“নিজেকে খোঁজা” ।। সীমাহীন শূন্যতার মাঝে কি করুন ভাবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আমি ।।
( পূর্ব প্রকাশনার পর )
(পঞ্চম কিস্তি )
তোমাকে একটা গল্প দিয়ে শুরু করছি আজকের লেখা । সত্যি গল্প ।মূল লেখার সাথে এর তেমন সম্পর্ক না থাকলেও কোথাও একটা মিল, গন্ধ খুঁজে পেলেও পেতে পারো ।
গল্পটি এই – দর্শনের এক নাস্তিক অধ্যাপক সৃষ্টিকর্তার সাথে বিজ্ঞানের সমস্যা বা বিরোধ নিয়ে কথা বলছিলেন ক্লাসে । ক্লাসে নতুন এক ছাত্রকে অধ্যাপক দাঁড়াতে বললেন এবং জিজ্ঞেস করলেন :
অধ্যাপক : ও.. তাহলে তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো ?
ছাত্র : অবশ্যই, স্যার ।
অধ্যাপক : তোমার ঈশ্বর কি ভালো লোক ?
ছাত্র : নিশ্চয়ই .. ।
অধ্যাপক : তোমার ঈশ্বর কি সর্বশক্তিমান ?
ছাত্র : নিশ্চয়ই .. ।
অধ্যাপক : আমার ছোটভাই ক্যানসারে মারা গেছে বছর খানেক হলো অথচ সে সবসময় তোমার ঈশ্বরকে ডেকেছে যেন ঈশ্বর তাকে সারিয়ে তোলে ।আমরা কমবেশী সবাই কোনও না কোনও ভাবে রোগাক্রান্তদের সাহায্য করি । অথচ তোমার ঈশ্বর তার জন্যে কিছুই করেননি । এইরকম একজন ঈশ্বর কেমন করে ভালো হয়, হুম ?
( ছাত্রটি নীরব )
অধ্যাপক: তোমার কাছে কোনও জবাব নেই, আছে কোনও ? তাহলে, আমরা আবার শুরু করি ? ঈশ্বর কি ভালো ?
ছাত্র : হ্যা ।
অধ্যাপক: শয়তান কি ভালো ?
ছাত্র : না ।
অধ্যাপক: শয়তান কোথ্থেকে এসচে ?
ছাত্র : ঈশ্বরই তাকে বানিয়েছেন … তার কাছ থেকেই এসচে…
অধ্যাপক: ঠিক বলেছ । এখোন আমাকে বলো, পৃথিবীতে কি খারাপি আছে ?
ছাত্র : হ্যা, আছে ।
অধ্যাপক : খারাপি সব জায়গাতেই আছে, তাইনা ? এবং তোমার ঈশ্বরই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন । ঠিক ?
ছাত্র : হ্যা ।
অধ্যাপক : তাহলে বলো, খারাপি কার সৃষ্টি ?
( ছাত্রের মুখে আর জবাব নেই )
অধ্যাপক : এখানে কি রোগ-শোক আছে ? মৃত্যু ? ঘৃনা ? কুৎসিততা ? সব ভয়ঙ্কর জঘন্য জিনিষগুলি পৃথিবীতেই আছে । আছে না ?
ছাত্র : হ্যা, স্যার ।
অধ্যাপক : সুতরাং বলো, এগুলো কার সৃষ্টি ?
( ছাত্রের মুখে কথা নেই, নিরব )
অধ্যাপক : বিজ্ঞান বলে, তোমার পাঁচটি ইন্দ্রিয় রয়েছে যা দিয়ে তোমার চারপাশের জিনিষগুলি তুমি চেনো এবং পর্যবেক্ষন করো । এখোন তুমি আমাকে বলো, ঈশ্বরকে কি তুমি দেখেছো ?
ছাত্র : না, স্যার ।
অধ্যাপক : আমাদের বলো, ঈশ্বরের কথা তুমি কখোনও শুনতে পেয়েছ কিনা ।
ছাত্র : না, স্যার ।
অধ্যাপক : তুমি কি তোমার ঈশ্বরকে ধরে দেখেছ ?তার গন্ধ পেয়েছ ?এ পর্য্যন্ত তোমার ইন্দ্রিয়ানুভুতি হয়েছে ঈশ্বরের ?
ছাত্র : না, স্যার । সত্যি বলতে কি, আমি তাকে শ্পর্শ করিনি কখোনও…..
অধ্যাপক : এরপরেও তুমি তাকে বিশ্বাস করো ?
