জনমত উপেক্ষা করার যখন সুযোগ থাকে না
ফকির ইলিয়াস
======================================
বাংলাদেশে আবারও হরতালের রাজনীতি শুরু হয়ে যাচ্ছে। প্রধান বিরোধীদল বিএনপি হরতাল ডেকেছে। তাদের উদ্দেশ্য এ হরতালের মাধ্যমে সরকারকে সতর্কীকরণ করা। সরকারকে সতর্ক করার দরকার মাঝে মধ্যে পড়ে। উন্নত বিশ্বেও আমরা দেখি, বিরোধীপক্ষ সরকারপক্ষের সমালোচনায় পঞ্চমুখ হন, এর প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় নির্বাচনে। কিন্তু দমন-পীড়ন কিংবা ভাঙচুর, বন্ধের মতো ঘটনা উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বের রেওয়াজ নয়।
বাংলাদেশে সেটিই হচ্ছে। যারা ক্ষমতায় থাকে তারা যেমন ধরাকে সরা জ্ঞান করে তেমনি যারা বিরোধীদলে থাকে তারা জ্বালাও-পোড়াও ছাড়া আর কোন গত্যন্তর খুঁজে পায় না। আবার এ জ্বালাও-পোড়াওয়ের মাধ্যমে কোন সরকারকে যে বিদায় করা গেছে তেমন কোন সুস্পষ্ট উদাহরণও বাংলাদেশের ইতিহাসে নেই। '৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন সেটি ছিল গণঅভ্যুত্থান। সম্মিলিত মানুষের সংগঠিত আন্দোলন। প্রায় এক দশক সময় ধরে রাষ্ট্রের বুক থেকে জগদ্দল পাথর সরাতে কত প্রাণ ঝরেছে, সে কথা কোনদিনই ভুলে যাওয়ার নয়।
তবে এটা ঠিক, গণমানুষেরা সরকারপক্ষকে মাঝে মধ্যেই সতর্ক করে। যেমনটি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনে করেছে। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট রাজনীতিক এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগও হয়েছে নিউইয়র্কে। আলাপকালে তাকে বন্ধুবৎসল, সজ্জন বলেই মনে হয়েছে আমার। কিন্তু একটি কথা মানতে হবে, ১৫ বছরেরও বেশি সময় তিনি চট্টগ্রামের নগরপিতা ছিলেন। ফলে তার পক্ষ-বিপক্ষ দুই-ই তৈরি হয়েছে। 'সব ওয়াদা পূরণ করা যায় না' এ সত্যটিও খুব ধ্রুব হয়ে প্রমাণিত হয়েছে প্রাজ্ঞ রাজনীতিক মহিউদ্দিন চৌধুরীর জীবনে।
কিন্তু তারপরও কথা হচ্ছে, এই মেয়রের চেয়ারটি ছেড়ে দেয়ার মানসিকতা কেন তার তৈরি হয়নি? কেন ২০১০ সালেও তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে হলো? আর দলই বা তাকে মনোনয়ন দিল কেন? আওয়ামী লীগে কী আর যোগ্য মেয়র প্রার্থী ছিলেন না? আওয়ামী লীগ কী জনমত যাচাই করেনি?
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল প্রচুর। বিশেষ করে নিজ দলের চট্টগ্রামের এমপিরা এতটাই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে তারা মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে কাজ করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের তথা মহাজোট প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেননি।
যেভাবেই হোক, মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরাজয় নতুন কোন বিষয় নয়। কারণ তা হতেই পারত। বরং নতুন মেয়র বিজয়ী মঞ্জুরুল আলমের আগমনই নতুন আলোচ্য বিষয়। কারণ যিনি একজন কমিশনার ছিলেন এবং একসময় আওয়ামী লীগের সমর্থকও ছিলেন। তার এই আওয়ামী লীগ বিমুখতার কারণটি দলের হাইকমান্ডের ভেবে দেখা দরকার।
মহিউদ্দিন চৌধুরীকে প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে চট্টগ্রামবাসী পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এর পাশাপাশি মানুষ চেক এন্ড ব্যালেন্সের রাজনীতির প্রতিও পক্ষপাত দেখিয়েছে। জনগণের এই যে সতর্ক সংকেত তা বর্তমান সরকারের গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতে কোন প্রভাব ফেলবে না বলেই মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের কিছু শীর্ষ নেতা। কিন্তু আমার মতে, বিষয়টি এমন সহজভাবে দেখার নয়। কারণ, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের মানুষ সরকারকে তাদের ওয়াদা পূরণ, গণসমস্যা সমাধানের দিকেই নজর দেয়ার বার্তা পাঠিয়েছে। সরকার তা কীভাবে, কতটা গ্রহণ করবে-তাই দেখার বিষয়।
দুই.
