লড়াই - পর্ব০১
লড়াই
ফকির আবদুল মালেক
রুটির শেষ টুকরাটি নিয়ে, টম কিং, ধীরে আর গভীর মনযোগের সহিত মাংসের ঝোলটুকু মুছে নিয়ে যখন মুখে পুড়ল, তখন তার দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা বইয়ে গেল নি:শব্দ। খাবার টেবিল থেকে যখন উঠল সে, তখনও সে দমন করল প্রচন্ড ক্ষুধার অনুভূতি। যদিও সে একাই খেল। দুটি বাচ্চাকে তাড়াতাড়ি ঘুম পড়িয়ে রাখা হলো পাশের রুমে যাতে বাচ্চারা টের না পায় যে, তারা কিছুই খায়নি। তার স্ত্রী কিছুই স্পর্শ করেনি, নিরবে বসে রইল আর উৎসুক নেত্রে তাকে অবলোকন করে গেল। মহিলা পাতলা ধরনের, নিচু স্তরের কাজের লোকের মত দেখতে যদিও চেহারা থেকে একটি সৌন্দর্যের রেখা এখনও চলে যায় নি। প্রতিবেশীর কাছ থেকে সে মাংসের ঝোলটুকু ধার করে এনেছে। হাতে থাকা শেষ টাকাটি আটা কিনতে শেষ হয়ে গেছে তার।
বারান্দায় রাখা নড়বড়ে চেয়ারে বসল যখন টম, চেয়ারটি আর্তনাদ করে উঠল যেন, কড়কড় শব্দে। তার গতিবিধি ধীর, দৈতের মতো দেহ, নিজের বাহুর মাংসপেশীকে এখন তার বোঝা মনে হলো। তার দৈহিক গঠন ছিল লোহার মতো দৃঢ় আর বলিষ্ট এবং সে কখনো এ ধরনের পরিস্থিতির কথা কল্পনাও করেনি। তার পোশাক একেবারে নোংরা আর জুতা জোড়া এখন আর তার ভার সহ্য করতে পারছে না বলে মনে হয়, কয়েক জায়গায় ছিড়ে যায় যায় করছে।
কিন্তু টমের চেহারাটা বিজ্ঞাপিত করছে সে কি ছিল। মুখমন্ডলখানি একজন প্রতিনিধি স্থানীয় মুষ্টিযোদ্ধার, যে দীর্ঘ সময় চারকোনাকার রিং-এ থেকে নিজেকে নিবেদন করে গেছে আর নিজেকে একজন জান্তব লড়াকু হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার চেহারাটা ছিল ঝড়ের তান্ডবের মতো রুদ্র আর গোফ-দাড়ীহীন। তার ঠোট ছিল বিকৃত, একটি দীর্ঘ লম্বা গাঢ় কাটা দাগ স্পষ্ট ছিল চেহারায়। তার চোয়াল ছিল আক্রমনাত্মক, জান্তব আর শক্তিশালী। দীর্ঘ লম্বা চুল কাঁদ বরাবর ঝুলে গেছে, কপালের খানিকটা চুল দ্বারা আবৃত আর চোখ দুটি শান্ত ভাবলেশহীন। নির্ভেজাল এক শিকারী জন্তু ছিল সে, চোখ দুটি সব সময় পিটপিট করত। কপালে ঢাকা আর লম্বা কাঁদ বরাবর নেমে আসা চুল, তার চোখ , শক্ত চোয়াল সহ তার পুরো মাথাটা গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে একজন দুর্বৃত্তের মত মনে হয়, মনে হয় যেন শিকারী সিংহের মাথাটি মানুষের দেহের উপর ভর করেছে।
সবমিলিয়ে, তার চেহারাটা অন্ধকার বা নিরব স্থানে দেখলে যে কেউ ভড়কে যাবে। যদিও টম কখনই দুর্বৃত্ত ছিল না, আর কখনোই কোন প্রকার আইন বিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত ছিল না। রিং এর বাইরে, জীবনের পথচলায়, সে কোন মারামারিতে কখনো জড়ায়নি। তাকে কেউ কখনও উগ্রপন্থী কার্যকলাপে কখনও দেখেনি। সে একজন পেশাধারী ফাইটার, তার সমস্ত ক্রদ্ধতা, পাশবিক আচরন ছিল পেশাধারী মনোভাবাপন্ন। রিং-এর বাইরে সে একজন ধীর স্থির মানুষ, তার আচরন উগ্রতাবিহীন। যৌবনের