somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

@"জাতির পিতা" বিতর্ক: বিভ্রান্তি এবং বাস্তবতা(প্রথমার্ধ)

১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ সকাল ৯:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভূমিকা: "পিতা", পৃথিবীতে আমাদের আগমনের দু'জন মাধ্যমের অন্যতম একজন। হাঁ, আমি এখানে জন্মদাতা পিতার কথা বলছি। প্রকৃত অর্থে পিতা বলতে যা বুঝায় তার সবটুকু অধিকার জন্মদাতা পিতার। বাকী অন্যসব "পিতা"র সম্পর্ক মূলত সমার্থক। পিতা আমাদেরকে এ উপলব্দি এনে দেন যে, কিভাবে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হয়, আর মাতা আমাদেরকে ভালবেসে বেসে বড় করার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন যে, ভালবাসা কাকে বলে। বেঁচে থাকার জন্য এবং পৃথিবীতে নিজ দায়িত্ব পালন করার জন্য মৌলিকভাবে আর কি চাই? সবকিছুই তো এই "বেঁচে থাকার পদ্ধতি" এবং "ভালবাসা"র যৌগিতকায় শামিল হয়ে যায়। মোদ্দাকথা, পিতামাতা দু'জনেই সন্তানের জন্য 'টিকে থাকা ও সফল হওয়া' শিক্ষার প্রশিক্ষক।

পিতা-মাতার রকমফের:
আসল ও মূল অর্থের পিতামাতার বাইরেও মানুষের সমাজে আরো অনেক ধরনের পিতা-মাতার সম্পর্ক প্রচলিত রয়েছে। মাতার ক্ষেত্রে যেমন- ১) সৎ মা, ২) শ্বাশুড়ী মা, ৩) ডাকা মা, ৪) দাদী, নানী, চাচী, খালা ইত্যাদি মা, ৫) আদি মাতা, ৬) পীর মাতা যা আগে ছিল কিনা বলা মুশকিল কিন্তু আজকাল বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায় এবং আরো হয়তো থাকতে পারে কোন কোন সংস্কৃতিতে। এবার আসা যাক পিতার ক্ষেত্রে, এখানে রয়েছে আরো বিস্তৃতি, যেমন- ১) সৎ পিতা, ২) শ্বশুর পিতা, ৩) ডাকা পিতা, ৪) চাচা, জেঠাকেও ছোট/বড় বাবা ডাকা হয় কোথাও কোথাও, ৫) আদি পিতা, ৬) পীর বাবা, ৭) জাতির পিতা ইত্যাদি। এই শেষ সম্পর্কটিতেই বোধ হয় এখনো কেউ মাকে নির্ধারণ করেনি। কেননা, জাতির মাতা আছেন বলে এখনো শোনা যায়নি।

"জাতির পিতা"র যৌক্তিকতা কি?
মাতা ও পিতার সমার্থ অর্থে ব্যবহৃত উপরে উল্লেখিত ৬টি ও ৭টি সম্পর্কের প্রথম ৬+৬=১২ টি সম্পর্কের ক্ষেত্রেই মানুষের যার যার নিজস্ব সম্পর্ক ও পছন্দ অনুযায়ী খুব একটা দ্বিমত করে না। শুধুমাত্র পিতৃ সম্পর্কের সপ্তমটি অর্থাৎ, "জাতির পিতা"র ক্ষেত্রেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায় মানব সমাজ। অবশ্য আদি পিতার প্রসঙ্গে আজকালকার কিছু বিবর্তনবাদী তাদের গুরু ডারউইনের কিছু ধারণার উপর ভিত্তি করে নিজেরকে ব্যঙাচী অথবা বানরের বংশ বলে দাবী করে থাকে; অবশ্য তাতে বৃহত্তর মানব সমাজের কিছু যায় আসে না। আদি পিতার সন্তানদের মধ্যে তো আর সবাই একই পরিবার ভুক্ত নাই, অবাধ্য সন্তান থাকলে কিংবা নিজ থেকেই কেউ ত্যাজ্য হয়ে গেলে তো আর তার জন্য জগৎ সংসার ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবে না। প্রসঙ্গে ফেরা যাক, জাতির পিতা বলতে আজকাল তো বুঝায় যেন কোন দেশকে পরাধীনতার কবল হতে মুক্ত করার লক্ষ্যে পরিচালিত স্বাধীনতার আন্দোলনে-যুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা কিংবা একচ্ছত্র নেতৃত্ব দান করতে পারলেই তাকে সে "জাতির পিতা" বলে আখ্যায়িত করা হয়। এটা আসলে কতটুকু যুক্তিসঙ্গত? পিতার ভূমিকা কি এবং সে তুলানায় 'পরাধীনতা কিংবা বিপদ থেকে মুক্ত করা'ই কি পিতা হওয়ার কারণ হিসেবে কতটুকু যথেষ্ট?

