করা যায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিন্তু তাঁর গুরুত্ব অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
শুধু কবিতা বা রবীন্দ্রকাব্য নয় অন্য বিষয়েও আইয়ুবের উপলব্ধি খুবই গভীর: অনুধ্যান অথবা অধ্যয়নলব্ধ। পথের শেষ কোথায়-এর প্রবন্ধগুলোর শিরোনাম- বুদ্ধিবিভ্রাট ও অপরোক্ষানুভূতি, সুন্দর ও বাস্তব, কাব্যের বিপ্লব ও বিপ্লবের কাব্য, আধুনিক কাব্যের সমস্যা: বিশ্বাস, সাহিত্যে যৌন প্রসঙ্গ ও বর্তমান সমাজ, সাধু ও সজ্জন, সেক্যুলারিজম ও জওয়াহরলাল নেহেরু, ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ ও ‘বিসর্জন’, পথের শেষ কোথায় এবং নয়নে কেন আঁধি প্রভৃতি।
রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয়ু বোধের প্রকাশ কিভাবে তাঁর কাব্যের ভেতর দিয়ে প্রথম বিচ্ছুরিত হয়েছে তার অনুসন্ধান করেছেন তিনি তাঁর গোটা সাহিত্য তন্ন তন্ন করে- বিচিত্র জিনিসের ভেতর থেকে একজন জহুরী যেমন মূল্যবান রত্নের খোঁজ করেন। Is That your Delight প্রবন্ধে তিনি বলেছেন My study of the growth of Tagore's religious thought will therefore follow the growth of his poetry and we lean more heavily on his poerty (including drama) that on his prose writing'. রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় চিন্তাধারার ক্রমবিকাশ অনুসন্ধান করতে গিয়েই তাঁর কাব্যের ক্রমবিকাশ আমার আলোচনায় আসছে, তাঁর গদ্যের চেয়ে (নাটকসহ) কাব্যের ওপরই জোর দেয়া হচ্ছে।
স্রষ্টা-নিরপেক্ষ শিল্পকর্ম হিসেবে তিনি বিচার করেননি কবিতাকে। কবি ও কবিতা পাশাপাশি স্থাপন করে কবিতা দিয়ে কবিকে এবং কবির মাধ্যমে কাব্যকে বিচার করেছেন তিনি। এ কাজটি আরও কেউ কেউ করবার চেষ্টা করে থাকতে পারেন, করেছেনও, তবে আইয়ুবই সফল। যেমন তিনি রবীন্দ্রকাব্যের ক্রমবিকাশ আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন:
কড়ি ও কোমল কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর পর প্রথম প্রকাশিত বই এবং মাত্র দু’বছর পরে প্রকাশিত। এতবড় শোকের অভিঘাতে মন যদি তিক্ত হয়ে থাকতো তবে এই কাব্যগ্রন্থেই তা সবচেয়ে দুর্ণিবার রূপে দেখা দিত অথচ তিক্ততা এখানে লক্ষণীয়ভাবে অনুপস্থিত- শোকের কবিতা থেকেও অনুপস্থিত। বরঞ্চ সুন্দর ভুবন এবং ভুবনবাসীর প্রতি ভালোবাসার সুস্পষ্ট প্রকাশ এ বইখানিকে স্মরণীয় করে রেখেছে আমাদের কাছে। (আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ)।
এরপর মানসী ও সোনার তরী সম্পর্কে আলোচনাকালে আইয়ুব মন্তব্য করেন: ‘মানসী’ই রবীন্দ্রনাথের সর্বপ্রথম কাব্যগ্রন্থ যাতে ‘কবির সঙ্গে যেন একজন শিল্পী এসে যোগ দিল’। ভাবের কুয়াশা কেটে গেছে, ভাষার পেশী শক্ত হয়েছে, হৃদয়াবেগ ঈষৎ সংযত, প্রকাশে অতিবিস্তার নেই- যদিও পরিণত বয়সের সংহতি এখনও অনায়ত্ত। তিন বছর ধরে লেখা কবিতা এ বইখানিতে স্থান পেয়েছে, তাই ভাববৈচিত্র্য এখানে অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের চেয়ে বেশি। মোটামুটি বলা যায় তিন প্রকার ভাবধারা বয়ে চলেছে তিন রকমের বিষয়কে অবলম্বন করে- প্রকৃতি, নারী ও স্বদেশ।