সেই দিনগুলোতে, যখন অর্থের সমাগম ছিল দ্রুতগতিতে তার দিকে ধাবমান, তখনও সে দাম্ভিব ছিল না আর তাই তার কোন শত্রু তৈরী হয়নি। লড়াই ছিল তার পেশা । রিং-এর ভিতর সে প্রচন্ড গতিতে আঘাত করত, অঘাত করত রক্তাক্ত করার জন্য, আঘাত করত ধ্বংসের জন্য। কিন্তু সেখানে কোন পাশবিকতা ছিল না। এটা স্রেফ তার পেশা ছিল। দর্শক চিৎকার করত আর তারা টিকেট কেটে দুজনের নৃশংসতা দেখতো। বিজয়ী জন পেত বড় অংকের টাকার থলে। বিশ বছর আগে, যখন টম উইলিয়ামের মুখোমুখি হয়েছিল, টম জানত উইলিয়াম সবেমাত্র তার চোয়ালটার ধকল সামলে রিং-এ ফিরেছে। টম লক্ষ্য রাখছিল প্রতিপক্ষের চোয়ালটার দিকে কারণ সে জানত উইলিয়ামের মতো প্রতিষ্ঠিত প্রতিপক্ষকে পরাভূত করার এটাই একমাত্র দুর্বলতা এবং নমব রাউন্ডে সে তার চোয়ালটা ভেঙ্গে দেয়। কোন অন্যায় ইচ্ছা তখনো তার কাজ করে নি। সে জানে এটা একটা খেলা আর দুজনই জানে এটা একটা খেলা আর তারা পরস্পরকে আঘাত করার এই খেলাতে মেতে উঠত নানা কৌশলে।
টম কখনো বাকপটু ছিল না, সে বিষন্ন নিরালায় বারান্দায় বসে রইল আর একদৃষ্টিতে হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। হাতের উল্টোপিঠে দীর্ঘ ও ফুলে উঠা রগ ভেসে উঠেছে এবং হাতের আঙুলগুলো পুন:পুন আঘাতে শক্ত ও কদাকার হয়ে উঠেছে। সে কখনো ভাবার সময় পায়নি যে, ধমনীগুলোর জীবনই একজন মানুষের জীবন কিন্তু সে তার ফুলে ফুলে উঠা শিরাগুলো গভীরভাবে লক্ষ্য করল। তার ফুসফুস উচ্চচাপে রক্ত সঞ্চালিত করতে থাকে শিরা-উপশিরাগুলোতে। এখন তার অধিক পরিশ্রমের চাপ সহ্য করা কষ্টসাধ্য মনে হয়। কোন অবস্থাতেই কম পরিশ্রমের কাজ নয়, কোদালে মাটি কাটা কিম্বা হামারের সাহায্যে খনিজ পাহাড় কাটা থেকে, দ্রুত গতির বিশ রাউন্ড। হিংস্র প্রদর্শনী ক্রমাগত হিংস্রতার রূপ নয়, বর্গাকৃতির সেই ষ্টেজটিতে কখনো আঘাত প্রাপ্ত হয়ে দড়িতে আছড়ে পরে কিম্বা নিজেই প্রতিপক্ষকে আঘাত দেয়। হিংস্র এই প্রতিযোগীতা বিশতম রাউন্ড পর্যন্ত টেনে নিয়ে সফল পরিসমাপ্তির দিকে যেতে শরীরের ভিতর এক গভীর চিৎকার অনুভুত হয়। নিজেকে উজার করে দিতে হয় আঘাত প্রাপ্ত হয়ে , প্রতিপক্ষকে আঘাত করতে। সমস্ত শরীর শূণ্য মনে হয়, আর বৃষ্টির ফোটার মতো জলধারা বইয়ে যেতে থাকে, নি:শ্বাসকে রাখতে হয় নিয়ন্ত্রিত। ক্ষীপ্র সেই শরীরে বিশ্বস্ততার সাথে ফুসফুস রক্ত সঞ্চালন করে দ্রুতগতিতে শিরা-উপশিরাগুলোতে। শিরাগুলো তখন ফুলে ফুলে উঠে আর নিয়ন্ত্রিত হয়ে আবার পূর্ববস্থায় চলে যেতে চায় কিন্তু প্রতিবারই সমান্য ফুলে থাকে। সে গভীরভাবে ফুলে উঠা শিরাগুলো দেখতে লাগল। সেই মুহুর্তে তার যৌবনের কিছু চিত্র ভেসে উঠে তার মানসপটে।
ক্ষুধার অনুভুতিতে সে আবার কাবু হয়ে পড়ল।
‘‘ব্লিমি , আমি কি একটুকরা মাংসও পেতে পারি না। ’’ সে বিড়বিড় করতে লাগল, হাতের আঙুলগুলি কুঞ্চিত করে শপথের মতো ভঙ্গি করল।
