ফকির ইলিয়াস
====================================
প্রধানমন্ত্রী তার মতামত জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী নিয়ে আদালতের রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার আর সুযোগ নেই। তার এই মতামত দেশের রাজনৈতিক মাঠকে সরগরম করে তুলেছে। বিএনপি সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। তারা হরতাল, অবরোধ, লাগাতার আন্দোলনের বিষয় নিয়েও হাইকমান্ডের সঙ্গে বৈঠক করছে। এর আগে ৩০ মে সোমবার সংবিধান সংশোধনে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। কমিটির একাধিক সদস্য সাংবাদিকদের জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার বিষয়ে কোনো সুপারিশ তারা করছেন না। এই প্রথা বাতিল বিষয়ে শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘এটা আমাদের ওপর চাপানোর কিছু নেই। এটা আমরা করছি না। আদালতের রায়েই এটা করা হচ্ছে।’
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা না থাকলে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষে রাষ্ট্র কিভাবে চলবে
-এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওয়েস্ট মিনস্টার টাইপ অব ডেমোক্রেসিতে যেভাবে হয়, সেভাবেই হবে। নির্বাচন করবে নির্বাচন কমিশন। সরকার তো নির্বাচন করবে না।’ এখানে উল্লেখ করা দরকার, ইংল্যান্ডের সংসদীয় গণতন্ত্রের মডেলই ওয়েস্ট মিনস্টার সরকার ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট ভবন ওয়েস্টমিনিস্টর প্যালেসের নাম অনুসারে এই নামকরণ। এ ব্যবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দেশ পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে, হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রী ইংল্যান্ডের কথা তুলছেন কেন? বাংলাদেশের গণতন্ত্র কি ব্রিটিশের আদলে মডেল হতে পেরেছে? নাকি বাংলাদেশের রাজনীতিকরা ব্রিটিশ রাজনীতিকদের আদর্শ ধারণ করতে সমর্থ হয়েছেন? এটা দেশবাসীর অজানা নয়, আওয়ামী লীগের দাবিতেই ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়। বিএনপি ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠান করে এই পদ্ধতির বৈধতা দেয়। এরপর প্রতিটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে এ ব্যবস্থাতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল।
গত ১০ মে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। তবে দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে আগামী দুটি নির্বাচন এ ব্যবস্থায় করা যেতে পারে বলে মত দেয় আদালত। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বর্তমান সরকার এই প্রথাকে পুরোপুরিই বাতিলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফও প্রায় অভিন্ন কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি যতোদিন থাকবে, ততোদিন এ জাতি অসভ্য হিসেবে পরিচিত হবে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে স্বাধীন, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। এর প্রমাণ আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে দিয়েছে। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির কোনো প্রয়োজন নেই। দেশে যতোদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি থাকবে, ততোদিন এ জাতি অসভ্য জাতি হিসেবে চিহ্নিত হবে।’ ৩১ মে মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সম্মিলিত নাগরিক আন্দোলন আয়োজিত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার : একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এটা আমাদের জানা আছে বাংলাদেশের মহান সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে অনেক বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছে। বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র এখন লালিত হয়েছে, সেই গণতন্ত্রের ধারার নামে প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংবিধানে ৫৫(১), ৫৫(২), ৫৬(১), ৫৮(২) ইত্যাদি ধারা এমনভাবে সংযোজিত হয়েছে যে, যেগুলোকে প্রধানমন্ত্রীকে অসীম ক্ষমতার অধিকারী বলা যায়। অনেকে এটাকে ‘প্রধানমন্ত্রীর একনায়কতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। এই ক্ষমতা এর আগে বিএনপি নেত্রীও ব্যবহার করেছেন। তিনি একক সিদ্ধান্তে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন করে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চালু করেছিলেন এক রাতের সংসদ সেশনে।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র কেন কিভাবে ব্যাহত হচ্ছে তা রাজনীতিকদের অজানা নয়। এরা সবসময় মনে করেন বল তাদের নিজের কোর্টে থাকবে। বল নিজেদের কোর্ট থেকে চলে গেলেই শুরু হয় সমস্যা! ইয়াজ উদ্দিনকে দিয়ে বিএনপি সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে চেয়েছিল। এখন আওয়ামী লীগও সে চেষ্টা করছে- প্রধান বিরোধী দলের এই অভিযোগ তো উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়।
