somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ফকির ইলিয়াস
আলোর আয়না এই ব্লগের সকল মৌলিক লেখার স্বত্ত্ব লেখকের।এখান থেকে কোনো লেখা লেখকের অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা, অনুলিপি করা গ্রহনযোগ্য নয়।লেখা অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা করতে চাইলে লেখকের সম্মতি নিতে হবে। লেখকের ইমেল - [email protected]

প্রবাসে উত্তর প্রজন্মের জন্য অগ্রজদের ভূমিকা

০২ রা জুলাই, ২০১১ সকাল ৯:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রবাসে উত্তর প্রজন্মের জন্য অগ্রজদের ভূমিকা
ফকির ইলিয়াস
========================================
নিউইয়র্কে থাকেন কবি শহীদ কাদরী। তাঁর সঙ্গে প্রায়ই কথা হয়। তাঁর একটা স্বপ্ন আছে। আর তা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে একটা বড় বাংলা লাইব্রেরি হবে। কবি বলেন, এখানে অনেক সামাজিক সংগঠন তাদের নির্বাচনের নামে লাখ লাখ ডলার খরচ করেন। তারা সবাই মিলে ডলার তোলে একটা ‘বাংলাদেশ ভবন’ কেন কেনে না? একটা বাংলা লাইব্রেরি কেন গড়ে তোলে না?
কবি বলেন, আর কিছু না পারলে এখানের পাবলিক লাইব্রেরিগুলোতে বাংলা বই প্রচুর পরিমাণে ডোনেট করার ব্যবস্থা হোক। এক একটি ‘বাংলা বইয়ের রেক’ গড়ে তোলা হোক। এতে বাঙালি জাতিসত্তার গৌরবোজ্জ্বল বিষয়ের ইংরেজি বইগুলোও দান করা হোক। বিদেশে বাঙালি প্রজন্ম তাদের শিকড়ের প্রকৃত সন্ধান পাবে।
কবির স্বপ্ন আমাকে ভাবায়। ঠিকই বলছেন তিনি। পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। প্রবাসে সামাজিক সংগঠনগুলো কী করছে? পিকনিক, ইফতার পার্টি, মেলা, নির্বাচন করে লাখ ডলার খরচ করা হচ্ছে। অসুস্থ প্রতিযোগিতার পসরা বাড়াচ্ছে। অথচ এই প্রবাসী প্রজন্ম অনেক সমস্যা জর্জরিত। এর কিছু ঘটনা এখানে তুলে ধরা যাক।
কেস স্টাডি- এক.
প্রবাসের একটি পরিবারের টিনএজ মেয়ে। মা-বাবার সঙ্গে মেয়েটি বাঙালিদের কোনো অনুষ্ঠানে যায় না। স্কুল থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় দেরি করে ফিরে। বান্ধবীদের বাসায় যাচ্ছে বলে প্রায় সময়ই বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে সে খোঁজখবর মা-বাবা রাখেন না। তারা জানেন না মেয়েটির বন্ধু-বান্ধবীই বা কে। একবার মেয়েটি হঠাৎ উধাও হয়ে গেলো। দুই সপ্তাহ তার কোনো খোঁজই পেলেন না মা-বাবা। পুলিশের খাতায় মেয়েটির লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার সংবাদ লিপিবদ্ধ করা হলো। পরে জানা গেলো মেয়েটি তার এক বন্ধুর সঙ্গে অন্য একটি অঙ্গরাজ্যে অবস্থান করছে।
কেস স্টাডি- দুই.
টিনএজ ছেলেটির কোমরে দামি সেলুলার ফোন। বোহেমিয়ান বেশভূষা। স্কুল কামাই করা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মধ্যরাতে বাসায় ফিরে। অন্ধকার সরু গলির কর্নারে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে দেখা যায় তাকে। জটলা পাকিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে নেশার পাইপে কড়া দম নিতে দেখা যায়। মা-বাবা বলেন তাদের আদরের ছেলেটি সিগারেট পর্যন্ত স্পর্শ করে না। অথচ তারা জানেন না, বা বোঝার চেষ্টা করেন না তাদের ছেলেটি সিগারেটের চেয়েও আত্মঘাতী মরণনেশায় দম নিচ্ছে প্রতিদিন।
কেস স্টাডি তিন.
মেয়েটির বেপড়োয়া আচরণ সামাল দিতে না পারায় বাবাকে একদিন তার গায়ে হাত তুললেন। মেয়েটি এখন আর ছোট নয়। তার বয়স চৌদ্দ বছর। সে পুলিশে ফোন করে। পুলিশ এসে তার বাবাকে গ্রেপ্তার করে আর মেয়েটিকে নিয়ে যায় সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে।
এ তিনটি ঘটনা নিউইয়র্কে ঘটে যাওয়া বাস্তবচিত্র। অভিবাসী সংসারে অনেক ঘটনাই ঘটে যাচ্ছে। যা পত্র-পত্রিকায় খবর হয়ে আসছে। আবার অনেক কিছু থেকে যাচ্ছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। অনেকে জানতেও পারছে না কি ঘটছে প্রবাসে বাঙালিদের সংসারে। একটি সমাজে যখন জনসংখ্যা বাড়ে তখন বেড়ে যায় সামাজিক সংকটও।
এমনি অনেক সংকটের মুখোমুখি এখন প্রবাসে বাঙালিরা এবং তাদের উত্তর প্রজন্ম। তাই বলে যে আশার ধ্বনি নেই, তা বলা যাবে না। প্রতি বছরই স্কুল এবং কলেজগুলোতে প্রচুর ছাত্রছাত্রী বেশ ভালো ফলাফল করেছে। এদের কেউ কেউ মূলধারার পত্র-পত্রিকায় শিরোনাম হয়ে এসেছে। তাদের কৃতিত্ব আলোচিত হচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
পিতা-মাতাই হচ্ছেন সন্তানের প্রথম এবং প্রধান বন্ধু। বাঙালি সমাজে লক্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে পিতা-মাতার সঙ্গে তার সন্তানের একটি দূরত্ব থেকে যায় সম্পর্কের। ফলে সামাজিক অথচ জরুরি অনেক বিষয় সন্তান জিজ্ঞাসা করতে পারে না মা-বাবাকে। আর এভাবে মা-বাবারা হয়ে যান সন্তানের প্রভু। ক্রমশ এ অবস্থাটি সন্তানদের অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে ঠেলে দেয়। এক সময় সন্তান শুধু অবাধ্য নয় বরং নাগালের বাইরে চলে যায়। চলে যেতে বাধ্য হয়।
