somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ফকির ইলিয়াস
আলোর আয়না এই ব্লগের সকল মৌলিক লেখার স্বত্ত্ব লেখকের।এখান থেকে কোনো লেখা লেখকের অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা, অনুলিপি করা গ্রহনযোগ্য নয়।লেখা অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা করতে চাইলে লেখকের সম্মতি নিতে হবে। লেখকের ইমেল - [email protected]

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তরুণ প্রজন্মের উচ্চকিত হাত

২৮ শে অক্টোবর, ২০১১ সকাল ৭:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তরুণ প্রজন্মের উচ্চকিত হাত
ফকির ইলিয়াস
=========================================
বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দাবি সাঈদী-নিজামী গংকে মুক্তি দিতে হবে। খালেদা জিয়ার ভাষায় এরা যুদ্ধাপরাধী কিংবা মানবতাবিরোধী কোন কাজ করেননি। এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানে সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, নিজামী যুদ্ধাপরাধী কি না! 'ইয়েস অর নো' বলেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমি 'ইয়েস অর নো কিছুই বলব না। আমি তো রাজনীতি করি।'
টিভিতে সে পর্বটি দেখলাম। কী চমৎকার রাজনীতি করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব! বিএনপির আসল উদ্দেশে ক্রমেই বেরিয়ে পড়েছে। তারা যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য তথাকথিত আন্দোলন, রোডমার্চ করছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখছে না।
বাংলাদেশের মানুষ ১৯৫২ সালে একটি চরম ভাষা বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। মাতৃভাষা কেড়ে নিয়ে অন্য ভাষা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল মুসলিম ব্রাদারহুড খ্যাত মুহম্মদ আলী জিন্নাহ। পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত জিন্নাহ ব্যক্তিগত জীবনাচার ছিল পাশ্চাত্য ধাঁচের। তিনি মাথায় একটি কালো টুপি পরতেন। এটাকে 'জিন্নাহ টুপি' বলে খ্যাতি দিয়েছিল তার অনুসারী-ভক্তরা। ব্যক্তিগত জীবনে জিন্নাহ ধর্মপরায়ণ না হলেও তার বাহ্যিক লেবাসে তা দেখানোর চেষ্টা করতেন। তা দেখে ব্রিটিশ লর্ডরা হাসাহাসি করতেন।
সেই জিন্নাহ ভাষার পাথর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বাঙালি জাতির বুকে। এর পরের ঘটনা সবার জানা। বাঙালি জাতি রক্ত দিয়েছে। মাতৃভাষার অধিকার, রাষ্ট্রভাষার স্বাধীন ক্ষুণ্ন হতে দেয়নি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম এরই ধারাবাহিক ঘটনা।
যারা বাংলাদেশে আজ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করছে, একাত্তরে তারাই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অভ্যুদ্বয়ের চরম বিরোধিতা করেছিল। শুধু তা-ই নয়, তারা সশস্ত্রভাবে পশ্চিমা হানাদারদের সহযোগিতা করেছিল। লুটপাট, ধর্ষণ, খুন, অগি্নসংযোগ করেছিল। রাজাকার, আলবদর বাহিনী বাংলাদেশে কী কী হীনকর্ম করেছিল তা আমরা প্রত্যক্ষদর্শীরা খুব ভালো করেই মনে রেখেছি।
সম্প্রতি একটি জনসভায় বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, 'মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ করে এদেশের মানুষকে মুক্ত করব।'
বেগম জিয়া একাত্তরে ছিলেন মেজর জিয়ার সহধর্মিণী। একজন গৃহবধূ। তিনি 'মুক্তিযুদ্ধ করেছেন' কি না, সে তর্কে আমি যেতে চাই না। তবে অন্যান্য সেক্টর কমান্ডারের মতো একজন সেক্টর কমান্ডার তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি 'অন বিহাফ অফ আওয়ার গ্রেট লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান' পাঠ করেন জিয়াউর রহমান। ঐতিহাসিকভাবে এটা বিশেষ কোন সাক্ষী বহন করে না। কারণ কোন দেশে ঘোষণা পাঠক কোনমতেই ইতিহাসের নায়ক হন না, হতে পারেন না। তাছাড়া জিয়া ওই সময়ে রাষ্ট্রের একজন সৈনিক ছিলেন, রাজনীতিবিদ ছিলেন না।
সে যা-ই হোক, বেগম জিয়া একজন গৃহবধূ হিসেবে ১৯৭১ সালের 'মুক্তিযুদ্ধ' প্রত্যক্ষ করেছেন, তা আমরা ধরে নিতে পারি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে তিনি কি একাত্তরের নারী ধর্ষণ, গণহত্যা, লুটপাট, অগি্নসংযোগ এসব কিছুই দেখেননি? না কি দেখেও এখন মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন? কেন নিচ্ছেন?
