ফকির ইলিয়াস
----------------------------------------------------------------------
বিশ্বের মানুষ স্পষ্ট ভাষায় বলছে, 'যুদ্ধাপরাধের বিচার চাই', 'মানবতার শত্রুদের বিচার চাই।' এর বিপরীতে যারা পরাজিত শক্তি, তারা কি বসে আছে? না, বসে নেই। তারাও তাদের বিষদাঁত শানাচ্ছে। পারলে আবারও আঘাত হানবে। রক্তপ্লাবন ঘটাবে। পার্থক্য হচ্ছে এই, কোনো সুসভ্য গণতান্ত্রিক দেশে যুদ্ধাপরাধীরা মাথা তুলে কথা বলতে পারছে না। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে পারছে। বাংলাদেশে পারছে। তারা প্রকাশ্যে বলছে, প্রতিশোধ নেবে!
যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের একটি নিভৃত গ্রামে বসবাস করতেন শেফার্ড রিভস্কি। একটি চিঠির সূত্র ধরেই তার ওপর হামলে পড়েন মার্কিনি গোয়েন্দারা। বেরিয়ে আসে অনেক তথ্য। তা ১৯৮৮ সালের ঘটনা। শেফার্ডের ডায়েরিগুলো সিলগালা করে নিয়ে যান গোয়েন্দারা। শেফার্ড নাৎসিবাদে বিশ্বাস করে যুদ্ধ করেছিলেন। মার্কিন কাঠগড়ায় তার বিচার হয় শেষ বয়সে। জেলেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বিশ্বে এমন ঘটনা অনেক আছে। নাৎসিবাদের ভয়াবহতা এখনও কাঁপিয়ে দিচ্ছে মানবতার ভিতকে। বিশ্বের মানুষ স্পষ্ট ভাষায় বলছে, 'যুদ্ধাপরাধের বিচার চাই', 'মানবতার শত্রুদের বিচার চাই।' এর বিপরীতে যারা পরাজিত শক্তি, তারা কি বসে আছে? না, বসে নেই। তারাও তাদের বিষদাঁত শানাচ্ছে। পারলে আবারও আঘাত হানবে। রক্তপ্লাবন ঘটাবে। পার্থক্য হচ্ছে এই, কোনো সুসভ্য গণতান্ত্রিক দেশে যুদ্ধাপরাধীরা মাথা তুলে কথা বলতে পারছে না। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে পারছে। বাংলাদেশে পারছে। তারা প্রকাশ্যে বলছে, প্রতিশোধ নেবে!
বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর এক শীর্ষ নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের প্রকাশ্যে বলেছেন, তাদের দলের রিজার্ভ ফোর্স আছে। সময়মতো সে ফোর্স মাঠে নামবে। একটি গণতান্ত্রিক শান্তিকামী রাষ্ট্রের সরকারকে এমন হুমকি আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল। সরকারকে চ্যালেঞ্জের শামিল। এই নেতা এমন দুঃসাহস কোথা থেকে পেলেন? জামায়াতের কিছু নেতাকে যুদ্ধাপরাধ কিংবা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব তমদ্দুনপন্থি নেতা একাত্তর সালে কী কী কাজ করেছিলেন তা বাংলাদেশের মানুষের অজানা নয়। তথ্য-প্রমাণসাপেক্ষে তাদের হীন কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি এখনও মিডিয়ায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এরপরও এসব দাগি যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের সহচর তা ঢেকে দেওয়ার জন্য নিয়মিত চেষ্টা করে যাচ্ছে। বারবার চরম মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে।
অতিসম্প্রতি নিউইয়র্কে একটি সমাবেশ করেছে বাংলাদেশে মৌলবাদী রাজনীতির সমর্থকরা। সড়ক ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে তারা যে সমাবেশ করেছে তা ছিল মূলত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, মুসলিম ইউনিটি অব নর্থ আমেরিকা (মুনা), ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা (ইকনা), দাওয়াতুল ইসলাম প্রভৃতি সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ আয়োজনে মূলত এর নেপথ্যে ছিল