অসামান্য সংযত এবং ঘন তাঁর ভাষা এবং বিশ্লেষণের বিষয়বস্তু শুধু নয় ভঙ্গিটিও অপ্রথাগত। যেমন-
‘গীতাঞ্জলি’র কবি ছিলেন সমাজ থেকে বেশ-একটু দূরে, আপন পরান-সখার সঙ্গে একান্তে আসীন বা এক তরীতে কুলহারা কিন্তু প্রশান্ত- কানে কানে গান শোনানো যায় এতোটা- প্রশান্ত সমুদ্রের মাঝখানে ভেসে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল। ‘বলাকা’র কবি সারা পৃথিবীর দুঃখ ও পাপের ভারে নিপীড়িত। আমরা জানি প্রথম মহাযুদ্ধের প্রকাশ্য ধ্বংসলীলা আরম্ভ হবার কিছু পূর্বেই মানবজাতির কোনো অজ্ঞাত মহাবিনাশ আসন্ন জেনে তাঁর মন কীরকম ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিলো।
পান্থজনের সখা ভাববাদী দর্শনের একটি অসামান্য গ্রন্থ, কাব্য সমালোচনামূলক রচনা নয়। রবীন্দ্রকাব্য অথবা সাহিত্য আলোচনা উপলক্ষ মাত্র, লক্ষ্য মহাবিশ্বে মানবজীবনের অবস্থান আলোচনা। এখানে রবীন্দ্রমানসের নানা দিকের ওপর তিনি আলো ফেলছেন। শুরুতেই তিনি জানান:
আমাদের পরিচিত মরমিয়া-সাধকরা কিন্তু প্রায় সবাই একই সাধনমার্গ ধরে ঈশ্বরের দিকে এগুতে প্রয়াসী হয়েছেন সমস্ত জীবনভরে। পক্ষান্তরে, রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর ভাবনা ও তৎ-সংশ্লিষ্ট ধ্যান-ধারণা মার্গ থেকে মার্গান্তরে চলে গেছে একাধিকবার- এক ধর্মসমাজ থেকে আর এক ধর্মসমাজে, তারপর একলা পথে কখনও মগ্ন হতে চেয়েছেন ব্যক্তিস্বরূপ জীবন স্বামীতে, কখনও নৈর্ব্যক্তিক বিশ্বজাগতিক সত্তা অর্থাৎ ভূমাতে, কখনো দীক্ষা নিতে চেয়েছেন নটরাজ শিবের কাছে, কখনো চিরমানবের বেদীতে পুষ্পার্ঘ্য সাজিয়ে দিয়েছেন, কখনো অমৃতভরা মুহূর্তে ধরতে চেয়েছেন শাশ্বতকালের মহিমা। এমন বৈচিত্র্যময় অথচ প্রত্যেকটি সাধনায় নিবিষ্টপ্রাণ সাধকের দৃষ্টান্ত সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না।
রবীন্দ্রকাব্য সরোবরে অবগাহন করতে গিয়ে আইয়ুব কখনোই নিজেকে বিস্মৃত হন না। মাঝে মাঝেই তাই নিজের দার্শনিক উপলব্ধি তিনি তুলে ধরেন। যেমন আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ-এ তাঁকে বলতে শুনি:
এবং দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তার পথে বিপথে যতো এগিয়েছি, ঈশ্বর বিশ্বাস আমার ততোই ক্ষীণ হয়েছে; অবশেষে আজ প্রৌঢ়ত্বের প্রান্তে পৌঁছে বাল্যকালের পরম আশ্রয়দাতা, পরম কল্যাণময়, অনন্ত শক্তিধর, সকল দুঃখতাপহর কোনো বিশ্ববিধানকর্তাকে তো আর কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। অথচ যে ব্যক্তিস্বরূপ ঈশ্বরকে গ্রহণ করতে আমার মনের প্রতিটি কক্ষে প্রবল প্রতিরোধ, সেই ঈশ্বর প্রেমে আদ্যোপান্ত অনুরঞ্জিত কাব্যকে হৃদয়ে স্থান দিতে একটুও বাধে না।
