মসজিদ নির্মাণ বিতর্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা
ফকির ইলিয়াস
==================================
একটি মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে গোটা যুক্তরাষ্ট্র এখন আলোচনায় পঞ্চমুখ। তর্ক হচ্ছে পক্ষে-বিপক্ষে। যেখানে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ছিল, সেই গ্রাউন্ড জিরো থেকে মাত্র দুব্লক দূরেই ৫১ পার্ক প্লেস। এই ব্লকটি খুব নিরিবিলি এলাকা বলেই পরিচিত ছিল এতোদিন। একটি পুরোনো বিল্ডিং পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল দীর্ঘদিন। সেই ভবনটি ক্রয় করে নিয়েছেন কিছু মুসলিম ব্যক্তিবর্গ। তাদের উদ্দেশ্য, তারা সেই ভবনের জায়গাটিতে বড় আকারে মসজিদ এবং ইসলামিক সেন্টার বানাবেন। এই ঘোষণার পরপরই শুরু হয় বিতর্ক। একপক্ষ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতি সম্মান রেখে, ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বিবেচনা করেই তারা সেখানে প্রায় একশত মিলিয়ন ডলার খরচ করে মসজিদ বানাবার উদ্যোগী হয়েছেন। আর বিপক্ষরা বলছেন, গ্রাউন্ড জিরো স্পর্শকাতর এলাকা। সেখানে মুসলিমরা মসজিদ বানাতে পারবে না।
সেখানে মসজিদ কেন বানানো যাবে না, এর সপক্ষে তারা অত্যন্ত দুর্বল এবং খোঁড়া যুক্তি উপস্থাপন করছেন প্রায় প্রতিদিন। বিপক্ষ দলের বক্তব্য হচ্ছে, মুসলিম ধর্মাবলম্বী সন্ত্রাসীরা সেপ্টেম্বর ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলা করেছিল। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারসহ ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ করেছিল। তাই সেই মুসলিমদের ঐ এলাকায় মসজিদ নির্মাণের কোনো এখতিয়ার নেই।
বিতর্কটি চলছে গেলো প্রায় ছয়মাস যাবৎ। আইনি প্রক্রিয়ার প্রায় প্রতিটিতেই জয়ী হয়েছেন মসজিদ নির্মাতা পক্ষের মুসলিম সমাজ। অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ধর্মাযাজকসহ বিভিন্ন ধর্মের লোকজন ঐ ৫১ পার্ক প্লেস চত্বরে জড়ো হয়ে মুসলমানদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। সবশেষে পবিত্র রমজানে শুরুতে হোয়াইট হাউস আয়োজিত পবিত্র ইফতার মাহফিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মি. বারাক ওবামা নিজেও সংহতি প্রকাশ করেন মুসলমান মসজিদ নির্মাতাদের সপক্ষে। প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠী এবং ধর্মাবলম্বীর ধর্ম পালনের স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিয়েছে। মুসলিমরাও নিশ্চয়ই তা পাওয়ার যোগ্যতা ও অধিকার রাখেন। এর পর পরই রিপাবলিকানরা ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের ওপর। তারা মসজিদ নির্মাণের বিপক্ষে শুরু করেন নানা প্রপাগান্ডা। এর প্রেক্ষিতে ১৮ আগস্ট ২০১০ বুধবার দুপুরে রিপোর্টারদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আবার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি যা বলেছেন ঠিকই বলেছেন। এজন্য তার দুঃখ প্রকাশ করার কিছু নেই। প্রেসিডেন্ট আজো বলেন, মুসলিমরা অবশ্যই মসজিদ নির্মাণের স্বাধীনতা রাখেন। রিপাবলিকান রাজনীতিকরা অযথাই এটাকে ইস্যুতে পরিণত করতে চাইছেন।
মসজিদ নির্মাণ নিয়ে এই বিতর্কটি উসকে দিতে চাইছে একটি মহল। তারা নানা ধরনের অমার্জনীয় হুমকি শুরু করেছে। ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের একটি চার্চের একজন প্যাস্টর বলেছেন, তিনি আগামী ৯/১১-এর বার্ষিকীটি দেখতে চান, যেদিন আল কুরআনে অগ্নিসংযোগ করা হবে! এ সংবাদটি ১৮ আগস্ট বুধবার দ্য এ এম নিউইয়র্কে ছাপা হয়েছে।
মসজিদ নির্মাণের জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন নিউইয়র্কের গভর্নর ডেভিড পেটারসন। তিনি বলেছেন, এজন্য নিউইয়র্ক স্টেট সার্বিক সহযোগিতা দেবে। কিন্তু মসজিদ নির্মাতা পক্ষের এডভাইজারি বোর্ড স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে তাদের মসজিদের স্থান পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই।
