পূর্বাংশ পড়ুন ।
কবরের উপর মসজিদ স্থাপন করা ও তাতে বাতি জ্বালানো প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতে আরো বর্ণিত আছে যে: ((তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কবরসমূহে নারী যিয়ারতকারিনীদের, সেখানে (কবরের উপর) মসজিদ স্থাপনকারীদের এবং সেসবে (কবরসমূহে) বাতি জ্বালানোওয়ালাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন।)) [আবু দাউদ: ২৮১৭, তিরমিযী: ২৯৪, নাসায়ী: ২০১৬, আহমাদ: ১৯২৬, ২৪৭২, ২৮২৯, ২৯৫২]
প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কবর সম্পর্কে আমাদের হুশিয়ার করে গেছেন যে: ((তোমরা আমার কবরকে ঈদগাহ বানিও না এবং তোমাদের গৃহগুলোকে কবর বানিও না।)) [মুসনাদে আহমাদ: ৮৪৪৯]
এছাড়াও কবরস্থানে মসজিদ তৈরি করা কিংবা মসজিদে কবর বানানো ইসলামে হারাম বলে ঘোষিত হয়েছে। কেননা কবরের প্রতি সম্মান দেখানো ও তাতে ইবাদত করা পর্যায়ক্রমে শির্কের মত অধঃপতনের প্রতি মানুষকে নিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ((আল্লাহ তাআ’লার অভিশাপ ইহুদি ও খৃষ্টানদের উপর তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে।)) [বুখারী ও মুসলিম] জুন্দুব রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পূর্বে তার নিকট হতে পাঁচটি অসিয়ত শুনেছেন, সেগুলোর মধ্যে একটি হল কবরকে মসজিদে রূপান্তরিত করার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি। হাদীসে এসেছে: وإن من كان قبلكم كانوا يتخذون قبور أنبيائهم و صالحيهم مساجد ، ألا فلا تتخذوا القبور مساجد ، فإني أنهاكم عن ذلك
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ((তোমাদের পূর্ববর্তীরা নবী ও সৎ লোকদের কবরকে মসজিদ বানাতো। সাবধান! তোমরা কবরকে মসজিদ বানিও না। আমি তোমাদেরকে এ থেকে নিষেধ করছি।)) [মুসলিম] তাই কবরস্থানে জানাজার সালাত ব্যতীত অন্য কোন সালাত বৈধ নয়।
এবার দেখা যাক যুক্তি কি বলে:
গৃহের প্রকারভেদ: গৃহ, ঘর, প্রাসাদ, ইমরাত ইত্যাদি যাই বলি না কেন, এসবের মৌলিক বিভাজন মূলত তিনটি- থাকার ঘর, কাজ করার ঘর এবং ইবাদাত-উপাসনার ঘর। কেউ কেউ আরো অন্যান্য ছোট ছোট ঘরের কথা তুলতে পারেন, কিন্তু সেসবগুলোই এই মৌলিক তিন প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। তাহলে লক্ষ্য করুন- কবরের উপর যে দেয়াল অথবা প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়ে থাকে, তার উদ্দেশ্য কি? সেখানে কেউ থাকবে? কেন থাকবে? নিজের শান্তিময় ঘর ফেলে কোন জীবিত মানুষ কি কারণে কবরের উপরে ঘর বানিয়ে থাকতে চাইবে? অথচ কবর বা মৃত্যুর নাম শুনলে এমন কোন মানুষ নেই যার অন্তর কেঁপে উঠে না। আবার যদি বলা হয় যে কাজের জন্য, তাহলে প্রশ্ন জাগে যে, কি কাজ তার কবরের উপর? কোন সুস্থ জীবিত মানুষ কবরের উপর কল-কারখানা, দোকান কিংবা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করবে না; যে করবে সে অবশ্যই কোন দূরভিসন্ধি নিয়েই করবে। যদি বলা হয় যে, ইবাদাত-উপাসনার জন্য, তাহলে তো উপরের আলোচনায় ইসলামের যে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে তা থেকে উক্ত ব্যক্তির গোমরাহী সুস্পষ্ট এবং সচেতন মুসলমানদের উচিত তাকে এ থেকে বিরত রাখা। ইসলামী সরকার হলে উচিত উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা যাতে অন্য কেউ এরূপ জঘন্য কর্ম সম্পাদন করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ না পায়।
থাকার ঘর: থাকার ঘর আমরা কেন নির্মাণ করি? তার কয়েকটি কারণ ও কবরের সাথে তুলনা দেখুন-
রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য: কবরের বাসিন্দার জন্য কি রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্জা থেকে বাঁচার জন্য ঘরের প্রয়োজন আছে? অবশ্যই নেই, কেননা মাটির যে বদ্ধ ঘরে সে ঘুমিয়ে অথবা যে মাটির সাথে সে মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেছে, সে মাটির উপরে কি হচ্ছে তাতে তার কিছুমাত্র যায় আসে না। পরন্তু সে মূলত এখন অন্য জগতের বাসিন্দা, তাই এ জগতের কোন কিছুর স্পর্শই তাকে ছুঁতে পারে না। ঘরে বাতি জ্বালানোর মত করে কবরে মোমবাতি জ্বালানো হয়, বলুন তো- সে আলো কি আদৌ কবরবাসী পর্যন্ত পৌঁছায়? তারা তো কবরে কোনরূপ ফাঁক-ফোঁকরও করে না, তাহলে উপরে বাতি জ্বালানো হয় কার জন্য? এটা কি এ জন্য নয় যে, তাদের চিন্তা মত অর্থের পতঙ্গরা ছুটে আসবে আর ভরে দেবে তাদের পেতে রাকা মটকা-হাঁড়ি। কি প্রকাশ্য লুণ্ঠন!