নিজে দার্শনিক বলেই রবীন্দ্রকাব্যের দার্শনিক তাৎপর্য উন্মোচন করতে তাঁর একটুও বেগ পেতে হয়নি। প্রথাগত সমালোচকদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বিস্তর। নির্লিপ্ত সমালোচকও তিনি ছিলেন না, বিশেষ করে রবীন্দ্রকাব্যের ও সাহিত্যের বিচার-বিশ্লেষণকালে আবেগকে তিনি উপেক্ষা করেননি, কাব্য-আলোচনাকালে ব্যবহার করেছেন। কবির চেতনার সঙ্গে তিনি একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। কবির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনিও যেন কবির সঙ্গে হেঁটেছেন। তিনি স্বীকার না করলেও বাস্তবিক পক্ষে রবীন্দ্রনাথই তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু-সংকোচবশত তাঁকে ‘গুরুদেব’ বলে সম্বোধন করুন বা নাই করুন। রবীন্দ্রনাথের প্রবর্তিত প্রেমধর্মের তিনি যেন একজন অনুসারী, যেমন রামকৃষ্ণের ছিলেন নরেন্দ্র। এর সপক্ষে আইয়ুবের নিজের বক্তব্যই যথেষ্ট:
রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আশা ছাড়েননি, মানুষে বিশ্বাস হারাননি। কিন্তু “হালের কাছে মাঝি আছে করবে তরী পার”- এমন চরম শুভ সংকল্পময় ও অনন্ত শক্তিমান ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়েছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ। সেইখানে রয়েছে তাঁর শেষ কাব্য-দশকের ট্র্যাজিক-চেতনার উৎস। আশা-নিরাশায় দোদুল্যমান কবি হলেন পৃথিবীর মহত্তম লিরিক কবি। ‘সমুখে শান্তি পারাবার” না “সম্মুখে ঘন আঁধার”- জেনে গেলেন কি সাধক রবীন্দ্রনাথ? প্রশ্নটি আমাকে ব্যাকুল করে; তিনি যে আমার মতন শত-শত পান্থজনের সখা। রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব আমি কখনোই বলতে পারিনি, পারবোও না; কিন্তু মনের গভীরে, কখনো-বা অবচেতনে, সর্বদাই একটি সুর বাজে- “চিরসখা, ছেড়ো না মোরে ছেড়ো না।” [পান্থজনের সখা]
কেন তিনি রবীন্দ্রনাথকে ছাড়তে চান না? চান না কারণ রবীন্দ্রনাথের বাণীতে ধ্বনি হতে দেখেন তিনি তাঁর নিজেরই মনের কথা। নানা কারণে বাংলা সাহিত্যে আবু সয়ীদ আইয়ুব অনন্য- অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর তীক্ষèধী আলোচনায় রবীন্দ্রসাহিত্য অর্জন করেছে এক নতুন মাত্রা। যে প্রচলিত বৃত্তের ভেতরে রবীন্দ্রকাব্য দীর্ঘদিন আবদ্ধ ছিলো তিনি কঠোর পরিশ্রম করে সেখান থেকে তাকে বের করে নিয়ে আসেন। এ এক মহৎ কৃতিত্ব।
-------------------------------------------------------------------
দৈনিক ইত্তেফাক / সাহিত্য সাময়িকী ১৯ মার্চ ২০১০
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মার্চ, ২০১০ সকাল ৭:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