ছাত্র : হ্যা ।
অধ্যাপক : পর্য্যবেক্ষন, পরীক্ষন, প্রমান ইত্যাদি যতো প্রোটোকল আছে বিজ্ঞানের, তা ই বলছে তোমার ঈশ্বরের কোনই অস্তিত্ব নেই । এখোন তুমি কি বলবে ?
ছাত্র : কিছুই না । আমার কেবল বিশ্বাসটুকু আছে ।
অধ্যাপক : হ্যা, বিশ্বাস… বিশ্বাস । আর এটাই হলো বিজ্ঞানের সমস্যা ।
ছাত্র : আমি কিছু বলতে চাই স্যার ।
অধ্যাপক : ও কে, য়্যু আর মোষ্ট ওয়েলকাম ।
ছাত্র : স্যার, তাপ (হিট) বলতে কি কিছু আছে ?
অধ্যাপক : হ্যা, থাকবেনা কেন ?
ছাত্র : ঠান্ডা বলতে কোনও কিছু কি আছে ?
অধ্যাপক : হ্যা, আছে ।
ছাত্র : না স্যার , এ রকম কিছুই নেই ।
( পুরো ক্লাস একদম নিরব, ঘটনা অন্য দিকে মোড় নেয়াতে )
ছাত্র : স্যার , আপনি অনেক অনেক তাপ পেতে পারেন । এমোন কি সুপার হিট, মেগা হিট, হোয়াইট হিট, লেস হিট কিম্বা নো-হিট ।কিন্তু ঠান্ডা বলতে কিছু নেই ।আমরা শুন্য ডিগ্রীর নীচেও ৪৬৫ ডিগ্রী নেমে যেতে পারবো যা কোনও তাপ নয় । এরচে’ বেশী আমরা নামতে পারবোনা ।কিন্তু ঠান্ডা বলতে কিছু নেই বিজ্ঞানে । তাপহীনতা বা তাপশুন্যতা বোঝাতেই আমরা ‘ঠান্ডা’ শব্দটি ব্যবহার করি । আমরা তাপ মাপতে পারি, কিন্তু ঠান্ডা মাপতে পারিনা । ঠান্ডা তাপের বিপরীত অবস্থা নয় স্যার, এটি কেবল তাপের অনুপস্থিতি মাত্র ।
( পুরো ক্লাসে একদম পিনপতন নিস্তব্দতা )
ছাত্র : স্যার , অন্ধকার সম্মন্ধে আপনার কি ধারনা ? অন্ধকার বলতে কিছু আছে কি ?
অধ্যাপক : হ্যা । যদি অন্ধকারই না থাকবে তবে রাত্রি আসে কোথ্থেকে ?
ছাত্র : আপনি আবারও ভুল বললেন । কোনও আলোর অনুপস্থিতিই অন্ধকার । আপনি কম আলো দেখতে পাবেন, স্বাভাবিক আলো দেখতে পাবেন, উজ্বল আলো দেখতে পাবেন কিন্তু যখোনই আপনি কিছু সময় আলো দেখতে পাবেন না তখোনই আপনি তাকে অন্ধকার বলবেন, ঠিক কিনা ? সত্যিকার অর্থে অন্ধকার বলতে কিছু নেই ।যদি থাকতো তবে সেই অন্ধকারকে কি আরো অন্ধকার করতে পারতেন ?
অধ্যাপক : আসলে তুমি কি বলতে চাও, ইয়ংম্যান ?
ছাত্র : স্যার, আমার বলার অর্থ হলো, আপনার ফিলোস্যোফিকাল অঙ্গনটি বা চিন্তা-ভাবনাগুলো ভুলে ভরা ।
অধ্যাপক : ভুলে ভরা ? তুমি কি ব্যাখ্যা করতে পারবে ?
ছাত্র : আপনি দ্বৈততা (ড্যুয়ালিটি) নিয়ে কাজ করছেন ।আপনি তর্ক করছেন, যেহেতু জীবন আছে তাই মৃত্যুও আছে, ভালো ঈশ্বর এবং মন্দ ঈশ্বরও আছেন ।আপনি ঈশ্বরের অস্তিত্বের ধারনাটি একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে দেখছেন যেন তা আমরা সহজেই মেপে দেখতে পারি । স্যার, বিজ্ঞান কিন্তু এখোনও ‘চিন্তা’র কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারেনি ।বিজ্ঞান আপনার বিদ্যুত আর চৌম্বকত্ব নিয়েই কাজ করে কিন্তু দেখতে পায়না তাদের । এমোন কি এ দু’টো সম্পর্কে তারা ঠিকঠাক বুঝেও উঠতে পারেনি । জীবনের বিপরীতে মৃত্যুকে দেখা হলো, মৃত্যু যে বাস্তবিক কোন মূল্য নিয়ে থাকতে পারেনা সেই সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা ।মৃত্যু জীবনের বিপরীত কিছু নয় বরং জীবনের অনুপস্থিতি । স্যার, এবার আমাকে বলুন; আপনি কি আপনার ছাত্রদের পড়াচ্ছেন যে, তাদের উদ্ভব হয়েছে বানর থেকে ?