দেশের গার্মেন্টস সেক্টর আবারও অশান্ত, অচল হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের নানা দাবি তোয়াক্কা না করে গার্মেন্টস মালিকরা মিল-কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে শ্রমজীবী মানুষ আরও ফুঁসে উঠছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। এখানে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে বলা দরকার। একটি মিডিয়া বন্ধ হয়ে গেলে, আমরা অনেকেই অনেকভাবে সোচ্চার হই। বলি, কয়েকশ' লোক তাদের চাকরি হারাচ্ছে। ঠিক একই সমানুপাতে একটি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হলে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ হারাচ্ছে। সব মিলিয়ে হাজার হাজার পরিবারের সদস্যরা বঞ্চিত হচ্ছে রুটি-রুজি থেকে।
গোটা বিশ্বে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। মন্দা অর্থনীতির ধকল সইতে হচ্ছে সবাইকে। তাই শ্রমিকরা, যারা বেতন বাড়ানোর দাবিসহ অন্যান্য যে দাবি-দাওয়া জানাচ্ছে তা সহানুভূতি, বাস্তবতার নিরিখে বিবেচনা করা উচিত ছিল। আলোচনার মাধ্যমে, রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতো। তা না করে মিল-ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা অবস্থাকে আরও জটিলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা কোন মতেই কাম্য হতে পারে না।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের একটি উৎসও বটে। এর সামান্য তোয়াক্কা না করে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়ার হঠকারি সিদ্ধান্ত যারা নিলেন তারা কি সামনে-পেছন ঠিকমতো ভেবে দেখেছেন? দেশবাসী লক্ষ্য করছে বেশ কিছুদিন থেকেই গার্মেন্টস শিল্পের মাঠটি উত্তপ্ত। সরকার 'গার্মেন্টস পুলিশ' গঠনের কথাও বলেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সেসব বাস্তবায়নের অগ্রগতি সাধন না করে বরং কারখানা বন্ধের দিকেই এগুচ্ছে মিল মালিকরা। বলা দরকার, হয়তো ছাঁটাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে 'আন্দোলনকারী' কিছু শ্রমিককে বাদ দেয়া যাবে কিংবা যেতে পারে। কিন্তু নতুন শ্রমিক নিয়োগ দিলে ক্রমে তাদের মাঝে থেকেই কেউ কেউ যে একই আন্দোলনের পথ অনুসরণ করবে না তার কোন নিশ্চয়তা আছে কি?
এটা আমরা অতীতেও দেখেছি কোন ক্ষমতাসীনদের পক্ষে, কোন ক্ষমতাবানদের পক্ষে জনমত উপেক্ষা করার যখন কোন সুযোগ থাকে না তখন তারা দমন-পীড়ন করে। মানুষকে রুখে দেয়ার নানা অপচেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবে মানুষকে, মানুষের শক্তিকে কি দমানো যায়? না যায় না। আর যায় না বলেই মানুষের জয় হয়। অপশক্তিরা পরাজিত হয়।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতার মেরুদ- ভেঙে দিতে নানা অপশক্তিই তৎপর। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এ সরকারের মেয়াদকালীনই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। তাদের মেয়াদকাল এখনও সাড়ে তিন বছর। তবে কি এ বিচারকার্য তারা পুরো সাড়ে তিন বছরই ঝুলিয়ে রাখবেন? মনে রাখা দরকার, রাজনৈতিক ভুলের মাশুল কিন্তু বড়ই কঠিন।
নিউইয়র্ক, ২৩ জুন ২০১০
-----------------------------------------------------------------------
দৈনিক সংবাদ । ঢাকা। ২৫ জুন ২০১০ শুক্রবার প্রকাশিত
ছবি - কেসনি ইবি
আলোচিত ব্লগ
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন
নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন
শৃঙ্খল মুক্তি আমার
শৃঙ্খল মুক্তি আমার

ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন
=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন
রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।