‘‘আমি চেষ্টা করেছি, মার্কস আর শেলীর দুজনের কাছেই’’ তার স্ত্রী দু:খের সাথে স্বীকার করল।
‘‘আর কেউ রাজি হলো না!’’ টম কিং বিস্মিত হয়ে বলল।
‘‘ধার-দেনা তো আর কম করিনি, ভেবে দেখেছো কত দেনা, কত বড় অংক দেনা করেছি, ভাবলে তুমি অস্থির হয়ে উঠবে।’’
গোৎ গোৎ করে সে ফুলতে থাকল কিন্তু কোন উত্তর দিল না। সে তার যৌবনের দিনগুলোতে জাবর কাটতে লাগল। তার কুত্তাটিকে সে কত মাংস দিত গননাহীনভাবে। মার্কস সে সময় মনকে মন মাংস বাকী দিত। কিন্তু সময় বদলায়। টম কিং, এখন অস্তমিত সময়ে , দ্বিতীয় শ্রেনীর ক্লাবের সে একজন কোচ হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। আর যা আয় হয় তা দোকান বিলের সাথে পাল্লা দিয়ে এগুতে পারে না।
টম কিং সকালে জেগে উঠল এক টুকরা মাংস খাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে এবং তার আকাঙ্খা কিছুতেই কমছে না। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য তার কোন প্রকার প্রস্তুতি ছিল না। অস্টেলিয়ায় এটা অনাবৃষ্টির বছর, এমন কি কোন ধরনের পরিশ্রমের কাজ যোগানও কষ্টসাধ্য। মান সম্মত খাবার যোগাড় করতে পারছিল না, যা যোগাড় হত তা যথেষ্ট ছিল না। মাঝে মাঝে নির্মান শ্রমিকের কাজ যোগাড় করতে পারত এবং খুব সকালে কাজে বেরিয়ে যেতে হতো। অবশেষে অনেক বলে সে দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্লাবের ট্রেইনার হিসাবে যোগদান করে যার বাবদ কিছু অগ্রীম নিয়েছিল সে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা স্থায়ী হয়নি। এটা খুব কষ্টসাধ্য কাজ, তাকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই, তাছাড়া স্ত্রী-দুই সন্তানের খাবারের চিন্তায় সে বিহ্বল ছিল। ফলে যা ঘটার তাই ঘটেছে, কর্তৃপক্ষ তাকে কাজে স্থায়ী করেনি। তার ভাল খাবার গ্রহনের প্রয়োজন ছিল। প্রায় চল্লিশে এসে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সত্যিই কঠিন, যা অনায়াসে বিশে পারা যায়।
‘‘কটা বাজে?’’ টম জিজ্ঞাসা করে।
তার স্ত্রী বাইরে গিয়েছিল খাবরের সন্ধানে এবং ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলো।
‘‘প্রায় আটটা’’ ব্লিমি বলল।
তার পরবর্তী দশ মিনিট নিরবতা ভর করল ঘরটিতে।
‘‘সত্যি কথা, ট্রেইনার হিসাবে আমি মোটেই ভাল নই কিন্তু ফাইট করতে জানি, জিততে জানি আমি, আজ যদি জিততে পারি...’’ টম বলল নিরবতা ভঙ্গ করে।
টম কখনো যাবার সময় চুমু খাবার প্রস্তাবনা করে না- কিন্তু ব্লিমি আজ নিজ বাহুতে টমকে জড়িয়ে ধরল আর চুমুতে চুমুতে আপ্লুত করে ফেলল। বৃহদায়ত দেহের কাছে ব্লিমিকে একজন বালিকার মতো মনে হলো।
‘‘গুড লাক, টম’ সে বলল,‘তুমি পারবে।’
‘আমি পারব’ কথাটি বারবার উচ্চারণ করতে লাগল টম যেন কথাটি প্রতিধ্বনি তুলল তার সমস্ত স্বত্ত্বা জুড়ে, ‘আমি পারব’।
