ফকির ইলিয়াস
=======================================
মহান ফেব্রুয়ারি মাস শুরু হয়েছে। আমাদের জীবনে আরো একটি একুশে জানান দিচ্ছে আমাদের উত্থানের কথা। একুশ এলেই আমি অনেকটা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ি। নিজের কাছে নিজে শাণিত হই। একুশ পালনে নিজের প্রস্তুতি সারি।
জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে এবার বহুভাষিক কবিরা কবিতা পড়বেন ২০ ফেব্রুয়ারি সোমবার বিকেলে। স্থায়ী মিশনের কালচারাল মিনিস্টার বিশিষ্ট নাট্যজন, সাহিত্যিক মমতাজউদ্দীন আহমদ ফোন করেছিলেন। বললেন, কবিতা পড়তে হবে। বললাম, জি, পড়বো। ২০টি দেশের কবিরা কবিতা পড়বেন সেদিন। জাতিসংঘ চত্বরে আমি প্রায়ই যাই। বিভিন্ন দেশের পতাকার পাশাপাশি বাংলাদেশের যে পতাকাটি পত পত করে উড়ছে, তার ছায়ায় গিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে অথবা বসে থাকি। মনে পড়ে আজ থেকে প্রায় ২৮ বছর আগে প্রথম যেদিন জাতিসংঘ চত্বরে গিয়ে ঐ পতাকার ছায়ায় দাঁড়িয়েছিলাম, তখন প্রাণভরে খুব কেঁদেছিলাম। কেন কেঁদেছিলাম আমি? সেই প্রশ্নটির উত্তর আজো খুঁজে বেড়াই।
আমরা জানি, যারা বাঙালি জাতিসত্তাকে শোষণ করতে চেয়েছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতির কণ্ঠ রুদ্ধ করে দেয়া। প্রজন্মকে গুঁড়িয়ে দেয়া। তা না হলে একই রাষ্ট্রের একটি অংশীদার অংশ, অন্য সমান অংশীদারের ওপর এমনভাবে আক্রমণাত্মক হতে যাবে কেন? ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের কাছ থেকে যখন পাকিস্তান স্বাধীন হয়, তখন তো ভাবা যায়নি পশ্চিম পাকিস্তানিরা চাইবে উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। জনসংখ্যার দিক দিয়েও বাঙালিরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। যদি রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে গণভোট হতো তবুও বাংলাভাষাই জিতে যেতো। বাঙালিরাই জিতে যেতেন। না, পশ্চিমারা সে সুযোগও দেয়নি। তারা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। বাঙালি জাতিকে, বাংলা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষিকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র সেদিনই শুরু হয়েছে। সেভাবেই শুরু হয়েছে।
ভাবতে অবাক লাগে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত দুই যুগ সময় বাঙালিরা পাকিস্তানিদের পেশি শাসন মেনে নিয়েছিলেন। শোষণের যতো কলাকৌশল, সবই প্রয়োগ করেছিল পাকিস্তানিরা। ভাষা, সংস্কৃতি, চাল-চলন, খাদ্যাভ্যাস, মানসিকতা কোনো দিকেই পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো মিল ছিল না এবং নেই। তার পরও ‘হাম মুসলিম’ ‘তুম ভি মুসলিম’ এই দোহাই দিয়ে জিন্নাহ, লিয়াকত আলীরা চেপে বসেছিলেন বাঙালি জাতিসত্তার বুকের ওপর। আমার বারবারই মনে হয় ১৯৪৭ সালেই বাঙালি জাতির, বাংলা সভ্যতা-সংস্কৃতির একটি ভূখ- জন্ম নেয়াটা খুব প্রয়োজন ছিল। পাকিস্তানিদের সঙ্গে রাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব মেনে নেয়াটা ছিল রাজনৈতিক মহাভুল।
রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার ঘোষণা দিয়ে তারা ‘স্টোন টেস্ট’ করেছিল। কিন্তু প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে বাঙালিরা। অনেক রক্ত এবং প্রাণের বিনিময়ে বাংলা বাঙালিদের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই রাষ্ট্রে দুটি রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার মাধ্যমে মূলত তারা সেদিন নিজেদেরকে আলাদা করে নিয়েছিল। শুধু ঝুলে থেকেছিল বাংলা ভূমি থেকে শোষণ কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। কলার ছড়িতে বাদুড় যেমন ঝুলে থাকে।