বিভিন্ন সামাজিক সংকট রোধে, প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করে শিকড়ের সন্ধান দিতে প্রবাসের সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে এ ব্যাপারে ছোট-বড় প্রায় প্রতিটি সংগঠনই বেশি উদাসীন। তাদের এমন অনীহা খুব দুঃখজনক। অথচ তারা চাইলে সম্মিলিতভাবে হলেও সেমিনার-সিম্পোজিয়াম আয়োজন করে প্রবাসে গণসচেতনতা গড়ে তুলতে পারে।
বাঙালি জাতির একটি নিজস্ব সামাজিক রীতিনীতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং কৃষ্টি আছে। যেহেতু আমরা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছি, যেহেতু আমাদের প্রজন্ম এখানে বড় হচ্ছেÑ তাই আমাদের এ দেশের মূলধারার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করেই বাঙালিত্বের সভ্যতা-সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হবে। বাংলাদেশে অবস্থানকালীন মানসিকতা নিয়ে তা সম্ভব নয়। আবার অতি উগ্র সভ্যতায় গা ভাসিয়ে দেয়াও আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
প্রবাসের বিভিন্ন সংগঠন সামাজিক উন্নয়নে, বাংলাদেশের জাতীয় প্রয়োজনে, বিভিন্ন অঞ্চলের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে নিরন্তর। বিশেষ করে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর প্রশংসনীয় কর্মকন্ড আমাদের চমৎকৃত করছে বারবার।
প্রবাসে রয়েছে বেশ কিছু সৃজনশীল সংগঠন। এরা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন কর্মকা- করে আসছে জন্মলগ্ন থেকে। বিশেষ করে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বৃত্তি প্রদান, দুর্গত অঞ্চলে অর্থ এবং দ্রব্যসামগ্রী পাঠানোর মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ, দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সার্বিক সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান অন্যতম। তবে দুঃখজনক কথা হচ্ছে, চেয়ারের লোভে কেউ কেউ সংগঠন ভাঙার কারিগর হিসেবেও কুখ্যাতি পেয়েছেন বিদেশ বিভুঁইয়ে।
বাংলাদেশের জন্য এবং প্রবাসে আমাদের উত্তর প্রজন্মের জন্য কাজ করতে যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। এই তাড়না আমরা বারবার অনুভব করছি। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে তারপরও আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি না। কেন পারছি না, এই প্রশ্নটি সবার নিজ বিবেককে জিজ্ঞাসা করা দরকার। বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন মত থাকবে। কিন্তু বৃহত্তর উন্নয়নের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মানসিকতা অবশ্যই থাকতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিবাসী জীবনে প্রজন্মের সংকটের কিছু উদাহরণ নিবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করেছি। এসব বিষয় আমাদের চেতনায় জাগ্রত হওয়া দরকার। যে পিতা-মাতা শুরু থেকে তার সন্তানকে আদরের নামে অপসভ্যতার প্রশ্রয় দিচ্ছেন তারা কি ভুল করছেন তা বুঝতে পারবেন কয়েক বছর পরেই। তখন মাথায় হাত দিলেও কোনো কাজ হবে না। তাই যতো শিগগির সম্ভব সবার বোধোদয় প্রয়োজন। আর এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে সামাজিক, আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। গ্রীষ্মকালীন অবকাশে শিক্ষা সফরের আয়োজন, ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করে তাদের সঙ্গে মতবিনিময়, মত প্রকাশের ব্যবস্থা করলে এই দূরত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব। মনে রাখতে হবে যারা বাংলা ভাষা পড়তে পারে না, তাদের কাছে আমাদেরকেই পৌঁছে দিতে হবে বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য। সবশেষে আবারো বলি, বিশ্বের প্রতিটি দেশে বাঙালিরা যে যেখানে আছেন , তারা কি নিজ নিজ উদ্যোগে এক একটি ‘বাংলা লাইব্রেরি’র বিশাল সমাহার গড়ে তুলতে পারেন না? হ্যাঁ, পারবেন যদি নিঃস্বার্থভাবে ঐক্যবদ্ধ হন। আমরা কি পারবো না আমাদের উত্তর প্রজন্মের জন্য এই ত্যাগটুকু স্বীকার করতে?
২৯ জুন, ২০১১
-------------------------------------------------------------------------------
দৈনিক ভোরের কাগজ / ঢাকা । ২ জুলাই ২০১১ শনিবার

ছবি- অর্চ ম্যাকডোনাল্ড
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০১১ সকাল ৯:১১
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×