“নিজেকে খোঁজা” ।। সীমাহীন শূন্যতার মাঝে কি করুন ভাবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আমি ।। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কিস্তি একই সাথে ।।
( পূর্ব প্রকাশনার পর )
( দ্বিতীয় কিস্তি )
এই মূহুর্তে তোমার ভৌগলিক অবস্থানটি কি ? ডেস্ক বা ল্যাপটপের সামনে । পৃথিবীর একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র যদি তোমার সামনে থেকে থাকে তবে ওখানে তোমার এই অবস্থানটি চিহ্নিত করার চেষ্টা করোতো । কলমের একটি বিন্দুও কি বসাতে পারবে ওখানে তোমাকে বোঝাতে যে, তুমি এইখানে আছো ? না কি তোমাদের পুরো বাড়ীটিই চিহ্নিত করতে পারবে ? পারা যাবেনা এই জন্যে যে, তুমি এতোই ক্ষুদ্র এই পৃথিবীর তুলনায় ।পৃথিবী খুব বিশাল একটা ব্যাপার স্যাপার তাইনা ? আর যদি বলি, তোমার সামনে রাখা একটি প্রমান সাইজের মহাকাশের মানচিত্রে পৃথিবীকে দেখাও তো ? পারবে ? তুমি খুঁজেই পাবেনা পৃথিবী নামের এই বিশাল একটি গ্রহকে । কারন, ওটা ওখানে দেখানোর কোনও সুযোগ নেই, তুলনায় ওটা এতোই ছোট্ট।
এখোন তুমি হয়তো রেগে গিয়ে বলেই বসবে, “আমি কি বাচ্চা ? আমাকে এভাবে বোঝাচ্ছো কেন ?” রাগ করতে নেই , রাগ করা ভালো নয় । হাসিখুশি থাকবে সব সময় যেমন চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙে যায় সবখানে । সূর্য্য ও তো হাসে, তাইনা ?
আর শুধু এই হাসি ই নয় কান্নার ও দেখা পাবো এই বিশাল মহাবিশ্বে নিজেকে খুঁজতে গিয়ে ।
ওকে, এবারে শোনো – যে তারাদের (ষ্টার) পাড়ায় তোমার ঘুম ভাঙে সকাল বেলায় অর্থাৎ তুমি-আমি-আমরা বাস করি তার নাম ‘দুধপথ’ (এটা মজা করতে বললাম) আসলে ‘ছায়াপথ’ অর্থাৎ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি । কি মজা, তারাদেরও নাকি পাড়া আছে ! আমাদের এই পাড়াটিতে কতোগুলি বাড়ী আছে , থ্থুড়ী .. ষ্টার আছে ? । আমাদের পরিচিত সূর্যকে(এটি একটি ষ্টার) যদি একটি বাড়ী হিসেবে ধরি তবে এখানে আনুমানিক দশ হাযার কোটি বাড়ী বা ষ্টার আছে এরকম । না.. না.. গাঁজা-টাজা খাইনি । এটা বিজ্ঞানের হিসেবে । বিজ্ঞান বলছে, এ হিসেব কেবলমাত্র আমাদের পাড়ায় দৃশ্যমান তারাদের হিসেব । এর বাইরেও যে কতো কোটি তারা রয়েছে, যাদের আমরা দেখছিনে তার পরিসংখ্যান তাদের হাতে নেই । ওহ্ গড্ … যাদের দেখছিনে, যারা নেই তারা আবার হিসেবের মধ্যে এলো কি করে ! হয়.. হয় … এমোনও হয়, যেমন এই মূহুর্তে তুমি আমাকে দেখছোনা অথচ মনে মনে কষে গাল দিচ্ছো এমোন ইনিয়ে বিনিয়ে লিখছি বলে, তার মানে আমি হিসেবের মধ্যেই আছি কোথাও না কোথাও । বিজ্ঞান বলে, দেখছিনে বলেই কি তাদের অস্তিত্ব ছিলো না কিম্বা নেই ? ছিলো এবং আছে । এই রকম ভাবেই তারারাও আছে অদৃশ্য, যাদের হিসেব আমরা জানিনে । বেশ জটিল মনে হচ্ছে ? আসলে ওরা জাতীয় পরিচয় পত্রের (ষ্টার ইনডেক্স) জন্যে ছবি তুলতে লাইনে দাঁড়াতে পারেনি । পারবে কি করে ? ওরা যে হারিয়ে গেছে অভিমানে অনেক অনেক দিন আগে । আর কোনদিনও তাদের দেখা আমরা পাবোনা । ওদেরকে ফিরিয়ে আনলে খুউব ভালো হতো তাইনা ? বিজ্ঞান বলছে, ওরা যে ভোঁ-দৌড়ে দৌড়িয়ে আমাদেরকে ফেলে রেখে গেছে পেছনে, অতো জোড়ে দৌড়ানোর শক্তি নেই আমাদের ঠাংয়ে । সুতরাং ওদের কাছে গিয়ে হাতখানি রেখে হাতের পরে যে বলবো, “ফিরে এসো, হে নীলিমা” তা আর হচ্ছেনা । হবেও না কোনদিন ………….
(তৃতীয় কিস্তি )
…… হবেও না কোনদিন ………….