"জাতি"র নানা রূপ:
"জাতি" শব্দ নিয়ে ভাবতে গেলে চিন্তার দুয়ারে কয়েক ধরনের বিভাজন এসে দাঁড়ায়। মানুষ হিসেবে আমরা মানব জাতি, ধর্মের ভিত্তিতে কেউ মুসলিম জাতি, কেউ খৃষ্টান, কেউ ইয়াহূদী, কেউ হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, মাজূসী ইত্যাদি জাতি, দেশ হিসেবে নিজ নিজ দেশের নামে নামে জাতি, যেমন- আমরা বাংলাদেশী জাতি, আবার দেশের ভেতরেও গোষ্ঠী হিসেবে জাতি ধরা হয়, যেমন- পাকিস্তানের পাঠান, ভারতের মারাঠা, শিখ, চীনের উইগুর প্রভৃতি। কিন্তু এখানে পিতৃত্ব দেয়া হচ্ছে ভূখণ্ড বা দেশ ভিত্তিক; যেহেতু পিতৃত্বের যোগ্যতা ও গুণাবলী আলোচ্য তাই মূখ্য হলো যাদেরকে সে পর্যায়ের মর্যাদা দেয়া হচ্ছে তারা আদৌ কি সে পর্যায়ের কিছু করেছে, না কি পুরোটাই আবেগের কারসাজী?

পিতার যোগ্যতা বিশ্লেষণ:
আসুন একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক- পৃথিবীর যেসব দেশে দেশে জাতির পিতা হিসেবে যাদেরকে ভূষিত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশ কিংবা প্রায় সবাইকেই এই একটি কারণেই "পিতা" খেতাব দেয়া হয়েছে যে, তারা সকলেই দেশকে, দেশের মানুষকে শত্রুমুক্ত করেছে, পরাধীনতার শৃংখল থেকে অবমুক্ত করেছে, স্বাধীনতা এনে দিয়েছে; স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাদের কথিত পিতৃত্বের ভূমিকা প্রসঙ্গ না হয় নাইবা টানলাম। অথচ পিতার সবচেয়ে বড় ও আসল যে গুণ তা হলো জন্মদান করা, একটু বিশ্লেষিত ভাষায় বললে- শুরু করা, জাতির ক্ষেত্রে নাম, পরিচয়, আকীদা-বিশ্বাস, কৃষ্টি-কালচার, জীবন পদ্ধতি ইত্যাদি সবকিছুকেই নতুন করে সূত্রপাত করা; যা "জন্মদান" শব্দের সত্যিকার সমার্থ প্রকাশ করে। কিন্তু শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ডকে শত্রুমুক্ত করা কিংবা কিছু মানুষকে অত্যাচার থেকে মুক্ত করে দেয়াতেই "পিতা" হবার যোগ্যতাসম্পন্ন মনে করাটা অযৌক্তিক। কেননা, পিতা কেন এরূপ সাহায্য যেকোন মানুষই অন্যের জন্য করতে পারে, যেমন- ভাই পারে, চাচা পারে, বন্ধু পারে, অপরিচিত যে কেউই পারে। অন্যদিকে পিতার ভূমিকা যথাযোগ্যতায় শুধু পিতাই নিতে পারেন।

পিতা হতে হলে পিতৃত্বের গুণ থাকা বাঞ্ছনীয়; ভ্রাতৃত্বের গুণে পিতা হওয়া যায় না:
যদি শত্রুমু্ক্ত করাকেই পিতার যোগ্যতা ধরা হতো, তাহলে মূসা আলাইহিস্ সালাম ফির'আওনের কবল থেকে বনী ইসরাঈল জাতিকে উদ্ধারের জন্য বর্তমান ইয়াহূদীদেরও পিতা হিসেবে মর্যাদা পেতেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি; বরং অন্যান্য নবীগণকে আল্লাহ্ যেভাবে স্ব স্ব জাতির ভাই বলে আখ্যায়িত করেছেন, যেমনটি কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন স্থানে এসেছে, ((তাদের ভাই নূহ্)) [সূরা আশ্-শু'আরা: ১০৬], ((তাদের ভাই হূদ)) [সূরা আশ্-শু'আরা: ১২৪], ((তাদের ভাই সালেহ্)) [সূরা আশ্-শু'আরা: ১৪২], ((তাদের ভাই লূত)) [সূরা আশ্-শু'আরা: ১৬১]; তেমনিভাবে মূসা 'আলাইহিস্ সালামও একজন নবী, তিনি তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জাতিকে অত্যাচারী ফির'আওনের কবল থেকে মুক্ত করে নতুন ভূখণ্ড সিনাই উপত্যকায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তথাপি তাকে বনী ইসরাঈলের পিতা হিসেবে না আল্লাহ্ তা'আলা গণ্য করেছেন আর না তার জাতি। কেননা, তিনি একজন দরদী বন্ধু, ভাই, কিংবা পথপ্রদর্শক হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেছেন। অপরপক্ষে, কথিত "জাতির পিতা"গণ তো সকলে মিলেও একজন নবীর সমতুল্য তো কোনদিনই নয়; কাছাকাছি কাজও করার যোগ্যতা রাখে না। অতএব, এটুকু কাজের জন্য কাউকে "জাতির পিতা" বলে আখ্যায়িত করা নিতান্তই অযৌক্তিক এবং সুস্পষ্ট অতিরঞ্জন।
(অসমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ সকাল ১১:০৯
৬৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×