লোয়ার ম্যানহাটান এলাকায় মুসলিম জনপদ ক্রমশ বাড়ছে তা বেশ কিছুদিন থেকেই বিভিন্ন রিপোর্টে জানা যাচ্ছে। ঐ এলাকাতে মুসলিমরা যে নামাজ আদায় করেন না তেমনও নয়। গ্রাউন্ড জিরো থেকে সামান্য দূরে ওয়ারেন স্ট্রিটে গড়ে উঠেছে একটি স্বল্প পরিসর মসজিদ। একটি ভবনের বেসমেন্টে মুসলমানরা প্রতিদিনই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। শুক্রবার পবিত্র জুমার নামাজের জন্য পুলিশ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সড়ক বন্ধ করে প্রতি সপ্তাহেই নামাজ পড়েন হাজারো মুসলমান। তারপরও ঐ এলাকায় স্থায়ী মসজিদ নির্মাণে কেন বাধা দেয়া হচ্ছে তা নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছেÑ এমনকি নতুন প্রজন্মের মনেও।
১৯ আগস্ট ২০১০ বৃহস্পতিবার দ্য মেট্রো নিউইয়র্ক দৈনিকে একটি জরিপ ছাপা হয়েছে। ঐ জরিপে দেখা গেছে ৬৩ শতাংশ নিউইয়র্কবাসী ঐ এলাকায় মসজিদ নির্মাণের বিপক্ষে মত দিয়েছেন। ২৭ শতাংশ মসজিদ নির্মাণের পক্ষে মত দিয়েছেন। ১০ শতাংশ কোনো মত দেয়া থেকে বিরত থেকেছেন। এ জরিপটি পরিচালনা করেছে সিয়েনা কলেজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট।
এদিকে নির্মাতারা মসজিদ নির্মাণের ফান্ড কোথায় পাচ্ছেন, তা নিয়ে বিতর্ক ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তারপরও একটি কট্টরপন্থী গ্র“প বলছে এই অর্থ নাকি জঙ্গিবাদীরা জোগান দিচ্ছে। যদিও তারা তা মার্কিনি প্রশাসনে প্রমাণ করতে পারছে না। মসজিদ যাতে নির্মাণ করা না হয় সেজন্য প্রতিদিন বেশ কিছু ভাড়াটে প্রতিবাদকারী ঐ এলাকায় প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, ব্যানার নিয়ে সভা-সমাবেশ করছে। এই বিষয়টিকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্পিকার অব দ্য হাউস ন্যানসি পেলোসি। তিনি বলেছেন, মসজিদ নির্মাণে যারা বাধা দিচ্ছে তারা ফান্ড কোথায় পাচ্ছে তাও খতিয়ে দেখা দরকার।
সব মিলিয়ে এই মসজিদ নির্মাণ ইস্যুটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকে বেশ বড় ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে ‘ফ্রিডম অব রিলিজিওন’। সেই ধর্মীয় স্বাধীনতা কেন ক্ষুণœ করার চেষ্টা করা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বত্র। মুসলিম সমাজের প্রতিটি সদস্য তো বটেই, যুক্তরাষ্ট্রের ইসলাম ধর্ম বিশেষজ্ঞরা খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে অহেতুক ঘোলাজলে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে কেউ কেউ। তা না হলে পবিত্র কুরআন অবমাননার কথা উঠবে কেন? ওকলোহোমা সিটিতে চরম ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল থিমোথি ম্যাকভে নামের একটি কট্টরবাদী সন্ত্রাসী। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ঐ ব্যক্তিটির কর্মযজ্ঞ বেমালুম ভুলে গিয়ে ঢালাওভাবে ‘সব মুসলিমই জঙ্গি’ এমন বক্তব্য এবং মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলমান সমাজ। মৌলবাদী কট্টরপন্থীরা প্রতিটি ধর্মেই রয়েছে। খুব ক্ষুদ্র সংখ্যক কট্টরপন্থীর কর্মকাণ্ড দিয়ে গোটা সমাজকে বিচার না করার পক্ষে মত দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিস্টান, জুইশ, ক্যাথলিক, বৌদ্ধ, হিন্দু ধর্মের ধর্মযাজকরাও। তারপরও এই মসজিদটি নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিতর্কের অবসান কিভাবে হবে তা দেখার বিষয়।
----------------------------------------------------------------------
দৈনিক ভোরের কাগজ / ঢাকা / ২৬ আগস্ট ২০১০
মসজিদ নির্মাণ বিতর্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিএনপির আবালীপনা।


আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।