হৃদয় বাহিত নির্মল হাসি হাসল টম, যখন আরো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল, টম ঘর দু'টির দিকে তাকাল। সারা পৃথিবীতে এই দু'টি কক্ষই তার আশ্রয়স্থল, নিজের, তার স্ত্রী আর বাচ্চাদের। এবং সে এটাকে ত্যাগ করছে, তাদের খাদ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। সে বেরিয়ে যাচ্ছে আধুনিক কোন কাজে সন্ধানে নয়, কারখানার শ্রমিক, সড়ক নির্মান শ্রমিক কিম্বা এ জাতীয় কোন কাজে নয়। সে বেরোচ্ছে, বন্য পশু যেমনি শিকারে বেরোয় নিজেদের খাদ্য সংগ্রহের জন্য আর জড়িয়ে পড়ে নানামূখী আক্রমন আর প্রতি-আক্রমনে এবং একে বলা যায় খাদ্য সংগ্রহের জন্য ঝাপিয়ে পরা। ‘আমি পারব’ সে বারবার উচ্চারন করতে লাগল, অবশেষে সে গোয়ারের মতো বলতে লাগল, ‘যদি আমি জিতি, বেশ কিছু টাকা আমার হাতে এসে যাবে- সমস্ত দেনা পরিশোধ করেও থেকে যাবে অনেক। আর যদি হেরে যাই, আমি কিছুই পাব না- এমনকি বাসের ভাড়াটাও আমার হাতে অবশিষ্ট থাকবে না।’’
‘‘ হেরে গেলে প্রাইজমানি পাবে না?’’
‘‘না। এভাবেই , এ শর্তেই আমি রিং-এ ফিরছি। যদি জিততে পারি তবে সমস্ত টাকা আমার আর যদি হেরে যাই তবে ক্লাবের সেক্রেটারী নিয়ে নিবে সব প্রাইজমানি। বিদায় হে আমার পুরানো বন্ধু । যদি জিতি তবেই আমি বাড়ি ফিরব।’’
‘আর আমি তোমার প্রতীক্ষায় থাকব....’ তার স্ত্রী বলল।
পুরো দুমাইল হেটে আসল টম। হাটতে হাটতে তার স্বর্লানী দিনের কথা মনে পরল নানা ভাবে। একদিন সে ছিল হেভী ওয়েট চম্পিয়ন- রিং-এ আসার জন্য ক্যাব ভাড়া করত আর প্রায় সব সময়ই তার কিছু সমর্থক ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তার সাথে গাড়ীতে চড়তে পেরে আনন্দিত হত। আর আজ তাকে হেটে আসতে হলো! এবং যারা জানে তারা বুঝবে যে দু'মাইল হেটে আসাটা এ ধরনের লড়াইয়ের জন্য কতটা ক্ষতিকর। সে একজন প্রবীণ আর পৃথিবী প্রবীণদেরকে স্বাগত জানায় না। এখন সে শ্রমিক শ্রেণীর কাজের উপযুক্ত আর তার ভাঙ্গা নাক ও চেহারায় গভীর ক্ষত যার প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাড়ায়। এক সময় সে ভেবেছিল কোন ধরনের ব্যবসায় জড়াবে। কিন্তু তা দীর্ঘ পথ পরিক্রমনা- কোন একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করা। আর তার আসে পাশে তাকে এ ধরনের উপদেশ দেয়ার কেউ ছিল না, থাকলেও টম কিং এতে কর্নপাত করত কিনা সন্দেহ। টাকা উপার্জন তার জন্য ছিল সহজ। সেটা অন্য উন্মাদনা। বড় অংকের টাকা- একটি সম্মানজনক ফাইট- মাঝে অলস সময়- তোষামদকারী, পিঠ চাপড়ে দেয়া, হাতে হাত রাখা, মাত্র পাঁচ মিনিটের পরিচয়ে তরল পানীয় উপহার দিতে পেরে ধন্য হয়ে যাওয়া লোকের অভাব ছিল না এবং অনেক গৌরব, মানুষের উল্লাসে ফেটে পড়া গ্যালারী, আর রেফারীর উচ্চারণ ‘ আর একটি কিং এর বিজয়।’’ এবং পরদিন খেলার পাতায় তার নাম। কি দিন!!
চলবে............
টম কি পারেব ঘরে ফিরতে আর একটি জয় নিয়ে? কি তার পরিনতি ..... জানতে হলে চোখ রাখুন এই গল্পে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