জামায়াতের নেতৃত্ব। এই সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমর্থকও যোগ দিয়েছে। অবাক করার মতো কথা হচ্ছে, 'বাংলাদেশে ইসলাম বিপন্ন হচ্ছে' এই ধুয়া তোলে কয়েকশ' পাকিস্তানি আমেরিকানও যোগ দিয়েছে এ সমাবেশে। ধর্মের নামে বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতি কটাক্ষ করতে যেসব পাকিস্তানি এখনও তৎপর তাদের একটি অংশই বিদেশের বিভিন্ন দেশে জামায়াত সমর্থক বাংলাদেশিদের সঙ্গে হাত মিলাচ্ছে। নিউইয়র্কের সড়ক ব্যবহার করে জামায়াত সমর্থকরা যে সমাবেশ করেছে তাতে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম কিছু ইমাম, ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আসা হয়েছে। এসব ইমামও বলতে চেয়েছেন, বাংলাদেশে নাকি ইসলাম বিপন্ন হচ্ছে! অথচ একাত্তরে যারা যুদ্ধাপরাধ, ধর্ষণ, খুন, রাহাজানি, অগি্নসংযোগে নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের বিচারের বিষয়টি বেমালুম চেপে গেছে এই আয়োজকরা। ইসলামের নামে তারা বিদেশেও হীন রাজনীতিতে তৎপর রয়েছে।
সন্দেহ নেই, বর্তমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রাক্কালে দেশ-বিদেশে সেই পরাজিত শক্তিরা বিষফণা ছড়াচ্ছে।
তারা বলছে, তাদের 'রিজার্ভ ফোর্স' দিয়ে মোকাবেলা করবে। বাংলাদেশে নাকি তাদের দুই-তিন কোটি সমর্থক রয়েছে! গেল নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলবাদী শক্তির চরম পরাজয় প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ-ধর্মভীরু। কিন্তু তারা জঙ্গিবাদ, মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেন না। তারপরও যারা বলছে, বাংলাদেশে তাদের কোটি কোটি সমর্থক আছে, তাদের মতলব হচ্ছে মানুষকে বিভ্রান্ত করে ঘোলাজলে মাছ শিকার করা। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কৌশল বিশ্বে নতুন নয়। এ পরাজিত রাজাকার চক্র একাত্তরেও বলেছিল, পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে গেলে পূর্বাঞ্চলে ইসলাম থাকবে না। পাক হানাদার ও তাদের দোসরদের চ্যালেঞ্জ সশস্ত্র মোকাবেলা করেই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এখন সেই চক্রটির লক্ষ্য, বাংলাদেশকে তালেবানি-জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করা- যা তাদের বিভিন্ন জবানবন্দিতেই বেরিয়ে আসছে।
মৌলবাদের কবলে পড়ে বর্তমান পাকিস্তানের অবস্থা কেমন তা কারও অজানা নয়। এ নিয়ে চিন্তিত স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসকশ্রেণীও। তাদের ভাষ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাকিস্তান জঙ্গিবাদের চারণভূমি এবং বিশ্ব মানবতার বিকাশে পাকিস্তানি তালেবান অন্যতম অন্তরায়ও বটে। তাই যুক্তরাষ্ট্র কোনোমতেই চাইছে না, আরেকটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটুক। অথচ ইউরোপ-আমেরিকায় সেই পরাজিত জার্মানি শক্তি নানাভাবে লবিংয়ের চেষ্টা করছে। তাই প্রতিটি সচেতন বাংলাদেশির উচিত, এদের অতীত কৃতকর্ম এবং বর্তমান পরিকল্পনা বিশ্বের গণতন্ত্রকামী রাষ্ট্রগুলোর কাছে তুলে ধরা।
=========================================
দৈনিক সমকাল / ঢাকা / ১০ অক্টোবর ২০১০ রোববার প্রকাশিত
ছবি- আলেকজান্ডার
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১০ ভোর ৬:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