পারিপার্শ্বিক ভীতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য আমরা গৃহ নির্মাণ করি: কবর বাসীর কি সে ধরনের কোন ভয় আদৌ আছে? কখখনোই নেই। এই পৃথিবীতে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় হলো মৃত্যুর ভয়, তাহলে যে ব্যক্তি এই ভয়কে অতিক্রম করে গেছে, তার জন্য আর কি বাকী আছে নশ্বর এই ধরাধামে? কিছুই নেই; বরং পৃথিবীর কারুরই কোন সাধ্য নেই মৃত কোন ব্যক্তির বিন্দুমাত্র ক্ষতি সাধন করে। চাই সে লাশের কবর হোক কিংবা না হোক। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কর্তৃক কা'বার সীমানায় আক্রান্ত ও অবরুদ্ধ হয়ে আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবায়ের যখন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে তার মা আসমা বিনতে আবি বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুমের নিকট গমন করেন, তখন তিনি ছিলেন অন্ধ, হাতড়ে ফিরে যখন ছেলের গায়ে লোহার বর্ম দেখলেন, তখন বললেন: তুমি কি ভয় পাও? তিনি বললেন: শুনেছি হত্যা করার পর তারা লাশকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। বীরাঙ্গনা মা বললেন: বাবা, আমরা যে গবাদী পশু জবাই করে কেটে-কুটে রান্না করে খাই, তাতে কি তাদের কোন কষ্ট হয়? হয় না। উল্লেখ্য যে, আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবায়ের কিন্তু ভয়ে বর্ম পরেননি; বরং মাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য পরেছিলেন এবং কথাগুলো বলেছিলেন। কেননা, পরবর্তীতেও দেখা গেছে যে, তার লাশ গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এবং ওনার মাকেই তা নামিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। কথাগুলো একদিকে যেমন বীরত্বগাঁথা তেমনি প্রাসঙ্গিক আলোচনায় অসাধারণ উদাহরণ, তাই উল্লেখ করলাম।
লজ্জা নিবারণের জন্য আমরা গৃহ নির্মাণ করি: কিন্তু মৃত ব্যক্তি তো মাটির বদ্ধ ঘরের আড়ালেই থাকেন অথবা মিশে যান, তাহলে যাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না, চিরদিনের জন্য যিনি আড়ালে চলে গেছেন, তার জন্য লজ্জা নিবারণ কিংবা একান্ত কর্ম সুরক্ষার জন্য কি প্রাসাদ নির্মাণের কোন প্রয়োজন আছে? অবশ্যই নেই। বরং ব্যাপার যে অন্য কিছু তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সৌন্দর্য বা অহংকার প্রকাশের জন্য গৃহ নির্মিত হয়: ভেবে দেখুন, কবরবাসীর জন্য কি মৃত্যুর পর সৌন্দর্য কিংবা অহংকার প্রকাশের কোন সুযোগ আছে? অবশ্যই নেই; বরং উত্তরসূরী কেউ কবরের উপর সুরম্য প্রাসাদ কিংবা দেয়াল নির্মাণ করলে তার পেছনে অবশ্যই কোন পার্থিব স্বার্থ কিংবা উত্তরসূরী তার নিজের অহংকারই কবরবাসীর উপর চাপিয়ে দিচ্ছে এর মাধ্যমে। আর অন্য কেউ নির্মাণ করলে তার উদ্দেশ্য এ ছাড়া আর কিছু নয় যে, সে এর মাধ্যমে অর্থময় দৃষ্টিসমূহকে আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
(অসমাপ্ত)
পরের পর্ব পড়ুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