বলতে দ্বিধা নেই, বাঙালি জাতির সে সময়ে রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেওয়ার মতো সাহসী নেতৃত্ব ছিল না। যারা ছিলেন তারা ছিলেন দ্বিধাদ্বন্দ্বে। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণে ’৫২তে মায়ের ভাষা কেড়ে নেয়ার চক্রান্ত হওয়ার পরও ‘স্বাধীন রাষ্ট্র চাই’- এই ঘোষণা সে সময়ের বাঙালি নেতৃবৃন্দ দিতে পারেননি। যারা একটু সোচ্চার হতে চেয়েছেন তাদেরকেই একটু ক্ষমতা, সামান্য বিত্ত-বৈভব দিয়ে থামিয়ে দেয়া হয়েছে।
একজন শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম নিতে কিংবা গড়ে উঠতে একাত্তর পর্যন্ত সময় নিতে হয়েছিল। বাঙালি জাতি যখন বুঝতে পেরেছিল এই জাতির আকাশে একটি নক্ষত্র জন্ম নিয়ে নিয়েছে, তখনই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে জাতি দেরি করেনি। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পরও যারা পশ্চিমা শোষকদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে রাজনীতি করতে চেয়েছিলেন কিংবা আত্মীয়তা করে পাকিস্তানের একাংশের ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন তাদের ধ্যান-ধারণা ভেঙে খান খান করে দিতেই এগিয়ে এসেছিলেন একজন বঙ্গবন্ধু, একজন শেখ মুজিব।
একুশের যে চেতনা ছিল তা ছিল একটাই। মাথা নত না করা। বাঙালি জাতি মাথা নত না করেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই চেতনায়ই অর্জিত হয়েছিল বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-বিজয়। দুঃখের কথা, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনেরও স্বদেশী, স্বজাতি বিরোধিতাকারী ছিল। সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে অনেক পরিবার ছিল যারা বাঙালি হলেও তাদের পারিবারিক, ব্যবহৃত ভাষা ছিল উর্দু।
রাষ্ট্রভাষা, ’৫২-এর পর বাংলা হলেও পশ্চিমারা কিন্তু দমে থাকেনি। দেশে মাদ্রাসা শিক্ষার নামে যে শিক্ষালয়গুলো গড়ে উঠেছিল ঐসব মাদ্রাসায় উর্দুই ছিল পঠিত প্রধান ভাষা। আমরা দেখেছি, নামীদামি ওলামারা কোনো ফতোয়া লিখে দিলেও তা লিখে দিতেন উর্দুতে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও মাদ্রাসার কারিকুলামে উর্দু রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে উর্দুতে আল কুরআন-হাদিসের বয়ান বিস্তৃতভাবে আছে। তাই সে ভাষায় গ্রন্থগুলোই মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য বেশি সহায়ক। উর্দুপ্রীতি প্রতিষ্ঠায় এই যে উদ্যোগ তা কিন্তু থেমে থাকেনি। শিক্ষার্জনের নামে, ধর্মীয় বিষয়াদি বিস্তারিত জানার নামে উর্দুতে লেখা বিশদ ভলিউমগুলো আলেম, ফাজেল, কামেল ক্লাসে পড়ানো হয়েছে এবং হচ্ছে। অথচ আল কুরআন-হাদিসের খুঁটিনাটি বিষয়ের বড় বড় ভলিউম ইংরেজি এবং বাংলায়ও প্রকাশিত হয়েছে।
আমি মনে করি, বাংলাদেশে সেকেন্ড লেংগুয়েজ হিসেবে ইংরেজিই হওয়া উচিত। কারণ বিশ্ব এখন ইংরেজি নির্ভর। জ্ঞানবিজ্ঞান প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগুচ্ছে বিশ্ব। তা ছাড়া অর্থনীতিও নিয়ন্ত্রণ করছে ভাষাকে। একজন মার্কিনি ব্যবসায়ী ব্যবসার প্রয়োজনে, বেশি অর্থ মুনাফার প্রয়োজনে চাইনিজ কিংবা জাপানি ভাষা শিখার জন্য দৌড়াচ্ছেন পিকিং কিংবা টোকিওতে। শুধুমাত্র দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে অর্থ বাণিজ্য সুপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘স্প্যানিশ’ ভাষাকে রাষ্ট্রের সেকেন্ড লেংগুয়েজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছে।
না, আজকের বাংলাদেশে শুধুমাত্র বাংলা ভাষা নির্ভর হয়েই বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ আর নতুন প্রজন্মের নেই। রাষ্ট্রভাষা, মাতৃভাষার প্রতি যথার্থ সম্মান অবশ্যই থাকবে। তবে যতো বেশি ভাষা শিখতে পারবে সেই প্রজন্ম হবে ততোই আলোকিত। হাঁ, তা হতে হবে সৃজনশীলতার প্রয়োজনে। কোনো উগ্র উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়।