কারন ওরা ছুটছে আলোর বেগের চেয়েও দ্রুত । আলোর গতিবেগ জানো নিশ্চয়ই ? উমমমমমম্ … গাল ফুলিও না । সেকেন্ডে, একলক্ষ ছিয়াশী হাযার মাইল । হারিয়ে যাওয়া সেই নীল তারারা এখোন কতোদুরে জানো ? তুমি জানবেই বা কি করে, যেখানে বিজ্ঞান নিজেই জানেনা ? ওরা কোনও ঠিকানা দিয়ে যায়নি আমাদের ! ঠিকানা জানা থাকলেও লাভ হোতনা কিছুই । কারন ঐ রকম গতিবেগে ছুটবে এমোন কোন যানবাহন নেই আমাদের, যে ওদের পিছু ধাওয়া করে বুড়ীটি ছুঁয়ে ফেলবো । আচ্ছা এসো, যারা আমাদের ভালোবাসা পায়ে ঠেলে দুরে সরে গেছে তাদের কথা কিছুক্ষন ভুলে থাকি না হয় । নিজেদের বাড়ীতে ফিরে যাই ।
এই বাড়ীটির মানে আমাদের সূর্য্যদেব এর উঠোনে আমরা অনেকগুলো ছোট ছোট গেষ্ট-হাউস, এখোন পর্যন্ত্ এরকম এগারোটি গেষ্ট-হাউস বা “গ্রহ/প্লানেট” নিয়ে আমাদের এই সোনালী আলোর সংসার । আমাদের মূল ঘরটি, মানে সূর্য্যটি নাকি যৌবন হারিয়ে মাঝবয়সী । এই মরলো বলে । অথচ দ্যাখো, এখোনও কি তার তেজ ! জ্বলছে, হৃদয়ের ভেতরে আগুনের পরশমনি জ্বালিয়ে, জ্বলছে । তোমার – আমার বেঁচে থাকার জন্যে সূর্য্যের এই নিজেকে পোড়ানো কি অদ্ভুত আত্মাহুতি ( সে আর এক কাহিনী ) তাইনা ? ধিকিধিকি নয়, কতো আগুন যে দাউদাউ করে জ্বলছে তার বুকে তুমি জানো ? তুমি আনবিক বোমা এবং তার ধংশের শক্তির কথা এতোদিনে জেনে থাকবে । হিরোশিমা কিম্বা নাগাসাকির দিকে তাকালেই চলে । ‘এ্যানোলা গে’ নামের যে বিমানটি থেকে প্রথম যে বোমাটি ছোড়া হয় তার নাম ছিলো ‘লিটল্ বয়’ । মাত্র বিশ হাযার টন “টিএনটি”র ধংশ ক্ষমতা ছিলো তাতে । জানলে অবাক হবে, সূর্য্যের বুকে প্রতি মূহুর্তে এরকম লক্ষ লক্ষ আনবিক বোমার আগুন জ্বলছে । জ্বলছে, গেল চারশো পঞ্চাশ কোটি বছর ধরে । কতো জ্বালা তার বুকে অনুমান করো । এই যে এখোন, আমার এই লেখাটি পড়তে পড়তে তোমার (পাঠক, আপনাদের ও ) যে গা পুড়ে যাচ্ছে রাগে; তার মাত্রা কতো ? মেপে দ্যাখো, মাত্র ৩৮ থেকে ৩৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস । অসহ্য তাইনা ? আর সুর্য্যের এই রাগ গিয়ে ঠেকেছে প্রায় এককোটি চল্লিশ লক্ষ ডিগ্রী সেলসিয়াসে । অসহ্যের ও বাইরে । ভাবা যায় ? বিজ্ঞান বলছে এর চেয়েও নাকি বেশী রাগী তারার সংখ্যা অগনিত ।
সূর্য্যের এতো যন্ত্রনা কেন ? কারন তার ভালোবাসার প্রথম কদমফুল খৈ’এর মতো ফুঁটছে তাতে । মহাশূন্যের প্রথম মৌল হাইড্রোজেন জোড়া লেগে হিলিয়ামে পরিনত হচ্ছে যে । ভালোবাসা প্রথমে হাল্কা থাকে, ধীরে ধীরে ভারী বা গাঢ় হয়, এটা আমরা সব্বাই ই জানি । মহাবিশ্বের প্রথম ভালোবাসা, দু’টো হাইড্রোজেন অনুর এক হয়ে যাওয়া । ঠিক যেন মানুষের ভালোবাসার মতো, দু’টো প্রান এক হওয়া । তাই হাইড্রোজেন সূর্য্যের আনবিক চুল্লীতে গাঢ় হয়ে যখোন ভারী অনু হিলিয়ামে পরিনত হচ্ছে তখোন তৈরী হচ্ছে শক্তি আর ছড়াচ্ছে ভালোবাসার উত্তাপ । সূর্য্যের বুকে প্রতি সেকেন্ডে ৬২০ মিলিয়ন মেট্রিক টন হাইড্রোজেন এভাবেই জোড়া লেগে যাচ্ছে । এই উত্তাপ থেকে জন্ম নিচ্ছে গামা রশ্মি । আমরা পাচ্ছি আলো । তারপর …… ?
……………. এই আলোতেই দৃশ্যমান হচ্ছে জগৎসংসার । লক্ষ কোটি তারাদের এমনি রয়েছে আলো তৈরীর নিজস্ব কারখানা , নিউক্লিয়র রি-এ্যাক্টর । তারাদের এই আলোতেই আমরা তাদের দেখতে পাই । রাতভর বৃষ্টির মতো, রাতের আকাশেও আলোর বন্যা বয়ে চলে । আমরা গান গাই, কেউ আসবে বলে জেগে থাকি ।
( চলবে…. গুছিয়ে লেখার খাতিরে কিছুটা সময় আপনাদের কাছে চাইছি, দেবেন তো ?)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