বেগম জিয়া তার রোডমার্চের বিভিন্ন জনসভা-পথসভায় নতুন প্রজন্মের সমর্থন পাওয়ার জন্য নানা রকম চেষ্টা করছেন, বক্তব্য রাখছেন। এ বিষয়ে আমি কিছু স্মৃতিচারণ করতে চাই। স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর নির্বাচনে জিতে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দিতে বেগম জিয়া নিউইয়র্কে আসেন। ঘাতক রাজাকারদের অন্যতম নেতা গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ও ঘাতক দালালদের বিচারের দাবিতে গোটা বিশ্বের বাঙালি তখন আন্দোলনে মুখর।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে 'ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়েছে।' আমি তখন একজন টগবগে তরুণ। যুক্তরাষ্ট্রে এই কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সহকারী সদস্য সচিবের দায়িত্ব তখন আমার ওপর ন্যস্ত। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিউইয়র্ক আগমন উপলক্ষে এ কমিটির যুক্তরাষ্ট্র শাখা বেগম জিয়ার সমাবেশের বাইরে বিশাল বিক্ষোভের আয়োজন করে। সেই উন্মাতাল দিনগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই শহীদ জননীর সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়। তিনি আমাকে বলেন, 'তোমরা বেগম জিয়াকে জিজ্ঞাসা কর, তিনি গোলাম আযমের বিচার করবেন কি না?'
মনে পড়ছে নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলের সামনে বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ির বহর আটকে দিয়ে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করেছিল সেদিন নিউইয়র্কের আকাশ, আমার মতো শত শত তরুণ। বেগম জিয়া পেছনের দরজা দিয়ে প্লাজা হোটেল ত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন।
এরপরে ছিল বেগম জিয়ার প্রেসব্রিফিং। সেখানে একজন সাংবাদিক হিসেবে উপস্থিত থাকার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমি বেগম জিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'শহীদ জননী বেগম জাহানারা ইমাম জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করেছেন। তিনি ঘাতক-দালাল রাজাকারদের বিচার দাবি করছেন। আপনার সরকার খুনি চক্রের হোতা গোলাম আযমের বিচার করছেন না কেন?'
প্রশ্নটি শোনার পর তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন খালেদা জিয়া। তিনি বলতে থাকেন, 'জাহানারা ইমাম কে? গণআন্দোলন করার তিনি কে? তিনি কি করেছেন দেশের জন্য?'
আমি আমার প্রশ্নের উত্তর চাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তিনি তা এড়িয়ে যান। অথচ আমরা জানি এবং চিনি জাহানারা ইমামকে! শহীদ রুমীর আম্মা জাহানারা ইমাম একাত্তরে কী করেছেন, তার সাক্ষী 'একাত্তরের দিনগুলি'।
আমার খুব মনে পড়ে, শহীদ জননীই সর্বপ্রথম বলেছিলেন তরুণ প্রজন্ম চাইলেই এই বাংলার মাটিতে ঘাতক দালালদের বিচার হবে। হ্যাঁ, এই তরুণ প্রজন্মই তা চেয়েছে এবং গত নির্বাচনে সে কারণেই মহাজোট সরকারকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে।
আজ ২০১১ সালে আমরা দেখছি, সেই সাঈদী-নিজামী যুদ্ধাপরাধী নয় বলে ফতোয়া দিচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। তার এই ফতোয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানো এবং এদের সঙ্গে গাঁটছাড়া বেঁধে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া। চিহ্নিত রাজাকারদের মন্ত্রী বানানোর পরও বেগম জিয়ার সাধ পূর্ণ হয়নি। এবার তিনি এদের সহায়তার দেশকে জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিণত করতে চান।
মনে পড়ছে, দেশে-বিদেশে যখন গণআদালত ইস্যু অত্যন্ত তুঙ্গে, তখন এ তরুণ প্রজন্মেরই কয়েকজন তরুণ শহীদ জননীকে বলেছিল, মা আপনি হুকুম করুন, আমরা ক্ষুদিরাম হতে চাই। একাত্তরের ঘাতক আলবদরদের হত্যাকা-ের প্রতিশোধ নিতে চাই। শহীদ জননী এদের এই বলে নিবৃত্ত করেছিলেন, কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়- বরং এই বিচার সংগঠনের লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে সেই ঐক্যের ফসল ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল।
বিএনপি চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক বলেছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে যদি রাজনীতিকদের শাস্তি দেয়া হয় তবে ঘরে ঘরে আগুন জ্বলবে। প্রশ্ন হচ্ছে, কে রাজনীতিক? কিসের রাজনীতিক? এরা কার জন্য রাজনীতি করছে? মনে রাখা দরকার, হিটলারও তো নিজেকে রাজনীতিক দাবি করতেন, অথচ তিনি ছিলেন ইতিহাস স্বীকৃত খুনি।
তরুণ প্রজন্ম অতীতে ভুল করেনি। আগামীতেও করবে না। তারা রাজাকার-আলবদরদের মনে প্রাণে ঘৃণা করছে। আগামীতেও করবে। খালেদা-মির্জা ফখরুল-জয়নুল ফারুকরা যে পক্ষপাত দেখাচ্ছেন, তা তাদের আজন্ম পাপের ধারাবাহিকতা। সময় তাদের মুখোশ আরও উন্মোচন করবে, সন্দেহ নেই।
নিউইয়র্ক, ২৬ অক্টোবর-২০১১
-------------------------------------------------------------------------------
দৈনিক সংবাদ / ঢাকা/ ২৮ অক্টোবর ২০১১ শুক্রবার প্রকাশিত





২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×