অধ্যাপক : হ্যা, তুমি যদি প্রকৃতির বিবর্তন প্রক্রিয়ার কথা বুঝিয়ে থাকো, তবে অবশ্যই আমি তা পড়াই ।
ছাত্র : আপনি কি নিজের চোখে এই বিবর্তন দেখেছেন ?
( আলোচনা কোথায় গড়াচ্ছে বুঝতে পেরে অধ্যাপক হাসির সাথে মাথা নাড়লেন )
ছাত্র : যেহেতু কেউই এপর্যন্ত বিবর্তন প্রক্রিয়াকে সক্রিয় অবস্থায় দেখেনি এবং প্রমানও করতে পারেনি যে এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া তাহলে আপনি কি আপনার নিজের ধারনাটাই ছেলেদের পড়াচ্ছেন না স্যার ? তাহলে কি আপনি একজন বিজ্ঞানী নন, কেবল প্রচারক ?
( ক্লাসশুদ্ধ হৈ হৈ করে উঠলো )
ছাত্র : বন্ধুরা , আপনারা কেউ কি স্যারের মগজটি (ব্রেইন) দেখতে পাচ্ছেন ?
( হাসিতে ভেঙ্গে পড়লো ক্লাস )
ছাত্র : এখানে এমোন কেউ কি আছেন, যিনি স্যারের মগজের কথা শুনতে পেয়েছেন,স্পর্শ করেছেন অথবা গন্ধ নিতে পেরেছেন ? আমার মনে হয়না এমোনটা কেউ পেরেছেন । তাই পর্যবেক্ষন, পরীক্ষন, সংগঠন করে দেখানোর প্রতিষ্ঠিত নিয়ম মতো বিজ্ঞান বলছে, আপনার কোনও মগজই নেই স্যার । যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন করেই বলছি স্যার, তাহলে আপনার লেকচার আমরা কিভাবে বিশ্বাস করবো ?
(সমস্ত ক্লাস আবার পিনড্রপ সাইলেন্ট । সারা মুখমন্ডলে একটা অনিশ্চয়তার ভাব নিয়ে অধ্যাপক ছাত্রটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন শুধু ।)
অধ্যাপক : আমার মনে হয়, তোমাকে বিশ্বাসের সাথে এটা মেনে নিতে হবে ।
ছাত্র : আমিও তাই বলছি, স্যার । মানুষ আর ঈশ্বরের মধ্যেকার যোগসূত্রটাই হলো বিশ্বাসের ।
( গল্পটি ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের জীবনের )
নিজেকে খুঁজতে গেলে এই কাহিনীটাকে মনে রাখতে হবে । এর প্রয়োজনটা পড়বে আগের কিস্তিগুলোতে যা বলা হয়েছে তার যথাযথ একটা ব্যাখ্যা পেতে আর ঐসব সৃষ্টিছাড়া অবিশ্বাস্য ব্যাপ্তির উদ্দেশ্য জানতে । আসলে লেখার প্রথমেই তো বলেছি, “……এর শুরুই বা কোথ্থেকে হবে আর শেষটুকুও বা কোথায় গিয়ে ঠেকবে..”।
“নিজেকে জানো” বলা যতো সহজ, জানা ততো সহজ নয় । এটি একটি “মাল্টি ফ্যাকটোরাল” বিষয় । আমি তোমাকে শুধু শেষমেশ “চানাচুর” বানানোর জন্যে আগে থেকেই বাদাম ভেজে দিচ্ছি, চানা ভাজছি, চিড়া ভেজে রাখছি, ঝুরি তৈরী করে রাখছি আলাদা আলাদা ভাবে । সবশেষ হলে একসাথে মিলিয়ে স্বাদের চানাচুরটি বানিয়ে ফেলবো …..
( চলবে…. গুছিয়ে লেখার খাতিরে কিছুটা সময় আপনাদের কাছে চাইছি, দেবেন তো ?)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুন, ২০১১ দুপুর ২:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