এই যে উগ্র-উপনিবেশ কিংবা অন্য কোনো দাঁতাল শক্তির আগ্রাসনের কথা বলছি- সেই শক্তিটিই কিন্তু আজো বাংলাদেশ, বাংলার মেধা, বাংলা সংস্কৃতিকে হত্যা করতে তৎপর। যারা ’৫২তে বাংলা ভাষার বিরোধিতা করেছিল, যারা একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তাদের উত্তরসূরিরাই এখনো বাংলাদেশকে হিংস্র দাঁত দেখাচ্ছে।
এর কিছু উদাহরণ এখানে দেয়া যেতে পারে। বিএনপির একজন রাজনীতিবিদ এখন জেলে আছেন তার নাম সাকা চৌধুরী। চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের উপদেষ্টা সাকা চৌধুরী প্রায়ই জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় সংস্কৃতিকে কটাক্ষ করে কথাবার্তা বলেছেন। জানা যায়, এখনো নাকি তার পারিবারিক ভাষা উর্দু! বাংলাদেশে এখনো নাকি এমন আরো কিছু পরিবার রয়েছে ! অন্যদিকে আমরা এটাও দেখছি, ভাষার প্রচারের নামে একটি বেনিয়া গোষ্ঠী দেশে মুনাফার বিভিন্ন উচ্চ বাণিজ্যের পসরাও সাজিয়ে বসেছে। বাংলিশে এসএমএস কে প্ররোচিত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বিভিন্ন টেলি কোম্পানিগুলো। দেশের আইনি ব্যবস্থায় ইংরেজির ব্যবহারের কথা আর না হয় নাই বললাম।
বাংলাদেশে এখনো অনেক চরিত্র রয়ে গেছে যা সেই কায়েমি স্বার্থবাদী শক্তির প্রতিকৃতি। যে কায়েমি স্বার্থবাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। খুবই দুঃখ এবং লজ্জার কথা এই অপশক্তির ছায়া এখনো বাংলাদেশে, বাঙালি জাতির মাঝে থেকে গেছে। এবং মাঝে মাঝে মহড়ার দাপট দেখাচ্ছে। তারা কোনো নিয়মনীতিই মানছে না। মানতে চাইছে না।
বাঙালি জাতি সবসময়ই বহন করেছে উত্থানের সুযোগ্য উত্তরাধিকার। রবীন্দ্র, নজরুল, তিতুমীর সূর্যসেন, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, শেখ মুজিবরা আবির্ভূত হয়েছেন যুগে যুগে। দুচার জন মীরজাফর যে পথের কাঁটা হয়নি- তা কিন্তু নয়। কিন্তু সেই বিচ্ছিন্ন অপশক্তি অগ্রসরমান প্রজন্মের পথ আটকাতে পারেনি। আর পারেনি বলেই এখনো বাংলাদেশে হাজারো তরুণ-তরুণী একুশে উৎসব, নজরুল উৎসব, রবীন্দ্র উৎসব, হেমন্ত উৎসব, বসন্ত বরণের উৎসবে রাজপথে নেমে আসেন। এখনো বৈশাখি মেলায় প্রাণ খুলে গান গেয়ে যান বিবাগী বাউল। এখনো বইমেলায় প্রাণের উচ্ছলতা নিয়ে ছুটে আসে এই প্রজন্ম। এখনো কৃষকের হাতের জোয়াল সন্ত্রাসীর কাটা বন্দুকের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। একুশ বাঙালি জাতিকে রুখে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। এই রুখে দাঁড়ানো স্বাধিকার আদায়ের প্রয়োজনে। অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে। প্রভাতফেরির পুষ্পার্ঘ্যশক্তির কাছে, সব অপশক্তি হার মানবেই। প্রজন্ম এগিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে সেই বজ্রসাহস নিয়েই। এই যে চেতনা, তা ধরে রেখেই সামনে এগোতে হবে। বিশ্বের যে কোনো ভাষা রপ্ত করা এখন দরকারি বিষয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে বাঙালি সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সভ্যতা ও ঐতিহ্যের যে বহমান ধারা, তা-ই হতে হবে বাঙালি জীবনের মূলস্রোত। দেশে কিংবা অভিবাসে, যেখানেই হোক।
২ ফেব্রুয়ারি, ২০১২
---------------------------------------------------------------
দৈনিক ভোরের কাগজ / ঢাকা / ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২ শনিবার প্রকাশিত
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১২ সকাল ৮:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