এই দেশে গণতন্ত্র বারবার মুখ থুবড়ে পড়ার কারণগুলো খুঁজে বের করা অবশ্যই জরুরি। তবে তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশে গণতন্ত্রের নামে যা চলছে বা চলে আসছে দীর্ঘদিন যাবৎ, তাকে আদৌ গণতান্ত্রিক আচরণ বলা যায় কিনা। অনেকেই বলে থাকেন, গণতন্ত্রের পথে আমাদের অর্জন একেবারে কমও নয়। তাদের এ বক্তব্যের মূল ভিত্তি হলো, নব্বইয়ে স্বৈরশাসনের অবসানের পর জাতীয় পর্যায়ের মোটামুটি সফল কয়েকটি নির্বাচন হয়েছে।
নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতার পালাবদলও ঘটেছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়েও বিস্তৃত হয়েছে এ ধারা। এসব নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণও বেশ আশাব্যঞ্জক ছিল। তবে আসল কথাটি হলো নির্বাচন মানেই গণতন্ত্রের প্রকৃত পাওয়া নয়। নির্বাচিত একটি সরকার ক্ষমতায় থাকলেই আপনা-আপনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না। স্বাধীনতা-পরবর্তী গত চার দশকে নির্বাচন আর নির্বাচিত সরকার তো আর আমরা কম দেখিনি। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বাদ কি বাঙালি জাতি পেয়েছে? যদি পেতো, তবে দেশের দুই শীর্ষ নেত্রীসহ বহু নামীদামি ব্যক্তিকে বিনা বিচারে বা প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে দিনের পর দিন কারাযন্ত্রণা ভোগ করতে হতো না। বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রহিত হতো না।
আমাদের দুঃখজনক ইতিহাস হচ্ছে আমাদের রাজনীতিকরা অতীত মনে রাখেন না। আজ যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, কাল তারা নাও থাকতে পারেন। প্রতিহিংসার রাজনীতি কোনো জাতিকেই সামনের দিকে এগোতে দেয় না। আদালতের রায় কিংবা দোহাই দিয়ে এই তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি আসেনি। এসেছিল আন্দোলনের ফসল হিসেবে। তাই আজ আবার যদি দেশ অশান্ত হয়ে ওঠে এর দায় কে নেবে?
ভুলে গেলে চলবে না, রক্তপাত বন্ধের জন্যই এদেশে ওয়ান ইলেভেন এসেছিল। এই ওয়ান ইলেভেন যে আবারো আসবে না তার কোনো নিশ্চয়তা এদেশে এখনো তৈরি হয়নি। হয়নি এজন্য, কারণ রাজনীতিকরা এখনো জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যে পৌঁছুতে পারেননি। ভারতেও এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা নেই। অথচ ভারত কতো আদর্শ গণতান্ত্রিক দেশ। ইংল্যান্ড-আমেরিকার কথা না হয় বাদই দিলাম। বর্তমান সরকার হয়তো বলবে, বিরোধী দল সংসদে না এলে আমরা কী করবো? কিন্তু এমন কিছুও তো করা উচিত নয়, যাতে বিরোধী দল দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়ার সুযোগ পায়।
যে দেশের সিংহভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, যে দেশে এখনো নিরক্ষরতার অভিশাপ এক বড় গ্লানি, সেদেশে ওয়েস্ট মিনস্টার স্টাইলের গণতন্ত্র প্রচলন করা এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। বিষয়টি বিবেচনায় রাখা দরকার। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, মহান জাতীয় সংসদে সিদ্ধান্ত নিয়ে আরো দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার পক্ষে বিল পাস করা হোক। দেশকে অনিবার্য সংঘাতের মুখোমুখি ঠেলে দেয়া থেকে বিরত থাকা হোক। বলার অপেক্ষা রাখে না, আজ আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলেও একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতো, যা বিএনপি করছে এই ইস্যুতে। দেশটি আগে দাঁড়াক। তারপর আমরা ব্রিটিশ কিংবা আমেরিকান গণতন্ত্রের ধারক হই।
নিউইয়র্ক , ১ জুন ২০১১
——————————————————————————দৈনিক ভোরের কাগজ / ঢাকা / ৩ জুন ২০১১ শনিবার প্রকাশিত
ছবি- বেন জাবিক
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০১১ ভোর ৫:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



